বুধবার, ১৯শে জুন, ২০১৯ ইং, ৫ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

খাজুয়ে কেরমানী

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ২২, ২০১৪ 

news-image

মুহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন খান

মানবেতিহাসে আধ্যাত্মিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মারেফাত হচ্ছে খোদাপ্রেমিক মহাপুরুষ ও আউলিয়াগণের ঊর্ধ্বজগতে বিচরণের এক বিশাল উৎক্ষেপণ মঞ্চ। এরফান বা আধ্যাত্মিকতার অমিয় সুধার স্বচ্ছ ধারাটি লালিত হয়েছে ইসলামী জাহান, বিশেষ করে ইরান বা পারস্য ভূখণ্ডে। পারস্যবাসীর ভাষা ফারসিকে ইসলামী দুনিয়া তথা বিশ্বসাহিত্য জগতে বলা হয় খোদাপ্রেমের ভাষা, ইশকের ভাষা। মধুর মতো মিষ্ট ফারসি ভাষায় বিশ্বখ্যাত মনীষিগণ তাঁদের মনের কথা, চিন্তা, দর্শন, অধ্যাত্মিকতা, মারেফাত ও দিকনির্দেশনাকে সাহিত্যাকারে স্থায়িত্ব দিয়ে গেছেন।

হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে যখন বীরত্বগাথায় এবং কাসিদা রচনায় ফেরদৌসী, রোদাকী, আনওয়ারী ও নাসের খসরু সমগ্র সাহিত্যাকাশ দখল করে রাখেন তখন তাঁদের সামনে কাব্যনৈপুণ্য প্রর্দশনের দুঃসাহস কারো হয়নি। কিন্তু হিজরি পঞ্চম শতকের ঠিক ওই সময় ফারসি সাহিত্যের আকাশকে নতুন আলোকে উদ্ভাসিত করে এরফান বা আধ্যাত্মিকতার উজ্জ্বল তারকার আবির্ভাব ঘটল এবং এ গগনে যাঁরা শক্তি প্রদর্শন করলেন তাঁরা হলেন সেনাঈ, শেখ আত্তার, মাওলানা রুমী, শেখ সাদী, খাজুয়ে কেরমানী, হাফেজ শিরাজী প্রমুখ আউলিয়া কেরাম। তাঁরা এরফান ও মারেফাতকে নিজেদের অমিতবিক্রম সাধনাবলে অদৃশ্যজগৎ থেকে নিয়ে এলেন ধরাপৃষ্ঠের অতি কাছাকাছি খোদাপ্রেমিক তাওহিদী জনতার মনমুকুরে। তাঁরা ফারসি ভাষার মধু রসে আপ্লুত করে এরফান ও মারেফাতকে পৌঁছে দিলেন মাটির মানুষের আধ্যাত্মিক রসনায় ও উপভোগের চৌহদ্দিতে। খোদাপ্রেম, ঐশীপ্রেম ফারসি ভাষার অন্যতম চরিত্রবৈশিষ্ট্যে পরিণত হলো। আধ্যাত্মিকতার জান্নাতী সৌরভ ফারসি কাব্যসাহিত্য ও ইরানী মনমনীষায় পূর্ণতা পেয়ে ডালপালা ও শিকড় ছড়িয়ে দেয় বিশ্ব মানব সভ্যতা-সংস্কৃতিতে।

ইসলামের এই ঐশী প্রেমময় সভ্যতা-সংস্কৃতিতে খাজুয়ে কেরমানীর অবদানের কথা সচেতন সাহিত্যামোদীদের অজানা বিষয় নয়। শেখ সাদী ও খাজা হাফেজ শিরাজীর মধ্যবর্তী শতকটি খাজুর কাব্যসুধা ও সৌরভমুখর ছিল। খাজু কেরমানীর কাব্যধারাকে সাদী-প্রভাবিত মনে করা হলেও তা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও ধারায় মণ্ডিত। অবশ্য খাজুর গজলের মধুসুধা, ইঙ্গিতময়তা ও ব্যঞ্জনা স্বয়ং গজরসম্রাট হাফেজের দিওয়ানেও পরিলক্ষিত। খাজুয়ে কেরমানীর গজল প্রেমময়, আধ্যাত্মিক ও মদিরাময়। অবশ্য খাজুর চিন্তাদর্শন অন্যান্য পারস্য সুফি-সাধকের মতোই এতো ভারী ও অর্থবহ যে, কাব্যিক পরিভাষা সে বোঝা বইতে অক্ষম, অপরাগ।

ইসলামী জাহান, বিশেষ করে বুখারা, সমরকন্দ, খোরসান, নিশাবুর, শিরাজ, ইসফাহান ও বাগদাদের ওপর দিয়ে যখন গোবী মালভূমির মঙ্গোলীয় প্রলয় ঝড় বইয়ে যায় এবং সব কিছু ছারখার করে দিয়ে চেঙ্গিজ হালাকুর রণোন্মাদ উত্তরসূরিরা শহরে শহরে ক্ষমতার মসনদ বসায় ঠিক সেই গোলযোগপূর্ণ সময়েই খাজুয়ে কেরমানীর জন্ম। তাঁর নিজের কথামতো ৬৮৯ হিজরিতে ইরানের কেরমান শহরে তিনি ভূমিষ্ঠ হন।

খাজু তৎকালীন সকল শিক্ষাদীক্ষাই লাভ করেন। রওজাতুল আনওয়ারনামক তাঁর এক দ্বিপদী কবিতায় তিনি উল্লেখ করেছেন, বাল্যকালেই স্বপ্নযোগে তিনি এক ফেরেশতাকে দেখেন যে ফেরেশতা তাঁর কাব্যপ্রতিভার ভবিষ্যদ্বাণী করেন এবং অপরূপ কাব্যজগতের দিগন্ত তাঁর চোখের সামনে তুলে ধরেন।

খাজুয়ে কেরমানী অন্যান্য সুফি-সাধকের মতো বহু দেশ ও শহর সফর করেছেন এবং সাক্ষাৎ করেছেন ওই সব জনপদের জ্ঞানী-গুণীদের সাথে এবং তাঁদের কাছ থেকে লাভ করেছেন জীবনদর্শনের পাথেয়।

খাজুয়ে কেরমানী যে সমস্ত কাব্যগ্রন্থ, বিশেষ করে মসনবী রচনা করেছেন সেসবের অন্যতম হলো (১) হুমাই ও হুমায়ূন, (২) গুল ও নওরোজ, (৩) রওজাতুল আনওয়ার, (৪) গওহরনামা, (৫) কামালনামা ও (৬) সামনামা। এছাড়া খাজুর গদ্য রচনার মাঝে মাফাতিহুল কুলুব, রেসালাতুল বাদিয়া, মুনাজারায়ে শামছ্ ও সাহাব, মুনাজারায়ে শামশির ও কলম উল্লেখযোগ্য।

৭৫২ হিজরিতে ৬৪ বছর বয়সে খাজু কেরমানী শিরাজ নগরে ইন্তেকাল করেন। আমরা ফারসি সাহিত্যাকাশের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের একটি আধ্যাত্মিক প্রেমের কবিতা বা গজলের অনুবাদ সম্মানিত পাঠক সমাজের সামনে পেশ করছি।

আক্ষেপ

সাকী! মৌজের সময় হয়ে এলো

নিয়ে এসো শারাবের জাম

সুরাসক্ত আমরা

গোলাপ-রাঙা প্রিয়াকেও বিলাও শারাব,

বকধার্মিকরা জানে না গোপন ভেদ

তাই ঠিক নয় কভু সুরাসক্তদের দোষারোপ করা

প্রেম থেকে ছিলাম বিরত অনেক

কিন্তু কই লাভতো হলো না কিছু!

যারা সেই শুরুতেই ভেবে নিত পরিণতি পিছু।

আর আমি তো তার তিলক কণিকার ঘ্রাণে

পড়ে গেলাম বহ্নিঘেরা ফাঁদে

যদিও বা সুজনেরা মনে করে।

সুকপাল এ ফাঁদেও।

যাক, শুনো

চাঁদ সুন্দরীদের প্রতি যার নেই

তিল পরিমাণ টান

তেমন গবেটের ওপর পশুরও

জেনো ঢের ঢের দাম

আমি তো প্রেমের জ্বালায়

করতে পারি না রাত থেকে প্রভাতের ভেদ,

হয়তো বা সুবহে সাদেকের চেয়েও উজ্জ্বল

ভেবে বসি তিমির আঁধার।

এমন আসক্ত হালতে কেউ যদি মাড়িয়ে

যার চীনের অপরূপ চিত্রশালা,

তবে তো পূজারিরাই অপরূপা প্রতিমা সকল

ভেঙে করবে খান খান।

কাঙ্গালদের মেরে ফেলার

বাদশার হয়তো বা আছে অধিকার,

তবে তার সাধারণ ক্ষমায় রয়েছে ভরসা সবার।

যেদিক থেকেই তাকাও না কেনো সময়ের প্রতি

তার ওপর নেই কোন ভরসা কারো

তাই হে খাজু!

আক্ষেপ বড়ই যদি করো

সময়ের অপচয়।

(নিউজলেটার, নভেম্বর ১৯৯১)