মঙ্গলবার, ২৪শে এপ্রিল, ২০১৮ ইং, ১১ই বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

English

এবারের নওরোজে ইরান ভ্রমণের আকর্ষণীয় ৫ স্থান

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ২৯, ২০১৮ 

news-image

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে সাজ সাজ রবে চলছে ফার্সি নববর্ষ বা ‘নওরোজ’ উৎসব। এ উপলক্ষে নববর্ষের শুরুর দিন ২০ মার্চ থেকে দেশটির সব প্রতিষ্ঠানেই চলছে টানা ছুটি। আগামী ২ এপ্রিল পর্যন্ত ইরানের সবচেয়ে বড় জাতীয় এই উৎসব চলবে আড়ম্বরপূর্ণ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে। ফার্সি ‘নওরোজ’ শব্দটির অর্থ নতুন দিন। নওরোজ বিশ্বের প্রাচীনতম উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম।

ইরানিরা এই উৎসবকে সবচেয়ে বড় ঈদ বলেও মনে করে। নববর্ষের প্রথম দিন থেকে ১৩ দিন পর্যন্ত তারা এই উৎসব পালন করে থাকে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও এই উৎসবের জন্য দেশটিতে অন্য যেকোন জাতীয় উৎসবের চেয়ে বেশিদিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।ফারসি নতুন বছর শুরু হয় বসন্তের প্রথম দিন থেকে। বসন্তে প্রকৃতি যেমন সাজে নতুন সাজে তেমনি দেশটির গ্রামগঞ্জ, শহর, পাড়া-মহল্লা সাজে বর্ণিল সাজে। ফলে সেদেশের দর্শনীয় স্থানগুলো ভ্রমণপিপাসুদের কাছে হয়ে ওঠে আরও বেশি মনোমুগ্ধকর।

প্রতিবছরই নওরোজ উৎসব উপভোগে ইরানের অনেকে বিদেশি দর্শনীয় কোনো স্থান ভ্রমণের আয়োজন করে থাকে। আবার অনেকে দেশীয় পর্যটন শিল্পকেই নওরোজের ছুটি কাটানোর জন্য উত্তম হিসেবে গ্রহণ করে। এসময়ে দেশটির পর্যটন কর্মকর্তারা দেশীয় পর্যটন শিল্প বিকাশের পাশাপাশি অর্থনীতির চাকা শক্তিশালী ও কর্মসংস্থান তৈরিতে মহত সব পরিকল্পনা হাতে নিয়ে থাকেন। ফলে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে পর্যটন কেন্দ্রগুলো।

এবার ইরানের নওরোজ উৎসবে ঘুরাফেরার জন্য পর্যটকদের কাছে ৫টি আকর্ষণীয় এলাকা ও বিখ্যাত স্থানের বর্ণনা তুলে ধরা হলো।

ইসলামি পর্যটনের রাজধানী তাবরিজ

ইসলামি পর্যটনের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর তাবরিজ। ২০১৮ সালের জন্য ইসলামি পর্যটনের রাজধানী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে ঐতিহাসিক এ শহরটি। এ উপলক্ষ্যে দেশটিতে ‘তাবরিজ ২০১৮’ নামের একটি ইভেন্টেরও উদ্বোধন করা হয়েছে। যার মাধ্যমে তুলে ধরা হবে শহরটির পর্যটন সম্ভাবনাকে। তাবরিজে রয়েছে অসংখ্য যাদুঘর, ঐতিহাসিক ভবন, মসজিদ ও গির্জা। অতীতের অভিজ্ঞতা অন্বেষণকারীদের জন্য সঠিক জায়গা এটি। এছাড়া এ অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচিত হয় ঐতিহাসিক এ স্থানটি।

২০১৬ সালে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর পর্যটনমন্ত্রীদের নবম সম্মেলনে তাবরিজকে ২০১৮ সালের ইসলামি পর্যটনের রাজধানী হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৭ সালে সৌদি আরবের পবিত্র মদিনা শহর ও ২০১৬ সালে তুরস্কের কোনিয়া শহর ইসলামি পর্যটনের রাজধানী হিসেবে মনোনীত হয়।

তাবরিজে রয়েছে ইউনেসকো স্বীকৃত ‘বাজার অব তাবরিজ’ নামে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে পুরনো বাজার। আজকের দিনে পর্যটকদের কেনাকাটর জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় এলাকা এটি। এছাড়া পর্যটকরা তাবরিজে স্থানীয় বাহারি রকমের খাবারের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ পাবেন। নওরোজ উৎসবের সময় স্থানীয় অনেক ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করার সুযোগ থাকছে পর্যটকদের।

আবাদান ও খোররামশাহর

ইরানের একেবারে দক্ষিণ পশ্চিম কর্নারে অবস্থিত আবাদান ও খোররামশাহর শহর। এ দুটি ব্যস্ততম শহর হলেও এখানকার প্রতি পর্যটকদের অন্যরকম আকর্ষণ রয়েছে। এছাড়া এখানকার টাটকা তরতাজা মাছ, মশলা ও খেজুরের বাজার তো রয়েছেই। বিশেষত আবাদানের দোকানপাট, স্বস্তা মূল্যের উপহারসামগ্রী শহরটিকে দিয়েছে অন্যরকম উচ্চতা।

সন্ধ্যায় সেখানে হাঁটলে উপভোগ করা যায় মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। বিভিন্ন ধরনের দৃশ্য অবলোকন, নদী পাড়ি দেওয়ার আনন্দ, এবং ‍খুজেস্তান প্রদেশজুড়ে থাকা প্রাচীন ঐতিহাসিক এলাকাগুলো দিনের বেলায় ভ্রমণ করার মজায় আলাদা। ইরাক সীমান্ত ঘেঁষে রয়েছে সাবেক ওয়ার জোন। নিকটস্থ তালগাছের দ্বীপে ঘুরাঘুরি পর্যটকদের কাছে অন্য রকম আনন্দের। খুজেস্তান ঘুরাঘুরির সবচেয়ে উপযুক্ত সময় নওরোজ। এসময় বছরের সবচেয়ে সুন্দরতম আবহাওয়া উপভোগ করা যায় যা পর্যটকদের দেয় এক অনাবিল আনন্দ।

ইরানের অনন্য সুন্দর দ্বীপ কীশ

ইরানের দক্ষিণ উপকূল হতে ২০ কিলোমিটার দূরে পারস্য উপসাগরের উত্তরাঞ্চলে ৯১ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে অনেকটা ডিম আকৃতির একটি দ্বীপ রয়েছে। দ্বীপটির নাম কীশ। পূর্বপশ্চিমে কীশ দ্বীপের দৈর্ঘ্য ১৫ কিলোমিটার। আর উত্তর দক্ষিণে দ্বীপটির প্রস্থ প্রায় ৮ কিলোমিটারের মত। পারস্য উপসাগরে ইরানের যতোগুলো দ্বীপ রয়েছে তাদের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ এটি। কারণ, সমগ্র বিশ্বের সাথে ইরানের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে এই দ্বীপটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কীশ দ্বীপ নৌচালনা এবং মুক্তা কুড়ানোর জন্যে বিখ্যাত। এর চমৎকার আবহাওয়াও পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। শীতকালেও কীশের আবহাওয়ায় উষ্ণতার পরিমাণ ১৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নীচে নামে না। বছরের ছয় মাস গরম থাকলেও বাকি ছয়মাসের আবহাওয়া বেশ উপভোগ্য। এই দ্বীপে প্রচুর পরিমাণ প্রবাল রয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার বছর আগে থেকে এখানে মানববসতি গড়ে ওঠে।

ইরানের সর্বপ্রথম ফ্রি ট্রেড জোন কীশ দ্বীপের কেবল বাণিজ্য নয় টুরিস্ট স্পট হিসেবেও খ্যাতি রয়েছে।পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্যে গড়ে উঠেছে নান্দনিক স্থাপনা, চমৎকার হোটেল। প্রকৃতির সৌন্দর্য আর স্থাপনার নান্দনিকতায় কীশ হয়ে উঠেছে দর্শনীয় একটি দ্বীপ। কীশ দ্বীপে রয়েছে উপকূলীয় বৈচিত্র্য, রয়েছে স্ফটিক স্বচ্ছ পানি, বহুরকমের প্রবাল, বিচিত্র রঙের অ্যাকুরিয়ামের মাছ এবং সর্বোপরি কীশে রয়েছে মন কেড়ে নেয়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এগুলো কীশ দ্বীপ দেখতে যাওয়া যে কোনো দর্শক বা পর্যটকই  উপভোগ করতে পারেন। এছাড়া পর্যটক মাতাতে নওরোজের বর্ণাঢ্য আয়োজন তো রয়েছেই।

ইরানের কাজভিন প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী কিছু নিদর্শন

কাজভিন প্রদেশের প্রধান শহর কাজভিন নামেই প্রসিদ্ধ। এখানে রয়েছে হোসাইনিয়া, রয়েছে প্রাচীন জামে মসজিদ, চেহেল সুতুন প্রাসাদসহ আরও অনেক স্থাপনা। মোটকথা কাজভিন শহরের যেদিকেই তাকানো যাবে দেখা যাবে মিনারের পর মিনার। যেন মিনারের শহর কাজভিন। মিনারের সাথে আছে গম্বুজ, বিরাট বিরাট গম্বুজ। স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় কাজভিনে রয়েছে অসংখ্য মসজিদ। মসজিদের প্রাচুর্য দেখে মনে হয় এখানকার এমন কোনো স্থান নেই যে স্থান মুমিন মানুষের উপস্থিতি বা পাদচারণায় ধন্য হয় নি। কাজভিনের জামে মসজিদ বা কাবির মসজিদের দিকে তাকালেই দৃষ্টি অর্থবহ হয়ে ওঠে। অসম্ভব সুন্দর এই মসজিদটি। কাজভিন শহরের সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ এটি। বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী এই মসজিদ প্রাচীনত্ব এবং নির্মাণ শৈলীগত দিক থেকে ইরানের মধ্যে একেবারেই বিরল।

কাজভিন জামে মসজিদ বা মাসজিদে কাবিরের সবচেয়ে প্রাচীন অংশটি কে নির্মাণ করেছিলেন তা নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেছেন ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের হাতে হিজরি ১০০ সনে ওই অংশটি নির্মিত হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেছেন ১৯২ হিজরিতে হারুনুর রশিদের হাতে নির্মিত হয়েছে কাবির মসজিদের প্রাচীনতম অংশটি। অবশ্য বর্তমানে হারুনুর রশিদের নামেই ‘ত্বা’কে হারুনি’ নামে তা প্রসিদ্ধ। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নিদর্শন বিশেষজ্ঞদের মতে কাজভিন জামে মসজিদে ঐতিহাসিক বহু লিপিকর্ম রয়েছে। এইসব লিপিকর্ম সেখানকার কারুকার্যে বা নকশাগুলোতে কবিতা আকারে কিংবা বর্ণনায় উঠে এসেছে।

নবী করিম (সা) এর বংশধর ইমামযাদা হোসাইনের মাযার কাজভিন শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত। মাযার ভবনের যে স্থাপত্যশৈলী তা আলাদা বৈশিষ্ট্যময়। টাইলসের কারুকাজ, কাঁচের কারুকাজ এক কথায় চোখ ধাঁধানো। দেশি বিদেশি পর্যটক সবাই এইসব কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে যান, আকৃষ্ট হয়ে যান।

কাজভিন বাজার আরেকটি প্রাচীন স্থাপনা। এই বাজারের নির্মাণশৈলীও দেখার মতো। এই বাজারের ঐতিহাসিক মূল্য যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে সাংস্কৃতিক মূল্যও। ইসলাম-পূর্বকালে নির্মাণ করা হয়েছিল এই বাজারটি। দেশি বিদেশি পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় এই স্থাপনা এই কাজভিন বাজার।

ইরানের মরুভূমির মুক্তা- ইয়াযদ

ইরানের কেন্দ্রীয় পর্বতমালার পাশে অবস্থিত ইয়াযদ প্রদেশের প্রধান শহরের নাম ইয়াযদ। মরু আঞ্চলিক শহরগুলোর মধ্যে এটি ইরানের অন্যতম প্রাচীন, বৃহত্তম ও  সুন্দর শহর হিসেবে স্বীকৃত। ইয়াযদ মানে হলো পাক পবিত্র। ইয়াযদ শহরটির বৈশিষ্ট্য তার নাম থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যায়।

ইয়াজদ মরুভূমিতে সূর্যাস্তের দৃশ্য অবলোকন অন্যরকম আনন্দের। হিজরি পঞ্চম শতক থেকে এই শহরটির বিকাশ ঘটে। আতাবাকিরাই এই শহরের উন্নয়নে অবদান রেখেছিল। ইয়াযদেও দেখার আছে অনেক কিছু। বিশ্ব পর্যটকরা এই শহরে প্রায়ই বেড়াতে আসে ইয়াজদের মসজিদে কাবির, ফাহরাজ জামে মসজিদ, সাইয়্যেদ রোকনুদ্দিনের সমাধি, দৌলতাবাদ বাগিচা, আমিরে চাখমখ মসজিদ, অগ্নিমন্দির, টাওয়ার ইত্যাদি দেখার জন্য। এবারের নওরোজ উৎসবে পর্যটকদের জন্য রয়েছে বহুবিধ আকর্ষণ।

সূত্র: ফিনানসিয়াল ট্রিবিউন।