সোমবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ওমর খৈয়ামের কবিতায় প্রফুল্লতা ও উপস্থিত মুহূর্তের মূল্যায়ন ড. মুহাম্মদ কাজেম কাহদূয়ী

পোস্ট হয়েছে: অক্টোবর ২২, ২০১৯ 

 

প্রফুল্লতা সন্ধান কর, কারণ, এই মুহূর্তই জীবনের সারবস্তু
মাটির কণায় কণায় কায়কোবাদ ও জামশীদের স্মৃতি অঙ্কিত।
জগতের গতিপ্রকৃতি আর যাপিত জীবনের ভিত্তিমূল
সবই স্বপ্ন, কল্পনা, ধোঁকা-প্রতারণা ও মুহূর্তের উপভোগ।
ওমর খাইয়াম নিশাপুরির পুরো নাম গিয়াস উদ্দীন আবুল ফাতাহ ওমর ইবনে খাইয়াম নিশাপুরি। তাকে খাইয়ামী, খাইয়াম নিশাপুরি ও খাইয়ামী নিশাপুরি হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। তিনি ৪২৭ ইরানি সালের ২৮ উর্দিবেহেশত (১৭ মে ১০৪৮ খ্রি.) ইরানের নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করেন।
হাকীম উমর খৈয়াম বিশ^বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ হিসেবে ইরানের ভেতরের ও বহির্বিশে^র অনেক জ্ঞানী মনীষীর কাছে অনুকরণীয় অনুসরণীয়। একজন বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি সর্বমহলে বরণীয় স্মরণীয়।
ওমর খাইয়ামকে নিয়ে যেসব গবেষণা পরিচালিত হয়েছে, তাতে দেখা যায় ১৩০০ সৌরবর্ষ থেকে নিয়ে ১৩৮০ সৌরবর্ষের মধ্যবর্তী সময়ে (১৯২১ শতকে) ওমর খাইয়ামকে নিয়ে ইরানে ৪২৫টি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ প্রবন্ধ খৈয়ামের জীবন, ব্যক্তিত্ব ও তাঁর কবিতা সংক্রান্ত। প্রবন্ধের সংখ্যা ১৬৬টি। এ ছাড়া কবিতার নান্দনিকতা বিষয়ে ১১টি, পা-ুলিপি পরিচিত সম্পর্কিত ৮টি, খৈয়ামের কালামশাস্ত্রীয় ও দার্শনিক রচনাবলি সম্পর্কে ১৮টি প্রবন্ধ রচিত হয়েছে। উল্লিখিত সময়কালের মধ্যে ইরানে রচিত খৈয়াম সংক্রান্ত গ্রন্থের সংখ্যা ৭০টি।
দুঃখজনক সত্য হলো, ওমর খৈয়ামের জন্ম ও মৃত্যু তারিখ আমাদের সঠিক জানা নেই। লেখক গবেষকগণ যত মত প্রকাশ করেছেন সবই কল্পনাভিত্তিক ও অনুমাননির্ভর। এর মধ্যে অধিকাংশ ইউরোপীয়ান লেখক বলেছেন, খৈয়ামের মৃত্যুসাল ৫১৭ (১১৩৮ খ্রি.)। ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ঃযব অৎধনরপ ডৎরঃঃবহ ঞৎধফরঃরড়হ এ ইৎড়পশবষসধহহ লিখেছেন, এই তারিখ হলো ৫১৫ (১১৩৬) সাল। তবে কেউই খৈয়ামের মৃত্যুসাল সম্পর্কে প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন করতে পারেন নি। গবেষকদের কেউ কেউ বলেছেন, ইউরোপীয় লেখকদের মধ্যে যাঁরা খৈয়ামের মৃত্যুসাল ৫১৭ বলে উল্লেখ করেছেন তাঁদের সনদসূত্র সম্ভবত রেযাকুলী খান হেদায়াতের ‘মাজমাউল ফুসাহা’ নামক কিতাব। কিতাবটিতে খৈয়ামের মৃত্যুসাল ৫১৭ হিজরি বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে যে বিষয়টি অধিকতর সঠিক বলে প্রতীয়মান হয় তা হচ্ছে খৈয়ামের মৃত্যুসাল ৫২০ হিজরির পরবর্তীকাল।
উপনাম : খৈয়াম এর উপনাম বা কুনিয়াত কারো মতে আবু হাফ্স, কারো মতে আবুল ফাতাহ। উস্তাদ জামাল উদ্দীন হুমায়ী লিখেছেন, হাকীম আবু হাফ্স বা আবুল ফাতাহ গিয়াস উদ্দীন ওমর ইবনে ইবরাহীম খাইয়ামী নীশাবুরি। তবে খৈয়ামের উপনাম আবু হাফ্স ছিল বলেই প্রতীয়মান হয়। অভিধানে আবু হাফ্স শব্দের অর্থ বাঘ।
ইরানের সালজুকী আমলের বিখ্যাত জ্যোতিঃশাস্ত্রবিদ, গাণিতিক ও কবি ছিলেন। তিনি মধ্যবয়সে ইমাম মুয়াফফাক নিশাপুরির কাছে ফিকাহশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। এ সময়ে তিনি হাদীস, তাফসীর, দর্শন, হিকমত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, হাকীম উমর খৈয়াম দর্শনশাস্ত্র সরাসরি গ্রিক ভাষা থেকে আয়ত্ত করেন।
বর্ণিত আছে যে, উমর খৈয়ামের শিক্ষকতা বা পুস্তক রচনার প্রতি মোটেও আগ্রহ ছিল না। এর কারণ সম্ভবত এটাই ছিল যে, তাঁর কাছে পাঠে বসার মতো বিচক্ষণ ছাত্র তিনি খুঁজে পান নি। এর কারণ এটাও হতে পারে যে, তাঁর সময়কালটি ছিল সালজুকী বংশের রাজত্বকাল। সালজুকীরা দর্শনের প্রচ- বিরোধী ছিল এবং ফকীহ ও যাহেরপন্থীদের ফিকাহর মাসয়ালা নিয়ে ঝগড়া ও তর্ক-বিতর্কের বাজার ছিল সরগরম। কাজেই তিনি সময়টিকে তাঁর মুক্ত ও সমুন্নত চিন্তাধারার প্রকাশের জন্য উপযোগী মনে করেন নি। এরপরও তাঁর কিছুসংখ্যক রচনা পাওয়া যায় যেগুলো মধ্যযুগে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয় এবং ইউরোপীয়দের মহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। খৈয়ামের রচনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মীযানুল হিকমত, লাওয়াযেমুল আমকানাত, নওরোযনামা, জাবার ও মোকাবিলা (অ্যালজেব্রা), রেসালা ফী শারহে মা আশকালা মিন মুসাদেরাতে ইকলিদুস, রিসালা মুশকিলাতুল হিসাব ইত্যাদি।
অ্যালজেব্রা সম্পর্কে তাঁর রেসালা এবং আরো কিছু পুস্তিকায় তিনি জ্যামিতির নানা জটিল সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। এই রচনাটি তাঁর বিখ্যাত গাণিতিক রচনার একটি।
মেরাজের ধরন সম্পর্কেও তিনি একটি পুস্তিকা লিখেন। প্রকৃতিবিজ্ঞানের ওপরও তাঁর প্রচুর লেখালেখি আছে। সুদীর্ঘ জীবনে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় এসব রচনা লিপিবদ্ধ করেন।
উমর খৈয়ামের বলে কথিত ফারসি ভাষার একটি রচনা হচ্ছে নওরোজনামা। এই পুস্তকে খুবই প্রাঞ্জল ও সরল ভাষায় নওরোজ আনুষ্ঠানিকতার উৎপত্তি, সাসানি রাজাদের দরবারে নওরোজ পালনের নীতিমালা বর্ণিত হয়েছে। তিনি মনের উদ্দীপনা নিয়ে আগেকার রাজা-বাদশাহদের শাসনপদ্ধতি এবং তাঁরা যেসব জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় উৎসাহী ছিলেন তার বর্ণনা দেন। প্রাচীন যুগের কয়েকজন রাজা-বাদশাহর জীবনচিত্র ও ইতিহাস তিনি তুলে ধরেন।
খৈয়াম ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। ইরানের আজকের যে বর্ষপঞ্জি, তার নির্ঘণ্ট তৈরি করেন তিনি এবং তাঁকে সহায়তা করেন আরো কয়েকজন বিজ্ঞানী। এই ঘটনাটি ছিল জালাল উদ্দীন মালিকশাহ সালজুকির আমলে। ইরানি বর্ষপঞ্জিকে যে ‘তাকবিমে জালালী’ বা ‘জালালী সাল’ বলা হয় তা এই বাদশাহর নামানুসারেই বলা হয়। খৈয়াম জ্যেতিঃশাস্ত্রীয় গণনার ক্ষেত্রে নিজেও একটি পুস্তিকা রচনা করেন। গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান ছাড়াও দর্শন, বিশ^-ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব ও ফিকাহশাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। তিনি গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞানের ওপর শিক্ষকতা করতেন। ছাত্রদেরকে তিনি শরীরচর্চা ও মননচর্চায় উৎসাহিত করতেন বলে জানা যায়। এসব কারণে তাঁর সময়কার সূফি ও সাধকদের অনেকেই তাঁকে আপন বলে মনে করতেন।
ওমর খৈয়ামের কবিতার বৈশিষ্ট্য
খৈয়ামের কবিতা ছিল চতুষ্পদী, ছোট কবিতা। একেবারে সাদাসিধা, নিজের নামযশ প্রকাশ করার মতো অলংকার হতে মুক্ত। তবে একই সময়ে বিশাল সৃষ্টিজগতের অনন্ত রহস্য সম্পর্কে চিন্তাশীলতা ও গভীর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সমৃদ্ধ ছিল। বলা হয়েছে যে, খৈয়ামের প্রকৃত রূবাইর সংখ্যা ছিল ৭০টি। অথচ তাঁর রূবাইর সংখ্যা এক লক্ষের বেশি হবে বলে দাবি করা হয়। (মুহাম্মদ মসউদ সিদ্দিকী, ১৭ বাহমান ১৩৯৭ ইরানি সাল)
রাজনৈতিক পরিস্থিতি
ওমর খৈয়ামের আমলে রাজনৈতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনা সংঘটিত হয়। যেমন আলে বুইয়া শাসকগোষ্ঠীর পতন, সালজুকীদের উত্থান, ক্রুসেড যুদ্ধ, বাতেনীপন্থী ইসমাঈলী সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ, খৈয়ামের প্রথম জীবনের সঙ্গীমহল, ইসমাঈলী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধবাদী গোষ্ঠী- যারা ইসমাঈলীদের কাফের আখ্যায়িত করত, তারপরে হিজরি তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি কারামাতিদের উত্থান- এ সবকিছু মিলে সমাজের সর্বত্র চরম ঘোলাটে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
ওমর খৈয়ামের যৌবনকালের যখন শুরু তখন ইবনে সীনা ও আবু রায়হান বীরুনীর বার্ধক্যকাল। দেখা যায়, প্রখ্যাত সাহিত্যবিশারদ নিজামী আরুজী সামারকান্দী ওমর খৈয়ামকে ‘হুজ্জাতুল হক’ সত্যের বা আল্লাহর পক্ষে দলিল এবং আবুল ফযল বায়হাকী ‘সমকালীন ইমাম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ওমর খৈয়ামকে ইবনে সীনার উত্তরসূরি ছাড়াও প্রাকৃতিক দর্শন, গণিত, যুক্তিশাস্ত্র ও মেটাফিজিক্স এর বরণীয় শিক্ষক হিসেবে স্মরণ করা হয়।
‘যা হওয়ার হোক’
ওমর খৈয়ামের জীবন দর্শনের অন্যতম কথা হচ্ছে ‘যা হওয়ার হোক না কেন’। তাঁর রূবাইয়াতের প্রধান অংশ জুড়ে রয়েছে নানা সমস্যার মোকাবিলায় নির্বিকার থাকা ও জীবনকে উপভোগ করার আহ্বান। শরাব, মদ্যপান ও সময়-সুযোগকে উপভোগ করা সম্পর্কিত তাঁর বাচনিক অভিব্যক্তিকে অনেকে আক্ষরিক অর্থে বিবেচনা করেছেন। ফলে অনেকের মনে খৈয়াম একজন বল্গাহীন, মদ্যপ, আনন্দ-ভোগের পূজারি বলে একটি বিকৃত চিত্র ফুটে উঠে। অথচ প্রকৃত অবস্থা এর চেয়ে ভিন্নতর।
‘মেয়’ বা মদ ফারসি সাহিত্যে এক বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং ফারসি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ শিল্পীরা রূপক অর্থে মেয়-এর ব্যবহার করেছেন ব্যাপকভাবে। পূর্ববর্তী কবি-সাহিত্যিকদের রচনায় মেয় অর্থ মদ নয়; বরং এটি এক বিমূর্ত ভাবধারা, যা কবিতার ভাষায় সৌন্দর্য আরোপ ও নান্দনিকতার বলয় তৈরির জন্য তাঁরা ব্যবহার করেন। কবি নিজামী গাঞ্জাবী তাঁর শরফনামা (ইসকান্দারনামার প্রথমার্ধ্ব) কাব্যে বলেন,
হে খিজির! মনে করো না আমার উচ্চারণে
মেয় (মদ) বলতে আমার উদ্দেশ্য শরাব বুঝানো
মেয় বলতে আমি আত্মহারা অবস্থা বুঝাতে চাই
সেই আত্মহারা অবস্থা দিয়ে জলশা আসর সাজাই।
আমার মদিরা পরিবেশক তো খোদায়ী প্রতিশ্রুতি
মদিরার নষ্টামির চুমুক তো আত্মহারা মত্ততা,
নচেত খোদার কসম যতদিন থেকে বেঁচে আছি
কখনোই মদিরায় কলুষিত করি নি আমার ঠোঁট দুটি।
যদি মদের চুমুকে রসনা কখনো কলুষিত করি
আল্লাহর যত হালাল, হারাম হবে আমার ওপর।

সৃষ্টিরহস্য অজ্ঞাত
খৈয়ামের জীবনদর্শনের অন্যতম মূলকথা, সৃষ্টি রহস্যের কেউ কূল-কিনারা করতে পারে না। তিনি বলেন,
আমার আসাতে লাভ হয় নি দিকচক্রবালের
আমার চলে যাওয়ায় বাড়ে নি তার প্রতিপত্তি
কারো কাছ থেকেই আমার এই দু’কান শোনে নি
আমার এই আসা এই যাওয়া কিসের জন্য ছিল।

জীবনের ব্যথা
খৈয়ামের জীবনদর্শনের অন্যতম মূল আবেদন- এই জীবন ব্যথায় ভরা। তিনি লিখেছেন :
আমার আসা যদি আমার ইচ্ছায় হতো, আসতাম না
আমার যাওয়া যদি আমার ইচ্ছায় হতো, যেতাম না।
এই নষ্ট জগতে যদি এর চেয়ে উত্তম না হতো তাহলে
আমি আসতাম না, চলে যেতাম না, থাকতামও না।

আদিকাল হতে লেখা নিয়তি
খৈয়াম মনে করেন, নিয়তিতে আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ লেখা। কাজেই জীবনে পাওয়া, না-পাওয়ার কারণে দুশ্চিন্তা অনর্থক।
যদিও আমার আছে গায়ের রঙ সুন্দর আনন
টিউলিপের মতো চেহারা দেবদারুর গড়ন
জানলাম না মাটির এই আনন্দ চিত্রশালায়
আদি চিত্রকর কেন অঙ্কিত করল আমায়।
খৈয়াম তাঁর রূবাইর একাংশে জীবনের তুচ্ছতা ও লক্ষ্যহীনতার দর্শনটি নিজস্ব চিন্তার আলোকে উপস্থাপন করতে প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর ব্যথা সম্পূর্ণ দার্শনিকসুলভ ব্যথা। তিনি তাঁর অনুভবের পটভূমি থেকে সৃষ্টির উৎসের কাছে অনুযোগ করেন। তা বেদনার দর্শন ও প্রত্যক্ষণ থেকেই তাঁর এই অনুভব জাগ্রত হয়।
মুহূর্তকে কাজে লাগাই
খৈয়ামের জীবনদর্শনের মূল কথা- ‘এখন এই মুহূর্তকে কাজে লাগাই। উপস্থিত সময়ের সদ্ব্যবহার কর।’
জীবনের এই কাফেলা বিস্ময়কর গতিতে চলে যায়
এই মুহূর্তকে কাজে লাগাও, যা উচ্ছ্বলতায় বয়ে যায়।
সাকী! প্রতিপক্ষের আগামীকালের দুশ্চিন্তা করে লাভ কি
আনো জামবাটি দাও এই রাত যে দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
খৈয়ামের চিন্তা ও চেতনা সেই চিন্তাধারার ধারাবাহিকতা, যা মানুষ প্রাচীনকাল থেকে লালন করে এসেছে। মানুষ কোত্থেকে এসেছে, কোথায় যাবে, কেন এসেছে, জীবন কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, জীবনের সময় ও মেয়াদের কতটুকু তার অধিকারের আওতায় আছে, তা নিয়ে মানবমন সর্বদা চিন্তামগ্ন ছিল এবং নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়ে আসছে। এসব চিন্তা খৈয়ামকে অভীভূত ও হতবাক করেছে। সেই চিন্তাধারা নিয়ে তিনি জগৎ-সংসারের দিকে তাকান এবং নিজের দিশেহারা চিন্তাগুলোকে ছোট ছোট বাক্যে গুঞ্জরিত করেন।
যে বলয়ে আমাদের আসা, আমাদের যাওয়া
তার কোনো আদি নাই, নাই অন্ত কারো জানা
বলে নি কেউ কখনো এই বিষয়ে সঠিক কথা
এই যে আসা আর চলে যাওয়া, কোত্থেকে তা।
খৈয়ামের আগেও ফেরদৌসি এই চিন্তাধারাটির পুনরাবৃত্তি করেছেন শাহনামায় বহুবার। রুদাকী এবং সামানি আমলের কবিদের চিন্তায়ও এ ধরনের ভাবধারা ছিল। তবে এই চিন্তাধারাটি খৈয়ামের রচনায় সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে, আর যাঁরা তাঁর অনুকরণ করেছেন তাঁদের সংখ্যাও অনেক। সত্যিই পরবর্তী কবিদের ওপর খৈয়ামের চিন্তাধারার প্রভাব বিস্ময়কর।
ওমর খৈয়াম তাঁর কবিতার প্রায় এক তৃতীয়াংশ জুড়ে মনের প্রফুল্লতা আর জীবন উপভোগের মাধ্যমে উপস্থিত মুহূর্তকে কাজে লাগানোর কথা বলেছেন। যদিও এই চিন্তাধার খৈয়ামের নিজস্ব নয় এবং ইসলামপূর্ব যুগ থেকেই এর উৎপত্তি হয়েছে। তবে এই চিন্তাধারাকে কবিতার আদলে ফুটিয়ে তোলার কৃতিত্ব খৈয়ামকে দিতেই হবে। সমকালীন ইরানের সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক ড. আবদুল হুসাইন যাররীনকূব বলেন, ‘যদিও এ কথা সঠিক যে, আমাদের অনেক বিশ^াস ও বিনোদনচিন্তা যুক্তিবুদ্ধির পরিপন্থী, কিন্তু এরপরও মনের সাক্ষ্য হচ্ছে, এসব ধারণা-কল্পনার মধ্যে প্রফুল্ল থাকার চিন্তাটি মনে সুখ দেয়। আর এই সুখের অনুভূতিই জীবনের দুঃখ-দুর্দশার পুরস্কার। জীবনে যদি আনন্দ ও প্রফুল্লতার অবকাশ না থাকত তাহলে জীবন হতো কবরের মতো শীতল, নীরব এবং বেঁচে থাকার কষ্টের সাথে তুলনা হওয়ার অযোগ্য।’
হ্যাঁ, খৈয়ামের দর্শনের সারকথা হচ্ছে মনের প্রফুল্লতা এবং উপস্থিত মুহূর্তকে কাজে লাগানো। অবশ্যই খৈয়াম অনর্থক আনন্দ প্রফুল্লতার কথা বলেন নি। তিনি বলেছেন, আমাদেরকে আমাদের প্রতিটি মুহূর্তের মূল্য জানতে হবে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, এই জগৎ ছেড়ে চলে যাওয়ার সাথে সাথে আমাদের সময়-সুযোগও হাতছাড়া হয়ে যাবে।
খৈয়াম বিশ^াস করতেন, আমাদের জীবন গতানুগতিক হলে চলবে না। যেহেতু মৃত্যুর সময়টি কারো জানা নেই, কাজেই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাতে হবে। মৃত্যুচিন্তা সর্বদা খৈয়ামের সাথি ছিল। কখনো তিনি জীবনকে নিয়ে হতাশায় ভোগেন নি। জীবনকে তিনি পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন।
এসো হে বন্ধু কালকের চিন্তায় বসে না থাকি
জীবনের এই একটি মুহূর্তকে মূল্যবান ভাবি
আগামীকাল চলে যাব জীর্ণ শুঁড়িখানা ছেড়ে
সাত হাজার বছরীদের সাথে থাকব মিলেমিশে।
খৈয়াম বিশ^াস করেন, যে মুহূর্তগুলো আমরা অতিক্রান্ত করছি সেগুলোই আমাদের নিজস্ব। একদিন পর বা এক মিনিট পরের যে সময় তা আমাদের এখতেয়ারে নেই। কাজেই আগামীকালের এবং যে মুহূর্তটি আসবে কি আসবে না জানা নেই তা নিয়ে চিন্তা অনর্থক।
কতকাল তার চিন্তা করব, জানি না যা আছে কি নেই
এ জীবন আনন্দে কাটাতে পারব, নাকি না, জানা নেই।
ভরে দাও এই জামবাটি, কারণ, আমি তো জানি না
এই নিশ^াস যে নিচ্ছি তা নির্গত হবে, নাকি হবে না?
সৎ ও সরল জীবনের প্রত্যয়
আমরা নিজেদের সাথে ও অন্যদের বেলায় সৎ ও সরল থাকব। লোকদেখানো ভ-ামি থাকবে না আমাদের জীবনে ও আচরণে। যখনই কোনো প্রতিকূল পরিবেশের সম্মুখীন হব, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে নিজের জীবনের মাহফিলে হারানো আনন্দকে ফিরে আসার আহ্বান জানাব।
খৈয়াম তাঁর কবিতায় ইঙ্গিত করেন যে, সাধকগণ আল্লাহর ইবাদত করেন এজন্য যে, তাঁকে ইবাদতের যোগ্য মনে করেন। তাঁরা বেহেশতের লোভে বা দোযখের ভয়ে ইবাদত করেন না। ভয় ও লোভ হচ্ছে নাফ্সের বন্ধন, যেমন মাটি, পানি আগুন ও বাতাস দেহের বাঁধন। সাধক যখন সিদ্ধিলাভের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে তার দেহও দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সৃষ্টিলোকের উপাদান চতুষ্টয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন :
আমরা আর মদিরা, বাদক ও এই বিরান ভা-ার
মন-প্রাণ, জামবাটি ও জামা মদিরার কাছে বন্ধক
রহমতের আশা ও আযাবের ভয় থেকে মুক্ত
মাটি, পানি, আগুন ও বাতাস হতে বিমুক্ত।
আদিকাল হলো সূচনাহীন কাল। আদিকাল বলতে যা বুঝায় তা সময় বা কালের সমগোত্রীয় নয়। আদি মানে এমন একটি বিষয় যার কাল বা সময় জানা নেই। কোনো কালের গ-িতে আবদ্ধ হয় না আযাল বা আদিকাল। আদি সময়ের ঊর্ধ্বে, সময়ের গ-ির বাইরে। তার সূচনার শেষ নেই। সময়ের সূচক নিয়ে যতই চিন্তা করেন, যেখানে গিয়ে আপনার চিন্তা ক্লান্ত-বিষন্ন হয়ে যাবে সেখানেই আদিকাল। মোটকথা মানুষের চিন্তা ও মন না আদি পর্যন্ত পৌঁছতে পারে আর না অন্ত। এখানেই মানুষের জ্ঞানবুদ্ধি নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে আর বলে, আদির স্বরূপ আমি চিন্তা করব না, নিজের মন ও চিন্তার আওতায় তা আসে না। অন্ত বলতে যা বুঝায় তাও আমার চিন্তা ও কল্পনার আওতায় আসে না। কাজেই এটুকুই জানি যে, আদিকাল বলতে একটা কিছু আছে। অনুরূপ অন্ত বা অনন্তকাল বলতেও একটা বিষয় আছে। তবে আদি ও অন্তের স্বরূপ বা চিত্র কী তা বুঝাতে পারব না। আদির জগৎ বলতে যা বুঝায় তা ‘আলাস্তু বিরাব্বিকুম’ এর সাথে একাকার। ‘আলাস্তু বি রাব্বিকুম’ (অর্থাৎ আমি কী তোমাদের প্রতিপালক নই?)- এই পরিভাষা আমরা এ জন্য ব্যবহার করি যে, তা কুরআন মজিদে উল্লেখ আছে।
কাযা মানে আল্লাহর সামগ্রিক নির্র্দেশনা। অন্যকথায় শাশ^ত বিধান। কদর মানে পরিমাণ। এর প্রতিপাদ্য আয়াত লক্ষ করুন।
‘কোনো জিনিস এমন নেই যার উৎস ও ভা-ার আমার কাছে নেই। তবে আমি তা থেকে (হেকমত অনুযায়ী) নির্দিষ্ট পরিমাণে অবতীর্ণ করে থাকি।’ (সূরা হিজ্র, আয়াত-২১)
খৈয়াম এই মূলনীতি বিশ^াস করেন। সৃষ্টির সূচনা ও আদিকাল সম্পর্কে বিশ^াসী। আমরা এখানে রূবাই উল্লেখ করছি। এই রূবাই এর প্রথম দুই লাইনে খৈয়াম বলতে চেয়েছেন- আমাকে কোনো কিছুর জন্য দায়ী মনে করো না। কেননা, সবকিছুই স্রষ্টার ফায়সালা ও নিয়তির অমোঘ নিয়মে হচ্ছে। আমার ওপর খামোখা মন খারাপ করো না। কালের চক্রের আবর্তন যদি আমার নিয়ন্ত্রণে থাকত তাহলে আমি নিজেকে দিশেহারা অবস্থা থেকে মুক্তি দিতাম। দ্বিতীয় পঙ্ক্তিতে তিনি বলেন, আকাশম-ল বলছে, আমিও আমার ভাগ্যের হাতে দিশেহারা ঘুরছি।
আমার মনের কানে বলেছে আকাশ সংগোপনে
নিয়তির ফায়সালা জান যে তা আমার আদেশ।
আমার ঘূর্ণন চক্রের ওপর যদি আমার হাত থাকত
তাহলে নিজেকে রক্ষা করতাম দিশেহারা অবস্থা হতে।
খৈয়াম আদিকালের চিত্রকর-এ বিশ^াসী। কুরআন মজীদে আছে : ‘তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করেন। তিনি ব্যতীত অন্য ইলাহ নেই; তিনিই প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৯)
তিনিই তো আদিকাল থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।
যদিও আছে রূপ ও গন্ধ সুন্দর আমার
টিউলিপের মতো চেহারা দেবদারুর গড়ন
জানা গেল না মাটির এই রঙ্গমঞ্চে কেন
কী জন্য আদি চিত্রকর সাজালেন আমাকে।
আদির রহস্যাবলি, সৃষ্টির গুঢ়তত্ত্ব, পরকাল, কিয়ামত কারো জানার আওতায় নেই। আল্লাহ ছাড়া তা কেউ জানে না। খৈয়ামও তাই বলেন,
আদির রহস্য না তুমি জান আর না আমি জানি
এই ধাঁধাঁর বাক্য না আমি পড়েছি আর না তুমি।
আমার তোমার কথাগুলো লুক্কায়িত পর্দার আড়ালে
পর্দা যখন উঠে যাবে, না তুমি থাকবে আর না আমি।
অনুরূপভাবে খৈয়াম অন্যত্র আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ^াসের এই চিন্তাধারার বিস্তার ঘটান। তিনি বলেন, এই জগৎ, আকাশ প্রকৃতি আল্লাহর কুদরতের আজ্ঞাবহ। এর মধ্যে হস্তক্ষেপ করার অধিকার ও সাধ্য কারো নেই। তিনি বলেন,
যদি খোদার মতো আসমানের ওপর আমার হাত থাকত
এই আকাশ আমি সরিয়ে নিতাম মাথার ওপর থেকে
একটি নতুন আকাশ আমি নির্মাণ করতাম
স্বাধীনচেতারা সহজে পূরণ করত মনস্কাম।
শেষের ছত্রে খৈয়াম নামপুরুষ ব্যবহার করে বলেন, আমার যদি আল্লাহর মতো ক্ষমতা চলত আকাশের ওপর, তাহলে আমি এমন একটি আকাশ নির্মাণ করতাম, যার সাহায্যে প্রত্যেক স্বাধীনচেতা মানুষ তার মনস্কাম পূর্ণ করতে পারত। এখানে খৈয়ামের সমুন্নত চিন্তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। খৈয়ামের দৃষ্টিতে কেবল স্বাধীনচেতা মানুষদেরই মনস্কামনা পূরণ হওয়া চাই। এই শ্রেণির লোকেরাই তাদের মনস্কাম পূর্ণ করতে পারে। তাদের সহায়তায় এগিয়ে যাওয়া খৈয়ামের জীবনের স্বপ্ন বটে।

*ইরানিয়ান ভিজিটিং প্রফেসর
অনুবাদ : ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী