বৃহস্পতিবার, ১৫ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

English

চিরভাস্বর কারবালার মহাবিপ্লব (পর্ব-৭)

পোস্ট হয়েছে: আগস্ট ৩১, ২০২০ 

news-image
কারবালার মহাবিপ্লবের মহানায়ক হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর বিপ্লবের বার্তাকে তথা ইসলামের বার্তাকে পৌঁছানোর জন্য সম্ভাব্য সব উপকরণ ও মাধ্যমকে কাজে লাগিয়েছেন। ইমামের মক্কা থেকে কারবালা পর্যন্ত এবং কারবালায় প্রবেশ করার পর থেকে শাহাদাত বরণ পর্যন্ত তার ভাষণগুলো অসাধারণ অনুপ্রেরণাদায়ক, আবেগময় এবং অসাধারণ সুন্দর আর সাবলীল ও বিশুদ্ধ ভাষা সমৃদ্ধ।
 
মানুষকে আরবী ভাষা শিখতে হবে; তবেই কেবল পবিত্র কোরআন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বাণীমালায়, মাসুম ইমামগণের ভাষণে এবং খোতবা আর দোয়া-কালামের মধ্যে নিহিত এই অপরূপ সৌন্দর্যকে অবলোকন করতে পারবে। ইমামের এসব ভাষণ অনুবাদ করলে যথার্থ রূপে অর্থ প্রকাশ করে না। তিনি বলছেন, ‘মৃত্যু হলো মানুষের গলায় অলঙ্কারের ন্যায়। একজন মানুষের জন্যে মৃত্যু ততখানি সৌন্দর্যময় যেমনটা সৌন্দর্য ফুটে ওঠে যুবতীর গলায় অলঙ্কার পরিধান করলে। হে লোক সকল! আমি সবকিছুর মায়া ত্যাগ করেছি, আমি আত্মত্যাগের নেশায় মত্ত, আমি আমার পূর্বসূরিদের সাক্ষাতে ততটাই আসক্ত যতটা আসক্ত ছিলেন নবী ইয়াকুব তার ইউসুফকে সাক্ষাতের জন্য।’
 
ইমাম তাঁর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ও দুনিয়ার বাহ্যিক পরাজয়ের বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন এবং সচক্ষে দেখতে পাচ্ছিলেন যে ঐ মরু মাঝে কিভাবে মানুষরূপী নেকড়েগুলো সারি বেধেছ ও কিভাবে তাঁকে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলছে, এ বিষয়টি জানিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, অর্থাৎ,আমরা মহানবীর আহলে বাইত আল্লাহ যেটাতে সন্তুষ্ট হন তাতেই সন্তুষ্ট থাকি। (বিহারুল আনোয়ার, খণ্ড ৪৪,পৃষ্ঠা ৩৬৭; মাকতালু মুকাররাম, পৃষ্ঠা ১৯৩, আল লুহুফ, পৃষ্ঠা ২৫, কাশফুল গুম্মাহ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৯) এটা হলো সেই রাস্তা যা আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং তিনি পছন্দ করেছেন। সুতরাং আমরা এ পথকেই বেছে নেব। আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমাদের সন্তুষ্টি।- মাত্র তিন চার লাইনের বেশি নয়। কিন্তু একটি বইয়ের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে।
 
শেষ মুহূর্তে শহীদ সম্রাট মানুষের কাছে নিজ উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, যে ব্যক্তি বুকের রক্তকে আমাদের পথে উৎসর্গ করতে তৈরি এবং নিজ প্রতিপালকের সাক্ষাত লাভ করার সংকল্প রাখে সে যেন প্রস্তুত থাকে। আগামীকাল সকালে আমরা রওনা হব। আশুরার রাতে পবিত্র তেলাওয়াতের মুগ্ধকর সুর শুনতে পাই, মৌমাছির গুঞ্জরনের মতো দোয়া মোনাজাতের গুনগুনানী ভেসে আসে যা শত্রুর অন্তরকেও বিমোহিত করে দেয় এবং তাদেরকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করে। যে সাহাবীদল মদীনা থেকে ইমামের সঙ্গে এসেছিলেন তাদের সংখ্যা খুবই কম ছিল। হয়তো কুড়ি জন হতে পারে। কেননা একদল তো পথিমধ্যে আলাদা হয়ে চলে যায়। বাহাত্তর জন শহীদের অনেকেই কারবালায় এসে যোগদান করেছিলেন। অনেকে আবার ইবনে সা’দের দল থেকে পৃথক হয়ে ইমামের বাহিনীতে যোগ দেয়। এদের মধ্যে একদল হলো তারা,যারা আশুরার রাতে এসব তাঁবুর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাদের কানে ভেসে আসছিল মিষ্টি মধুর গুঞ্জরনের ধ্বনি, কুরআনের তিলাওয়াত, সিজদা আর রুকুর যিকির, সুরা হামদ। এই ধ্বনিই তাদেরকে আকৃষ্ট করে এবং তাদেরকে টেনে নিয়ে যায়। অর্থাৎ ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর সাহাবীরা যত প্রকার মাধ্যমকেই যত বেশি সম্ভব কাজে লাগানো যেত তার সবগুলোকেই কাজে লাগিয়েছেন। অন্যান্য মাধ্যম ও উপকরণের কথায়ও যাব। স্বয়ং দৃশ্যগুলোকেও ইমাম এমনভাবে বিন্যস্ত করেন যে মনে হবে যেন কোনো ঐতিহাসিক দৃশ্যকে মঞ্চস্থ করার উদ্দেশ্যেই এভাবে সাজিয়েছেন যাতে কিয়ামত অবধি এক শিহরণ জাগানো দৃশ্য হিসাবে ইতিহাসে অক্ষয় থেকে যায়।
 
ইতিহাসে লেখা রয়েছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সাহাবীরা বেঁচে ছিলেন এমনকি তাদের একজন অবশিষ্ট থাকা পর্যন্তও আহলে বাইতের তথা ইমাম হুসাইন  (আ.) এর সন্তানবর্গ, ভাই-ভাতিজা প্রমুখের কোনো একজনকেও ময়দানে যেতে দেননি। তাদের কথা ছিল, হে ইমাম! আমাদের দায়িত্বকে আগে পালন করার সুযোগ দিন। তারপর আমরা যখন থাকবো না তখন আপনি যেটা ভালো মনে করেন সেটাই করবেন। অপরদিকে নবী (সা,) এর আহলে বাইতও অপেক্ষায় ছিলেন কখন তাদের পালা আসবে। ইমামের সাহাবীদের মধ্যে সর্বশেষ ব্যক্তি যখন শহীদ হন তখন নবী পরিবারের যুবকদের মধ্যে সহসা ধ্বনি পড়ে গেল। সবাই নিজ নিজ জায়গা ছেড়ে উঠে পড়লেন। লেখা রয়েছে যে,  অর্থাৎ তারা পরস্পরকে বিদায় জানাচ্ছিলেন, এক অপরের গলায় হাত রেখে পরস্পরের মুখে চুম্বন করছিলেন।
 
আহলে বাইতের যুবকদের মধ্যে সর্বপ্রথম যিনি যুদ্ধে যেতে ইমামের অনুমতি লাভ করেন তিনি হলেন তার যুবক পুত্র হযরত আলী আকবার। যার ব্যাপারে স্বয়ং ইমাম হুসাইন  (আ.) সাক্ষ্যদান করেছেন যে দেহের গড়ন, চেহারা-চরিত্র আর চলায় বলায় আলী আকবার ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.) এর অধিকতর সদৃশ। তিনি যখন কথা বলতেন মনে হতো যেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) কথা বলছেন। এত বেশি মিল ছিল যে ইমাম হুসাইন  (আ.) নিজে বলেন, হে আল্লাহ! তুমিই ভালো জানো যে নানা নবীজীর স্মৃতি মনে আসলে যখন আমাদের প্রাণ কাঁদত ও আমরা নবীজীকে দেখার জন্যে উদগ্রীব হয়ে পড়তাম তখন এই যুবকের দিকে তাকাতাম। সে ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পূর্ণ প্রতিচ্ছবির দর্পণ। এবার সেই যুবকই এলেন পিতার সম্মুখে। বললেন, বাবা! আমাকে অনুমতি দিন। অনেক সাহাবী বিশেষ করে যুবকদের সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে তারা যখন অনুমতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে ইমামের কাছে উপস্থিত হচ্ছিলেন তখন ইমাম কোনো না কোনো ভাবে তাকে বিরত রাখতে ব্যাখ্যা তুলে ধরছিলেন। যেমন হযরত কাসিমের কাহিনী যা সকলের জানা রয়েছে। কিন্তু যখন হযরত আলী আকবার উপস্থিত হলেন তখন তিনি শুধুই কেবল স্বীয় মাথাকে নিচু করলেন। যুবক পুত্র ময়দানে রওনা হয়ে যায়। বর্ণিত রয়েছে যে ইমামের চক্ষুদ্বয় যখন অর্ধ নির্মিলিত অবস্থায় ছিল তখন যুদ্ধের অনুমতি নিতে আসা পুত্রের দিকে তিনি ভিন্নভাবে তাকিয়েছিলেন। বলা হয়:
 
ثُمَّ نَظَرَ اِلَيْهِ نَظَرَ آئِسٍ
 
অর্থাৎ তিনি তাঁর দিকে তাকালেন এমন ভঙ্গিতে যেভাবে একজন নিরাশ ব্যক্তি তার যুবক পুত্রের দিকে তাকায়। (আল-লুহুফ,পৃষ্ঠা ৪৭)
 
ইমাম নিরাশার সাথে তাঁর যুবক পুত্রের দিকে তাকালেন,কয়েক ধাপ তাঁর পিছে পিছেও এগিয়ে গেলেন। আর ঠিক এই সময়ে তিনি বলে ওঠেনঃ হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো যে এমন এক যুবক আজ এদের বিরুদ্ধে রওনা হয়েছে যে ছিল তোমার নবীর চেহারার সাথে সবচেয়ে বেশি সদৃশ । অতঃপর তিনি ওমর ইবনে সা’দকেও একটি কথা বলেন। উচ্চৈঃস্বরে বললেন যেন ইবনে সা’দ বুঝতে পারে। বললেনঃ
 
يَابْنَ سَعْدٍ قَطَعَ اللهُ رَحِمَكَ
 
অর্থাৎ, হে ইবনে সা’দ! আল্লাহ যেন তোমার বংশকে নির্বংশ করে যেমনভাবে আমার এই সন্তান থেকে আমাকে নির্বংশ করলে। (আল-লুহুফ, পৃষ্ঠা ৪৭, মাকতালু আলী আকবার-মুকাররাম, পৃষ্ঠা ৭৬,মাকতালুল হুসাইন -মুকাররাম, পৃষ্ঠা ৩২১, মাকতালুল হুসাইন -খরাযমী, খণ্ড ২,পৃষ্ঠা ৩০, বিহারুল আনোয়ার, খণ্ড ৪৫, পৃষ্ঠা ৪৩)
 
 
ইমাম হুসাইন  (আ.) এর এই বদদোয়ার পর দুই তিন বছরের বেশী দেরী হয়নি, এর মধ্যেই মোখতার ওমর ইবনে সা’দকে হত্যা করেন। এমন সময়ে যখন ওমর ইবনে সা’দের পুত্র মোখতারের দরবারে এসেছিল তার পিতার জন্য সুপারিশ করতে। ওমর ইবনে সা’দের মস্তককে একটি কাপড়ে ঢেকে সভায় আনা হয় এবং মোখতারের সামনে রাখা হয়। তখনই তার পুত্র এসেছিল পিতার জন্য সুপারিশ করতে। একসময় বলা হলো যে মস্তকটি এখানে রাখা আছে সেটাকে তুমি কি চেন? যখন কাপড় সরিয়ে ফেলা হলো দেখতে পেল যে তারই বাবার মাথা। মনের অজান্তেই কখন সে সেখান থেকে উঠে চলে যেতে লাগল। সাথে সাথে মোখতার নির্দেশ দিলেন, ওকেও ওর বাবার সাথে যুক্ত করে দাও।
 
এভাবেই হযরত আলী আকবার ময়দানে যাত্রা করেন। ঐতিহাসিকগণ সকলে একমত পোষণ করেন যে হযরত আলী আকবার অতুলনীয় সাহসিকতা আর বীরত্বের সাথে লড়াই চালিয়ে যান। কিছুক্ষণ যুদ্ধ করার পর তিনি ফিরে আসনে তার মহান পিতার নিকটে যা ইতিহাসে একটি চিরন্তন ধাঁ ধাঁ হয়েই থাকবে যে কি কারণে তিনি ফিরে এসেছিলেন এবং তার উদ্দেশ্য কি ছিল? এসে বললেন, বাবা! বড়ই পিপাসা! পিপাসা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে । এই অস্ত্রের ভারও আমাকে পরিশ্রান্ত করে ফেলেছে। এক কাতরা পানি যদি আমার গলায় স্পর্শ করে তাহলে আমি শক্তি সঞ্চার করে পুনরায় আক্রমণ চালাতে পারবো। এই কথাগুলো ইমামের কলিজায় আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনি বলেন, পুত্র আমার! দেখ, আমার মুখ তোমার মুখের চাইতেও শুষ্ক। তবে আমি তোমাকে ওয়াদা দিলাম যে শীঘ্রই তুমি তোমার নানা নবীর হাতে পানি পান করবে। এই যুবক আবারো চলেন ময়দানে এবং লড়াই চালিয়ে যান।
 
হামিদ ইবনে মুসলিম নামের জনৈক ব্যক্তি ছিল হাদীসের রেওয়ায়েতকারী। কারবালার ময়দানে সে উপস্থিত ছিল একজন সংবাদদাতার মতো। অবশ্য যুদ্ধে সে অংশগ্রহণ করেনি। তবে বেশিরভাগ ঘটনাকে সে বর্ণনা করেছে। তার বর্ণনায় এসেছ যে, আমি এক ব্যক্তির পাশে ছিলাম। যখন আলী আকবার আক্রমণ করছিলেন তখন সবাই পালিয়ে যাচ্ছিল। এ দেখে লোকটি অসন্তুষ্ট হলো কারণ সে নিজেও একজন বীর। শপথ করে বললো, যদি ঐ যুবক আমার নিকট দিয়ে অতিক্রম করে তাহলে আমি ওর পিতাকে পুত্র হারানোর শোক বেদনায় নিমজ্জিত করবই। আমি তাকে বললাম,তোমার এতে কি কাজ। ছেড়ে দাও, শেষ পর্যন্ত তো তাকে হত্যা করা হবেই। সে বললো, না। আলী আকবার যখন অগ্রসর হলেন তখন তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় লোকটি গুপ্ত হামলার মতো বর্শা দিয়ে এমন সজোরে আঘাত করলো যে আলী আকবার নিশ্চল হয়ে পড়লেন। হাত দুটি ঘোড়ার গলায় জড়িয়ে ধরে নিজের ভারসাম্য রাখার প্রচেষ্টা করলেন। এমন সময় চিৎকার করে বলে উঠলেন,
 
يَا اَبَتَاه هَذَا جَدِّي رَسُولِ اللهِ
 
অর্থাৎ, হে বাবা! এখনই আমি নানা রসূলকে মনের চোখে দেখতে পাচ্ছি ও পানি পান করছি। (বিহারুল আনোয়ার,খণ্ড ৪৫,পৃষ্ঠা ৪৪,মাকতালুল হুসাইন  খরাজমী,খণ্ড ২,পৃষ্ঠা ৩১)
 
ঘোড়া হযরত আলী আকবারকে এমনভাবে শত্রুদের মাঝে নিয়ে গেল (যেহেতু বাস্তবে ঐ ঘোড়ার আর কোনো সওয়ারী ছিল না) যে এখানে এসে অদ্ভুত একটি কথা লেখা রয়েছে :
 
فَاحْتَمَلَهُ الْفَرَسُ اِلَي عَسْكَرِ الْاَعْدَاءِ فَقَطَّعُوهُ بِسُيُوفِهِمْ اِرْباً ارْباً
 
অর্থাৎ, অতঃপর ঘোড়া তাকে বহন করে নিয়ে গেল শত্রু সেনার অভ্যন্তরে। আর তারা তাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ছাড়ে। (মাকতালুল হুসাইন -মুকাররাম,পৃষ্ঠা ৩২৪,মাকতালুল আওয়াসিম,পৃষ্ঠা ৯৫,বিহারুল আনোয়ার খণ্ড ৪৫,পৃষ্ঠা ৪৪,মাকতালুল হুসাইন -খরাজমী,খণ্ড ২,পৃষ্ঠা ২৪২)
 

মহান আল্লাহ জালিম ইয়াজিদ ও তার সহযোগীদের যথাযোগ্য শাস্তি দান করুন। পার্সটুডে।