বুধবার, ১৪ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১লা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

English

জেনারেল সোলাইমানি: অন্তহীন এক বীরের স্মৃতিকথা

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ৯, ২০২১ 

সিরাজুল ইসলাম –

কালের গর্ভে চলে গেল একটি বছর। স্মৃতির পাতায় জমা হয়েছে অনেক কথা, অনেক দুঃখ-ব্যথা। তিনি চলে গেছেন নশ্বর এ পৃথিবী ছেড়ে। কিন্তু স্মৃতির মণিকোঠায় উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছেন এখনো। এই উজ্জ্বল নক্ষত্র আর কেউ নন, তিনি ইরানের মহাবীর কাসেম সোলাইমানিÑ বহু বিপ্লবী মানুষের প্রাণপুরুষ।
বছর ঘুরে আবার এসেছে সেই অভিশপ্ত ৩রা জানুয়ারি। ২০২০ সালের এই দিনে খুব ভোরে মার্কিন সন্ত্রাসী বাহিনী ইরাকের বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় জেনারেল কাসেম সোলাইমানির গাড়িবহরে। এতে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন তিনি। তাঁর সঙ্গে আরো শহীদ হন ইরাকের জনপ্রিয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হাশদ আশ-শাবির সেকেন্ড ইন-কমান্ড আবু মাহদি আল-মুহান্দিস এবং আট সঙ্গী। মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিভে যায় বিশ্বের এক নম্বর সমর নায়কের প্রাণপ্রদীপ। তবে তিনি রেখে যান অজস্র কর্ম। তাঁর দেখানো পথই আলোকবর্তিকা হয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধকামীদের জন্য। কর্মের মাঝেই বেঁচে আছেন; মহৎ কর্মের মাঝেই বেঁচে থাকবেন ইরানের এ কমান্ডার।
আমেরিকা কেন হত্যা করল জেনারেল সোলাইমানিকে?
একথা আজও বড় হয়ে দেখা দেয় যে, আমেরিকা কেন এই মহান সমরবিদকে নির্মম ও বর্বরভাবে হত্যা করল? এ আলোচনার হাত ধরে গভীরে প্রবেশ করলে বেরিয়ে আসবে আমেরিকার ভয়াবহ এক কুৎসিত চোহারা। উন্মোচিত হবে মানবতার ছদ্মাবরণে মার্কিনিদের ভয়ঙ্কর মানবতাবিরোধী তৎপরতার কথা।
কুদস ফোর্সের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কাসেম সোলাইমানি ইরানের হয়ে সিরিয়া ও ইরাকের মাটিতে তৎপর উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে জটিল ও কঠিন সব অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানে সন্ত্রাসীরা সব চোখে সর্ষের ফুল দেখেছে। দিন দিন ফুরিয়ে আসছিল সন্ত্রাসীদের প্রাণবায়ু। এ অবস্থায় আমেরিকা জেনারেল সোলাইমানিকে বর্বরভাবে হত্যার পথ বেছে নেয়। কারণ, যে লক্ষ্য নিয়ে উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে মধ্যপ্রাচ্যে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, জেনারেল সোলাইমানি বেঁচে থাকলে সেসব লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। তাতে আমেরিকার ভা-ার শূন্য থেকে যায়। শূন্যেরে তাই পূর্ণ করতেই আমেরিকা নিষ্ঠুরতার পথ বেছে নেয়; শহীদ করে জেনারেল সোলাইমানিকে।
ইসলামের শত্রুরা আইএস বা দায়েশ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সৃষ্টি করেছে যাতে ইসলাম ও মুসলিম জাতিগুলো সম্পর্কে সারা বিশ্বে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা যায়। অন্যদিকে তারা আইএস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে ইরাক ও সিরিয়ায় তাদের অবৈধ উপস্থিতি জোরদার করার চেষ্টা করছে। এভাবে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে ইরাক ও সিরিয়াসহ পশ্চিম এশিয়ার তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মূলোৎপাটন সম্ভব হলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ভিন্ন হবেÑ একথা ভেবে আমেরিকা, ইহুদিবাদী ইসরাইল ও তাদের পশ্চিমা এবং আঞ্চলিক মিত্ররা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক সমাধান কিংবা কূটনীতির পথ কোনটাতেই তারা নিরাপদ বোধ করে নি। তারা বেছে নেয় সন্ত্রাসের পথ। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে, সমস্ত আন্তর্জাতিক আইন-কানুন উপেক্ষা করে মার্কিন সরকার ও তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী নির্জন ভোরে বাগদাদের রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করে। শাহাদাতবরণ করেন ইরানের শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তা জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। যেন শাহাদাতের সাক্ষী হয়ে বাগদাদের রাজপথে পড়ে থাকে হাতের আংটিটি।
এমন নির্মম, বেআইনি ও বর্বর হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দম্ভভরে ঘোষণা করেন যে, তাঁর সরাসরি নির্দেশে জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করা হয়েছে। যে ইহুদিবাদী ইসরাইলের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলেন জেনারেল সোলাইমানি, সেই ইসরাইল মোটা মাথার ট্রাম্পকে ক্ষমতায় থাকার কার্ড হিসেবে সোলাইমানি হত্যাকা-কে ব্যবহারের উসকানি দেয়। শুধু ইরান-বিরোধিতা নয় বরং ইরানের শীর্ষ সমর নায়কককে হত্যা করার মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট টানার ঘৃণ্য কৌশল গ্রহণের প্ররোচনা দেয় তাঁর বুদ্ধিদাতারা। ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া ট্রাম্প সহজ পথ ভেবেই তা গ্রহণ করেন এবং জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যা করে বসেন। কিন্তু যে পথ তিনি বেছে নিয়েছিলেন তা যে কণ্টকাকীর্ণ তা তিনি হয়ত বুঝতে পারেন নি।
শহীদ হয়ে গেছেন জেনারেল সোলাইমানি, কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষমতার মসনদ স্থায়ী হয় নি। অজস্র প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার সুযোগ পান নি। ট্রাম্পের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে, তিনি এই জানুয়ারিতেই বিদায় নেবেন। তাঁকে বিদায় নিতে হবে কোটি কোটি মানুষের অভিশাপ আর ঘৃণা মাথায় নিয়ে। ট্রাম্প যেসব কারণে বিশ্ববাসীর কাছে অতিমাত্রায় ঘৃণিত, নিশ্চয় জেনারেল সোলাইমানির হত্যাকা- তার প্রধান। ইরানি জেনারেলের শাহাদাতের পর বহু বীর সেনানি তৈরি হবেন তাঁর পথ ও কর্মকে এগিয়ে নিতে। কিন্তু ট্রাম্পের এই ঘৃণিত কাজ এগিয়ে নিতে আমেরিকায় কেউ আগুয়ান হবেন কিনাÑ সে এক মস্ত প্রশ্ন।
এর মানে হচ্ছে জেনারেল সোলাইমানি হত্যাকা-ের বিষয়টি আমেরিকার জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না, বরং ভুল ও ঘৃণিত কাজ বলেই চিহ্নিত হবে। জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার পর খোদ আমেরিকাতেই এর বিরোধিতা করতে দেখা গেছে। গত নির্বাচনের ডেমোক্র্যাট দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী বার্নি স্যান্ডার্স থেকে শুরু করে অনেক মার্কিন রাজনীতিকই হত্যাকা-টিকে মন্দ কাজ বলেছেন। অন্যদিকে, জেনারেল সোলাইমানির যে দাফন অনুষ্ঠান হয়েছিল তা ছিল স্মরণকালের অন্যতম বৃহত্তম জনউপস্থিতির ঘটনা।
দুঃসাহসিক অভিযানের অনন্য স্মৃতি
২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর। তুরস্কের সীমান্ত থেকে এক কিলোমিটার দূরে তাঁদের শেষ অভিযান। অন্য দিনগুলোর মতো সেদিনও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিমান অভিযান পরিচালনার কথা ছিল। সুখোই-২৪ বোমারু বিমান নিয়ে আকাশে উড়লেন এবং ঠিকঠাক মতো সন্ত্রাসী অবস্থানে বোমাবর্ষণ শেষে রাশিয়ার পাইলট লেফটেন্যান্ট কর্নেল ওলেগ পেশকভ এবং কো-পাইলট ক্যাপ্টেন কনস্টানটাইন মুরাখতিন সিরিয়ার হেমেইমিম ঘাঁটিতে ফিরছিলেন। কিন্তু বাধ সাধলো তুরস্কের এফ-১৬ জঙ্গিবিমান। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তুর্কি এফ-১৬ থেকে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র এসে আঘাত হানে সুখোই-২৪’র পেছনের অংশে। উপায়হীন হয়ে প্যারাস্যুটের সাহায্যে বিমান থেকে বেরিয়ে পড়েন দুই পাইলট।
কিন্তু ভাগ্য খারাপ; আকাশে থাকা অবস্থাতেই সিরিয়ার তুর্কমেন ১০ ব্রিগেডের সন্ত্রাসীদের গুলিতে পাইলট ওলেগ পেশকভ মারা যান। আর কোনো রকমে প্রাণে বাঁচেন কো-পাইলট মুরাখতিন। পাইলট পেশকভের দেহ মাটিতে পড়ার পর সন্ত্রাসীরা উল্লাস প্রকাশ করে এবং আক্ষেপ করতে থাকে যে, ‘জীবিত পেলে পুড়িয়ে মারা যেত’! পরে লেগে যায় কো-পাইলট মুরাখতিনের খোঁজে। এরই মধ্যে রাশিয়ার এমআই-৮ হেলিকপ্টার নেমে যায় দুই পাইলটের সন্ধানে। সে অভিযানেও সন্ত্রাসীদের ছোঁড়া গোলার আঘাতে হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একজন উদ্ধারকারী মেরিন সেনা নিহত হন। প্রথমে খবর বের হয় যে, দুই পাইলটই নিহত হয়েছেন। পরে ফ্রান্সে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার ওরলভের মাধ্যমে খবর বের হয় যে, একজন পাইলট আহত অবস্থায় বেঁচে আছেন। এ অবস্থায় রাশিয়া সিদ্ধান্ত নেয়Ñ যে এলাকায় বিমানটি ভূপাতিত হয়েছে সে এলাকায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হবে। শুরু হয় দুঃসাহসিক অভিযান; পরের ঘটনাপ্রবাহ বড়ই রোমাঞ্চকর।
ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ‘ফার্স নিউজ’ জানায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর আল-কুদস ফোর্সের বিশ্ববিখ্যাত কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কাসেম সোলাইমানি ওই অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং মজার বিষয় হলো কোনো রকমের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই সফলভাবে উদ্ধার অভিযান শেষ করতে সক্ষম হয়েছেন। সে গল্প জানিয়েছেন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা স্পুৎনিকের সাংবাদিক ইমাদ আবশেনাস।
কেমন ছিল সেই অভিযান : সিরিয়ার লাতাকিয়া এলাকায় কর্মরত সিরিয় একজন সিনিয়র সেনা কর্মকর্তার কাছে ইমাদ আবশেনাস জানতে চেয়েছিলেন উদ্ধার অভিযানের কাহিনী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিরিয়ার সেনা কর্মকর্তা জানালেন সে গল্পÑ
‘কো-পাইলট ক্যাপ্টেন মুরাখতিন প্যারাস্যুটের সাহায্যে যে এলাকায় নামেন তা ছিল বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার এলাকা অচেনা; শুধুই শত্রুর বসবাস! সিদ্ধান্ত হলো ক্যাপ্টেন মুরাখতিনকে উদ্ধার করতে হবে। বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পরপরই রাশিয়ার দুটি হেলিকপ্টার রওয়ানা দিল সেদিকে। কিন্তু পশ্চিমা সমর্থিত কথিত ফ্রি সিরিয়ান আর্মি বা এফএসএ এবং তুরস্ক সমর্থিত তুর্কমেন সন্ত্রাসীরা রকেট ও উন্নত অস্ত্র দিয়ে হেলিকপ্টারগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালাতে থাকল। এসব অস্ত্র তারা খুব সম্প্রতি পেয়েছে। অভিযানে রাশিয়ার একজন সাহায্য কর্মী (কেউ কেউ বলছেন মেরিন সেনা) মারা গেলেন।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গিয়েছিলÑ বিমান ভূপাতিত হওয়ার পর ওই এলাকায় তুরস্ক স্পেশাল ইউনিটের সেনাদেরকে পাঠায় যাতে আটক রুশ পাইলটকে তারা নিয়ে যেতে পারে এবং পরে রাশিয়াকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারে। অন্যদিকে, রাশিয়া শিগগিরি আরেকটি অপারেশন পরিচালনার পরিকল্পনা করছিল যার মাধ্যমে নিখোঁজ পাইলটকে উদ্ধার করা যায়। এ অবস্থায় ইরানের জেনারেল সোলাইমানি রুশ সেনা কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তিনি একটি বিশেষ টাস্কফোর্স ইউনিট গঠনের প্রস্তাব দেন যাতে থাকবে হিজবুল্লাহর স্পেশাল ফোর্স এবং সিরিয়ার কমান্ডো সেনা যাঁদেরকে ইরান প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এসব সেনার কাছে ওই এলাকা ছিল সম্পূর্ণ পরিচিত। এদের নিয়েই জেনারেল সোলাইমানি পাইলট উদ্ধারের অভিযান পরিচালনা করবেন। আর আকাশ থেকে রুশ বাহিনী বিমান ও স্যাটেলাইট তথ্য দিয়ে সহায়তা করবে। জেনারেল সোলাইমানি রুশ সেনা কর্মকর্তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিলেন, আল্লাহ চান তো তিনি নিরাপদে এবং অক্ষত অবস্থায় পাইলটকে উদ্ধার করবেন।
রুশ পাইলটের ব্যবহার করা জিপিএস শনাক্ত করে তাঁর অবস্থান জানা গেল যে, তিনি যেখানে অবস্থান করছেন সেখান থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে সিরিয়ার সেনা ও সন্ত্রাসীদের ফ্রন্টলাইন। সেখানে বার বার সংঘর্ষ হয়েছে।
হিজবুল্লাহর স্পেশাল অপারেশন ইউনিটের ছয় যোদ্ধা এবং সিরিয়ার ১৮ কমান্ডোকে নিয়ে উদ্ধার অভিযানে রওয়ানা দিলেন জেনারেল সোলাইমানি। এরই মধ্যে রুশ বিমান ও হেলিকপ্টার ওই এলাকায় এমনভাবে হামলা শুরু করল যেন সন্ত্রাসীদের জন্য তা দোজখে পরিণত হলো। বিমান ও হেলিকপ্টার হামলায় সন্ত্রাসীদের সদরদপ্তর ধ্বংস হয়ে গেল এবং মোতায়েন করা শত্রুরা যারা বেঁচে আছে তারা পালিয়ে যেতে থাকল। এ পর্যায়ে শুরু হলো স্পেশাল ইউনিটের স্থল অভিযান।’
গল্পের মাঝে সিরিয়ার ওই সেনা কর্মকর্তা জানালেন, ‘অভিযানের পুরো সময় স্পেশাল ইউনিট রাশিয়ার স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের আওতায় কাজ করেছে। পাইলটের অবস্থানের ১০০ মিটারের কাছাকাছি পৌঁছলে তাদেরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয় এবং সে সময় ক্রেমলিনের একজন অত্যন্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে প্রতি মুহূর্তের অভিযানের রিপোর্ট জানানো হচ্ছিল (বলা হয়েছিল রুশ উচ্চ পদস্থ এ কর্মকর্তা আর কেউ নন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট পুতিন) এবং এটা পরিষ্কার যে, মস্কো থেকে তিনি পুরো অভিযান স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করছিলেন।’
গল্পের কথক সিরিয়ার ওই সেনা কর্মকর্তার বর্ণনা অনুসারে- ‘অভিযানের এক পর্যায়ে তা সন্ত্রাসী ধরার অভিযানে পরিণত হয় যা আকাশ থেকে পরিচালনা করছিল রুশ বাহিনী আর স্থলভাগ থেকে জেনারেল সোলাইমানি। অভিযানের সময় রুশ বাহিনী শক্তিশালী ইলেক্ট্রনিক ওয়ারফেয়ার শুরু করে এবং শত্রুদের সব ধরনের স্যাটেলাইট ও যোগাযোগ যন্ত্র অকেজো হয়ে যায়। এ যুদ্ধ শুরু হয় অভিযানের মূল এলাকায় পৌঁছানোর কয়েক কিলোমিটার আগে থেকেই। যখন শত্রুরা বুঝতে পারল ইলেক্ট্রনিক ওয়ারফেয়ারের মতো কিছু একটা ঘটছে ততক্ষণে অপারেশন শেষ। রুশ বাহিনীর উদ্বেগ ছিল যে, পশ্চিমা স্যাটেলাইটগুলো সন্ত্রাসীদের কাছে এ অভিযানের কথা ফাঁস করে দিতে পারে। যাহোক, শেষ পর্যন্ত স্পেশাল ইউনিট শত্রু লাইনের ছয় কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পাইলটকে নিরাপদে উদ্ধার করে। এ সময় শত্রুপক্ষের উন্নত প্রযুক্তির সরঞ্জমাদি ধ্বংস করা হয় এবং এগুলো যারা পরিচালনা করছিল তারাও নিহত হয়। সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল- যে ২৪ জনকে নিয়ে স্পেশাল ইউনিট গঠন করা হয়েছিল তাদের সবাই পাইলট মুরাখতিনকে নিয়ে নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে আসেন। বিপজ্জনক এ মিশনে ২৪ জনের কেউই সামান্য একটু আহতও হন নি।’
হত্যাকা-ে যেসব ভুল করেছে আমেরিকা
জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে নিজের ভূমিকা বিতর্কিত করেছে আমেরিকা। সিরিয়া ইস্যুসহ বিভিন্ন ঘটনায় আমেরিকা দাবি করে আসছে তারা উগ্রবাদ এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। যদিও সিরিয়ায় তৎপর উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশের প্রতিষ্ঠা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র এবং অর্থ যোগানের সবকিছুর সাথেই আমেরিকার সম্পৃক্ততা ছিল তারপরও তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দাবি করে আসছিল। অন্যদিকে মাঠে-ময়দানে লড়াইয়ে জেনারেল কাসেম সোলাইমানি উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। ইরানের কোনো শত্রুদেশও বলতে পারবে না যে, জেনারেল কাসেম সোলাইমানি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন নি। এরকম একটা পেক্ষাপটে জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যা করে আমেরিকা প্রকৃতপক্ষে সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। অর্থাৎ আমেরিকার এই ভূমিকা সন্ত্রাসীদের পক্ষে গেছে এবং সেক্ষেত্রে বলাই যায় যে, আমেরিকা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে নি; বরং সন্ত্রাসীদের পক্ষে লড়াই করছে। জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার ক্ষেত্রে এটি ছিল আমেরিকার সবচেয়ে বড় ভুল।
জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে ৩ জানুয়ারি হত্যার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী এক জরুরি বৈঠকে বসেন। সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি সরাসরি নির্দেশনা দেন যে, আমেরিকা যেভাবে জেনারেল সোলাইমানি হত্যা করেছে ঠিক একইভাবে আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে পাল্টা হামলা চালাতে হবে। সর্বোচ্চ নেতাসহ ইরানের প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে অন্যান্য বহু কর্মকর্তা এই হত্যাকা-ের প্রতিশোধের ঘোষণা দেন। জেনারেল সোলাইমানি হত্যাকা-ের পর ৮ জানুয়ারি ইরাকে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যাপকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। ওই হামলায় আইন আল আসাদ ঘাঁটি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো- ইরান যেসব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে তার একটিও ভূপাতিত করতে পারে নি আমেরিকা বরং আমেরিকার ঘাঁটি ও সেনারা অসহায়ের মতো আর্তনাদ করেছে এবং তারা মৃত্যুর প্রমাদ গুনেছে সেদিন। আমেরিকার এত সামরিক শক্তি, এত উন্নত প্রযুক্তি রয়েছে বলে দাবি করে অথচ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তারা প্রতিহত করতে পারে নি। সেক্ষেত্রে ইরান এখন তাদরে জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। আমেরিকার এই ভুলের কারণে তাদের সামরিক শক্তি, কৌশল, অস্ত্রের ব্যর্থতা এবং প্রযুক্তির দুর্বলতা মারাত্মকভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। সবার মনে একই প্রশ্ন ছিল বিশ্বের এক নম্বর সামরিক শক্তির দাবিদার আমেরিকা ইরানের হামলা ঠেকাতে পারে নি। তাহলে কি আমেরিকার সামরিক প্রযুক্তি ইরানের কাছে অসহায় হয়ে গেল?
জেনারেল সোলাইমানি ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন সামরিক কর্মকর্তা। এ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তাকে এরকম বর্বরতার আশ্রয় নিয়ে হত্যা করা আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন। কিন্তু আমেরিকা তাই করেছে। সেক্ষেত্রে আবারও পরিষ্কার হয়েছেÑ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকা আইনের মোটেই তোয়াক্কা করে না বরং তার স্বার্থের জন্য আইন লঙ্ঘন করতে দ্বিধা করে না।
আমেরিকা হচ্ছে বিশ্বের মানবতা রক্ষার কথিত ধ্বজাধারী একটি দেশ, কথায় কথায় তারা মানবতার বুলি আওড়ায়। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তারা রিপোর্ট তৈরি করে। সেই আমেরিকা অত্যন্ত নির্মমভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে একজন জেনারেলকে হত্যা করেছে। এর মধ্য দিয়ে আমেরিকা যেমন মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তেমনি কূটনীতির পথকে কঠোরভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছে। যদিও আমেরিকার জন্য এই ধরনের হত্যাকা- নতুন কিছু নয় তবে জেনারেল সোলাইমানি হত্যাকা-ের ঘটনায় আমেরিকা মানবতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় অভিযুক্ত। বিশ্ববাসীর কাছে আরেকবার পরিষ্কার হয়েছেÑ আমেরিকার কাছে শিশুদের যেমন অধিকার নেই তেমনি একজন জেনারেলেরও অধিকার আমেরিকার কাছে নেই। অর্থাৎ তারা মানুষের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেই আন্তরিক নয়। জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার মধ্য দিয়ে আমেরিকা সুদীর্ঘকালের কর্মকা- নতুন করে চিনিয়ে দিয়েছে।
যেকোনো সমস্যার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সমাধান সেরা বলে বিবেচিত। কিন্তু আমেরিকা এসবের ধারে কাছে না গিয়ে বরং জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যা করে পেশী শক্তির পরিচয় দিয়েছে। তারাই একথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আমেরিকার কাছে কূটনীতি নয় বরং পেশিশক্তিই বড়।
জেনারেল সোলাইমানি হত্যার কারণে ইরান আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সামরিকভাবে প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ পেয়েছে, তেমনি আমেরিকার সামরিক ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতাও ইরানের কাছে পরিষ্কার হয়েছে। সেক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান তার প্রভাব প্রতিপত্তি আরো বেশি বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে বাদ দিয়ে কেউ এখন কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারবে না। ইরানের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি তার কূটনৈতিক সৌন্দর্য পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশকিছু দেশকে আকৃষ্ট করবে যা আমেরিকা ও তার মিত্রদের জন্য কূটনৈতিকভাবে বড় ধরনের বিপর্যয় হিসেবে দেখা হবে।
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর থেকে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে মারাত্মক রকমের শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক চলে আসছে। ইরানের ভেতরে নানা রকমের নাশকতার পাশাপাশি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করার মতো চরম অমানবিক ঘটনাও আমেরিকার ঘটিয়েছে। এবারে শীর্ষ পর্যায়ের একজন সেনা কমান্ডারকে হত্যার পর মার্কিন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে তাদের শত্রুতার মাত্রা ভিন্ন পর্যায়ে নিয়ে গেল। ইরান এতদিন মার্কিন শত্রুতা উপেক্ষা করে নিজের মতো করে পথ চলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এবার মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ওপর সফল হামলার মাধ্যমে আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে আরো শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে সুযোগ পাবে। মূলত আমেরিকা জেনারেল সোলাইমানি হত্যার মাধ্যমে ইরানকে আরও বেশি শক্ত অবস্থানে চলে যাওয়ার পথ করে দিল।
ইরানের কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানি যে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তাতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধকারী সংগঠনগুলোর নেতা হিসেবে মূলত তিনি কাজ করছিলেন। কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করা মানেই হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধকামী সংগঠনগুলোর নেতাকে হত্যা করা। ফলে আমেরিকার বিরুদ্ধে শুধু ইরানই শক্ত অবস্থান গ্রহণ করবে না বরং ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে প্রতিরোধকামী সংগঠন রয়েছে সেসব দেশে ইরানের অবস্থান অনেক বেশি সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইরান তাদের নেতা হয়ে উঠবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ইরানকে এই সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে জেনারেল কাসেম সোলেইমানির শাহাদাত। শাহাদাতের এই গৌরব ও মর্যাদা প্রতিরোধকামী সংগঠনগুলোর নেতারা অর্জন করতে উদগ্রীব হয়ে উঠবেন। এতে প্রতিরোধকামী সংগঠনগুলো এবং মার্কিন ও ইসরাইল-বিরোধী প্রতিরোধ প্রবল হয়ে উঠবে। স্মরণ রাখা দরকার, যে জাতি রক্ত দিতে জানে সে জাতিকে দমিয়ে রাখা যায় না। বিজয় তাদের কাছে ধরা দিতে বাধ্য। জেনারেল কাসেম সোলাইমানির শাহাদাত মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধকামী সংগঠনগুলোর কাছে এই বার্তাটিই পৌঁছে দেবে। ফলে শাহাদাতবরণের মধ্য দিয়ে জেনারেল সোলাইমানি যে মশাল প্রজ¦লন করে গেলেন সে মশাল বহন করার লোকের অভাব হবে না কোনো দিন। সে মশাল প্রজ¦লিত থাকবে যুগ-যুগান্তর ধরে। এটিই হবে অন্তহীন এই বীরের মহান কীর্তি।
লেখকÑ সাংবাদিক ও কলামিস্ট