মঙ্গলবার, ১৮ই জুন, ২০১৯ ইং, ৪ঠা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

কোরআনের ব্যাখ্যা-১

পোস্ট হয়েছে: নভেম্বর ২৮, ২০১২ 

news-image

সূরা আল আ’রাফের ১৯৭ ও ১৯৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ نَصْرَكُمْ وَلَا أَنْفُسَهُمْ يَنْصُرُونَ (197) وَإِنْ تَدْعُوهُمْ إِلَى الْهُدَى لَا يَسْمَعُوا وَتَرَاهُمْ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ وَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ (198)

“আর তোমরা তাঁকে ( তথা আল্লাহকে) বাদ দিয়ে যাদেরকে ডাক তারা না তোমাদের কোন সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে, না নিজেদের সাহায্য করতে পারে।” (৭:১৯৭)

“আর (হে নবী!), তুমি যদি তাদেরকে (মুশরিকদেরকে) সুপথে আহবান কর, তবে তারা তা কিছুই শুনবে না। আর তুমি তো তাদের দেখছ যেন তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ তারা (প্রকৃতপক্ষে) কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।” (৭:১৯৮)

আগের কয়েকটি আয়াতে মুশিরকদের ও তাদের উপাস্যগুলোর বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার পর এ আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন, মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া অন্য যেসব মনগড়া খোদার উপাসনা করছে- তা মূর্তি বা মানুষ যা-ই হোক না কেন তাদের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা বা শক্তি নেই। ফলে তারা কাউকে কোনো বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়। বরং তারা নিজেরাই সব সময় নানা বিপদ-আপদের শিকার হচ্ছে। তাই কেন মুশরিকরা তাদের খোদা মনে করছে ও আসল খোদা তথা আল্লাহকে ভুলে আছে?  এরপর আল্লাহ রাসূল (সা.)-কে বলছেন, তুমি তোমার দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে বিভ্রান্তদের সতর্ক করছ ও সত্যের বাণী তাদের কানে পৌছে দিচ্ছ। কিন্তু তাদের সবাই তোমার এইসব আহ্বানে সাড়া দেবে বলে আশা কর না। তাদের বেশিরভাগই নিজ নিজ মনগড়া কাঠ ও পাথরের খোদাদের মতই শুনতে ও দেখতে পায় না এবং সত্যের দাওয়াত শুনে নির্বিকার বা উদাসীন চিত্তে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের এই দৃষ্টি বোধ ও উপলব্ধিহীন। তারা তোমার কথা শুনলেও বাস্তব অবস্থা হচ্ছে বধিরের মত এবং তারা তোমাকে দেখতে পেলেও বাস্তবে তারা অন্ধ।

 এ দুই আয়াতের দু’টি শিক্ষা হল:

এক. যিনি খোদা বা উপাস্য অন্যকে সাহায্য করার মত ক্ষমতা তার থাকতে হবে যাতে অন্যরা তার কাছে আশ্রয় নিতে পারে। কিন্তু আল্লাহ ছাড়া মনগড়া খোদাগুলো নিজেরাই নিজেদের বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়।

দুই. চোখ ও কান থাকা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। অনেক মানুষ অন্ধ ও বধির হওয়া সত্ত্বেও সত্যকে গ্রহণ করেন। আবার বহু মানুষ সচল চোখ ও কান থাকা সত্ত্বেও সত্যকে অস্বীকার করেন।

 

সূরা আল আ’রাফের ১৯৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ (199)

“(হে রাসূল! জনগণের সঙ্গে মেলা-মেশার ক্ষেত্রে) তুমি ক্ষমার পথ ও মধ্য-পন্থা অবলম্বন কর ( তথা তাদের ওজরগুলো গ্রহণ কর ও তাদের জন্য কঠোর হয়ো না) এবং সৎকাজের নির্দেশ দাও। আর  অজ্ঞ বা জাহেলদের উপেক্ষা কর।” (৭:১৯৯)

এ আয়াতে রাসূল (সা.)-কে ও তাঁর অনুসারীদের  সম্বোধন করে মহান আল্লাহ শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সব ধরনের  মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান উল্লেখ করেছেন।  তিনি বলছেন, তোমাদের সঙ্গে যারা খারাপ আচরণ করেছে তাদের ক্ষমা কর, প্রতিশোধ নিও না। সব সময়ই মানুষকে ভাল কাজের দিকে আহ্বান কর। আর যারা অজ্ঞতাপূর্ণ ও সংকীর্ণমনা আচরণ করে তোমার সঙ্গে তাদেরকেও মহানুভতা দেখিয়ে ক্ষমা কর।

অবশ্য এই নীতি ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ, জনগণের অধিকার ক্ষমা করে দেয়ার এখতিয়ার সমাজের নেতাকেও দেয়া হয়নি। ইসলামী রাষ্ট্রের শত্রুদের মোকাবেলায়  তাকে কঠোর আচরণ করতে হবে যাতে জনগণের সম্পদ ও মর্যাদা শত্রুদের লালসার শিকার না হয়।

 

এ আয়াতের দু’টি শিক্ষা হল:

এক. কেউ নিজে সত বা ভালো মানুষ হওয়াই যথেষ্ট নয়। সমাজেও মানুষের মধ্যে ভালো গুণের বিস্তার ঘটাতে হবে ও অন্যদেরকে ভাল কাজ করার আহ্বান জানাতে হবে।

দুই.  যারা অক্ষর-জ্ঞানহীন তারাই অজ্ঞ নয়। যারা অযৌক্তিক ও অদূরদর্শী আচরণ করে তারাই অজ্ঞ।

 সূরা আল আ’রাফের ২০০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ (200)

“আর (হে নবী!) যদি শয়তানের (সামান্যতম) প্ররোচনাও তোমাকে প্রলুব্ধ করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর; নিশ্চয়ই তিনিই সর্বশ্রোত, সর্বজ্ঞ।” (৭:২০০)

এ আয়াতে রাসূল (সা.)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় শয়তান আল্লাহর রাসূল (সা.)-কেও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা কখনও ত্যাগ করেনি, যদিও মহান আল্লাহ তাঁকে সব ধরনের বিচ্যুতি ও ভুল-ত্রুটি থেকে রক্ষা করেছেন। এ আয়াত থেকে বোঝা যায় শয়তান সব সময়ই ক্রোধের আগুন প্রজ্জ্বলিত করে মানুষকে পরস্পরের প্রতি ক্ষমাশীল হতে বাধা দেয় এবং প্রতিহিংসা বা জিঘাংসার আগুন ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। তাই এ আয়াতে আল্লাহ বলছেন: কখনও শয়তানের উস্কানী বা প্ররোচনাকে গ্রাহ্য করবে না, বরং ক্রোধের আগুন নিভিয়ে ফেলবে এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে তাঁর ওপর ভরসা করবে। আর তাহলেই শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিরাপদ থাকবে।

 এ আয়াতের দু’টি শিক্ষা হল:

এক-শয়তানের কুমন্ত্রণা স্থায়ী ও অবশ্যম্ভাবী। তাই আল্লাহ এ ব্যাপারে বার বার মানুষকে সতর্ক করেছেন।

দুই- শয়তানের ফাঁদ থেকে আত্মরক্ষার জন্য আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা এবং তাঁর স্মরণ  বা জিকিরের আশ্রয় নেয়া জরুরি।

 

সূরা আল আ’রাফের ২০১ ও ২০২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمْ مُبْصِرُونَ (201) وَإِخْوَانُهُمْ يَمُدُّونَهُمْ فِي الْغَيِّ ثُمَّ لَا يُقْصِرُونَ (202)

“যাদের মনে আল্লাহর ভয় রয়েছে,  শয়তানের কুমন্ত্রণা সাথে সাথেই তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তখনই তাদের চোখ খুলে যায়।” (৭:২০১)

“পক্ষান্তরে যারা ( আল্লাহকে ভয় করে না তথা) শয়তানের ভাই, তাদেরকে সে ক্রমাগত পথভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যায় অতঃপর তাতে কোন শিথিলতা দেখায় না।” (৭:২০২)

রাসূল (সা.)-কে সম্বোধন-করা আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এ আয়াতে মুমিনদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, শয়তানের কুমন্ত্রণা সব সময়ই তাদেরকে ঘিরে রেখেছে, যাতে  যে কোনো এক পথে মুমিনকে কাবু করা যায়। কিন্তু মুমিন বা খোদাভীরু ব্যক্তিরা  শয়তানের কুমন্ত্রণা অনুভব করা মাত্রই আল্লাহকে স্মরণ করেন এবং আল্লাহ যে তাদের কাজ-কর্ম দেখছেন ও কথাবার্তা শুনছেন তাও তাদের মনে পড়ে। ফলে তারা পাপ এড়িয়ে চলেন। কিন্তু যারা খোদাভীরু নয় শয়তান তাদের সঙ্গে প্রতারক ভাইয়ের মত মিশে যায় এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু সেজে ক্রমেই তাদেরকে পাপাচার ও নোংরা কাজে জড়িয়ে ফেলতে থাকে। আর এ কাজে কোনো শৈথিল্য দেখায় না শয়তান।

 এ আয়াতের কয়েকটি শিক্ষা হল:

এক. মানুষ ও জিন শয়তানরা সব সময়ই অন্যদের বিভ্রান্ত করার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই আমাদেরকে সদা সতর্ক থাকতে হবে।

দুই. মুখে আল্লাহর নাম উচ্চারণ ও মনে মনে তাঁকে স্মরণ করলে মানুষ শয়তানের অনেক কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা পায়।

তিন. মানুষের মধ্যে যদি খোদাভীতি না থাকে তাহলে শয়তান তাদের ভাই হয়ে যায় এবং তাদের সর্বনাশ করার লক্ষ্যে পথভ্রষ্ট করতেই থাকে। #

সংগ্রহ: রেডিও তেহরান