মঙ্গলবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর ভূমিকা

পোস্ট হয়েছে: আগস্ট ৩০, ২০১৮ 

মো. মাঈনউদ্দিন: ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ছিলেন ইমামতের আকাশের ষষ্ঠ তারকা। তিনি ৮৩ হিজরির ১৭ রবিউল আউয়াল মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন ও ৬৫ বছর বয়সে ১৪৮ হিজরিতে শাহাদাত বরণ করেন। তিনি জান্নাতুল বাকীতে প্রিয় পিতার পাশে সমাধিস্থ হন। একদা সেখানে সমাধি সৌধ ছিল, কিন্তু ৮ শাওয়ালের ওয়াহাবী তাণ্ডব ও পরবর্তী ঘটনা প্রবাহে তা আর আলাদা করে চিহ্নিত করার উপায় নেই।
তাঁর কুনিয়াহ ছিল আবু আব্দুল্লাহ ও উপাধি হলো সাদিক। তাঁর মহান পিতা ছিলেন ইমাম বাকির (আ.) ও মাতা ছিলেন উম্মে ফারভাহ।
ইমাম সাদিক (আ.) ইতিহাসের এমন এক অধ্যায় অতিক্রম করছিলেন, যখন বিশৃঙ্খলা, বিরোধ ও রাজনৈতিক বিবাদ ইসলামি সমাজে এমন আকারে বিস্তৃতি লাভ করেছিল যে, তদানিন্তন সমাজ ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। ঠিক এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার কারণে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটানোর জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল। তিনি তাঁর তীক্ষ্ম চিন্তার আলোকে জ্ঞানের অবগুণ্ঠন বিদীর্ণ করে বিশ্বমানবতাকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উপত্যকার সন্ধান দিয়েছেন।
ইমাম সাদিক (আ.)-এর অভূতপূর্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে তাফসীর, কোরআন তত্ত্ব, হাদীস, ফিকাহ, ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি অন্যান্য জ্ঞান, যেমন : গণিত, চিকিৎসাবিদ্যা, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা ও আরও শতাধিক বিদ্যার পাঠ দান করা হতো, যেগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানুষের জ্ঞানের উৎস হয়েছিল।
ইতিহাস সাক্ষী হয়ে আছে যে, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর ইন্তিকালের পর ইমামগণ নিজ নিজ সময়ের শাসকদের দ্বারা চাপের মধ্যে জীবন কাটিয়েছিলেন। তথাপি ইমাম সাদিক (আ.) কিরূপে সক্ষম হয়েছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের একাধিক শাখায় ভূমিকা রাখতে?
এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য ইমাম (আ.)-এর ইমামত কালে রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতি আলোকপাত করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ইমাম সাদিক (আ.) ১১৪ হিজরিতে ইমামত লাভ করেছিলেন। তাঁর ইমামত-কাল ছিল উমাইয়্যা শাসনের শেষ দিকের সমসাময়িক। ১৩২ হিজরিতে উমাইয়্যা শাসনের অবসান ঘটে ও আবাসীরা ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করে। সুতরাং উমাইয়্যা যুগের অবসান ও আব্বাসী যুগের সূচনা এমনই এক সময়ে ইমাম এক অপূর্ব সুযোগ হাতে পান। ইমাম এ সুযোগ জ্ঞান-বিজ্ঞান বিস্তারের জন্য কাজে লাগান। এ সময় উমাইয়্যা ও আব্বাসীরা ক্ষমতা রক্ষা করা ও ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করার জন্য দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল। সুতরাং শাসকশ্রেণি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত ছিল। আর শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নের এক সোনালি যুগ ইমাম সাদিক (আ.)-এর সময়ে রচিত হয়েছিল। এ সময়ই বিভিন্ন শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন রূপ পরিগ্রহ করেছিল। এর ধারাবাহিকতায় ইলমে ক্বারাআতে কোরআন, ইলমে তাফসীর, ইলমে হাদীস, ইলমে ফিক্হ, ইলমে কালাম, অপরদিকে চিকিৎসাবিদ্যা, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও রসায়ন ইত্যাদি বিদ্যা অস্তিত্ব লাভ করেছিল। জ্ঞানচর্চা এতটা প্রসার লাভ করেছিল যে, যার কাছে যা-ই চিন্তার খোরাক ছিল, তা-ই বাজারে বিকাতো। ফলে এক অদ্ভুত জ্ঞানপিপাসা সমাজে বিরাজ করছিল, তাই বিভিন্ন ধরনের চিন্তাগত দ্বিধা-দ্বন্দ্বেরও উদ্ভব হয়েছিল। আর এগুলোর জবাব দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল।
যা হোক বিভিন্ন জ্ঞানগত ধারার উৎপত্তির কারণ হিসেবে নিম্নলিখিত কারণগুলোকে উল্লেখ করা যায় :
(১) ইসলামে চিন্তা ও বিশ্বাসগত স্বাধীনতা : এ স্বাধীনতার মূল উৎস ইসলামের শিক্ষায়ই নিহিত। ফলে আব্বাসী খলিফারা চাইলেও তা রোধ করতে পারতেন না।
(২) তদানিন্তন ইসলামি সমাজ ছিল পরিপূর্ণরূপে মাযহাবী। ফলে জনগণ মাযহাবী প্রবণতার প্রভাব বলয়ে বিদ্যমান ছিল। জ্ঞানার্জনের ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর উৎসাহ এবং জ্ঞান, বিজ্ঞান ও চিন্তার পথে পবিত্র কোরআনের শিক্ষা এ জ্ঞানগত ধারাসমূহের উৎপত্তির পথে প্রধান উদ্দীপক ছিল।
(৩) বিভিন্ন ক্ষেত্র ও গোষ্ঠী, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল প্রকারান্তরে তারা পূর্ব থেকেই কিছু নিজস্ব ধ্যান-ধারণার অধিকারী ছিল। এগুলোর মধ্যে পারসিক, মিশরীয় ও সিরিয় সভ্যতা ছিল তদানিন্তন সভ্যতাসমূহের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁরা ইসলামের শিক্ষাকে গভীরভাবে অনুধাবনের জন্য গবেষণা, অনুসন্ধান ও মতবিনিময় করতেন।
(৪) অন্যান্য ধর্মের মানুষের সাথে মুসলমানদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস, বিশেষ করে আহলে কিতাবের সাথে অবস্থান। মুসলমানরা আহলে কিতাবের সাথে বসবাসকে নিজেদের দ্বীনের মূলনীতি বিরুদ্ধ বলে মনে করতেন না। তদানিন্তন আহলে কিতাবের মধ্যেও অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি ছিলেন। মুসলমানরা তাঁদের সাথে তাত্ত্বিক আলোচনা ও বিতর্ক করতেন।
এবার মূল শিরোনামের দিকে আলোকপাত করা যাক।
ইমাম সাদিক (আ.) বিদ্যমান পরিস্থিতিকে পূর্ণরূপে কাজে লাগালেন এবং স্বীয় পিতা পঞ্চম ইমাম বাকির (আ.)-এর কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় এক বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেন। সেখানে তিনি আক্বলী (বুদ্ধিবৃত্তিক) ও নাক্বলী (কোরআন, হাদীস…) বিষয়ে অনেক খ্যাতিমান শিষ্য ও ছাত্র লালন করেছিলেন। শেখ মুফিদ ‘আল ইরশাদ’-এর ২৭১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর ছাত্র সংখ্যা ছিল চার হাজারেরও বেশি। এদের মধ্যে হিশাম ইবনে হাকাম, মোহাম্মদ ইবনে মুসলিম আবান ইবনে তাগলিব, হিশাম ইবনে সালিম, মুমিন তাক্ব, মোফাজ্জাল ইবনে ওমর, জাবির ইবনে হাইয়্যান প্রমুখের কথা উল্লেখ করা যায়। আমরা এখানে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের প্রসারে ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর ভূমিকার উত্তম উদাহরণ হিসাবে তাঁর শিষ্যদের মধ্যে কারো কারো অমর কীর্তির দিকে আলোকপাত করব। আশা করি শিষ্যদের কর্ম তাঁদের গুরুর দৃষ্টান্তমূলক পরিচয় পাঠকের কাছে তুলে ধরবে।
হিশাম ইবনে হাকাম
হিশাম ইবনে হাকাম ৩১টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি একজন বিখ্যাত মুতাকাল্লিম ও বাগ্মী তার্কিক। তিনি ছিলেন ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর প্রথম সারির ছাত্র। তাঁর উল্লেখযোগ্য লিখনির মধ্যে রয়েছে, ইলমে কালামে ‘আল ইমামাহ’, ‘জাবর ওয়া এখতিয়ার’, উসূলে ফেকহ-এ ‘আলফায’।
মুমিন তাক্ব
মোহাম্মদ ইবনে নো’মান কুফী আবু জাফর মুমিন তাক্ব নামে খ্যাত। তিনি একাধিক কিতাব লিখেছেন এবং খাওয়ারেজের সাথে বিতর্ক করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো : ‘আল ইহতিজায ফীল ইমামাতু আলী (আ.)’, ‘আফয়ালু লা তাফয়াল’, ‘আররাদ্দু আলাল মু’তাযিলা’।
মোফাজ্জাল ইবনে ওমর কুফী
ইমাম সাদিক (আ.) প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বিষয়ে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছিলেন, যেখানে প্রকৃতির নিগূঢ় রহস্য উন্মোচিত হয়েছিল; যা আধুনিক যুগের বিজ্ঞানীদেরকে আজও বিস্মিত করে। ইমাম চার দিন ধরে মোফাজ্জালকে লিখিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তা ‘তাওহীদে মোফাজ্জাল’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিল।
প্রসঙ্গক্রমে ইমাম সাদিক (আ.) মোফাজ্জাল ইবনে ওমর কুফীকে বললেন : ‘আমি তোমার নিকট জগৎ সৃষ্টি, প্রাণিকুল, হিংস্র পশুসমূহ, পোকা-মাকড়, পাখিদের সৃষ্টি এবং যে কোন প্রাণী, মানুষ, চতুষ্পদ, বৃক্ষ-লতা, ফলজ ও ফলহীন বৃক্ষ, খাওয়ার যোগ্য ও খাওয়ার অযোগ্য বৃক্ষ-লতার সৃষ্টিতে মহান আল্লাহর প্রজ্ঞা সম্পর্কে বর্ণনা করব, যাতে উপদেশ গ্রহণকারীরা তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে পারে আর মুমিনদের মা’রেফাত বৃদ্ধি পায়, আর নাস্তিক ও কাফেররা তাতে পেরেশানিতে থাকে। আগামীকাল প্রভাতে আমার কাছে আস।’
ইমাম এরপর ধারাবাহিকভাবে চারদিন ধরে সৃষ্টির সূচনা থেকে মানুষের সৃষ্টি, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শক্তি, তার ফেতরাতগত গুণাবলি, মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সৃষ্টি, বিভিন্ন প্রকার পশু-পাখি সৃষ্টি, অনুরূপ আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টি, বিপদ-আপদ ও মৃত্যুর দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে বর্ণনা দেন। আর তা পরবর্তীকালে তাওহীদে মোফাজ্জাল হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিল।
জাবির ইবনে হাইয়্যান
ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর একজন অন্যতম ছাত্র ছিলেন জাবির ইবনে হাইয়্যান। তিনি রসায়নবিদ্যার ওপর একাধিক বই লিখেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী তিনি ইমাম (আ.)-এর শিক্ষা থেকে এ বইগুলো লিখেছেন। কারণ, তাঁর বইতে উল্লিখিত হয়েছে :
قال لی جعفر علیه‌ السّلام القی علی ‌جعفر علیه ‌‌السّلام، حدّثنی مولای جعفر علیه ‌السّلام، اخذت هذا العلم من جعفر ابن‌ محمّد سید أهل زمانه علیهما السّلام
জাবির তাঁর থিওরিগুলো প্রমাণের জন্য তদানিন্তন সময়ের উপযোগী করে একটি পরীক্ষাগারও তৈরি করছিলেন। তিনি তেজাব পানি ও সালফিউরিক এসিডের আবিষ্কারক। তাঁর লিখিত পুস্তক সংখ্যা পাঁচশ’।
আবু হামযা সুমালী
ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর অন্যতম ছাত্র। তিনি ছিলেন কুফার অধিবাসী, অন্যতম বিশ্বস্ত ও জ্ঞানী ব্যক্তি। তিনি কোরআনের তাফসীর লিখেছিলেন। তিনি ইমাম সাজ্জাদ (আ.), ইমাম বাকির (আ.), ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ও ইমাম মূসা কাজিম (আ.), এ চারজন ইমাম থেকেই কল্যাণ লাভ করেছিলেন।
ইমাম আবু হানিফা
ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর বিশ্ববিদ্যালয় কেবল মাত্র তাঁর একান্ত অনুসারীদের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং আহলে সুন্নাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিগণও তাঁর এ বিদ্যানিকেতনে আশ্রয় পেয়েছিলেন। তাঁদের অন্যতম ছিলেন ইমাম আবু হানিফা যাঁর নামে হানাফী মাযহাব প্রচার লাভ করেছিল। তিনি দুই বছর ইমাম থেকে শিক্ষা নেয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। আর এ দুই বছরকে তিনি জ্ঞান ও বিদ্যার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন : لو لا السنتان لهلك نُعمان ‘যদি ঐ দুই বছর না থাকত, তবে নোমান ধ্বংস হয়ে যেত।’
উল্লেখ্য, ইমাম আবু হানিফার নাম নো’মান ইবনে সাবেত।
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) নিজ সময়ের সমস্ত চিন্তা ও বিশ্বাসগত ধারার সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং তাদের মোকাবেলায় ইসলাম এ আহলে বাইতের মতাদর্শগত অবস্থানকে পরিষ্কার করেছিলেন এবং ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিলেন। আর তাই তাবৎ জ্ঞান-বিদ্যা ইমামতের আকাশের এ ষষ্ঠ তারকার নিকট ঋণী।
তথ্যসূত্র
১. সিরায়ে পিশবুয়গ সাহদী পিশাভারী
২. উইকিপিডিয়া