বৃহস্পতিবার, ১৩ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৩০শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

কবিতার দেশে বিপ্লবের দেশে কিছু অনুভূতি ঃ আমিন আল আসাদ

পোস্ট হয়েছে: অক্টোবর ২২, ২০১৯ 

কবিতার দেশে বিপ্লবের দেশে কিছু অনুভূতি
আমিন আল আসাদ

পারস্য বা ইরানের কথা সর্বপ্রথম জেনেছিলাম ছোটবেলায় স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে। ইরানের কবি শেখ সাদীর জীবনের ঘটনা নিয়ে একটি গল্প ‘পোশাকের গুণে’ পাঠের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম ইরানের নাম আমার চেতনায় স্থান লাভ করে। এছাড়া সপ্তম শ্রেণির সাহিত্য পাঠে ‘সোহরাব রুস্তমের কাহিনী’ নামে একটি গল্প পাঠ করেছিলাম। বিদ্যালয়ের সেলিম স্যার কি দারুণভাবে পড়িয়েছিলেন গল্পটি আজো মনে আছে। গল্পটি ইরানের জাতীয় কবি মহাকবি ফেরদৌসীর ‘শাহানামা’য় রয়েছে।
আমার মেজ চাচা মরহুম জহুরুল করিম চৌধুরী একজন জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বইপ্রেমিক ও পাঠপ্রিয় মানুষ। তিনি আমাদেরকে নানা উপলক্ষে বই উপহার দিতেন। বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর ভালো রেজাল্ট করায় তিনি আমাকে ও তাঁর ছেলে মঞ্জুর-উল করিম চৌধুরীকে যথাক্রমে ‘ফুটলো গোলাপ ইরান দেশে’ এবং ‘শাহনামার গল্প’ নামে দুটি বই উপহার দেন। আমি পেয়েছিলাম মরহুম আখতার ফারুকের লেখা ফুটলো গোলাপ ইরান দেশে বইটি। দুটি বইই আমরা বিনিময় করে পড়েছিলাম। এভাবে শৈশব কৈশোর কাল থেকেই আমাদের স্বদেশের পাশাপাশি ইরান দেশটিও যেনো কেমন করে আপন হয়ে পরে। কিন্তু তখনো ভাবি নি মহান আল্লাহ সেই ভালো লাগা দেশটি ভ্রমণের তওফিক দেবেন। গিয়েছিলাম ইমাম খোমেইনী (র.)-এর ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠানে ২০০৮ সালে। আমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক লালকুঠি দরবার শরীফের পীর সাহেব জনাব আহসানুল হাদী, বিশিষ্ট লেখক আহমেদুল ইসলাম চৌধুরী, কবি মোহন রায়হান, কবি রোকন জহুর, কবি আহমেদ কায়সার, প্রকাশক মিজানুর রহমান পাটোয়ারী, ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন, মাওলানা সাবির রেজা, জনাব রাশেদুজ্জামান, জনাব আবু সায়িদ প্রমুখ। এর মধ্যে জনাব আবু সায়িদ ইরানেই থাকতেন। দেশে এসেছিলেন, তাই ফিরছিলেন আমাদের সাথে। তিনিও যোগ দেবেন ইমাম খোমেইনী (র.)-এর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে। আমরা গাল্ফ এয়ারে বাহরাইন হয়ে তেহরান যাব। জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইরানের উদ্দেশ্যে আমাদের বোয়িং আকাশের উড়াল দেয়ার সাথে সাথে এক অভাবনীয় আনন্দের ঢেউ খেলে গেল দেহমনে। কারণ, এটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম বিমান যাত্রা। আর যাচ্ছি আমার আদর্শের প্রতিষ্ঠাভূমিতে। কারণ, আমি যে সমাজের স্বপ্ন দেখি তা বিংশ শতাব্দীতে ইরানই করে দেখিয়েছে। যেখানে ঘটেছে এক আলোকের বিস্ফোরণ যা আলোকিত করেছে ইরানবাসীকে ও বিশ্ববাসীকে। হ্যাঁ, আমরা যাচ্ছি কবিতার দেশে ও বিপ্লবের দেশে। পারস্য সভ্যতার দেশে। সাহাবী সালমান ফারসি (রা.)-এর দেশে। যে দেশ সম্পর্কে আমাদের প্রিয়নবী (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যখন সূরা মুহাম্মাদের শেষ আয়াত নাযিল হয়- ‘যদি তোমরা পেছন ফিরে যাও তবে আল্লাহ এমন এক জাতিকে বছাই করবেন যারা তোমাদের মতো হবে না’। সাহাবীরা রাসূল (সা.)-কে বললেন : ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)! যদি আমরা পেছন ফিরে যাই তবে আল্লাহ পাক কোন্ জাতিকে বাছাই করবেন?’ সালমান ফারসি (রা.) রাসূল (সা.)-এর পাশেই বসা ছিলেন। মহানবী (সা.) সালমান ফারসির ঊরুতে আঘাত করে বললেন : ‘এই ব্যক্তি ও তার জাতি। শপথ তাঁর, যাঁর হাতে আমার জীবন, ঈমান যদি আকাশের সুরাইয়া তারকাতেও ঝুলে থাকে, ফারসের মানুষ সেখান থেকে তা ছিনিয়ে আনবে।’ সেদিনকার সেই র্ফাস-ই আজকের ইরান বা ফারসি বা পারস্য। সপ্তম শতকে মুসলিম বিশ্বে যত জ্ঞানী-গুণী জন্মগ্রহণ করেছিলেন এর বেশিরভাগই জন্মেছিলেন ইরানি ভূখ-ে। তখন ইরান আরো বড় ছিল। ইরাকের একটি বিরাট অংশ আর সমরকন্দ, বোখারা, তাজিকিস্তান, কাজাখস্তান প্রভৃতি রাশিয়া অধিকৃত প্রদেশগুলোও ইরানের ছিল। শিয়া ও সুন্নি উভয় মাযহাবের প-িতগণ ইরানে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মগ্রহণ করেন কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, মহাকাশবিদ, ধর্মত্ত্ববিদ প্রমুখ।
ইরানের কবিদের নাম বিশ্বসাহিত্যের আসরে বিশেষ মর্যাদা নিয়ে অবস্থান করছে। বিশেষ করে ইরানের জাতীয় কবি ফেরদৌসী ছাড়াও শেখ সাদী, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, নিযামী, রুদাকী, সুফিকবি মাওলানা রুমি, ফরিদউদ্দিন আত্তারের কথা বিশ্বের কবিদের মুখে মুখে বিরাজমান। মুসলিম দার্শনিক ইমাম গাজ্জালী, চিকিৎসাবিদ ইবনে সীনা, মহাকাশ বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আল বিরুনী, পদার্থবিদ আল ফারাবী প্রমুখ জ্ঞানী-গুণী ইরানে জন্মেছিলেন। আমাদের দেশে মরহুম সাহিত্য গবেষক মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন ইরানের কবিদের নিয়ে লিখেছিলেন ‘ইরানের কবি’ নামে এক বিশাল বই। আর মুহাম্মদ বরকতুল্লাহ লিখেছিলেন ‘পারস্য প্রতিভা’। আমরা জ্ঞানীদের দেশ, কবিদের দেশ এবং মহান ইমাম খোমেইনী (র)-এর দেশ, মহান ইসলামি বিপ্লবের দেশ ইরানে যাচ্ছি। আমরা ঢাকা থেকে বাহরাইন এবং বাহরাইন থেকে তেহরান গেলাম।
আমাদের প্রাণপ্রিয় স্বদেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। আমাদের রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। আমাদের রয়েছে জাতীয় সংস্কৃতি। আমরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করেছি এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পেয়েছি স্বাধীন স্বদেশ। তেমনি ইরানেরও রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। হাজার বছরের নানা সংগ্রামের ভেতর দিয়ে ১৯৭৯ সালে মহান ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমেই সত্যিকার স্বাধীন দেশে পরিণত হয় ইরান। প্রকৃত স্বাধীনতা মানে কি? প্রকৃত স্বাধীনতা মানে আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত না করা। দুনিয়ার কোন দেশ বা কোন মানুষ আমার প্রভু নয়, বরং বন্ধু। আমার দেশের সীমানা, আমার দেশের জনগণের ভালো-মন্দ, আমাদের আয়-উন্নতি, শিক্ষাদীক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মের ব্যাপারে অন্য কেউ নাক গলাতে পারবে না। কিন্তু কেউ কিছু জোর করে আমাদের মাঝে চাপিয়ে দিতে পারবে না। এটাই হলো আসল স্বাধীনতা। কাজেই আমাদের স্বাধীনতাকে মজবুত করতে হলে আমাদেরকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। দৃঢ় শপথ নিতে হবে। কঠোর পরিশ্রমী ও সৎ হতে হবে। এটি ইরানি জাতি থেকে শেখার আছে। কারণ, ইরান ও আমাদের বাংলাদেশের সাথে অনেক বিষয়ে মিল রয়েছে। যেমন আমরা বলি- ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির ভাষা সংগ্রাম আমাদেরকে মাথা নত না করার শিক্ষায় শিক্ষিত করেছে। কারণ, একজন দেশপ্রেমিক ও প্রকৃত ঈমানদার কোন আধিপত্যবাদীর কাছে মাথা নত করতে পারে না। আমরা বাংলাদেশিরা যেমন নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা ও ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে সাহসী ও স্বাধীন চেতনার অধিকারী হয়েছি। ইরানিরাও ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যে ইসলামি বিপ্লব করেছে সেখান থেকে মাথা নত না করার শিক্ষা লাভ করেছে এবং দিনে দিনে উন্নতি লাভ করেছে। ইরানের সাথে বাংলাদেশের রয়েছে জনগণের ধর্মবিশ্বাসের মিল, ইতিহাসের বিভিন্ন সময় আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিতেও ইরানের নানা বিষয় প্রবেশ করেছে। যেমন এদেশে যে সুফিগণ ইসলাম প্রচারে এসেছিলেন তাঁদের বেশিরভাগ ছিলেন ইরানি ভাবধারার। তাঁরা সবাই ছিলেন নবীবংশের ভক্ত। বাংলা ভাষায় সাড়ে সাত হাজার ফারসি শব্দ সরাসরি প্রবেশ করেছে নানা পরিভাষায়। আরো অনেক ফারসি শব্দ এসেছে বাংলায় পরিবর্তন পরিবর্ধন হয়ে।
এদেশের শাসকদের সাথেও ইরানের এবং ইরানের কবিদের সম্পর্ক ছিল। আমরা জানি, সোনারগাঁ থেকে যে সব সুলতান বাংলা শাসন করতেন তাঁদের সাথে ইরানের বন্ধুত্ব ছিল। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ ইরানের কবি হাফিজকে বাংলায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
এইসব কথা ভাবতে ভাবতেই মধ্য আকাশ থেকে আমরা ক্রমেই তেহরানের আকাশে এবং তেহরানের মাটির দিকে নেমে আসছিলাম। আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম মধ্যদুপুরের সোনালি রোদে চকচক করছিল তেহরানের রাস্তাঘাট, গাড়ি, বাড়িঘর, গাছপালা, বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, উঁচু গম্বুজ ইত্যাদি। আমরা অবতরণ করছি ইমাম খোমেইনী (র.) বিমানবন্দরে। কবিতার দেশ ও বিপ্লবের দেশ আর বিশ্বসেরা গোলাপের দেশ ইরানের মাটি স্পর্শ করতে করতে অপার এক আনন্দে দুলে উঠল মন এই ভেবে যে, আমরা আমাদের স্বপ্নের ভূমিতে এসে পড়েছি। বিমানের চাকা তেহরানের মাটি স্পর্শ করার সাথে সাথেই সকল যাত্রী সহ একসাথে দরূদ পাঠ করলাম নবীর শানে ‘আল্লাহুম্মা সাল্লে আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলে মুহাম্মাদ’। ইমিগ্রেশনের যাবতীয় কাজ শেষ করে এগিয়ে যেতেই লক্ষ্য করলাম দু’জন যুবক আমাদের জন্য দাঁড়িয়ে আছে ইমামের ছবিযুক্ত এক প্লাকার্ড হাতে নিয়ে। তাতে ইংরেজিতে যা লেখা তার অর্থ হচ্ছে ‘আমরা ইমাম খোমেইনী (রহ)-এর উনিশতম মৃত্যুবার্ষিকী উদ্যাপন কমিটির পক্ষ থেকে বিদেশী অতিথিদের আগমনের অপেক্ষা করছি।’ আমরা বললাম : ‘আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি।’
তারা বলল : ‘হ্যাঁ, আমরা আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছি।’ তারা তাদের অতিথিদের নামের তালিকা বের করে আমাদের সাথে পরিচিত হলো। যুবক দু’জন তেহরান ইউনিভার্সিটির ছাত্র। আমাদের লাগেজগুলো খুঁজে বের করতে সহযোগিতা করল তারা। এরপর আমাদেরকে সাথে করে নিয়ে এলো বিমান বন্দরের বাইরে। এখানে আমাদের জন্য দাঁড়িয়ে আছে চারটি মূল্যবান মোটর কার। হাত ইশারায় গাড়িতে চড়তে অনুরোধ করে বলল : ‘বেফারমাইদ’ অর্থাৎ দয়া করে উঠুন। গাড়ি ছুটে চলল ‘খিয়া’বানে ইমাম খোমেইনী’ অর্থাৎ ইমাম খোমেইনী (র.) সড়কের ওপর দিয়ে। সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। দু’চোখ ভরে দেখলাম ইরানি বিকাল। তেহরান বিশ্বের অন্যতম আধুনিক শহর। চতুর্দিকে পাহাড় আর পাহাড়। পুরো তেহরান শহর ঘিরে আছে আল-বোর্য পর্বতমালা। এর আশ-পাশে ছড়িয়ে আছে ধূসর পাহাড়। পাদদেশে সমতল ভূমিও রয়েছে বিস্তীর্ণ। ছোট বড় পাহাড়ের ওপর নির্মিত হয়েছে বড় বড় অট্টালিকা। আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে সত্তর কিলোমিটার গতিতে হু হু করে। অজস্ত্র গাড়ি আসছে যাচ্ছে। আমরা ইমাম খোমেইনী (র.)-এর মাযারের পাশ দিয়েই অতিক্রম করলাম। ড্রাইভার আমাদের হাত ইশারায় দেখালেন ইমামের মাযার। এটাই বেহেশত যাহরা। এখানে শুয়ে আছেন সত্তর হাজারেরও অধিক শহীদ। যাঁরা ইসলাম ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য অকাতরে তাঁদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা মারা যান নি। তাঁরা জীবিত। ‘আল্লাহর রাস্তায় যারা শহীদ তাদেরকে তোমরা মৃত বল না, বরং তারা জীবিত।’ আল কোরআনের বাণী অনুসারে কবিও বলেন সেকথা-
‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই/নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’
আমাদেরকে হোটেল ইস্তেকলাল-এ নিয়ে যাওয়া হবে। ইরানে তিনটি ফাইভস্টার হোটেল খুবই নামকরা। হোটেল ইস্তেকলাল, হোটেল আজাদী, হোটেল লালেহ। হোটেলগুলোর অন্য নাম ছিল। বিপ্লবের পর এধরনের নামকরণ করা হয়েছে। ইস্তেকলাল মানে স্বাধীনতা, আজাদী মানে মুক্তি, আর লালেহ অর্থ লাল টিউলিপ। সংগ্রামের প্রতীক। আমাদের দেশে যেমন সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে পলাশ, শিমুল, রক্তজবার কথা উল্লেখ করা হয়। আমরা হোটেল আজাদীর পাশ দিয়েই গেলাম। হোটেল আজাদী পাহাড়ের ঠিক মাঝখানে। চলতি পথে একটি টাওয়ার দেখতে পেলাম। এর নাম বোর্জে মিলাদ। বড় অট্টালিকাগুলোর দেয়ালে দেয়ালে ইরানের কৃতি সন্তান যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের প্রকা- ছবি আঁকা রয়েছে। শহীদ ড. বেহেশতি, শহীদ আয়াতুল্লাহ মোরতাজা মোতাহারী, শহীদ ড. মোস্তাফা চামরান, শহীদ ড. জাভেদ বাহোনার, শহীদ প্রেসিডেন্ট আলী রাজাই প্রমুখ। আরেকটি অট্টালিকার দেয়ালে দেখলাম ফিলিস্তিনের ইসলামি বিপ্লবের (হামাস) নেতা শহীদ শেখ মুহাম্মদ ইয়াসিন এবং শহীদ ইমাদ মুগনিহ-এর ছবি যার পেছনে আল-কুদ্স বা বায়তুল মোকাদ্দাসের বিশাল আকৃতির ছবি। এসব দেখতে দেখতে যখন হোটেল ইস্তেকলালে আমরা এসে পৌঁছলাম তখন মাগরিবের আজান হচ্ছে।
বিশ্ব সাহিত্যের আসর মাতানো শাহনামার দেশ, মসনবী শরীফের দেশ, গুলিস্তা, বোস্তা আর কারিমায়ে সাদীর দেশ, দিওয়ানে হাফিজ ও রুবাইয়াতে ওমর খৈয়ামের দেশ, আলো ঝলমল ও মোহময় পারস্য উপন্যাসের দেশ, সর্বোপরি ইমাম হোসাইন (আ.)-এর বিপ্লবী চেতনার দেশ ইরান যেমন এক স্বপ্নের ভূমি, তেমনি এক আপোষহীন সংগ্রামেরও ভূমি। সেজন্যই ইরান যেমন কবিতার দেশ, তেমনি বিপ্লবের দেশ। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্র উচ্ছেদ হয়েছিল একটি ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বৈপ্লবিক প্রক্রিয়ায়। ইসলামের ইতিহাসের এক মহান আত্মত্যাগের ঘটনা হলো কারবালায় সপরিবারে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর আত্মত্যাগ। কারবালায় ইমাম হোসাইন (আ.)-এর আত্মত্যাগ ও কালজয়ী বিপ্লবের চেতনাই সমগ্র ইরানি জাতিকে উদ্দীপ্ত করেছিল। সেজন্যই ইরানকে বলা হয় ‘আশুরা সংস্কৃতির লালন ভূমি’।
মহান ইমাম খোমেইনী (র.) ইরানি জাতির মাঝে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভোরের আকাশে সূর্যের মতো। ইমাম খোমেইনী (র)-এর পুরো নাম সাইয়্যেদ আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ মুসাভী আল খোমেইনী। তিনি ছিলেন নবী বংশের সন্তান। ইমাম হোসাইন (আ.)-এর বংশধারায় জন্ম নেয়া ৭ম ইমাম মূসা কাযেম (আ.)-এর বংশধর। ইরানের জনগণ তাঁর মতো মানুষের নেতৃত্ব পেয়ে বিশ্বের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো। যেন কুয়াশা আর বরফে আবৃত শীতের জড়তা ভেঙে জেগে উঠল হাজারো পুষ্প কানন। মানুষ তার অধিকার ফিরে পেল। ইরানের জনগণের ওপর চেপে থাকা অত্যাচারী শাহ দেশ ছেড়ে পালালো। ইমাম খোমেইনী শুধু ইরানি জাতিকেই ঝাঁকুনি দিয়ে জাগিয়ে দেন নি, গোটা বিশ্বের মুসলমান ও নির্যাতিত মানুষের হৃদয়ে নতুন করে আশা জাগালেন। বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে পৃথিবীর দিকে দিকে দেশে দেশে মুসলমানদের জাগরণ আমরা দেখতে পেয়েছি। ইরানের ইসলামি বিপ্লব সেইসব জাগরণকে নুতনভাবে প্রেরণা দিল। যুগ যুগ ধরে ফিলিস্তিনের মুসলমানদের ওপর ইহুদিদের নির্যাতন বর্বরতার সকল সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ইমাম এসব কঠিন মুহূর্তে মুসলিম জাতিকে ধৈর্য ধারণ করার উপদেশ দিলেন। ইমাম সকল দেশ-ভাষা, বর্ণ ও মাযহাবের মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ হবার উপদেশ দিলেন। মুসলমানদের প্রথম কেবলা আল-কুদ্স বা বায়তুল মোকাদ্দাস ও ফিলিস্তিনের মুসলমানদের মুক্তির ব্যাপারে সকল মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য প্রতি বছর মাহের রমযানের শেষ শুক্রবার তথা পবিত্র জুমাতুল বিদা-কে আল-কুদ্স দিবস ঘোষণা করলেন। আজো প্রতিবছর বিশ্বের সবকটি মুসলিম দেশে আল-কুদ্স দিবস পালিত হয়। ইমাম বলেছিলেন, ‘বিশ্বের সব মুসলমান যদি ঐক্যবদ্ধ হতো আর ইসরাঈলের ওপর সকলে মিলে এক বালতি করে পানিও ঢেলে দিত তবে ইসরাঈল বানে ভেসে যেত।’ আমরা দেখেছি, সালমান রুশদী নামের এক কুখ্যাত ব্রিটিশ লেখক মহানবী (সা.) সম্পর্কে যখন খারাপ মন্তব্য করে ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ নামে এক বই লিখে তখন একমাত্র ইমাম খোমেইনী (রহ.) পরাশক্তির সকল ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে সালমান রুশদীর মৃত্যুদ-ের ফতোয়া দিলেন। আমরা দেখেছি, ইমামের ফতোয়া ঘোষণার মাধ্যমেই সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সালমান রুশদী ও তার ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ বইয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। পৃথিবীতে একই বিষয় নিয়ে একই সাথে সব মানুষের এমন আন্দোলন আর দেখা যায় নি। আমাদের দেশের মুসলমানরাও সালমান রুশদীবিরোধী আন্দোলন করেছিল।
ইরানের রাজধানী তেহরানের পুরোটাই ইমাম ও ইসলামি বিপ্লবের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। তেহরানের রাস্তাঘাট, মেহেরাবাদ বিমান বন্দর, আযাদী স্কোয়ার, ময়দানে ইনকেলাব, তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়, ইমামের বাসগৃহ, সর্বোপরি বেহেস্ত যাহরা সহ স্মৃতিময় প্রত্যেকটি স্থান যেন বিপ্লবের এক একটি সৌধ। বাতাসে কান পাতলে আজো যেন শোনা যায় উত্তাল জনতার আকাশ কাঁপানো স্লোগান যা ফিরআউনরূপী শাহ, হামানরূপী আমেরিকা ও কারূণরূপী ইসরাঈলের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। মাটিতে হৃদয় বিছালে আজো পাওয়া যায় বীর শহীদদের বক্ষ থেকে ছিটকে পড়া রক্তের উত্তাপ। আমি আর হাদী সুযোগ পেলেই রেড়িয়ে যেতাম রাস্তায়। ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতাম। কল্পনায় খুঁজে বেড়াতাম সেই দৃশ্যগুলো। মনে হতো যেন এই ফ্লাইওভারের ওপরে ও নিচের রাস্তায় লক্ষ জনতার মিছিল। এই সব রাস্তাঘাটেই ইমামের মুক্তির দাবিতে, ইমামের নির্বাসনের বিরুদ্ধে, ইমামকে স্বদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য শিশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ সকলেই নেমে এসেছিল। ‘মার্গ বার শাহ’ অর্থাৎ শাহের পতন হোক। কিংবা ‘আজাদী, নাজাতি, জমহুরীয়ে ইসলামি’ অর্থাৎ স্বাধীনতা, মুক্তি ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র। কিংবা ‘আজ মুক্তির দিন’, ‘শহীদদের আত্মাদের ফিরে আসার দিন’, ‘শাহের পতন হোক’, ‘খোমেইনী স্বাগতম’, ‘হয় খোমেইনী, না হয় মৃত্যু’। আমরা পথে পথে হাঁটতে হাঁটতে আর তেহরান ইউনিভার্সিটি ও ময়দানে ইনকিলাবে গিয়ে বিপ্লব চলাকালীন ময়দানে ইনকিলাব ও তেহরান ইউনিভার্সিটির কথা মনে করলাম যা ছিল জনতার প্রতিরোধ দুর্গ। এইতো সেই জুমআর নামাযের স্থান। যেখানে আজো জাতীয়ভাবে জুমআর নামায অনুষ্ঠিত হয়। মেহেরাবাদ বিমানবন্দরে গেলাম। মেহেরাবাদ বিমান বন্দর ইসলামি বিপ্লবের ইতিহাসে এক অক্ষয় মনুমেন্ট। এই বিমান বন্দর দিয়েই অত্যাচারী শাহ ইমামকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। অদৃষ্টের অবধারিত পরিণামে ইরানি জনগণের ঘৃণা অবজ্ঞার আবর্জনা মাথায় করে শাহ সপরিবারে এই বিমান বন্দর দিয়েই পালিয়েছিল। আর এ বিমান বন্দরেই ইমাম অবতরণ করেছিলেন বীরের বেশে। ইমামকে জীবিতাবস্থায় না দেখলেও আমার মনে হলো যেনো আমি দেখছি ওইতো এয়ার ফ্রান্সের সিঁড়ি বেয়ে ইমাম দৃঢ়তার সাথে বীরের বেশে নামছেন তাঁর প্রাণপ্রিয় স্বদেশের মাটিতে। সারা বিমানবন্দর লোকে লোকারণ্য, ফটোসাংবাদিক, পত্রিকার রিপোর্টার ও টেলিভিষন ক্যামেরাম্যানদের দারুণ ব্যস্ততা। মেহেরাবাদ থেকে আযাদী স্কয়ার পর্যন্ত লক্ষ মানুষের ভীড়। তিলধারণের ঠাঁই নেই। স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরাও এসেছে। প্রত্যেকের হাতে রক্তগোলাপ, লাল টিউলিপ আর কারনেশন। মেহেরাবাদ বিমান বন্দরের অদূরেই আযাদী স্কয়ার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ওইতো এখানে ইরানি জাতি সম্বর্ধনা জানাচ্ছে ইমামকে। ইমাম জনতার উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন। জনতা স্লোগান দিচ্ছে। ‘আল্লাহু আকবার, খোমেইনী রাহবার’। আযাদী স্কয়ারের পাদদেশে দাঁড়িয়ে নীরবে অনুভব করা যায় সেদিনের উত্তপ্ত দিনগুলোর কথা।
রাজধানী তেহরানের একপ্রান্তে পাহাড়ের ওপর যে মহল্লায় ইমামের বাড়ি তার নাম জামারান। ইমাম এখানে থাকতেন বলে তাঁকে বলা হতো জামারানের পীর। এখানে একটি ছোট্ট ঘরে ইমাম থাকতেন। ইরানের শাহ যেখানে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছিল বিশাল রাজপ্রাসাদ। সেই জাতির নেতৃত্ব দিয়ে ইমাম দিন কাটাতেন গরীবের বেশে। ইমামের ঘরে রয়েছে একটি সাধারণ সোফা, সাদা কভারে আচ্ছাদিত, একটি ছাতা, ইমামের ছেলে মোস্তফা খোমেইনীর ছবি, একটি ঘড়ি ও সাদাকালো একটি টেলিভিশন। পাশেই রয়েছে মসজিদ। যেখানে উপরে একটি চেয়ার পাতা রয়েছে। এখানে বসে ইমাম ভাষণ দিতেন। আমার মনে হলো আমি তাঁর বয়ান শুনতে পাচ্ছি। ইমামকে সরাসরি না দেখলেও তাঁর স্মৃতিবিজরিত একেকটি স্থানে গিয়ে গিয়ে তাঁর জীবিতকালের দৃশ্যগুলোই আমি কল্পনার পর্দায় দেখতে লাগলাম। ইমামের বাসস্থানের পাশেই একটি ঘরে ইমামের অন্তিম জীবনের স্মৃতিগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে যা ইমামের হাসপাতাল জীবনের শেষদিনগুলোকে মনে করিয়ে দেয়। ওইতো সেই বেড- যেখানে অসুস্থাবস্থায় ইমাম শুয়েছিলেন। ওইতো সেই স্যালাইনের বোতল ও পাইপগুলো- যা অক্ষত রাখা হয়েছে। এই সেলাইনের বোতল ঝোলানো অবস্থায়ও ইমাম তাহাজ্জুদের নামায আদায় করেছেন। রুকু-সিজদা দিয়েছেন, পেছন থেকে ডাক্তার ইমামের রুকু-সিজদার সময় স্যালাইনের বোতলটি সাবধানে ওঠাচ্ছিলেন-নামাচ্ছিলেন যাতে ইমাম কষ্ট না পান।
ইমামের বাড়িটি দেখলাম, আবার পাশাপাশি আমাদেরকে রেযা শাহ পাহলভীর জৌলুশপূর্ণ জীবন যাপনের প্রমাণস্বরূপ শাদাবাদ প্যালেস জাদুঘরও দেখানো হলো। সমস্ত ইরানবাসীকে শোষণ করে শাহ কীভাবে বিলাসবহুল জীবনযাপন করত, কিভাবে শাহ ও তার বংশধর সাঙ্গ-পাঙ্গরা ইরানি জাতিকে ভিক্ষুকের জাতিতে পরিণত করছিল আমেরিকার তাঁবেদারি করে সেটা না দেখলে বোঝানো যাবে না।
ইমামের মৃত্যু দিবস ৩রা জুনে বেহেস্ত যাহরায় জড়ো হয়েছে লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ। সারা ইরানের বিভিন্ন শহর থেকে গাড়ি বোঝাই করে জনতা ছুটে এসেছে ইমামের রওজায়। ইমামের মাযারের পশ্চিম পার্শ্বে উপরে স্থাপিত হয়েছে মঞ্চ। আমরা মঞ্চের সামনে ছিলাম। ইরানের নেতৃবৃন্দ ভাষণ দিলেন। আলেমগণ বয়ান রাখলেন। ইমামের নাতি সৈয়দ হাসান খোমেইনী ভাষণ দিলেন, প্রেসিডেন্ট ভাষণ দিলেন। মুহুর্মুহু দরূদ, দোয়া, আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে এবং কিছুক্ষণ পরপর আমেরিকা ও ইসরাঈলবিরোধী স্লোগানে এক অন্যরকম দৃশ্যের সৃষ্টি হলো। অবশেষে রাহাবার ভাষণ দেয়ার জন্য দাঁড়ালেন। তখন জনতার স্লোগানের আওয়াজ আরো বেড়ে গেল।
এই সেই বেহেশত যাহরা। এখানে আমরা দাঁড়িয়ে। এখানে শুয়ে আছেন দুই লক্ষেরও অধিক শহীদ, যাঁরা আমেরিকার নির্দেশে ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দামের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, যাঁরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য অকাতরে তাঁদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। এত শাহাদাত, এত রক্তাদান কিন্তু ইরানি জাতিকে ভয় পাইয়ে দেয় নি; বরং কারবালায় সত্যের জন্য ইমাম হোসাইন (আ.)-এর আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে এই ত্যাগকে খুব সামান্যই মনে করেছে তারা। ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের চেতনায় নুতনভাবে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মনে হলো ওইতো জনতা স্লোগান দিচ্ছে ‘হার রুয আশুরা, হার যামিন কারবালা’।
তেহরানের পথে প্রান্তরে ইমাম খোমেইনী (র.) ও ইসলামি বিপ্লবের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো যেমন স্পর্শ করার সুযোগ পেয়েছিলাম, সুযোগ পেয়েছিলাম ইমামের বাড়ি-ঘর ও মাযার যিয়ারতের, তেমনি আমরা সৌভাগ্য লাভ করেছিলাম মাশহাদ প্রদেশে গিয়ে নবী বংশের ৮ম ইমাম রেযা (আ.)-এর মাযার যিয়ারতের। এই মহান ইমাম ও অলি-আল্লাহর রুহানি বরকত ইরানবাসী সবসময় পাচ্ছে। ইমামগণ, অলি-আল্লাহগণ, শহীদগণ অমর এবং তাঁদের আত্মা সর্বদা সজীব ও জীবন্ত, সেটি পবিত্র কোরআনে আছে- ‘আল্লার পথে যারা জীবন দিয়েছে তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত’। আল্লাহর পথে থেকে তাঁরা ইহকালে যেমন অগণিত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন তেমনি মৃত্যুর পরও তাঁরা তা পাচ্ছেন। ইমাম রেযা (আ.)-এর মাযারে সবসময় হাজার হাজার লোকের ভীড় লেগেই আছে। ইমাম রেযা (আ.)-এর মাযার যিয়ারত করে পেলাম আত্মার প্রশান্তি।
ইমাম রেযা (আ.)-এর পূর্বপুরুষ ইমাম মূসা কাযেম (আ.)-এর বংশেই জন্মেছিলেন ক্ষণজন্মা মহান ইমাম খোমেইনী (র.)। তাঁর মতো মানুষ কালে ভদ্রে জন্মায়, যিনি ছিলেন ইসলামি জনতার জন্য মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। কারণ, তিনি ঘুমন্ত জাতিসমূহকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। আজ পৃথিবীর সকল অপশক্তি ও পরাশক্তির বিরুদ্ধে সকল নির্যাতিত মানুষের পক্ষে একা দাঁড়িয়ে আছে ইরান। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সকল ক্ষেত্রে ইরান এগিয়ে গেছে। অজস্র সংগ্রামী মানুষের রক্তে পবিত্র যে দেশের মাটি তা আজ দুনিয়ার মুসলমানদের গর্ব। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের ভরসা ও আশ্রয়স্থল। ইমাম খোমেইনী (র.) আজ আর নেই, কিন্তু তিনি পৃথিবীর ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছেন।
কথায় আছে যে, ছুটি যত লম্বাই হোক না কেনো একদিন তা শেষ হয়। বেড়ানোর দিনগুলোও তাই শেষ হয়ে আসে একসময়। আমাদের পনর দিনের ভিসাও একদিন শেষ হয়। শেষের দিকে এসে দেশে ফিরে যাবার জন্য প্রাণ টানছিল। একদিকে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ও তথায় রেখে আসা প্রিয়জনদের টান অন্যদিকে স্বপ্নের ভূমি ইরানের প্রতি গভীর মমতায় দোটানার ভেতরেই স্বদেশের উদ্দেশে উড়াল দিলাম আবারো সেই ‘ফুরুতগাহে ইমাম খোমেইনী (র)’ বা ‘ইমাম খোমেইনী (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে। স্মৃতিতে সঙ্গে করে আনলাম ইরান ভ্রমণের অভিজ্ঞাতা ও অনুভূতি।
কবিতার দেশ ও কবিদের দেশ ইরান। বিপ্লবের দেশ ও বিপ্লবীর দেশ ইরান। অলিদের দেশ, সুফিদের দেশ ইরান। হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের দেশ ইরান। টিউলিপ আর বিশ্বসেরা গোলাপের দেশ ইরান। গানের দেশ প্রাণের দেশ ইরান। বাস্তবিক ইরান দেশটি খুবই সুন্দর। সুন্দর এর প্রকৃতি, পাহাড় ও মালভূমি। সুন্দর এর শহরের রাস্তাঘাট, ফুটপাথ, বাড়িঘরগুলো। তেমনি সুন্দর ইরানের মানুষের মন। তাদের আতিথেয়তার তুলনা হয় না। পথচারী, দোকানদার, বাস কন্ডাকটভর, ট্যাক্সি ড্রাইভার সবার কাছেই সুন্দর আচার-ব্যবহার পেয়ে মুগ্ধ হয়েছি। বিদেশী পেয়ে কোথাও ঠকানো তো দূরের কথা যেখানেই গিয়েছি তারা বলেছে, ‘শোমো মেহমানে মা’ অর্থাৎ আপনারা আমাদের মেহমান। তেমনি আতিথেয়তা পেয়েছি বিভিন্ন কাজে ও বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণে আমাদের গাইড হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত আল্লামা তাবাতাবায়ী ও তেহরান ইউনির্ভাসিটির ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে। হোটেলের বাইরে ফুটপাথে ও খোলা স্থানে হাঁটতে গিয়ে স্কুলের ছোট দুটি ছেলে-মেয়েও আমাদেরকে হেল্প করেছে পথের পাশে টেলিফোন বুথ থেকে কথা বলার কৌশল শিখিয়ে দিয়ে। আসলে তাদের সঙ্গে আমাদের এক প্রস্থ স্মৃতির কথা কোনদিনই ভুলব না।