বৃহস্পতিবার, ২০শে মার্চ, ২০১৯ ইং, ৭ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

English

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রেসিডেন্ট রুহানি

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ১৫, ২০১৮ 

নবাগত দুর্বৃত্তরা পারমাণবিক চুক্তি নস্যাৎ করলে বিশ্বের একটি বিরাট সুযোগ হাতছাড়া হবে
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন ড. হাসান রুহানি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন যে, নবাগত দুর্বৃত্তরা যদি ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পবিষয়ক চুক্তিকে নস্যাৎ করে দেয় তাহলে বিশ্বের কাছ থেকে একটি বিরাট সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। তিনি গত ২০শে সেপ্টেম্বর (২০১৭) নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ এবং শীর্ষস্থানীয় সরকারি ব্যক্তিত্ববর্গ ও কূটনীতিকদের সামনে প্রদত্ত ভাষণে এ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। তিনি বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করেন যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই এ চুক্তি লঙ্ঘনকারী প্রথম দেশ হবে না।
প্রেসিডেন্ট রুহানির ভাষণের পূর্ণ বিবরণ নিম্নে প্রদত্ত হলো ঃ
বিসমিল্লাহির রাহ্মানির রাহীম
মাননীয় সভাপতি,
মাননীয় মহাসচিব,
মহামান্যবর্গ,
ভদ্র মহিলাগণ ও ভদ্র মহোদয়গণ!
আমি আমার ভাষণের শুরুতেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অত্র অধিবেশনের সভাপতিকে তাঁর এ পদে নির্বাচিত হবার জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি। একই সাথে আমি মহাসচিব মি. গুটেরেস্কে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি এবং তাঁর ওপরে যে গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে তা পালনের ক্ষেত্রে সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামরা করছি।
চার মাস আগে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের দ্বাদশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে চার কোটি দশ লাখ ইরানি অর্থাৎ শতকরা ৭৩ ভাগ ভোটার অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁরা নির্বাচনী বুথে হাযির হয়ে আমার ভারসাম্যপূর্ণ কর্মসূচি, মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকারী অভ্যন্তরীণ নীতি, আন্তঃক্রিয়া সৃষ্টিকারী পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক বিবর্তনের ক্ষেত্রে অগ্রগতির প্রতি পুনরায় আস্থা ব্যক্ত করেন। তাঁদের এ রায় হচ্ছে এমন একটি সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিপক্বতার ফসল যা মাত্র চার দশক হলো জনগণের শাসনের রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং মুক্তি ও স্বাধীনতার অভিজ্ঞতার অধিকারী হয়েছে। বস্তুত এ নির্বাচন কেবল একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়; বরং এ হচ্ছে এমন একটি জনগণের পক্ষ থেকে বিরাট রাজনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগ যারা ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকেন।
বিগত দেড় শতাধিক বছর ধরে, বিশেষ করে ১৯৭৯ সালে সংঘটিত ইসলামি বিপ্লবে ইসলাম ও সুবিচারের দাবির পাশাপাশি মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের দাবি ইরানি জনগণের গুরুত্বপূর্ণ দাবিসমূহের অন্যতম। আমার সরকার পূর্ববর্তী মেয়াদে বৈদেশিক অঙ্গনে পারমাণবিক আলোচনায় উন্নতির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকার সুবিন্যস্ত করার চেষ্টা চালায় এবং এরই ধারাবাহিকতায় ‘নাগরিক অধিকারের ঘোষণাপত্র’ ঘোষণা করে ও তা কার্যকর করার জন্য জারি করে। তৎকালীন স্বৈরাচারী ও ডিক্টেটরী সরকারগুলোর বিরুদ্ধে এবং মানুষের সমুন্নত মর্যাদা ও সম্মান আদায় করা ও স্বীয় অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে এখন থেকে ১১১ বছর পূর্বে যে সাংবিধানিক বিপ্লব (মাশ্রূত্বাহ্) সংঘটিত হয় এবং এখন থেকে প্রায় ৩৯ বছর আগে যে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হয় তাতে ইরানি জনগণের যেসব দাবি-দাওয়া ও আশা-আকাক্সক্ষা ছিল তারই পথ ধরে এ ঘোষণাপত্র বাস্তবায়িত হয়।
ভদ্র মহিলাগণ ও ভদ্র মহোদয়গণ!
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ আন্তর্জাতিক সমাবেশে আমি সুউচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করছি যে, মহান ইরানি জাতির মানসিকতা ও চলার পথ হচ্ছে ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যম পন্থা। আর ভারসাম্য ও মধ্যম পন্থার মানে না একঘরে হয়ে থাকা, না আধিপত্যকামিতা, তেমনি না উদাসীনতা, না উগ্রতা।
০ ভারসাম্যের পথ হচ্ছে শান্তির পথ; কিন্তু সুবিচারপূর্ণ ও সামগ্রিক শান্তি, এমন শান্তি নয় যা হবে এক জাতির জন্য শান্তি, আর অপর এক জাতির জন্য যুদ্ধ ও সংঘাত।
০ ভারসাম্য মানে মুক্তি, স্বাধীনতা ও জনগণের শাসন, কিন্তু তা হতে হবে সামগ্রিক ও সর্বাত্মক, এমন নয় যে, এক দেশে বাহ্যত মুক্তি ও স্বাধীনতাকে সমর্থন করা হবে, অথচ আরেক দেশে ডিক্টেটরী শাসনের পৃষ্ঠপোষকতা করা হবে।
০ ভারসাম্য মানে পারস্পরিক চিন্তাসমূহের বিস্তার সাধন, তলোয়ারের ঝনঝনানি নয়।
০ সর্বোপরি, ভারসাম্যের পথ হচ্ছে সৌন্দর্য সৃষ্টিকারী; যে মারণাস্ত্র রফতানি করা হয় তা সুন্দর নয়। শান্তি সুন্দর, যুলুমমূলক বয়কট সুন্দর নয়; সুবিচার সুন্দর।
আমাদের আবেদন শান্তিকামী এবং জাতিসমূহের অধিকারের প্রতি সমর্থন। আমরা যুলুমকে পছন্দ করি না এবং আমরা মযলূমের প্রতিরক্ষা ও সমর্থন করি। আমরা হুমকি দেই না এবং কারো পক্ষ থেকে ও কোনো শক্তির পক্ষ থেকে দেয়া হুমকি মেনে নেই না। আমাদের ভাষা হচ্ছে সম্মান প্রদর্শনের ভাষা এবং আমরা হুমকির ভাষায় বিচলিত হই না। আমরা আলাচনা ও সংলাপের সমর্থক, কিন্তু তা হতে হবে সমান-সমান ও পারস্পরিক সম্মানের অবস্থান থেকে এবং তার আবেদন হবে উভয় পক্ষেরই অর্জন (উইন-উইন)-এর আবেদন।
আজকের দুনিয়ায় দেশসমূহের শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতি পরস্পর অবিচ্ছেদ্যভাবে সংযুক্ত হয়ে আছে। তাই এটা হতে পারে না যে, ফিলিস্তিনের জনগণ একটি দুর্বৃত্ত ও বর্ণবাদী সরকার কর্তৃক ন্যূনতম মানবাধিকার থেকেও বঞ্চিত হবে অথচ সেই ভূখ-টি জবরদখলকারী সরকার নিরাপদ থাকবে। তেমনি এ-ও হতে পারে না যে, ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক, বাহরাইন, আফগানিস্তান, মিয়ানমার ও অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানরা দারিদ্র্য, যুদ্ধ ও সংঘাতের মধ্যে জীবন যাপন করবে, অথচ কিছুসংখ্যক লোক মনে করবে যে, তারা তাদের নিজ নিজ দেশে নিরাপত্তা, কল্যাণ ও উন্নয়নের অধিকারী হবে।
মাননীয় সভাপতি!
ইরান অতীত কাল থেকেই ধর্মসমূহের ও জাতিগত জনগোষ্ঠীসমূহের সহাবস্থানের পতাকাবাহী। আমরা হচ্ছি সেই জাতি যারা ইহুদিদেরকে বাবেলীদের বন্দিত্বের কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়েছি, আর্মেনীয় খ্রিস্টানদেরকে প্রশস্ত হৃদয়ে বুকে টেনে নিয়ে নিজেদের মধ্যে স্থান দিয়েছি এবং নিজেদের মধ্যে একটি ‘সাংস্কৃতিক মহাদেশ’ গড়ে তোলার আর বিভিন্ন জাতিগত জনগোষ্ঠী ও বিভিন্ন ধর্মকে নিজেদের মধ্যে স্থান দেয়ার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। এ হচ্ছে সেই ইরান যে সব সময়ই মযলূমদের পাশে দাঁড়িয়েছেÑ বহু শতাব্দী আগে ইহুদিদের অধিকারের প্রতিরক্ষা করেছিল এবং আজ ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রতিরক্ষা করছে। এ ইরান হচ্ছে সেই সত্যপন্থী এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতাকামী ইরান।
আমরা আজ মধ্যপ্রাচ্যের বুকে সন্ত্রাসবাদবিরোধী ও ধর্মীয় চরমপন্থাবিরোধী সংগ্রামের প্রথম কাতারে অবস্থান করছি। আর আমাদের এ অবস্থান কোনোরূপ র্ফিক্বাগত বা জাতিগত অবস্থান নয়; বরং আমাদের এ অবস্থান হচ্ছে মানবিক ও নৈতিক অবস্থান।
ইরান না তার ঐতিহাসিক সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়, না তার রাষ্ট্রীয় মাযহাবকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, না স্বীয় বিপ্লবকে বর্শার ডগার শক্তির মাধ্যমে রফতানি করতে চায়। আমরা আমাদের সংস্কৃতির দৃঢ়তায়, আমাদের ধর্মের সত্যতায় ও আমাদের বিপ্লবের মৌলিকত্বে এতখানি আস্থা পোষণ করি যে, আমরা কখনোই তা নব্য উপনিবেশবাদীদের উদ্দেশ্য হাসিলের পন্থার অনুসরণে সৈন্যদের হেলমেটের মধ্যে লুকিয়ে রফতানি করতে চাই না। আমরা আমাদের সংস্কৃতি, সভ্যতা, ধর্ম ও বিপ্লব প্রবর্তনের জন্য অন্তরসমূহে প্রবেশ করি এবং বিচারবুদ্ধির কাছে আবেদন করি। আমরা কবিতা আবৃত্তি করি এবং অকাট্য জ্ঞানসহকারে কথা বলি। আমাদের রাষ্ট্রদূতগণ হচ্ছেন আমাদের কবিগণ, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিবর্গ ও দার্শনিকগণ। আমরা মাওলানা রূমীকে নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপার পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছি। আমরা সা‘দীকে নিয়ে এশিয়ার গভীরে প্রবেশ করেছি। আমরা হাফেযকে নিয়ে বিশ্বকে জয় করেছি। অতএব, আমাদের জন্য নতুন বিজয়ের আর কী প্রয়োজন আছে?
মান্যবরগণ!
এখানে ভারসাম্য ও মধ্যম পন্থার আহ্বান এমন একটি জাতির পক্ষ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে যে জাতিটি কেবল এর ঘোষণার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে নি; বরং কাজেও তা মেনে চলছে। ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প সম্পর্কিত যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) আমাদের এ দাবির সত্যতার সর্বোত্তম নিদর্শন।
যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা হচ্ছে দুই বছরব্যাপী সংক্ষিপ্ত আলোচনার ফলÑ যা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত ও বৈশ্বিক সমাজ কর্তৃক সমর্থিত হয়েছে এবং নিরাপত্তা পরিষদের ২২৩১ নং সিদ্ধান্তের অঙ্গীভূত হয়েছে। তাই যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা কোনো একটি বা দু’টি দেশের নিজস্ব বিষয় নয়; বরং এটি হচ্ছে নিরাপত্তা পরিষদের একটি দলিল এবং তা সমগ্র আন্তর্জাতিক সমাজের সম্পদ।
জেসিপিওএ মানে নতুন বৈশ্বিক সম্পর্কে এক নতুন আন্তঃক্রিয়াÑ যে আন্তঃক্রিয়া আমাদের ও বৈশ্বিক সমাজের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্ব ও গঠনমূলক কর্মকা-ের ওপর ভিত্তিশীল। আমরা আন্তঃক্রিয়া ও সহযোগিতার দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দিয়েছি; আমরা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের উন্নত দেশসমূহের সাথে ডজন ডজন উন্নয়ন চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কোনো কোনো সরকার নিজেদেরকে এ নতুন সম্ভাবনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। বস্তুত তারা নিজেদেরকে বয়কট করারই পদক্ষেপ নিয়েছে, আর প্রতারণা করতে পেরেছে বলে মনে করার পর এখন তারা মনে করছে যে, তারা নিজেরাই প্রতারিত হয়েছে, অথচ প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এই যে, আমরা না প্রতারিত হয়েছি, না কাউকে প্রতারিত করেছি। আমরা আমাদের পারমণবিক কর্মসূচির স্তর নিজেরাই নির্ধারণ করেছি। আমরা পারমাণবিক অস্ত্রের সাহায্যে নয়; বরং জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাহায্যে ও আমাদের মহান জাতির প্রতিরোধ শক্তির সাহায্যে পারমাণবিক হামলানিরোধক শক্তির অধিকারী হয়েছি। এটাই হচ্ছে আমাদের সূক্ষ্ম নীতি ও কর্মকৌশল।
তারা চেয়েছিল যে, ইরান যে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী ছিল না তা-ই তার কাছ থেকে কেড়ে নেবে। অবশ্য যে জিনিস আমাদের হাতে কখনো ছিল না এবং আমরা কখনো যার দাবিদারও ছিলাম না আমাদের কাছ থেকে তা কেড়ে নেয়াকে আমরা পরোয়া করি না। কিন্তু এটা কখনোই মেনে নেয়া চলে না যে, ফিলিস্তিন-গ্রাসী যায়নবাদী সরকার পারমাণবিক অস্ত্রের সাহায্যে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে ও বিশ্বকে হুমকির সম্মুখীন করবে এবং কোনো রকমের আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান মেনে চলবে না ও কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক নযরদারিকে গ্রহণ করবে না, অথচ শান্তিকামী জাতিসমূহকে উপদেশ দেবে।
ভদ্র মহিলাগণ ও ভদ্র্র মহোদয়গণ!
কেবল এক মুহূর্তের জন্য ভেবে দেখুন, যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) না থাকলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে কী পরিস্থিতির উদ্ভব হতো। আপনারা চিন্তা করে দেখুন, পশ্চিম এশিয়ায় গৃহযুদ্ধসমূহ, তাকফিরি সন্ত্রাসবাদ, মানবিক সঙ্কটসমূহ এবং জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির পাশাপাশি এ অঞ্চলে যদি কৃত্রিম পারমাণবিক সঙ্কটও বিরাজ করতো তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়াতো?
আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করছি যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা লঙ্ঘনকারী প্রথম দেশ হবে না, কিন্তু এটি লঙ্ঘিত হলে যথাযথ ও দৃঢ় প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করবে। ‘রাজনৈতিক অঙ্গনের দুবর্ৃৃত্তদের’ দ্বারা যদি এ সমঝোতা নস্যাৎ হয়ে যায় তাহলে তা হবে খুবই দুঃখজনক ব্যাপার এবং এর ফলে বিশ্ব একটি বিরাট সুযোগ হাতছাড়া করবে। কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ কোনোদিনই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে তার উন্নয়ন ও অগ্রগতির সমুন্নত পথ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারবে না।
আমেরিকার নতুন সরকার চুক্তি ভঙ্গ করে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারসমূহ লঙ্ঘন করে তাহলে কেবল স্বীয় বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতাকেই বিনষ্ট করবে এবং ভবিষ্যতে যে কোনো ধরনের আলোচনা ও অঙ্গীকারের ক্ষেত্রে সরকারসমূহের ও জাতিসমূহের আস্থা হারিয়ে ফেলবে।
ভদ্র মহিলাগণ ও ভদ্র মহোদয়গণ!
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান হচ্ছে সহিংসতা ও চরমপন্থী নীতির বিরুদ্ধে মোকাবিলার লক্ষ্যে বৈশ্বিক ঐক্যের উদ্ভাবক এবং উভয় পক্ষের অর্জন (উইন-উন্) নীতির ভিত্তিতে সংলাপ ও আলোচনাকে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সঙ্কটসমূহের সমাধানের একমাত্র পন্থা বলে মনে করে। আমরা প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশসমূহের সাথে বন্ধনকে গভীরতরকরণ ও বন্ধু দেশসমূহের সাথে সহযোগিতার স্তর বৃদ্ধিকরণকে সচেতনভাবে বেছে নিয়েছি। আর সরকারসমূহ ও জাতিসমূহের পক্ষ থেকে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহমর্মিতা বৃদ্ধিকরণ এবং সংলাপকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান করা ব্যতীত চলমান যুগের বিপজ্জনক হুমকিসমূহ ও জটিল বিবর্তনসমূহকে অতিক্রম করা কিছুতেই সম্ভব নয়।
গতকাল এ সম্মানিত সমাবেশে ইরানি জাতির বিরুদ্ধে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মুখ থেকে মূর্খতাসুলভ, নোংরা, শত্রুতামূলক এবং ভুল তথ্যাদি ও বিভিন্ন ভিত্তিহীন অভিযোগে পূর্ণ বাগাড়ম্বর শোনা গিয়েছে। এ ধরনের বক্তব্য যে জাতিসংঘের মর্যাদার জন্য মানানসই ছিল না শুধু তা-ই নয়; বরং তা এ অধিবেশনের কাছে জাতিসমূহের আজকের প্রত্যাশার অর্থাৎ যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জাতিসমূহের ঐক্যের প্রত্যাশার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
আমি এ অধিবেশনে ঘোষণা করছি যে, মিসাইল সক্ষমতাসহ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের গোটা প্রতিরক্ষা সামর্থ্যরে একমাত্র লক্ষ্য প্রতিরক্ষামূলক ও নিরোধমূলক এবং তা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার হেফাযতের ও অদূরদর্শিতামূলক অভিযাত্রিকতা প্রতিহত করার লক্ষ্যে নিবেদিত। আট বছরব্যাপী চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধকালে আমাদের শহরসমূহের জনগণ সাদ্দাম সরকারের দূর পাল্লার মিসাইলের হামলার শিকার হয়েছিল; তাই আমরা আর কখনোই কাউকে ধ্বংসাত্মক আধিপত্যলিপ্সার পুনরাবৃত্তি করার সুযোগ দেব না।
আমাদের অঞ্চলে এ অঞ্চলের বাইরের শক্তিসমূহের সামরিক হস্তক্ষেপ এ অঞ্চলে স্থিতিহীনতা ও সহিংসতাকেই তীব্রতর করবে। আর এরা হচ্ছে সেই সব শক্তি যারা এখন আরো বেশি হস্তক্ষেপের ও মারণাস্ত্র বিক্রির লক্ষ্যে ইরানকে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করছে। আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করছি, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে বৈদেশিক হস্তক্ষেপ ও বাইরের শক্তিগুলোর দ্বারা এ অঞ্চলের জনগণের জন্য দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণ করে দেয়ার ফল সঙ্কটের স্থায়িত্ব ও বিস্তার ব্যতীত আর কিছুই হবে না। সামরিক সমাধান সিরিয়া, ইয়েমেন ও বাহরাইনের সঙ্কটের সমাধান নয়; বরং কেবল সহিংসতা বন্ধ করা এবং জনগণের রায় ও মতামত মেনে নেয়ার মাধ্যমে এসব সঙ্কটের অবসান হওয়া সম্ভব।
আমেরিকার সরকারের তার নিজ দেশের জনগণের সামনে কৈফিয়ত দেয়া উচিত যে, কেন আমেরিকান জাতির ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের জাতিসমূহের সম্পদ থেকে হাজার হাজার কোটি ডলার স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তায় সহায়তা করার পরিবর্তে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ও বিশ্বে হত্যা, দারিদ্র্য সৃষ্টি ও ধ্বংসের কাজে এবং সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থী নীতির বিস্তারে ব্যয়িত হচ্ছে?
ভদ্র মহিলাগণ ও ভদ্র মহোদয়গণ!
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিগত চার বছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত চমৎকারভাবে প্রমাণ করেছে যে, ইরানের অর্থনীতি বিকাশ ও প্রসারের বিরাট সম্ভাবনার অধিকারীÑ যার নযির খুবই বিরল।
ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা যে ইরানের গতিরোধ করতে সক্ষম হয় নিÑ শুধু তা-ই নয়; বরং জাতীয় উৎপাদনকে শক্তিশালী করার জাতীয় প্রতিজ্ঞাকে দৃঢ়তর করেছে। গত বছর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অর্থনীতি বৈশ্বিক অঙ্গনে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির অধিকারী হয়Ñ যা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, আগামী বিশ বছরে ইরানের অর্থনীতি এক লক্ষ কোটি ডলার প্রবৃদ্ধি সামর্থ্যরে অধিকারী হবে এবং বিশ্বের বুকে সর্বাধিক আশা সঞ্চারকারী নব উদ্ভাসিত অর্থনীতি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে সক্ষম হবে। এ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে আমরা যে নীতি অনুসরণ করছি তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দৃঢ়তা, ভারসাম্য ও বিশ্বের সাথে ব্যাপকভিত্তিক আন্তঃক্রিয়া। আমাদের বিশ্বাস এই যে, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা একই সাথে বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং যৌথ স্বার্থ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের ও বিশ্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।
বিশ্বের সর্বাধিক পরিমাণ গ্যাস সম্পদের ও প্রচুর পরিমাণ তেল সম্পদের অধিকারী ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এক দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সাহায্য করবে এবং সামুদ্রিক, রেল ও সড়ক পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে যৌথ পুঁজি বিনিয়োগ আন্তর্জাতিক ট্রানজিটের করিডোরসমূহের ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। গ্যাস লাইন, বিদ্যুৎ লাইন, রেল ও সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অবকাঠামোসমূহকে শক্তিশালী করা হলে তার ফলে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং বিভিন্ন ধরনের শিল্প প্রকল্পসমূহের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে ইরানের বিশাল বাজারে ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের বিরাট বিরাট বাজারে উপস্থিত হওয়া সহজতর হয়ে যাবে। আইনগত দিক থেকে যথাযথ পরিবেশ তৈরি হওয়ার ফলে বর্তমানে বিভিন্ন বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগকারী প্রতিনিধিদল ইরানমুখী হয়েছেন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে যৌথ পুঁজি বিনিয়োগ ও আর্থিক সরবরাহের লক্ষ্যে ক্রমবর্ধমান হারে বিরাট বিরাট চুক্তি সম্পাদন করছেন।
ইরানে সরকারের নীতি হচ্ছে ব্যবসায়ের জন্য পরিবেশের অনবরত উন্নয়ন, বুদ্ধিবৃত্তিক ও চৈন্তিক সম্পদের মালিকানাকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান, প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতার অনবরত সংশোধন ও মানি লন্ডারিং কঠোরভাবে মোকাবিলাকরণ। এর ফলে বিজ্ঞানভিত্তিক উৎপাদনে কর্মতৎপর কোম্পানিসমূহে এবং বিভিন্ন কারিগরি, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুঁজি বিনেয়োগের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ দিনের পর দিন অধিকতর বেশি পরিমাণে নিশ্চিত হচ্ছে।
ইরানি জাতি পরিপূর্ণ মুক্ত, স্বাধীন, স্বনির্ভর ও উন্নততর ইরান গড়ে তোলার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ এবং নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক অধিকারসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ভিত্তিতে শান্তি ও নিরাপত্তাপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল গড়ে তোলার কাজে অংশীদারিত্বে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ কারণেই ইরানি জাতি বিশ্বের সকল পুঁজি বিনিয়োগকারীকে এবং জ্ঞানী-বিজ্ঞানী ও আবিষ্কারক-উদ্ভাবকের অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতাকে স্বাগত জানায়। যারা জাতিসমূহের পারস্পরিক অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতার ছায়াতলে শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন-অগ্রগতির সন্ধান করছেন আমি এই বৈশ্বিক মঞ্চে ইরানের অতিথিপরায়ণ জনগণের মুখপাত্র হিসেবে এ জাতির পক্ষ থেকে তাঁদের সকলকে ইরান সফরের ও এ আশাব্যঞ্জক আগামী দিনে অংশীদার হওয়ার জন্য দাওআত করছি।
ভদ্র মহিলাগণ ও ভদ্র মহোদয়গণ!
চার বছর আগে আমি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সহিংসতা থেকে মুক্ত হয়ে চরম পন্থা, চাপিয়ে দেয়া সংলাপ, একদেশদর্শিতা এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের আতঙ্ক সৃষ্টি ও যুদ্ধের স্থলে সংলাপ, সহযোগিতা ও শান্তি প্রতিস্থাপিত করে মুক্ত বিশ্ব গঠনে সক্ষম হব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলাম, সে আশাবাদকে আমরা সিদ্ধান্তে পরিণত করতে পারিÑ যাতে ভারসাম্য ও মধ্যম পন্থার ধ্বনি বৈশ্বিক অঙ্গনে সর্বপ্রধান ও বিজয়ী ধ্বনিতে পরিণত হয়।
আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ।
ফারসি থেকে অনুবাদ : নূর হোসেন মজিদী