শুক্রবার, ২০শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং, ৫ই কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

English

কবি শাহরিয়ার ও তার ফারসি কবিতা

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ২৬, ২০১৬ 

আহসানুল হাদী
মোহাম্মদ হোসাইন শাহরিয়ার ইরানের কাব্যজগতের একটি সুপরিচিত নাম। ফারসি কবিতায় আধুনিক গজলের সূচনা তিনিই করেছিলেন। তিনি ১২৮৫ সৌর হিজরি (হি. শা.) মোতাবেক ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে ইরানের তাবরিয শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হাজি মির ওগা খোসগোনাবি আর মাতার নাম কাওকাব খানম, যিনি ‘খানম নানে’ নামেও পরিচিত ছিলেন। একজন দ্বীনদার ও ধর্মভীরু নারী হিসেবে তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন।
শাহরিয়ার ছিলেন স্বভাবকবি। কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিক কবিতা লিখে ফেলতেন। সেগুলোকে লিখেও রাখতেন না। এভাবে তাঁর অলিখিত অনেক কবিতা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।
মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি ফারসি ভাষায় কবিতা লিখতে শুরু করেন। সৌভাগ্যক্রমে সেই সময়ের লেখা তিনটি বেইত (দ্বিপদী শ্লোক) এখনো পাওয়া যায়। একবার শাহরিয়ারের মা তাঁর উপর রাগ করলে মাকে খুশি করতে গিয়ে তিনি নি¤েœাক্ত কবিতাটি লিখেন :
من گنه کار شدم واي به من
مردم آزار شدم واي به من
অর্থ:
হায় কপাল! আমি গোনাহের কাজ করে ফেললাম,
হায় আফসোস! মানুষের কষ্টের কারণ হলাম!
শাহরিয়ার তাবরিযের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় সেখানকার একজন তরুণ কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন এবং প্রথম বারের মত তাঁর কবিতা বেহজাত কাব্যনামসহ আদাব পত্রিকায় ছাপা হয়।
সৌর ১৩১০ হিজরিতে (১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ) শাহরিয়ারের প্রথম কাব্যগ্রন্থ মালেকুশ্ শোয়ারায়ে বাহার, সাঈদ নাফিসি ও পুজমান বাখতিয়ারের ভূমিকাসহ প্রকাশিত হয়।
শাহরিয়ারের পদ্য সাহিত্যকর্মই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শাহরিয়ারের সাহিত্যকর্মকে প্রধানত দু’ভাগে ভাগ করা যায় : ক. ফারসি কবিতা ও খ. তুর্কি কবিতা। তিনি ফারসিতে প্রায় ২৮ হাজার বেইত ও তুর্কিতে প্রায় ৩ হাজার বেইত লিখে গেছেন। ফারসি ভাষায় ৫৪৭টি গযল, ১০০টি কাসিদা, ২৫টি দীর্ঘ মাসনাভি, ১৫০টি কেতআ কবিতা, অন্যান্য বিভিন্ন গঠনের ১২৩টি খণ্ড কবিতা এবং ইসলামি বিপ্লব নিয়ে ৩৯টি কবিতা লিখেছেন। আর তুর্কি কবিতার মধ্যে হায়দার বাবায়ে সালাম (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড), সাহান্দিম ও তুর্কি মুক্ত কবিতাসমূহ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
সৌর ১৩২৮ হিজরিতে (১৯৪৯ খ্রি.) শাহরিয়ারের দিভান বা কাব্যসংকলনের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। ইমাম খোমেইনি (রহ.) শাহরিয়ারকে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকিতে ‘بلبل داستانسراي غزل فارسي’ ফারসি গযলের ‘বুলবুল পাখি’ বলে উল্লেখ করেন।
১৩৩৫ হিজরিতে (১৯৫৬ খ্রি.) তাঁর দিভান এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড এবং ১৩৪৬ হিজরিতে (১৯৫৬ খ্রি.) চতুর্থ ও পঞ্চম খণ্ড প্রকাশিত হয়। বর্তমানে তেহরানের এন্তেশারাতে নেগাহ শাহরিয়ারের দিভান বা কাব্যসমগ্র দুটি খণ্ডে প্রকাশ করেছে। তাঁর দিভান-এ গজল, কাসিদা, মাসনাভি, দো বেইতি, রুবায়ি, কেতআত, মোতার্ফারেকে ও কিছু মুক্ত কবিতা দেখতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ ফারসি সাহিত্যে প্রচলিত প্রায় সবধরনের কবিতাই তিনি লিখেছেন।
তবে শাহরিয়ার তাঁর সাহিত্যপ্রতিভার পুরোটাই ‘গযল’-এ ঢেলে দিয়েছেন। শাহরিয়ারকে বুঝতে হলে তাঁর গযলকে বুঝতে হবে। শাহরিয়ার পুরো জীবনের অভিজ্ঞতাকে তাঁর গযলে নিয়ে এসেছেন। ‘কবিতা লেখার জন্য তিনি গযলকে নির্বাচন করেননি; বরং জীবন কাহিনীই তাঁকে গযল নির্বাচন করতে বাধ্য করেছে।’
বিষয় বৈচিত্র্যের মাঝে প্রেমই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। শাহরিয়ার প্রায় সব ধরনের বিষয়বস্তু নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তাঁর কবিতাগুলো নিজের জীবনের খুব কাছাকাছি ছিল। ছোটবেলার বিভিন্ন স্মৃতি, না পাওয়ার বেদনা, জীবনের ব্যর্থতা, প্রেম, বিরহ, নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস প্রভৃতি দ্বারা শাহরিয়ারের কবিতাগুলো পরিপূর্ণ ছিল।
শাহরিয়ার ছিলেন সাধারণ মানুষের কবি। সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়া, দুঃখ-বেদনার চিত্র তাঁর কবিতার মধ্যে ফুটে উঠেছে। তিনি দেশ নিয়ে কবিতা লিখেছেন, দেশের মানুষের কথা বলেছেন।
পুরো ফারসি সাহিত্য জুড়েই, বিশেষ করে ফারসি গযলে অধ্যাত্মবাদের একটি প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। শাহরিয়ারের গযল দুনিয়া ত্যাগ, পার্থিব জীবনের প্রতি অনীহা, আখেরাতের প্রতি আগ্রহ প্রভৃতি আধ্যাত্মিক বিষয়বস্তু দ্বারা পরিপূর্ণ। حاتم درويشان، باده ي حسرت، کارگاه آدم سازي، دروغ اي دنيا، راز و نياز প্রভৃতি গযলে উপরিউক্ত বিষয়াবলি দেখতে পাওয়া যায়।
শাহরিয়ারের কিছু কিছু কবিতা সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও জাতীয় বিষয়াবলি নিয়ে লেখা। বিশেষ করে বিভিন্ন উৎসব, যুদ্ধ-বিগ্রহ, যোদ্ধাদের মাহাত্ম্য বর্ণনা, বিভিন্ন যুগের সাংস্কৃতিক রীতি-নীতি, ইরানের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার আকাক্সক্ষা প্রভৃতি বিষয়বস্তু নিয়ে কবিতাগুলো লেখা হয়েছে। شب و علي، به پيشگاه آذربايجان، تخت جمشيد، کودک قرن طلا، ماتم پدر প্রভৃতি কবিতাগুলো এই সমস্ত বিষয়বস্তু নিয়ে লেখা।
ইসলামি বিপ্লব নিয়েও তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন। ইমাম খোমেইনির প্রশংসা, বিপ্লবের বৈশিষ্ট্যাবলি, এই বিপ্লবে সাধারণ জনতার অংশগ্রহণ ও তাদের মনোভাব ইত্যাদি বিষয়সমূহ তাঁর বিপ্লবী কবিতায় স্থান পেয়েছে।
শাহরিয়ারের কবিতাগুলো আধুনিক ও ক্ল্যাসিক ধারার সংমিশ্রণে লিখিত। তাতে একদিকে নিযামি, হাফিয, অওহেদি ও সালমান সাওজির কবিতার বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, অন্যদিকে আধুনিক কবিতার ভাষাগত বৈশিষ্ট্য তাঁর কবিতাকে ফারসি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়েছে।
তাঁর গযলগুলো হৃদয়গ্রাহী ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর। শাহরিয়ার নিজের চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি ও জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোকে গযলের ভেতর উজাড় করে দিয়েছেন। বাহ্যিক, অভ্যন্তরীণ ও অর্থগত ছন্দের সামঞ্জস্যের মাধ্যমে গযলগুলো আধুনিক যুগের শ্রেষ্ঠ গযলের মর্যাদা লাভ করেছে। দিভান-এর চারশ’ গযল, গযল রচনায় তাঁর পারদর্শিতার প্রমাণ বহন করছে। মালেকুশ শোয়ারায়ে বাহারসহ অন্যান্য গবেষকের মতে : হাফিযের পর শাহরিয়ারই ফারসি গযলকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন।
শাহরিয়ারের গযলগুলোকে দু’টি যুগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি মানবীয় প্রেমের জ্বালা-যন্ত্রণার যুগ। দ্বিতীয়টি বিষণœতার যুগ বা আধ্যাত্মিক প্রেমের যুগ। নিমা ইউশিয, শাহরিয়ারের هذيان دل (হেযইয়ানে দেল) গযলটিকে শ্রেষ্ঠ গযল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। سه تار গযলটিও শাহরিয়ারের প্রসিদ্ধ গযলসমূহের মধ্যে একটি, এই গযল দু’টিতে কবি তাঁর জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন। গযল লেখার ক্ষেত্রে শাহরিয়ার অধিকাংশ জায়গায় হাফিযকে অনুসরণ করেছেন। হাফিযের চিন্তা-চেতনাকে আধুনিক ভাষায় গযলের ভেতর নিয়ে এসেছেন।
গযল ছাড়াও শাহরিয়ার কিছু উল্লেখযোগ্য মাসনাভি লিখেছেন। منظومهي تخت جمشيد তাঁর একটি বিখ্যাত মাসনাভি। এই মাসনাভিতে তিনি ইরানের প্রাচীন শৌর্য-বীর্যের ইতিহাস তুলে ধরেছেন ও এর সাথে বর্তমান ইরানের একটি তুলনামূলক আলোচনা করেছেন।
ক্ল্যাসিক গঠনরীতির পাশাপাশি আধুনিক গঠনের কবিতা বা নিমা ইউশিযের মুক্ত কবিতা অবলম্বনে বেশকিছু কবিতা লেখেন। پيام اينشتين তাঁর লেখা মুক্তধারার একটি কবিতা। এই কবিতায় তিনি একজন আইনস্টাইন চেয়েছেন, যার সাথে নিজস্ব প্রতিভাকে বিনিময় করবেন এবং এর দ্বারা সমাজের নিপীড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে দূর করা সম্ভব হবে। دو مرگ بهشت তাঁর আধুনিক কবিতার আরেকটি উদাহরণ, যেখানে স্বপ্নের ভেতর পারস্পরিক কথাবার্তার মাধ্যমে নিজের আধ্যাত্মিক চিন্তা-চেতনাকে তুলে ধরেছেন। سهنديه কবিতার মাধ্যমে শাহরিয়ার আধুনিক মোস্তাযাদ কবিতার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন।
শাহরিয়ার তাঁর তেজোদীপ্ত, গতিশীল, আন্তরিক, কোমল ও হৃদয়গ্রাহী ভাষার মাধ্যমে অবিস্মরণীয় ছন্দময় কবিতার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। তাঁর কিছু কবিতার ভাষা এতই সহজ-সরল যা শুনলে দৈনন্দিন কথা-বার্তার মত মনে হয়। সাধারণ মানুষের মুখের প্রচলিত শব্দগুলো তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন। যদিও অধিকাংশ সাহিত্য সমালোচক কবিতায় এই সাধারণ শব্দ ব্যবহারের সাহসিকতাকে প্রশংসা করেছেন, তবে কারো কারো মতে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ব্যবহার তাঁর কবিতার মূল্যকে কমিয়ে দিয়েছে। এ ধরনের শব্দ তাঁর কবিতার অনেক জায়গায় দেখতে পাওয়া যায়। যেমন :
آن بيد کناره جاده ده
آيا که پس از منش گذر کرد
هر برگي از آن زبان دل بود
با من چه فسانه ها که سر کرد
او ماند و جوان عاشق از ده
شب همره کاروان سفر کرد
অর্থ :
গ্রামের রাস্তার পাশে অবস্থিত ঐ বীদ বৃক্ষ!
আমার পরে কি আর কেউ তার পাশ দিয়ে চলে গেছে?
সেই বৃক্ষের প্রতিটি পাতায় হৃদয়ের ভাষা ছিল,
আমার কাছে কত গোপন কল্প-কাহিনী বর্ণনা করেছে।
সে দাঁড়িয়ে ছিল আর গ্রামের প্রেমিক যুবকেরা,
রাতের কাফেলার সাথে তার পাশ দিয়ে ভ্রমণ করেছে ॥
এই কবিতায় بيد، کناره جاده ده، منش، چه فسانه ها প্রভৃতি শব্দগুলো সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা।
গযলের ক্ষেত্রেও সাধারণ শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। গযলের ক্ষেত্রেও এই সাধারণ শব্দের ব্যবহার ফারসি সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এরকম কতগুলো গযলের মাত্বলা ছিল নিম্নরূপ :
آمدي جانم به قربانت ولي حالا چرا
بي وفا حالا که من افتاده ام از پا چرا
অর্থ :
এসেছ! আমার জীবন তোমার জন্য উৎসর্গিত! কিন্তু এখন কেন এলে?
বিশ্বাসঘাতক, যখন আমি নিঃশেষ হয়ে গেছি তখন কেন এলে?
تا هست اي رفيق نداني كه كيستم
روزي سراغ وقت من آيي که نيستم
অর্থ :
যতক্ষণ ছিলাম বুঝলে না হে! বন্ধু আমি ছিলাম কে,
একদিন আমার খোঁজে তুমি আসবে, সেদিন আর আমি রইব না যে ॥
****
আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার ছিল শাহরিয়ারের কবিতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যেমন :
با خلق مي خوري مي و با ما تلوتلو
قربان هر چه بچه ي خوب سرش بشو
অর্থ :
মানুষের সাথে মদ খাও আর মাতলামি কর আমার সাথে,
তোমাকে কোরবানি করে দিলাম যা ভাল মনে চায় তাই হও ॥

শাহরিয়ারের কবিতায় প্রকৃতির প্রভাব বিশেষভাবে দেখা যায়। সুনিপুণ দক্ষতার সাথে কবি প্রকৃতিকে কবিতায় নিয়ে এসেছেন এবং চমৎকারভাবে প্রকৃতিকে উপস্থাপন করেছেন। জঙ্গল, পাহাড়, সকাল, চাঁদ, ঝরনা, রাত ইত্যাদির বর্ণনা ও উপমা প্রায়ই নিয়ে এসেছেন। যেমন : তিনি তাঁর درياچة اشک বা অশ্রুর সাগর কবিতায় বলছেন :
سرو من صبح بهار است به طرف چمن آي
تا نسيمت بنوازد به گل افشاني ها
گر بدين جلوه به درياچة اشکم تابي
چشم خورشيد شود خيره ز رخشاني ها
অর্থ :
ওগো আমার চিরসবুজ বৃক্ষ! বসন্তের এই সকালে তৃণভূমিতে এস,
তোমার কোমল বাতাস ফুলের গায়ে আদর বুলিয়ে দেবে।
যদি তুমি এই আলো আমার অশ্রুর সাগরে ছড়িয়ে দাও,
তবে সেই বিস্ময়কর আলোয় আমার চোখ যেন সূর্য হয়ে যাবে ॥
শাহরিয়ারের কবিতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো গ্রাম্য ভাষার ব্যবহার। হায়দার বাবায়ে সালাম, সাহান্দিয়ে ও আরো বিশেষ কয়েকটি কবিতাকে বিশ্লেষণ করলে নিঃসংকোচে তাঁকে ‘পল্লিকবি’ বলা যায়। বিশেষ করে হায়দার বাবায়ে সালাম-এর মধ্যে পল্লি মানুষের জীবনধারা, তাদের সামাজিক অবস্থান, আচার-ব্যবহার, রীতি-নীতি, ভাষা ও সংস্কৃতি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। ফারসি কবিতার আধুনিক যুগের অন্য কোন কবি গ্রাম্য উপাদান নিয়ে এত কবিতা লেখেন নি।
শাহরিয়ারের কবিতায় তেহরানের অঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার ও তেহরান সংক্রান্ত আলোচনা অত্যধিক প্রাধান্য পেয়েছে। তাবরিযের কিছু ভাষাও কবিতায় দেখতে পাওয়া যায়, তবে তুলনামূলকভাবে তিনি তেহরানকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। تهران و ياران নামক গযলে বলেন :
من نه آنم كه فراموش كنم تهران را
شب تهران و شعاع و شفق شمران را
অর্থ :
আমি এমন নই যে, তেহরানকে ভুলে যাব,
তেহরানের সূর্যকিরণ ও সন্ধ্যায় লালিমার দৃশ্য উপভোগ করাকে ॥
চিত্রকল্প ব্যবহারের ক্ষেত্রে শাহরিয়ার বেশ পারদর্শিতার পরিচয় দেন। তাঁর চিত্রকল্পগুলো ছিল জীবন্ত ছবির মত। পরিপূর্ণ দক্ষতার সাথে জীবন্ত চিত্রকল্প ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি তাঁর কবিতার ভাষাকে বেশ সমৃদ্ধ করেছেন। যেমন : پيشة عشق বা প্রেমের পেশা শিরোনামের গযলে তিনি বলছেন :
به کاخ وصل تو پر مي فشاندم از سر شوق
کنون ز سنگ جدايي شکسته بال شدم
به دست تير و کمان آمدم به پيشة عشق
شکار شير نگاه تو اي غزال شدم
অর্থ :
অনেক আশা নিয়ে পাখা মেলেছিলাম তোমার মিলন প্রাসাদ দিকে,
তোমার বিচ্ছেদের পাথরের আঘাতে এখন ডানা ভাঙা (পাখির) মত হয়ে গেছি।
তীর আর ধনুক হাতে প্রেমের পেশায় নেমেছিলাম,
কিন্তু হায়! তোমার ব্যাঘ্র দৃষ্টির কাছে শিকারি হরিণে পরিণত হয়েছি ॥
এখানে কবি নিজের ভালবাসা, প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ, প্রেমিকার নির্দয় আচরণ ও প্রেমের শেষ পরিণতিকে শিকারি, বাঘ, হরিণ, ডানাভাঙা পাখি প্রভৃতি চিত্রকল্প দ্বারা চমৎকারভাবে চিত্রিত করেছেন।
সহানুভূতি বা অনুকম্পা প্রদর্শন শাহরিয়ারের কবিতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অপরের ব্যথায় তিনি ব্যথিত হয়েছেন, অন্যর দুঃখ-কষ্টে নিজেও কষ্ট পেয়েছেন। এই সহানুভূতিশীলতার মূল উৎস ছিল তাঁর জীবনের ব্যর্থ প্রেম। طوطی خوش لهجه (সুসময়ের তোতা পাখি) حالا چرا (এখন কেন), نی مخزون (চিন্তিত বাঁশি), سه تار من (আমার সেতারা), نيما غم دل بگو (নিমা হৃদয়ের ব্যথা বল), وحشی شکار (শিকারির পাশবিকতা) প্রভৃতি গযলে তাঁর অনুকম্পার প্রতিফলন দেখা যায়।
শাহরিয়ারের লিখিত গযলসমূহ তাঁর আবেগ-অনুভূতি ও ব্যক্তিগত চরিত্রের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। যে সমস্ত কবিতায় তাঁর সূক্ষ্ম অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাওয়া যায় সেগুলো হলো اي وي مادرم، کودک و خزان، بهشت گمشده، صبا مي ميرد، প্রভৃতি।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রতি শাহরিয়ারের পূর্ণ সমর্থন ছিল। ইসলামি বিপ্লবে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁদের প্রশংসায় কবিতা লিখেছেন। শাহরিয়ারের কবিতাগুলো নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে মিশে ছিল। তিনি কোরআন ও আহলে বাইতের আশেক ছিলেন। রাসূলে পাক (সা.), তাঁর পরিবারবর্গ, আহলে বাইত সদস্যদের নিষ্পাপ চরিত্র ও হযরত আলী (আ.)-এর প্রশংসায় তিনি অসংখ্য কবিতা লিখেছেন। যেমন : داغ حسين নামক কবিতায় বলেন :
محرم آمد و نو كرد درد و داغ حسين
گريست ابر خزان هم به باغ و راغ حسين
هزار و سيصد و اندي گذشت سال و هنوز
چو لاله بر دل خونين شيعه داغ حسين
অর্থ :
মুহররম এল, হোসাইনের ব্যথাভরা ক্ষতকে নতুন করে জাগিয়ে তুলল,
শরৎ এর মেঘগুলোও যেন হোসাইনের বাগানে ও তাঁর উপত্যকায় কাঁদছে।
তেরশ’ বছরের চেয়ে আরো বেশি কিছু সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু এখনো,
অনুসারীদের রক্তাক্ত বুকে টিউলিপ ফুলের মত হোসাইনের ক্ষত রয়ে গেছে।
اي هماي رحمت را بسرايد که কবিতাটিকে তাঁর সর্বোৎকৃষ্ট সাহিত্যকর্মের মধ্যে গণ্য করা হয়।
শাহরিয়ারের কবিতার ধর্মীয় বিষয়াবলিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। ক. রাসূলে পাক (সা.) ও তাঁর পরিবারবর্গের প্রতি অকৃত্রিম অনুরাগ, খ. ইসলামি বিপ্লবের প্রতি সমর্থন, গ. আধ্যাত্মিক বিষয়াবলি।
বিশেষ করে তাঁর প্রসিদ্ধ কাসিদা দু’টি قيام محمد، علي اي هماي رحمت আল্লাহর রাসূল ও হযরত আলী (আ.)-এর প্রশংসায় লিখেছেন। যেমন : علي اي هماي رحمت কবিতায় তিনি বলছেন :
علي اي هماي رحمت تو چه آيتي خدا را ؟
كه به ما سوا فكندي همه سايه ي هما را
অর্থ :
হে আলী! তুমি সৌভাগ্যময় রহমতের পাখি, তুমি খোদার কী অনুপম নিদর্শন!
তুমি আমাদের জন্য সকল সৌভাগ্যের আলো-ছায়াকে ছড়িয়ে দিয়েছ ॥
শাহরিয়ারের কবিতায় কোরআনের বিষয়াবলি নিয়ে তালহমিহ! লক্ষ্য করা যায়। যেমন : قاف عزلت শিরোনামের গযলে তিনি সূরা আরাফের ১৪৩ নম্বর আয়াতের অর্থাৎ ولما جاء موسي لميقاتنا و كلمه ربه قال رب ارني انظر اليك قال لن تراني . . এর ঘটনা বর্ণনায় বলছেন :
جلوه كن كه سخن با تو كنم چون موسي
سينه ام سوخته در حسرت سينا گشتن
অর্থ :
তোমার নিজেকে প্রজ্বলিত কর; কারণ, তোমার সাথে মূসার মত কথা বলব,
সিনা পর্বতের অনুশোচনায় আমার হৃদয় পুড়ে গেছে ॥
পরিশেষে বলা যায়, শাহরিয়ার ছিলেন একজন আধুনিক কবি। নতুনত্বের প্রতি কবি শাহরিয়ারের প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। তিনি তাঁর কবিতাগুলোকে নতুন ভাষা, চিত্রকল্প, বিষয়বস্তু ও চিন্তা-চেতনার দ্বারা নতুন আঙ্গিকে সাজানোর চেষ্টা করেছেন। নব যৌবনের উদ্দীপনা ও আধুনিক ভাবনা তাঁর কবিতার সর্বত্র প্রতিফলিত হয়েছে। دکتر غلامحسين يوسفي বলেন : ‘তাঁর বয়স ত্রিশ বছরের বেশি ছিল না, কিন্তু তাঁর কবিতাগুলো ছিল পরিপক্ব, এক কথায় বলা যায়, একটি সার্থক কবিতার জন্য যে সমস্ত শর্ত প্রয়োজন, যেমন : সুস্পষ্ট চিন্তা, সূক্ষ্ম শব্দচয়ন ও বিষয়বস্তুর প্রভাব, সবকিছুই তাঁর কবিতায় পাওয়া যায়।’

সহকারি অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়