সোমবার, ১৮ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং, ৪ঠা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

English

ঐতিহাসিক গাদির-এ-খুম দিবসে হজরত আলী

পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৭ 

news-image

সৈয়দ গোলাম মোরশেদ:  জিলহজ ১৮, হিজরি ১০, ৬৩২ খ্রি., উম্মতে মুহাম্মদী (সা.)-এর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আনন্দঘন দিন। ওই ঐতিহাসিক দিনেই দ্বীন-ই-ইসলাম আল্লাহর কাছ থেকে পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হয় এবং আল্লাহর মনোনীত ধর্ম হিসেবে দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

বিদায় হজের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ফেরার পথে গাদির-এ-খুম নামক স্থানে আল্লাহর নির্দেশে এক অভিষেক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হজরত আলীকে (রা.) মুমিনগণের মওলা হিসেবে মনোনীত করেন। ওই ঐতিহাসিক ঘটনার ৮০ কিংবা ৮৪ দিন পর আল্লাহর রাসূল (সা.) আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। প্রিয়নবী (সা.) জীবনে মাত্র একবার হজ পালন করেছিলেন।

বিদায় হজ সমাপনের পর তিনি মদিনা অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন এহরাম পরা অবস্থায়। সঙ্গে সোয়া লাখ সাহাবি ছিল। পথে ১৮ জিলহজ মদিনার নিকটবর্তী গাদির-এ-খুম নামক স্থানে উপস্থিত হলে পবিত্র কোরআনের এ আয়াত নাজিল হয়।

‘হে রাসূল! যা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তা পৌঁছে দাও, আর যদি তুমি তা না কর, তবে তুমি (যেন) তাঁর কোন বার্তাই পৌঁছাও নি; এবং আল্লাহ তোমাকে মানুষের অনিষ্ট হতে রক্ষা করবেন; এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সঠিক পথে পরিচালিত করেন না।’ (সূরা মায়েদা : ৬৭)।

প্রিয়নবী (সা.)-এর ওপর দীর্ঘ ২৩ বছর পবিত্র কোরআন নাজিল হয়ে আসছে। নবুয়াত ও রেসালতের বিভিন্ন নির্দেশ তিনি যথাসময়ে উম্মতের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। কোরআন অবতীর্ণও প্রায় শেষ। বিদায় হজে সবার কাছ থেকে বিদায়ও নেয়া হয়েছে। নবীজীর শেষ সময় আর মাত্র ৮০ কিংবা ৮৪ দিন বাকি। এখন চিন্তা করার বিষয় হচ্ছে, কী এমন নির্দেশ- যা তিনি এখনও উম্মতের কাছে পৌঁছাননি? সত্যিই ভাববার বিষয়! আল্লাহর পক্ষ থেকে এই নির্দেশ নাজিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) গাদির-এ-খুম নামক স্থানে আল্লাহর ওই ঘোষণাটি উম্মতকে জানিয়ে দেয়ার জন্য এক অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন।

বারা ইবনে আজেব ও যায়েদ ইবনে আকরাম বর্ণনা করেন, ‘যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) গাদির-এ-খুম নামক এলাকায় এসে থামলেন, তখন সবাইকে একত্রিত করলেন, হজরত আলীর (রা.) হাত ধরে উপরে তুললেন এবং জনতার উদ্দেশে বললেন, ‘আমি কি তোমাদের ওপর তোমাদের নিজেদের চেয়ে অগ্রাধিকার রাখি না?’ লোকেরা বললেন, ‘হ্যাঁ ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)’। অতঃপর তিনি বললেন, ‘মান কুনতু মাওলাহু ফাহাযা আলীয়্যুন মাওলাহু, আল্লাহুম্মা ওয়ালি মান ওয়ালাহু, আদি মান আদাহু…’ অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমি যার মাওলা, এই আলীও তার মওলা। হে আল্লাহ যে তাকে বন্ধু বানায় তুমিও তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ কর, আর যে তার সঙ্গে শত্রুতা করে তুমিও তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ কর।

অতঃপর হজরত ওমর হজরত আলীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন, ‘ওহে আবু তালেবের সন্তান, প্রত্যেক মুমিন নর-নারীর মাওলা হিসেবে তুমি সকাল করবে, সন্ধ্যা করবে (বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসির, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ৬১৬, ইঃফাঃবা)। এই হাদিসটি কমপক্ষে ১১০ জন সাহাবা, ৮৪ জন তাবেঈ, ২৫৫ জন আলেম, ২৭ জন হাদিস সংগ্রাহক, ১৮ জন ধর্মতত্ত্ববিদ, ১১ জন ফিকাহবিদ, ইমাম ও আলেমবৃন্দ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। হাদিসটি মুসনাদে ইবনে হাম্বল, তিরমিযি, নাসাঈ, ইবনে মাযা, আবু দাউদ, তাফসিরে কাশশাফ ইত্যাদি বিখ্যাত কিতাবে উল্লিখিত হয়েছে। শাহ ওয়ালীউল্লাহ মোহাদ্দেস দেহলবীর ‘ইজালাতুল খাফা’ কিতাব বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য।

পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ তায়ালা হজরত আলীকে (রা.) মুমিনগণের মওলা হিসেবে ঘোষণা করছেন। দেখুন পবিত্র কোরআনের আয়াত ‘(হে বিশ্বাসিগণ!) তোমাদের অভিভাবক তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং সেসব বিশ্বাসী যারা নামায কায়েম করে্ এবং রুকু অবস্থায় যাকাত প্রদান করে।’ (সূরা মায়েদা : ৫৫)।

অনেক তাফসিরকারক বলেছেন যে, উক্ত আয়াত হজরত আলীর শানে নাজিল হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক আমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, ‘ইয়া আইয়্যুহাল্লাযিনা আমানু আতীউল্লাহা ওয়া আতিউর রাসূলা ওয়া উলিল আমরি মিনকুম’(সূরা নিসা : ৫৯)।

অর্থ হে ঈমানদারগণ তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূল ও তোমাদের মধ্যে যারা নির্দেশের অধিকর্তা তাদের আনুগত্য কর। ‘উলিল আমর’ অর্থ এখানে আল্লাহ এবং রাসূল (সা.)-এর পক্ষ থেকে উম্মতকে পরিচালনা বা হুকুম প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি। আল্লাহ এবং রাসূল (সা.)-এর নির্দেশ মানা সব মুমিন নর-নারীর জন্য ফরজ।

আল্লাহর নির্দেশে রাসূল (সা.) গাদির-এ-খুম এলাকায় হজরত আলীকে (রা.) ‘অছি’ (নিজের অনুপস্থিতিতে বা অবর্তমানে আপন কাজ সমাধা করার জন্য প্রতিনিধি নিযুক্তি), পবিত্র কোরআনের ভাষায় উম্মতের ‘উলিল আমর’ বা ‘মওলা’রূপে নিযুক্তি দিয়ে যান।

ইমাম ওয়াকেদি তার ‘আসবাবুন নুজুল’ কিতাবে, হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.)-এর বর্ণনায় এবং ইমাম ইব্রাহিম বিন মুহাম্মদ আল হামাউনি শাফেয়ী তার ফারায়েদুস সিমতাঈন কিতাবে হজরত আবু হোরাইরার বর্ণনায় বলেন সূরা মায়েদার উল্লিখিত ৬৭ নং আয়াতটি হজরত আলী (রা.)-এর শানে অবতীর্ণ হয়।

এভাবে হজরত আলীর (রা.) প্রতিনিধিত্বের বাইয়াত শেষ হলে পবিত্র কোরআনের এই আয়াতটি নাজিল হয় (দেখুন বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসির, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ৬১৬, ৬১৭, ইঃফাঃবা)। ‘আজ অবিশ্বাসীরা তোমাদের দ্বীন থেকে নিরাশ হয়ে গেল, অতএব, তোমরা তাদের ভয় কর না; বরং শুধু আমাকেই ভয় কর; আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে ইসলামের প্রতি সন্তুষ্ট হলাম।’( সূরা মায়েদা : ৩)।

উম্মতে মুহাম্মদীর দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়ার ঘোষণা এবং তাদের ওপর আল্লাহর নেয়ামত দান করার বিষয়টি সম্পূর্ণ হল। তাই প্রিয়নবী (সা.) আল্লাহর দরবারে এ বলে প্রার্থনা করলেন- ‘আল্লাহর মহানতর দ্বীনকে কামেল করে দেয়ার ওপর এবং নেয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দেয়ার ওপর এবং আবু তালেব নন্দন আলীর বেলায়াতের জন্য সব প্রশংসা আল্লাহর।’

মেশকাত শরিফে উল্লেখ রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদের উদ্দেশে বললেন, ‘যদি তোমরা আলীকে তোমাদের পথ নির্দেশক হিসেবে মেনে নাও তাহলে তোমরা তোমাদের সর্বাবস্থায় সিরাতুল মুস্তাকিমের মধ্যে শামিল পাবে। প্রিয়নবী (সা.) হজরত আলীর শানে আরও বলেন, ‘আনা দারুল হিকমাহ ওয়া আলীয়্যুন বাবুহা’ অর্থ: আমি হলাম হিকমতের গৃহ আর আলী হল তার দুয়ার। সূত্র: যুগান্তর।