মঙ্গলবার, ২০শে আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৫ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

চলো জীবন গড়ার লক্ষ্যপানে

পোস্ট হয়েছে: নভেম্বর ১০, ২০১৬ 

আকরাম আব্বাসী
আজ আমাদের  বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার উন্নয়ন সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই। আমার জানি, আমাদের প্রত্যেকের মনে কতক সুপ্ত ইচ্ছা বা স্বপ্ন আছে। সেই ইচ্ছা পূরণ ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিশ্চয়ই একটা লক্ষ্যও হয়তো স্থির করা আছে।
এ ব্যাপারে আমি সর্বপ্রথম যে কথাটা বলতে পারি তা হচ্ছে, আমার মনের এই  ইচ্ছা বা স্বপ্নটি বাস্তবায়ন হওয়া একান্তই সম্ভব। তবে আমরা তো জানি যে, জীবন বলতে যা বুঝায় তার গতি পরিবর্তন মোটেও সহজ ব্যাপার নয়; বরং অত্যন্ত  কঠিন কাজ। কারণ, জীবনের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য নানা ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। বহু ব্যর্থতা, কষ্টের পর কষ্টের পারাবার পার হতে হয়। জীবন চলার পথে এমন এমন মুহূর্ত আসে যখন আমার নিজের মধ্যেই সন্দেহ জাগে যে, আচ্ছা, আমি কি সফলকাম হতে পারব, নাকি পারব না।
এমন সময়ও আসে যখন আমি বলতে বাধ্য হই যে, হায় আল্লাহ! আমার জীবনে এমন দিনটি কেন আসল? আমি তো কেবল নিজেকে নিয়ে আর নিজের পরিবার-পরিজনের সুখ-শান্তি ও  জীবন-জীবিকা নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। কারো সাথে ঝামেলায় জড়াই নি, জড়াতে চাই নি। আমি তো কখনো কারো পকেটের টাকা মারতে চাই নি! আমি সরলভাবে জীবন যাপন করছিলাম। এরপরও কেন আমার সামনে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব  হলো।
যাঁরা জীবনে কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন তাঁদের সাথে আমার কিছু কথা আছে।
প্রথম কথা হলো, আপনি মনে যে ইচ্ছা বা স্বপ্ন কিংবা আশা-আকাক্সক্ষা লালন করছেন তা কোনো অবস্থাতেই ত্যাগ করবেন না।
মনে রাখবেন, জীবনে দুঃখ-কষ্ট, কঠিন পরিস্থিতি আসে, আসবে, আসতে পারে; তবে এই আসাটা স্থায়ী থাকার জন্য নয়। চলে যাওয়ার জন্যই এই আগমন। একদিন অবশ্যই চলে যাবে। আর যখন চলে যাবে তখন পেছন ফিরে দেখতে পাবেন যে, এসব দুঃখ-কষ্ট, কঠিন পরিস্থিতি আমাদেরকে অনেক অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে। আমাদের পথ চলাকে অবিচল, শক্ত ও মজবুত করে দিয়ে গেছে। কাজেই নিশ্চিত জেনে রাখুন যে, যদি ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন, তাহলে আপনার সাফল্যের বিস্ময়কর দৃশ্যপট একের পর এক সম্মুখে হাজির হবে। জেনে রাখুন, ধৈর্যের বিনিময়ে সাফল্যের এই বরমাল্য খুব কম সংখ্যক লোকের ভাগ্যেই জোটে। আর সেই নগণ্য লোকের মধ্যে আপনিও একজন। মনে রাখবেন, আল্লাহ পাক আপনাকে খাসভাবে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ আপনার আকৃতি-অবয়ব যেমন আলাদা তেমনি আপনার মধ্যে যে বৈশিষ্ট্য দান করেছেন তাও আলাদা ও বৈশিষ্ট্যম-িত।
সাধারণত সব মানুষের পরিবার-পরিজন আছে। তাদের  আয়-উপার্জনের পথও আছে। তারা জীবন-যাপন করে এবং পরিশেষে  মৃত্যুবরণ করে। এই শ্রেণির লোকেরা জীবনকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সাধনা করে না। তারা তাদের  লালিত স্বপ্ন পূরণ বা জীবনের চরম লক্ষ্যে উপনীত হবার কথা ভুলে যায়। এ পথে চেষ্টা-সাধনার প্রয়োজন অনুভব করে না। আসলে তাদের জীবনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। আগে থাকলেও তা বিস্মৃত হয়ে গেছে। কোনো মতে জীবনকে তরিয়ে নেয়া, হায়াতের দিনগুলো পার করাই তাদের জীবনের লক্ষ্য। তারা নিজের ইচ্ছা বা স্বপ্নের কথা ভুলে গেছে। তাই সেদিকে অগ্রসর হওয়ার মনোবল পায় না।
কারণ কী?
অনেকেই আছে, শুধু অভিযোগ করতে ভালোবাসে। নিজের সাফল্যের জন্য কোনো কাজ করার মনোবৃত্তি তাদের নেই। এর প্রথম কারণ হচ্ছে তারা ভীতু। যদি লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হই তাহলে কী হবে- এই ভয় তাদেরকে পেছন দিকে টানতে থাকে।
এসব লোক ঝুঁকি নিতে চায় না। সে সাহস তাদের নেই।
লক্ষ্য করুন, আপনারা জীবনের বহু মূল্যবান সময় মানুষের সাথে মেলামেশায় ব্যয় করেন। এর পেছনে উদ্দেশ্য থাকে মানুষ যাতে আপনাকে ভালো বলে। আপনি নিজেকে যতখানি চেনেন, তার চেয়ে অন্যদেরকে ভালো করে চেনেন; অথচ আপনার কর্তব্য ছিল নিজেকে, নিজের ভেতরটাকে ভালো করে চেনা। আত্মপরিচয় নিয়ে গবেষণা করা।
আপনি অন্যদের  সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন। আপনিও চান যে, তাদের মতোই সময় অতিবাহিত করবেন। অথবা ঠিক তাদের মতোই হয়ে যাবেন। আসল ব্যাপারটা কী তা কি আপনি জানেন? আসল ব্যাপার হচ্ছে, আপনি নিজেকে চেনার জন্য যথেষ্ট সময় ব্যয় করেন না; বরং অন্যের চর্চা নিয়েই ব্যস্ত থাকন।
আপনি ওদের জন্য অনেক সময় ব্যয় করছেন। অথচ আপনি নিজে কে, সেটা জানেন না। আপনার কাছে আমার একান্ত অনুরোধ থাকবে, দয়া করে আপনার সময়টা নিজের জন্য ব্যয় করুন।
আপনি যদি চান যে, আপনার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়িত হোক, যদি আগ্রহী হন যে, আপনার ইচ্ছা ও আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ হোক, তাহলে অনাকাক্সিক্ষত লোকদের তালিকা আপনার জীবনের খাতা থেকে কেটে দিন।
যেসব লোক জীবনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যপথে অগ্রসরমাণ তাদের কাছে জীবন বিরাট অর্থবহ ও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
আপনি যখন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অভিসারী একজন মানুষ হবেন, তখন যে কাজটি করতে হবে তা হলো, নিজের ভেতরকার ইতিবাচক দিকগুলোকে চিহ্নিত করুন। নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে নিতে তৎপর হোন। অর্থাৎ নিজের যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতাগুলো চিহ্নিত করুন। তখন দেখবেন যে, আপনি ঠিকই নিজের ইতিবাচক দিকগুলোকে খুঁজে পেয়েছেন। এখন দায়িত্ব হলো, ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
নিজের লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় মনোবল নিয়ে অগ্রসর হোন। পরবর্তী পদক্ষেপে সেই লক্ষ্যগুলোকে আরো স্পষ্ট করুন। অর্থাৎ মনের কাছে বলুন যে, যেমন আমি এমপি হতে চাই কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই অথবা ডাক্তার হওয়া আমার লক্ষ্য।
একটা কথা মনে রাখবেন, আপনি নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবেন না যদি বিষয়টিকে আপনার বিশ্বাসের মধ্যে নিয়ে না আসেন। অর্থাৎ আপনার চিন্তাকে বিশ্বাস করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা নিজের ওপর আস্থাশীল হতে হবে।
আপনি অনেক বই-পুস্তক পড়েন। পড়াশুনার মধ্যে আপনার দিনরাত কেটে যায়; কিন্তু একটি কথা কি চিন্তা করে দেখেছেন যে, আপনি নিজেকে বিশ্বাস করেন না। আপনার মধ্যে যে যোগ্যতা ও প্রতিভা আছে তার ব্যাপারে মনে সাহস সঞ্চয় করুন। একাকী থাকার জন্যও সাহসের প্রয়োজন হয়। সেই সাহস আপনাকে অর্জন করতে হবে। নিজকে চেনা, নিজের যোগ্যতা ও প্রতিভার পরিচয় লাভ, নিজের আশা-আকাক্সক্ষার বিচার-বিশ্লেষণ ইত্যাদির  জন্য কিছু সময় বরাদ্দ করুন। ছোট থেকে  বড় লক্ষ্যে কীভাবে পৌঁছা যাবে তার একটি ছক তৈরি করুন।
এ পর্যায়ে এসে আপনি এক মানুষে পরিণত হবেন, আপনি যেন নতুন সৃষ্টি হয়েছেন, সবেমাত্র পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়েছেন।  চেষ্টা করুন, নিজে যেন উপকারী মানুষ হতে পারেন। এর জন্য নিজেই নিজের একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করুন।
যখন একাকী হবেন, তখন নিজের যোগ্যতা ও সক্ষমতাকে নির্মাণ করতে তৎপর হোন। নিজের প্রতি বিশ্বাসী হোন। যে কোনো কাজের ঝুঁকি নিতে সাহসী হোন। প্রতিদিন মনে মনে বলুন : আমি আছি, আমার অস্তিত্ব আছে। কাজেই আমার কাজে অবশ্যই আমি সফল হব।
আপনি নিজের চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগান। জীবনের লক্ষ্যগুলো খতিয়ে দেখুন। কতদূর এসেছেন আর কতদূর যেতে হবে, ভেবে দেখুন। নিজেকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যান যাতে মানুষ আপনাকে কষ্ট না দেয়। মানুষের সাথে হানাহানি, রেষারেষির পরিবর্তে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে ভাবুন।
কখনো আত্মতৃপ্ত হয়ে বলবেন না যে, আমার আর কোনো আশা-আকাক্সক্ষা নেই। না। আপনার অনেক ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষা এখনো অপূরণ রয়ে গেছে।
আপনাকে এমন হতে হবে যাতে আপনার পিতামাতা আপনাকে নিয়ে গর্ব করে। আপনার বন্ধুমহলে প্রিয়পাত্র হওয়া চাই। লক্ষ-কোটি মানুষকে মুগ্ধ করার মতো ব্যক্তিত্বের অধিকারী আপনাকে হতে হবে।
এই দুনিয়া নদীর পানির মতো বয়ে চলেছে। জগৎ-সংসার যেভাবে চলে যাচ্ছে তা পুনরায় ফিরে আসবে না। আপনি তো এমন পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছেন যে পথে চলার পূর্ব অভিজ্ঞতা আপনার নেই।
কাজেই সতর্ক থাকবেন অন্যরা যাতে আপনাকে উপহাসের পাত্র বানাতে না পারে। আপনার ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষার গুড়ে বালি দেয়ার সুযোগ যেন কেউ না পায়। এজন্য মনের কথাগুলো কোনো অবস্থাতেই বলে বেড়াবেন না। কোনো অবস্থাতেই মন খারাপ করবেন না। হয়তো এমন লোকদের মাঝে বিচরণ করছেন যারা কথা দিয়ে কথা রাখে না। তখন তাদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পরিবর্র্তে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে- এই দর্শনে বিশ্বাসী হোন। অন্যের অবহেলা বা অবজ্ঞাকে অবহেলা করুন। একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্যপ্রার্থী হোন।
আমি জানি, জীবন চলার পথে আপনি বার বার হোঁচট খেয়েছেন। কিন্তু এরপরও আপনার সামনে আশার নতুন দিগন্ত হাতছানি দিয়েছে। ফলে প্রতিদিনই নতুন নতুন আশা বুকে বেঁধে এগিয়ে গেছেন। দেখুন, কতখানি এগিয়ে এসেছেন। কাজেই মনে মনে বলুন : এখনই আমার সব কাজ শেষ হয়ে যায় নি। আমার জীবনে পূর্ণ সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প নিয়ে অদম্য মনোবল নিয়ে চেষ্টা ও সাধনা চালাতে হবে। তখনই বিজয় ও সাফল্য আপনার পদচুম্বন করবে। জীবনে যেটি চেয়েছিলেন তা হয়তো পান নি; কিন্তু এখন যা পেয়েছেন তা সেই চাওয়ার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়; বরং অধিকতর উত্তম, আরো বেশি উন্নত। বুঝতে পারবেন যে, জীবনের দুর্গম পথ পাড়ি দিতে আল্লাহ তাআলা আপনাকে পদে পদে সাহায্য করছেন। কথায় বলে ‘হিম্মতে মর্দ মদদে খোদা’- ‘মানুষের সাহস মনোবল যেখানে, আল্লাহর সাহায্য সেখানে।’
অনুবাদ : ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী