বুধবার, ১৯শে জুন, ২০১৯ ইং, ৫ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

কুরআন মজীদের চর্চায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বহুমুখী তৎপরতা

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ১৭, ২০১৮ 

ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয় লাভ করেছে ১৯৭৯ সালে। এই বিপ্লবের ফলে ইরানকে ইসলামের পথে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টায় বহু ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেছে। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র হচ্ছে কুরআন মজীদের হিফ্য ও কেরাআত এর উৎকর্ষতা এবং কুরআনী জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচার-প্রসার।
কুরআনিক সাইন্সের উৎকর্ষতা ও বিস্তারে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের অর্জনগুলো সত্যিই অকল্পনীয়। বলতে গেলে ইসলামি বিপ্লব ইরানের সমাজে কুরআনকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। কুরআনের আলোকে জীবন ও সমাজ গড়ার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা মহান নেতা ইমাম খোমেইনীর সঠিক দিকনির্দেশনা এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত বর্তমান রাহবার হযরত আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী মাদ্দাযিল্লাহুল আলীর দক্ষ নেতৃত্ব।
ইসলামি ইরানে এখন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কারীর সংখ্যা অনেক। তারা বিভিন্ন উপলক্ষে বাংলাদেশও সফর করেছেন এবং কুরআন মজীদের বোদ্ধা শ্রোতাদের মাঝে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা ঈর্ষণীয়। এ ছাড়া ইরানের ভেতরে দেশীয় পর্যায়েও কারীর সংখ্যা অগুনতি। ইরানের সমাজে কুরআন মজীদ যাঁরা হিফ্য করেছেন- এক পারা থেকে নিয়ে পুরো ত্রিশ পারা পর্যন্ত, তাঁদের সংখ্যা দশ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। কুরআন চর্চার এই ব্যাপকতার পেছনে কাজ করছে দেশের বিভিন্ন মসজিদ, মহল্লা, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামরিক বাহিনী, অফিস-আদালত, শিল্প ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠা কুরআন চর্চা কেন্দ্র। ইরানের কোনো মহল্লা বা গলিতে ঢুকলেই কোনো না কোনো কুরআন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেখা মেলে। কুরআনের ভাষা আরবি। এই ভাষা ইরানি জনগণের মুখের ভাষা নয়; এরপরও কুরআনের এত ব্যাপক চর্চার মূলে রয়েছে ওহীর ভাষার প্রতি জনগণের ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রাবল্য। অবশ্য এটি ইরানের জন্য গর্বের বিষয় যে, কুরআনী সংস্কৃতির বিস্তারকে ইরান তার সাংস্কৃতিক পলিসির কেন্দ্রীয় ভূমিকায় স্থান দিয়েছে।
ইরান কুরআন মজীদের জ্ঞান ও চর্চার ক্ষেত্রে এই অগ্রগতিকে নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে নি; বরং সারা জাহানের দ্বীনি ও ঈমানী ভাইদেরকে তার অংশীদার করেছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রতি বছর বহু কুরআন চর্চা দল বিশে^র বিভিন্ন প্রান্ত সফর করেন। তাঁরা বিভিন্ন দেশে কুরআন তেলাওয়াতের নূরানি ও রূহানি মাহফিলের আয়োজন করেন।
ইরান দেশের অভ্যন্তরে ও বহির্বিশ্বে কুরআন চর্চার ক্ষেত্রে যেসব খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছে তার একটি পরিসংখ্যান পেশ করা হলে বিষয়টি সহজে বুঝা সম্ভব হবে।
১. এ ক্ষেত্রে ইরানের ৭০ হাজার মসজিদের প্রধান কার্যক্রম কুরআন চর্চা ও মহানবী (সা.)-এর আহলে বাইতের জ্ঞান ও শিক্ষা বিস্তারের লক্ষে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
২. তিনটি বড় প্রতিষ্ঠান এসব কার্যক্রমের পেছনে শক্তির যোগান দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো কুরআনী সংস্কৃতি সম্প্রসারণ পরিষদ, সর্বোচ্চ কুরআন চর্চা পরিষদ এবং ইসলামি সংস্কৃতি ও নির্দেশনা মন্ত্রণালয়ের অধীন কুরআন ও আহলে বাইত ফাউন্ডেশন। এসব প্রতিষ্ঠান কুরআন চর্চার তৎপরতাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে সমর্থন ও সহায়তা দান, প্রতিভা খুঁজে বের করা ও সমন্বয় সাধনের কাজ আঞ্জাম দিয়ে থাকে।
৩. ৫০ হাজার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, দারুল কুরআন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কুরআন মজীদের কেরাআত, হিফ্য, তরজমা ও তাফসীর প্রশিক্ষণের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।
৪. ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আওকাফ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রতি বছর একটি করে বড় আকারের আন্তর্জাতিক কেরাআত ও হিফ্য প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ থেকে অনেক হাফেয ও কারী এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। অংশগ্রহণকারীদের বাছাই পর্বের কাজটি আঞ্জাম দিয়ে থাকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রতিভাবান ছেলেরা বহুবার এই প্রতিযোগিতা হতে বিভিন্ন পর্যায়ে আন্তর্জাতিক পুরস্কার ছিনিয়ে এনেছে। এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার পঁয়ত্রিশতম পর্বটি সম্পন্ন হয়েছে চলতি বছর।
৫. ইরানের চারটি ছাপাখানার প্রতিটি এক কোটি কপি ছাপার ক্ষমতা নিয়ে কুরআন মুদ্রণের কাজে নিয়োজিত আছে। কুরআন মজীদ ছাপার ব্যাপারে যে গুরু-দায়িত্ব ও স্পর্শকাতরতা রয়েছে তার আলোকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে যে কোনো সংস্থা বা প্রেসকে কুরআন মজীদ মুদ্রণের অনুমতি দেয়া হয় না। ইরানে মুদ্রিত এসব কুরআন ইরানের ভেতরে ও বাইরের দেশগুলোতে বিতরণ করা হয়।
৬. টিভি ও বেতারের চারটি প্রচার-মাধ্যম দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা বিশ্বের বিখ্যাত কারীদের তেলাওয়াত প্রচারের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে।
৭. কয়েক ডজন সংবাদ মাধ্যম, ওয়েব সাইট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কুরআনের জ্ঞান ও শিক্ষা সম্প্রসারণ ও বিস্তারের গুরু-দায়িত্ব পালন করে থাকে।
৮. ৫০টির অধিক ম্যাগাজিন ও ১০০ এর অধিক গবেষণা সাময়িকী কুরআনী জ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চার কাজ করে যাচ্ছে।
৯. ইরানের মাদ্রাসাগুলো ছাড়াও বিশটি উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কুরআন প্রশিক্ষক ও উস্তাদদের প্রশিক্ষণ দানের দায়িত্ব পালন করে থাকে।
১০. প্রতি বছর কুরআন হিফ্য কোরাস কণ্ঠে কুরআনের তেলাওয়াতকারী অগণিত গ্রুপ বিশ্বের আনাচে-কানাচে প্রেরিত হয়। তারা দুনিয়াবাসীর সামনে আল্লাহর মহিমান্বিত বাণী তেলাওয়াতের গুরু-দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
১১. বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসাগুলোর সমাপনী বর্ষের ছাত্রছাত্রীরা প্রতি বছর কুরআনিক সাইন্সের ওপর শত শত বই ও গবেষণাপত্র রচনা করেন এবং তা মুদ্রিত হয়।
১২. বিশ্বের সর্ববৃহৎ কুরআনিক আরকাইভটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রেডিও ও টিভি কেন্দ্রে অবস্থিত।