রবিবার, ১৬ই জুন, ২০১৯ ইং, ২রা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

জ্যোতির্ময় মহামানব : ইমাম আলী বিন মূসা রেযা (আ.)

পোস্ট হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৭ 

খন্দকার মোঃ মাহফুজুল হক

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষ সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জন্য উত্তম জীবন বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছেন, সেই ঐশী জীবন বিধান বা আল্লাহর বাণী বহন করে যুগে যুগে একদল নিষ্কলুষ, আলোকময় পুরুষ দুনিয়াতে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁরা আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত, প্রেরিত। আল্লাহর বাণীবাহক এই আলোকিত মহামানবগণ নবী বা রাসূল নামে আখ্যায়িত হয়েছেন। হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মাদ (সা.) পর্যন্ত আলোক অভিযাত্রিগণের এ যেন এক সুদীর্ঘ কাফেলা। তাঁরা সমকালের মানবগোষ্ঠীর মাঝে আবির্ভূত হয়েছেন পর্যায়ক্রমে। একজনের কাজ
সমাপ্ত হতেই অন্যজনের হাতে কাজের দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে। এ দীর্ঘ কাফেলার সর্বশেষ মহামানব হলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এই ইহধাম ত্যাগ করার পর সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির কাছে আর কোন পয়গম্বর আসবে না। নবী বা রাসূল প্রেরণের পরিসমাপ্তি ঘটেছে শেষ পয়গম্বর আবির্ভূত হওয়ার মধ্য দিয়ে। তাই বলে ঐশী জ্ঞান বিতরণের কাজ বন্ধ হয়ে যায় নি। কোন দিন তা বন্ধও হবে না। কারণ, সর্বশেষ পয়গম্বরের মাধ্যমে মানবজাতির কাছে যে জীবন বিধান পাঠানো হয়েছে তা চিরন্তন। মহাপ্রলয় পর্যন্ত এই জীবন বিধান কার্যকর থাকবে। অতএব,এই জীবন বিধান বুকে বহন করে নির্ভুলভাবে তা ব্যাখ্যার মহান দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে বিশ্বনবীর সুযোগ্য ও জ্যোতির্ময় উত্তর পুরুষের একটি ক্ষুদ্র দলের ওপর। তাঁরা আহলে বাইতের পবিত্র ইমাম হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। তাঁদেরই একজন হলেন ইমাম আবুল হাসান আলী বিন মূসা রেযা (আ.)। তিনি পবিত্র নবীবংশ বা আহলে বাইতের অষ্টম ইমাম। ১৪৮ হিজরির ১১ জিলকদ মদীনা শরীফে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
ইসলামের ইতিহাস গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, পবিত্র আহলে বাইতের মনোনীত বারো জন ইমাম পবিত্র কোরআন ও রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের একমাত্র অনুমোদিত ব্যক্তি। তাঁরা এই মহান কাজের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে। বিশ্বনবীর মাধ্যমে মানবম-লীর কাছে যে জীবন বিধান পাঠানো হয়েছে তা সর্বকালীন। কেয়ামত পর্যন্ত নতুন কোন ঐশী বিধান মানুষের কাছে পাঠানো হবে না। পবিত্র কোরআনের চিরন্তনতা এবং খতমে নবুয়্যত বা নবী-রাসূল প্রেরণের পরিসমাপ্তির এই দর্শন সু¯পষ্টভাবে এটাই ইঙ্গিত করে যে, রাসূলে পাক (সা.)-এর ইহধাম ত্যাগের পর এমন নেতৃত্বের প্রয়োজন যাঁরা নি®পাপ ও পূতপবিত্রতার জায়গা থেকে কোরআন ও সুন্নাহর সঠিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করবেন।
তাছাড়া নবীজির ওফাতকালীন কিছু ঘটনা পর্যালোচনা করলে তাঁর ওফাত-পরবর্তীকালে আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের অপরিহার্যতার যৌক্তিক কারণ উপলব্ধি করা যায়। ঐ সময়ে মুসলমানদের সাথে তৎকালীন প্রবল পরাক্রমশালী রোমান সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রত্যক্ষ যুদ্ধ (মুতার যুদ্ধ) যেমন চলছিল তেমনি অপর প্রবল পরাক্রমশালী পারস্য সম্রাটও নবীজির ইসলামি দাওয়াতের প্রত্যুত্তরে চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছিল। অন্যদিকে কিছু ভ- নবীর উত্থানের পাঁয়তারা চলছিল। যে কারণে অন্তিম সময়ে নবীজি ফেতনা-ফ্যাসাদ চতুর্দিক থেকে ধেয়ে আসছে বলে আক্ষেপও করেছেন! একইভাবে ঐ সময় মুহাজির ও আনসারগণের মধ্যেও প্রচুর পক্ষ পরিবর্তনকারীর অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। অতএব, একজন বিচক্ষণ সত্যদ্রষ্টা, সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ হিসেবে শেষনবী তাঁর অনুসারীদের পথপ্রদর্শন, ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং আসন্ন চরম বিশৃঙ্খলা মোকাবেলা করার জন্য কোনো সুযোগ্য নেতা নির্বাচনের গুরুত্বকে অবহেলা করবেন, বা এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উম্মতের হাতে ছেড়ে দিয়ে যাবেন, এমন বক্তব্য ইসলামের মৌলিক দর্শনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয় না।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ¯পষ্টই উপলব্ধি করা যায় যে, নবী করিম (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বের বিষয়টি বিদায় হজ্বের অব্যবহিত পরে গাদীর খুম নামক স্থানেই সুরাহা হয়েছিল। এ বিষয়ে আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ প্রত্যাদেশ বাণীতে বলা হয়, ‘হে রাসূল! পৌঁছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না।’ (মায়েদা : ৬৭)
আদিষ্ট হওয়ার পর নবীজি সমবেত মুসলমানদের উদ্দেশে হযরত আলীকে মুসলমানদের নেতা এবং কোরআন ও সুন্নাহর ব্যাখ্যাতা হিসেবে ঘোষণা দেন। কিন্তু নবীজীর ওফাতের অব্যবহিত পর মুহাজির ও আনসারগণের একাংশের একটি সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে খলিফা নির্বাচনের কাজ স¤পন্ন হয়ে যায়, ফলে মুসলিম সাম্রাজ্যে আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব এবং প্রধান নির্বাহীর পদে বিভক্তির ধারা সূচিত হয়।
যাই হোক, গাদীরে খুমে আল্লাহর রাসূলের ঘোষণা থেকে উৎসারিত আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব কোটি কোটি মুসলমানের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে আছে। পবিত্র নবীবংশের অষ্টম পুরুষ ইমাম রেযা (আ.) ঐ আধ্যাত্মিক নেতৃত্বেরই অন্যতম প্রাণ পুরুষ। তিনি ১৮৩ হিজরিতে স্বীয় পিতা নবীবংশের সপ্তম পুরুষ ইমাম মূসা কাযেম (আ.)-এর শাহাদাতের পর পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে মুসলিম উম্মাহর ইমামতের ঐশী দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তিনি মানুষকে সত্য, ন্যায় ও কোরআন সুন্নাহর পথে চলার আহ্বান জানাতেন। তাঁর বক্তৃতা এবং উপদেশ বাক্যে পবিত্র কোরআনের উদ্ধৃতি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ব্যবহৃত হতো। জীবনের সর্বক্ষেত্রে কোরআনের দিকনির্দেশনা গ্রহণ করার জন্য তিনি মানুষকে নসিহত করতেন। এ স¤পর্কে তিনি বলেছেন, ‘কোরআন হচ্ছে আল্লাহর বাণী, কোনক্রমেই তা উপেক্ষা করো না, কোরআন ব্যতীত অন্য কোন কিছু থেকে দিকনির্দেশনা গ্রহণ করার চেষ্টা করো না, কারণ, তা তোমার জন্য বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তি ডেকে আনবে।’ তিনি বেশির ভাগ সময় কোরআন অধ্যয়ন ও গবেষণায় ব্যয় করতেন, প্রতি তিন দিনে একবার কোরআন খতম করা তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।
নবীবংশের প্রত্যেক ইমামের জীবন মহৎ গুণ, জ্ঞান, আর কল্যাণের নানা ঐশ্বর্যের মহিমায় সমুজ্জ্বল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ভাষ্য অনুযায়ী ইমামদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো সামাজিক-রাজনৈতিক সংগ্রাম। ইসলামের মধ্যে নানা বিকৃতি চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই সোচ্চার ছিলেন বিশ্বনবী (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইতের ইমামগণ। হিজরি প্রথম শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ইসলামি খেলাফত যখন সু¯পষ্টভাবেই রাজতন্ত্রের রূপ নেয় এবং ইসলামি নেতৃত্ব জাঁকজমকপূর্ণ বাদশাহিতে রূপান্তরিত হয়, তখন থেকেই আহলে বাইতের সম্মানিত ইমামগণ সকল অব্যবস্থা বা
অসঙ্গতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম চালাতে থাকেন। তাঁদের সংগ্রামের বৃহত্তর লক্ষ্য ছিল প্রকৃত ইসলাম এবং ইমামতের ভিত্তিতে হুকুমাত প্রতিষ্ঠা করা।
ইমাম রেযা (আ.)-এর ইমামতির সময়কাল ছিল বিশ বছর। এই বিশ বছরে আব্বাসী তিনজন শাসক যথাক্রমে বাদশাহ হারুন এবং তার দুই পুত্র আমিন ও মামুনের শাসনকাল তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই ইমাম রেযা (আ.) তাঁর পিতা ইমাম মূসা কাযেম (আ.)-এর নীতি-আদর্শকে অনুসরণ করেই এগিয়ে গেছেন। ফলে ইমাম মূসা কাযেম (আ.)-এর শাহাদাতের পেছনে যে উপাদানগুলো সক্রিয় ছিল, ইমাম রেযাও সেসবের মুখোমুখী হন। অর্থাৎ কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের নেপথ্য রোষের মুখে পড়েন তিনি। আব্বাসী রাজবংশে বাদশা হারূন এবং মামুনই ছিল দোর্দ- প্রতাপশালী। তাঁরা প্রকাশ্যে আহলে বাইতের ইমামদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রদর্শন করতেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ইমামদেরকে হত্যার চক্রান্ত করতেন।
ইমাম কাযেমের শাহাদাতের পর মদীনা শরীফের প্রভাবশালী ও জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিরা ইমাম রেযার প্রতি ঝুঁকে পড়েন। ইমামের প্রতি ইমানদার মুসলমানদের এই আগ্রহ আব্বাসী খলিফা মামুনকে বিচলিত করে তুলে। নবীবংশের এই ইমামের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে খলিফা মামুন তাঁর ক্ষমতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে ধরে নেন। ফলে ধূর্ত মামুন ইমাম রেযাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার নীতি গ্রহণ করেন। অবশ্য উমাইয়া এবং আব্বাসী সব শাসকই নবীবংশের সকল ইমামকে গণবিচ্ছিন্ন করে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছিল। মামুন যখন দেখল যে, ইমাম রেযার ক্ষেত্রে এই পুরানো কৌশল খুব একটা কার্যকরী হচ্ছে না, তখন তিনি ইমামকে মদীনা শরীফ থেকে তাঁর রাজধানী ইরানের অন্তর্গত খোরাসানে আসার আমন্ত্রণ জানান। ইমাম প্রথমত রাজি হন নি, কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁকে আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়। এরপর খলিফা নানা নাটকীয়তার আশ্রয় নেন। শেষ পর্যন্ত ইমামকে বিষ প্রয়োগে শহীদ করা হয়। তখন ইমামের বয়স ছিল মাত্র পঞ্চান্ন বছর। এভাবে ২০৩ হিজরির সফর মাসের ১৭ তারিখ ইসলামের ইতিহাসে আরেকটি কালো দিবস হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।
বিষ প্রয়োগে ইমামকে শহীদ করা হলেও আসল মৃত্যু ঘটেছিল মামুনেরই। পক্ষান্তরে ইমাম শাহাদাতের পেয়ালা পান করে অমর হয়ে গেলেন চিরকালের জন্য। তার প্রমাণ মেলে মাশহাদে তাঁর পবিত্র সমাধিস্থলে গেলে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে তাঁর মাযারে উপস্থিত হয়। ইমামের জন্মদিনে তাঁর মাযার প্রাঙ্গনে লাখো মানুষের ঢল নামে। সোনালি রঙ্গের সমাধি-ভবনের চারপাশ জাঁকজমক আর অপূর্ব ঐশ্বর্যে কোলাহল-মুখর হয়ে ওঠে। যুগ যুগ ধরে মানুষের নেক বাসনা পূরণের উসিলা হিসেবে কিংবদন্তিতুল্য খ্যাতি রয়েছে নবীবংশের ইমামগণের।
ইমাম রেযা (আ.) ও তাঁর পবিত্র মাযারও এর ব্যতিক্রম নয়। শুধু মাযার প্রঙ্গনই নয়, ইমামের সমাধিকে বুকে ঠাঁই দিয়ে পবিত্রতার সম্মানে সিক্ত হয়েছে গোটা খোরাসান প্রদেশ। ভক্তি ও আনত শ্রদ্ধায় খোরাসানবাসী মহান এই ইমামকে ‘শাহে খোরাসান’ খেতাবে সম্বোধন করে থাকে।
ইমাম রেযার অসংখ্য বক্তব্য এবং অগণিত উক্তি মানবজাতির জন্য অমূল্য স¤পদ ও পথ চলার উত্তম পাথেয় হয়ে আছে। এখানে তাঁর মহামূল্যবান কয়েকটি বাণী তুলে ধরা হলো।
‘জ্ঞান ও প্রজ্ঞা হচ্ছে এমন এক গচ্ছিত স¤পদের মতো যার চাবি হলো, প্রশ্ন। আল্লাহর রহমত তোমাদের ওপর বর্ষিত হোক, কারণ, প্রশ্নের মাধ্যমে চার ধরনের মানুষ অর্থাৎ প্রশ্নকারী, শিক্ষার্থী, শ্রবণকারী ও প্রশ্নের উত্তরদাতা সাওয়াব বা পুণ্য অর্জন করে।’
‘মুমিন ক্রোধান্বিত হলেও, ক্রোধ তাকে অপরের অধিকার সংরক্ষণ থেকে বিরত করে না।’
‘কিয়ামতের দিনে সেই ব্যক্তি আমাদের সর্বাধিক নিকটবর্তী হবে, যে সদাচরণ করে এবং তার পরিবারের সাথে সদ্ব্যবহার করে।’
‘যদি কেউ কোন মুসলমানের সাথে প্রতারণা করে, তবে সে আমাদের কেউ নয়।’
‘তিনটি কাজ সবচেয়ে কঠিন : এক. ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যবাদিতা। দুই. সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করা। তিন. ঈমানদার ভাইকে নিজ স¤পদের অংশীদার করা।’
লেখক : গবেষক ও লেখক