রবিবার, ১৯শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৫ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ ব্যর্থ করে দেয়ার আহ্বান জানালেন সর্বোচ্চ নেতা

পোস্ট হয়েছে: আগস্ট ১১, ২০১৯ 

news-image

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহ’র জিয়ারতকারী হাজিদের উদ্দেশে দেয়া এক বাণীতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এবং তাদের রিংলিডার আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করাকে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর ঘাতক ও যুদ্ধবাজদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করারই নামান্তর বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেছেন, আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার অর্থ হবে দায়েশ ও মার্কিন ব্ল্যাকওয়াটারের মতো উগ্র সন্ত্রাসবাদীদের নিন্দা জানানো, শিশু হত্যাকারী ইহুদিবাদী সরকার ও এর সাহায্যকারী ও পৃষ্ঠপোষকতা দানকারীদের প্রতি মুসলিম উম্মাহর ঘৃণা প্রদর্শন এবং স্পর্শকাতর পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে আমেরিকা ও তার সহযোগীদের যুদ্ধ বাধানোর অতৎপরতার নিন্দা জানানো।  তিনি ফিলিস্তিন সংকটকে মুসলমানদের রাজনৈতিক তৎপরতার শীর্ষে স্থান দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জালিম আমেরিকা ও তার সহযোগী বিশ্বাসঘাতক শাসকেরা ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ নামের যে ধোঁকাবাজির ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে তা গোটা মানব জাতির প্রতি একটি অপরাধ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শত্রুর এই প্রতারণা ভণ্ডুল করে দেয়ার জন্য সব মুসলমানের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইনশা আল্লাহ ইসলামি প্রতিরোধ ফ্রন্টের ঈমান ও প্রচেষ্টার সামনে সাম্রাজ্যবাদীদের এই অপকৌশলসহ অন্যান্য ধোঁকাবাজি ব্যর্থ হবে।

হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর পূর্ণাঙ্গ হজবাণী শনিবার সকালে সর্বোচ্চ নেতার হজ বিষয়ক প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলেমিন নবাব আরাফাতের ময়দানে পড়ে শুনিয়েছেন।রেডিও তেহরানের শ্রোতা ও পাঠকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ হজবাণীটি তুলে ধরা হচ্ছে।

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

ওয়ালহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন ওয়া সাল্লাল্লাহু আলা রাসুলিহিল কারিমাল আমিন, মুহাম্মাদ খতামুন্নাবিয়্যিন, ওয়া আলা আলিহিল মুতাহ্‌হিরিন সিমা বাকিয়াতুল্লাহি ফিল আরদিন, ওয়া আলা আসহাবিল মুনতাজাবিন ও মিন তাবেয়া’হুম বিইহসান ইলা ইয়াওমিদ্দিন।

প্রতি বছর মুসলিম উম্মাহর প্রতি পরওয়ারদিগার আল্লাহর রহমতের ফল্গুধারা হয়ে হজের মওসুম আগমন করে। পবিত্র কুরআন ‘ওয়া আযযিন ফিন্নাসি বিলহাজ’ বলে যে আহ্বান জানিয়েছে তার মাধ্যমে ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় এই রহমতের বিছানায় আসন গ্রহণ করার জন্য সকলের প্রতি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। খোদাপ্রেমিকদের অন্তর এবং প্রজ্ঞাবানদের দৃষ্টি ও চিন্তাশক্তি এই আহ্বানে সাড়া দেয়। প্রতি বছর হজ পালনকারী ব্যক্তিদের মাধ্যমে হজের শিক্ষাগুলো সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

হজে আল্লাহর জিকির ও ইবাদত হলো ব্যক্তি ও সমাজের আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রধান উপকরণ, একসঙ্গে মুসলমানদের সমাবেশ ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উম্মাহর প্রমাণ বহনকারী এবং একত্ববাদের কেন্দ্রবিন্দুকে ঘিরে সব বর্ণের মানুষের প্রদক্ষিণ ইসলামে বর্ণবৈষম্য না থাকার সুস্পষ্ট প্রমাণ তুলে ধরে। এর ফলে বোঝা যায়, ইসলামে বর্ণবৈষম্যের কোনো স্থান নেই এবং এখানে সবার জন্য সমান সুযোগ অবারিত রয়েছে। আর হজের এ আনুষ্ঠানিকতা বিশাল মুসলিম সমাজের একটি ছোট্ট নমুনা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে। ইহরাম, তাওয়াফ, সাঈ, উকুফ, রামি ইত্যাদি হচ্ছে আদর্শ মুসলিম সমাজের যে চিত্র ইসলাম বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে চায় সেগুলোর কিছু খণ্ডচিত্র।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত দেশ ও অঞ্চলগুলোর মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও সম্পদের আদানপ্রদান, পরস্পরের খোঁজখবর গ্রহণ, ভুল বোঝাবুঝির অবসান এবং অভিন্ন শত্রুর মোকাবিলা করার লক্ষ্যে সবার সক্ষমতাগুলো একত্র করা হচ্ছে হজের অন্যতম বিশাল অর্জন যা অন্যান্য জমায়েত বা সমাবেশ শত শত বার অনুষ্ঠিত করেও অর্জন করা সম্ভব নয়।

হজের বারাআত অনুষ্ঠানটি হচ্ছে নির্যাতিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর বলদর্পী ও আধিপত্যকামী শক্তিগুলোর সব ধরনের জুলুম, নিষ্ঠুরতা, অন্যায় ও অপকর্মের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন এবং  সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর বলপ্রয়োগ ও ছাড় আদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলারই নামান্তর।

আজ শিরক ও কুফরের আস্তানা হিসেবে পরিচিত সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এবং তাদের রিংলিডার আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা হচ্ছে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর ঘাতক ও যুদ্ধবাজদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করারই সমতুল্য। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার অর্থ হচ্ছে দায়েশ ও মার্কিন ব্ল্যাকওয়াটারের মতো উগ্র সন্ত্রাসবাদীদের নিন্দা জানানো, শিশু হত্যাকারী ইহুদিবাদী সরকার ও এর সাহায্যকারী ও পৃষ্ঠপোষকতা দানকারীদের প্রতি মুসলিম উম্মাহর ঘৃণা প্রকাশ এবং স্পর্শকাতর পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে আমেরিকা ও তার সহযোগীদের যুদ্ধ বাধানোর অপতৎপরতার নিন্দা জানানো। এসব অপশক্তি বিভিন্ন নির্যাতিত জাতির দুঃখ-দুর্দশা ও কষ্টকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে এবং প্রতিদিনই নানাভাবে তাদের ওপর নির্যাতন ও দমন অভিযান পরিচালনা করছে।

বারাআত অর্থ হচ্ছে ভৌগোলিক সীমানা, বর্ণ ও বংশ পরিচয়ের ভিত্তিতে সৃষ্ট বৈষম্য ও বর্ণবাদী আচরণের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা। সেইসঙ্গে বারাআতের আরেকটি লক্ষ্য হচ্ছে ন্যায়বিচার, সমতা ও সম্মানিত আচরণের বিপরীতে সাম্রাজ্যবাদী ও মতভেদ সৃষ্টিকারীদের জঘন্য আচরণের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করা; কেননা ইসলাম সবাইকে ন্যায়বিচার, সমতা ও সম্মানিত আচরণের দিকে আহ্বান জানিয়েছে।

এগুলো হচ্ছে হজ্জে ইব্রাহিমির বিশাল বরকতের ক্ষুদ্র কিছু নমুনা যেগুলোর প্রতি প্রকৃত ইসলাম আমাদেরকে আহ্বান জানায়।

আর প্রতি বছর মুসলিম বিশ্বের একটি অংশ হজের আনুষ্ঠানিকতা পালন করে যে বিশাল ও অর্থপূর্ণ ইবাদতে শামিল হয় তার মাধ্যমে তারা সুস্পষ্টভাবে সবাইকে একথা জানান দেয় যে, মুসলিম উম্মাহ ঠিক এরকম একটি সমাজ গঠনের জন্যই যুগ যুগ ধরে অপেক্ষার প্রহর গুণছে। এক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের চিন্তাবিদগণ যাদের একটা অংশ এই মুহূর্তে হজের আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দিয়েছেন, তাদের কাঁধে বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। হজের এই শিক্ষাগুলো তাদের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়বে এবং সাধারণ মুসলমানরা তাদের মাধ্যমেই আধ্যাত্মিকতার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে।

বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে ফিলিস্তিন সংকট। ভাষা, বর্ণ ও মাজহাব নির্বিশেষে এই সংকট সকল মুসলমানের সব ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতার শীর্ষে স্থান পাওয়া উচিত। সাম্প্রতিক শতাব্দিগুলোর ভয়ানকতম জুলুম ফিলিস্তিনে সংঘটিত হয়েছে। এই বেদনাদায়নক ঘটনায় একটি জাতির ভূমি, ঘরবাড়ি, কৃষিক্ষেত, সহায়-সম্বল, সম্মান-সম্ভ্রম ও আত্মপরিচিতি’সহ সব কিছু জবরদখল করা হয়েছে। কিন্তু এই জাতি আল্লাহর রহমতে এখনো পরাজয় মেনে নিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়নি বরং প্রতিদিন নতুন উদ্যোমে জিহাদের ময়দানে অবতীর্ণ হচ্ছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ফিলিস্তিনি জাতির এই প্রচেষ্টার সাফল্য নির্ভর করছে তাদের প্রতি সকল মুসলমানের সম্মিলিত পৃষ্ঠপোষকতার ওপর। জালিম আমেরিকা ও তার সহযোগী বিশ্বাসঘাতক শাসকেরা ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ নামের যে ধোঁকাবাজির ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে তা শুধু ফিলিস্তিনি জাতির প্রতি নয় বরং গোটা মানব জাতির প্রতি একটি অপরাধ। আমরা শত্রুর এই প্রতারণা ও অপকৌশলকে পরাস্ত করার লক্ষ্যে সকলের সক্রিয় উপস্থিতি কামনা করছি এবং আশা করছি ইনশা আল্লাহ ইসলামি প্রতিরোধ ফ্রন্টের ঈমান ও প্রচেষ্টার সামনে সাম্রাজ্যবাদীদের এই অপকৌশলসহ অন্যান্য ধোঁকাবাজি পণ্ড হবে।

মহান আল্লাহ যেমনটি বলেছেন: “না তারা ষড়যন্ত্র করতে চায়? অতএব যারা কাফের, তারাই ষড়যন্ত্রের শিকার হবে।” সদাকল্লাহুল আলিয়্যুল আযিম। মহান আল্লাহর দরবারে সকল সম্মানিত হাজির জন্য সুস্বাস্থ্য, রহমত ও সাফল্যে কামনার পাশাপাশি তাদের সবার ইবাদত কবুল হোক সে দোয়া করছি।পার্সটুডে।

সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী

১৪ মোরদাদ ১৩৯৮ সাল মোতাবেক

৩ জিলহাজ, ১৪৪০ হিজরি।”