বুধবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং, ১১ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

English

জীবন যাত্রায় পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব

পোস্ট হয়েছে: অক্টোবর ২১, ২০১৫ 

news-image

আকরাম আব্বাসী: আজকের বিশ্বকে বলা হয় সম্পর্ক ও যোগাযোগের বিশ্ব। যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম উন্নতির এ যুগে প্রত্যেকে অনায়াসে এক অপরের সাথে, এমনকি অন্যান্য বস্তুর সাথে প্রতি মুহূর্তে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন ও রক্ষা করতে পারে। এই যোগাযোগ ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে যারা যত বেশি সফলকাম, তাদেরকে তত সফল ও সুখী মানুষ বলে মনে করা হয়।

আসলে মানুষের জীবনটা এক বিরাট নেয়ামত ও খোদার দান। এই প্রাপ্তি আমরা লাভ করেছি অনায়াসে ও যাচনা করা ছাড়াই। তবে আমরা তখনই এ জীবনে সুখী ও সফল হতে পারব, যখন অন্যদের সাথে কার্যকর যোগাযোগ রক্ষা করে জীবনকে সচল রাখতে পারব। এ কারণে জীবন যাপন আর জীবন অতিবাহিত করা কথা দু’টির মাঝে তফাৎ আছে।

পবিত্র ইসলামে মানুষে মানুষে সম্পর্কের ওপর সবিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ জন্য দূরের কাছের সব মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সবার সাথে হাস্যোজ্জ্বল মুখে কথা বলা ও সুন্দর ব্যবহার করার জন্য তাকিদ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এর ফলে মানুষে মানুষে সম্পর্ক বৃদ্ধি পায় এবং অন্তরের কদর্যতা দূর হয় ও পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া তা মনে আনন্দ ও উৎফুল্লতা জন্ম দেয়। এ দিকটি সামনে রেখে কীভাবে পারস্পরিক সম্পর্ক ও প্রভাবশালী যোগাযোগ রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে আমরা পর্যালোচনা করতে চাই।

যোগাযোগ ও সম্পর্কের ব্যাপকতর পরিসরে বিবাহ বন্ধন, আত্মীয়তা, ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব রক্ষা, পরিচিত জনের সাথে সুসম্পর্ক রাখা, ধর্মীয় বিষয় ও অনুষ্ঠানাদিতে অংশগ্রহণ প্রভৃতি মানুষের জীবনে আনন্দ, সুখ-সমৃদ্ধি ও সাফল্য বয়ে আনে। তখনই প্রাণ ভরে ওঠে আনন্দে আর হাতগুলো হয় সচল ও কর্মঠ।

কার্যকর ও প্রভাবশালী যোগাযোগ ও সম্পর্ক বলতে বুঝায় এমন সম্পর্ক ও যোগাযোগ, যার মাধ্যমে মানুষ নিজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে সফলকাম হয়, অন্যদিকে প্রতিপক্ষও সন্তুষ্টি অনুভব করে।

অন্য কথায়, কার্যকর যোগাযোগ বলতে বুঝায়, অন্যদের সঙ্গে এমনভাবে সম্পর্ক বজায় রাখা, যার মাধ্যমে একদিকে নিজের প্রয়োজন পূরণ হয়, অন্যদিকে প্রতিপক্ষেরও সন্তুষ্টি অর্জন হয়। অর্থাৎ উভয়ের লক্ষ্য অর্জন ও পারস্পরিক ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি লালন করে।

পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব

পারস্পরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ হচ্ছে অন্যদের কাছ থেকে তথ্য আহরণের একমাত্র মাধ্যম। মানুষ যোগাযোগের মাধ্যমেই নিজের অনুভূতি ও মনোভাব অন্যের কাছে স্থানান্তর করতে পারে। পারস্পরিক ভুল বুঝাবুঝির অবসানও একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যমে সম্ভবপর হয়। ক্রোধ-এর মতো নেতিবাচক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করাও সুস্থ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সম্ভপর হয়।

যোগাযোগের প্রকারভেদ

১. বাকনির্ভর যোগাযোগ

বাকনির্ভর যোগাযোগের ক্ষেত্রে মুখের বাক্য ও বুলির ব্যবহার হয়। তবে তা মুখে উচ্চারণ ও লিখিত আকারে হতে পারে। বাচনিক যোগাযোগে সুর, ছন্দ, স্বরের উঠানামা প্রভৃতি অর্থবহ হতে পারে।

২. নির্বাক যোগাযোগ

এতে চেহারার ভাবভঙ্গি, চোখের ইশারা-ইঙ্গিত, দেহের অঙ্গভঙ্গি প্রভৃতি শামিল আছে। এগুলোই হচ্ছে ব্যক্তি পর্যায়ের সম্পর্ক ও যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পথ ও পদ্ধতিসমূহ

১. অস্তিত্বের প্রকাশ

এর মধ্যে শামিল রয়েছে নিজের অধিকার অর্জন করা, নিজের বিশ্বাসসমূহের প্রকাশ ঘটানো, সরাসরি ও সততার সঙ্গে নিজের চিন্তা-চেতনা অন্যদের কাছে প্রকাশ করা, আর তা এমনভাবে করা যাতে অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।

২. ভিন্নধর্মী বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটানো

অন্যদের অযৌক্তিক দাবিসমূহ পরিবর্তন সাধনের জন্য বলা, তবে নিজের দুর্বলতাগুলো স্বীকার করে নেয়া, অন্যদের সাথে লেনদেন ও মেলামেশা করা, ইতিবাচক অনুভূতির প্রকাশ ঘটানো, অন্যদের সাথে সাক্ষাৎ ও বিদায় বেলায় ভদ্রতা ও সম্মানপূর্ণ ভাষার ব্যবহার ও আচরণ প্রকাশ করা।

৩. কথা শোনা

অন্যের কথা এমনিতে শোনা আর ভালোভাবে শোনার মধ্যে কিন্তু তফাৎ আছে। খুব মনোযোগ সহকারে, যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে এবং বিষয় ভেদে গুরুত্ব অনুধাবন করে অন্যদের কথা শুনতে হবে।

৪. মনোযোগ প্রদান

মনোযোগ প্রদান মানে আমাদের চারপাশে যা কিছু ঘটছে, আমরা তা বেশি বেশি পর্যবেক্ষণ করব আর অন্যদের ব্যাপারে মন্তব্য খুব কম করব।

৫. ধৈর্যশীল হওয়া

ধৈর্যশীল হওয়া এমন এক বৈশিষ্ট্য যার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাগত সুফল পাওয়া যায়।

পারস্পরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে ধৈর্যশীল হওয়ার একটি প্রকাশ আমরা দেখতে পাই অন্যের আচরণের বেলায় ধৈর্যের পরিচয় দেয়ার ক্ষেত্রে। বিশেষত অন্যরা যখন কথা বলে তখন তাদের কথা শোনার মধ্যে ধৈর্যের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। যাদের চরিত্রে ধৈর্যের গুণের অভাব রয়েছে তারা অন্যদের আচরণের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায়; এমনকি অন্যদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার ধৈর্যও তাদের থাকে না।

৬. মুখের কোলে হাসি

মুখের হাসি প্রমাণ করে যে, আমরা অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে প্রস্তুত আছি। আমরা যখন হাসিখুশি অবস্থায় থাকি এবং অন্যদের সঙ্গে কথা বলি তখন প্রকৃতপ্রস্তাবে তাকে এ কথা বুঝিয়ে দিতে চাই যে, তাকে আমি গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছি বা তার প্রতি আমি আগ্রহী।

৭. চোখে চোখে যোগাযোগ

চোখ হচ্ছে অন্তরের আয়নাস্বরূপ। আমাদের চোখগুলো আমাদের অনুভূতি সম্পর্কে খুব জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি অন্যদের কাছে সরবরাহ করে থাকে। অন্যের দিকে দৃষ্টিপাত করে আমরা তাকে বুঝিয়ে থাকি যে, তার সাথে কথা বলতে বা যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে আমি আগ্রহী।

কার্যকর সম্পর্কের মূলনীতিসমূহ

১. সততা

সততা বলতে বুঝায় মানুষ যা আছে তা কোন হ্রাস-বৃদ্ধি ছাড়াই প্রকাশ করা। অন্যকথা মানুষের ভেতর ও বাহির একই হওয়া।

২. নিঃস্বার্থ ভালোবাসা

এর অর্থ হচ্ছে, অন্যের প্রতি আগ্রহী হওয়া, অন্যের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাকানো, অন্যের ভালো খবর ও আনন্দে ইতিবাচক সাড়া ও মনোযোগ প্রদান করা, অন্যের ভালো করার জন্য তৎপর হওয়া; বিশেষত নিজের প্রতিবেশীর জন্য স্বার্থত্যাগ এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অন্তর্ভুক্ত।

৩. সহমর্মিতা ও দরদিপ্রাণ হওয়া

এর অর্থ হচ্ছে অন্যের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার শক্তির অধিকারী হওয়া। অর্থাৎ আমরা নিজেকে অন্যের স্থানে রাখব। তারপর সব ব্যাপারকে অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখব। তারপর নিজের কাছে জিজ্ঞাসা করবে যে, আমি যদি তার জায়গায় হতাম, তাহলে এই পরিস্থিতিতে আমার অবস্থা কী হতো! একমাত্র তখনই আমরা অন্যের অবস্থা ও অনুভূতিকে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে সক্ষম হব।

৪. সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আস্থা। পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যাদের আস্থার মাত্রা অনেক উচ্চে, তারা নিজের কাছের ও ঘনিষ্ঠ লোকদের (যেমন স্বামী-স্ত্রী) কাছ থেকে আন্তরিকতাপূর্ণ ও সম্মানজনক আচরণের আশা করতে পারে।

৫. ক্ষমা ও ভুল শোধরানো

ক্ষমা ও ভুল শোধরানো হচ্ছে এমন সম্পর্ক পুনর্বহালের সুন্দর পদ্ধতি, যে সম্পর্ক ছোটখাট ভুলত্রুটির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষমার দ্বারা মানুষের দৈহিক ও মানসিক অবস্থারও উন্নতি হতে পারে। অর্থাৎ তা আনন্দ ও উৎফুল্লতার কারণ হতে পারে।

আমরা যখন ভুল শুধরে নেই, তখন নিজের মধ্যে পাপের অনুভূতিকেও কমিয়ে আনতে পারি। তাতে আমাদের দৈহিক ও মানসিক অবস্থার উন্নতি হতে পারে। ক্ষমা ও ভুল শোধরানোর জন্য নিজের মধ্যে বিনয় থাকেতে হবে; এর সাথে থাকতে হবে অহঙ্কার বর্জনের প্রবণতা। কারণ, যতক্ষণ আমাদের মধ্যে অহঙ্কার থাকবে ততক্ষণ অন্যকে ক্ষমা করার বা নিজেকে সংশোধন করার প্রক্রিয়াটা আমরা আত্মস্থ করতে পারব না।

৬. মর্যাদাবোধ

মর্যাদাবোধ হচ্ছে পারস্পরিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আমরা যখন বিশ্বাস করতে পারব যে, সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যদের কাছ থেকে একটি ইতিবাচক আচরণ লাভ করছি, তখনই বুঝতে পারব যে, আমাদের ব্যক্তি পর্যায়ের সম্পর্ক ও যোগাযোগ মজবুত রয়েছে।

যে ব্যক্তি ইতিবাচক ও প্রভাবশালী আচরণ ও ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়, সে প্রথম পর্যায়ে নিজের ও নিজের ভেতরের সাথে সচেতন আচরণ করে থাকে। নিজেকে ও অন্যদেরকে ঠিক যেভাবে আছে সেভাবে গ্রহণ করে। সে নিজের প্রয়োজন, চাহিদা, অনুভূতি, চিন্তা ও মূল্যবোধ সম্পর্কে সম্পূর্ণ সজাগ থাকে। তার বৈশিষ্ট্য হলো

 সে মানসিক সুস্থতার অধিকারী। নিজের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করে। কোন মাধ্যমের চেয়ে নিজে সরাসরি অন্যের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে।

 নিজের চিন্তা, অনুভূতি, চাওয়া-পাওয়া সরলভাবে ও সততার সাথে প্রকাশ করে।

 এমন লোকরা আস্থাভাজন, সংসর্গপ্রিয়, খোলামেলা ও সরলপ্রাণ হয়ে থাকে।

 নিজের ইচ্ছা ও মতামত অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয় না।

 অন্যের অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না।

 উচ্চতর আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা লালন করে থাকে।

 যে কোন কাজে প্রথমে উদ্যোগী হয়।

 অন্যের কাছ থেকে বেশি প্রত্যাশা করে না এবং নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে না।

 ধৈর্য ও সাহসিকতার সাথে সবকিছুর মোকবিলা করে।

 যা কিছু শোনে, মনোযোগ সহকারে শোনে।

 যখন সম্মিলিত কাজ করে তখন নিজের চিন্তা-চেতনাকে দুপক্ষের মতামতের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়।

 সে অন্যকে মর্যাদা দেয় এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।

অনুবাদ : ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী