শনিবার, ২৩শে মার্চ, ২০১৯ ইং, ৯ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

English

একটি অনুপম চলচ্চিত্র : ম্যালকম এক্স

পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৫ 

ওয়ার্নার ব্রাদার্স এর একটি ছবি ‘ম্যালকম এক্স’ (Malcolm X) । এ ছায়াছবির প্রযোজক এবং পরিচালক হচ্ছেন স্পাইক লী (Spike Lee)। ম্যালকমের নামে ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ডেনজেল ওয়াশিংটন (Denzel Washington)।

‘ম্যালকম এক্স’ বিংশ শতাব্দীর এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র। অ্যালেক্স হ্যালীর ‘রুট্‌স’ (Roots) এর পরে সম্ভবত ‘ম্যালকম এক্স’ কালো আমেরিকানদের মাঝে অসাধারণ প্রেরণা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।

ছবির শুরুতেই শোনা যায় আল্লাহর প্রশংসা আবৃত্তি। তারপরই একটি কণ্ঠস্বর জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন রাখে, ‘কার কথা আমরা শুনতে চাই?’ জনতার স্বতঃস্ফূর্ত জবাব, ‘ম্যালকম এক্স’। এরপর পর্দায় প্রযোজক পরিচালকের নাম ভেসে ওঠার সাথে সাথে দেখা গেল আমেরিকান পতাকা। তারপর শোনা গেল ম্যালকম এক্সের কণ্ঠস্বর। জনতার উদ্দেশে তিনি বলছেন :

‘ভাই ও বোনেরা আমার! আপনাদের সামনে আমি সাদা মানুষদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে হাজির হয়েছি। আমার অভিযোগ সাদা মানুষেরা পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বড় হত্যাকারী। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপহরণকারী। পৃথিবীর এমন কোন জায়গার কথা ওরা বলতে পারবে না যে, সেখানে তারা শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। যেখানেই সাদা মানুষ গেছে সেখানেই বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসাত্মক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এই শ্বেতাঙ্গ মানুষই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডাকাত। সবচেয়ে বড় অপহরণকারী। সবচেয়ে বেশি শুকরের গোশতখোর আর মদ্যপায়ী। এই শ্বেতকায়দের বিরুদ্ধে আমি অভিযোগ উত্থাপন করছি। সাদা মানুষ এ সকল অভিযোগ অস্বীকার করতে পারবে না। আপনারাও এটি অস্বীকার করতে পারবেন না। আমরাই হলাম এর জীবন্ত প্রমাণ।

আপনারা আজ আমেরিকান হিসাবে গণ্য নন। আপনারা আজ ওদের শিকার। আপনারা নিজের ইচ্ছায় এদেশে আসেননি। সাদা মানুষ আপনাদেরকে নিয়ে আসার সময় একথা বলেনি : ‘হে কালো মানুষ! এসো আমেরিকাকে গড়ে তুলতে আমাকে সাহায্য কর।’ বরং সে বলেছিল : ‘এ ব্যাটা কালুয়া! এই বোটের অন্ধকার তলায় নেমে যা। আমেরিকা গড়ায় আমার কাজ করে দেয়ার জন্য তোকে নিয়ে যাচ্ছি।’

এদেশে জন্মগ্রহণ করেও আপনি আমেরিকান হতে পারেননি। আজ আমি আমেরিকান নই, আপনি আমেরিকান নন। আপনি হলেন দুই কোটি বিশ লাখ কালো মানুষের একজন যারা আজ আমেরিকার শিকার। আপনি এবং আমি কখনও গণতন্ত্র দেখিনি। জর্জিয়ার তুলাক্ষেতে কোন গণতন্ত্র আমাদের চোখে পড়েনি। হার্লেম, ব্রুকলিন, ডেট্রয়েট এবং শিকাগোর সড়কগুলোতে গণতন্ত্রের কোন চিহ্ন আমাদের চোখে পড়েনি। কোথাও কোনখানে আমরা গণতন্ত্র দেখিনি। সবখানে আমাদের চোখে পড়েছে শুধু ভ-ামি আর কপটতা। আমরা কোন আমেরিকান স্বপ্ন দেখিনি। শুধু দেখেছি আমেরিকান দুঃস্বপ্ন।’

ম্যালকম এক্সের উপরিউক্ত বক্তৃতার সাথে সাথে পর্দায় ভেসে ওঠা মার্কিন পতাকায় আগুন ধরে যায়। ধীরে ধীরে আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে গিয়ে পতাকাটি একটি ঢ আকৃতিতে রূপলাভ করে।

এই পতাকা পোড়ার সময় ইনসেটে মার্কিন পুলিশ কর্তৃক রডনি কিং এর প্রহৃত হওয়ার করুণ দৃশ্য তুলে ধরা হয়।

স্পাইক লী অত্যন্ত শক্তিশালী উপস্থাপনার মাধ্যমে এ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। চলচ্চিত্রের শুরুতে যেমন ম্যালকম এক্সের সংগ্রামী জীবনের সূচনা তুলে ধরা ঠিক তেমনি শেষের দিকেও তাঁর জীবন চিত্রের মূল্যায়ন উপস্থাপিত হয়েছে। চলচ্চিত্রের শেষাংশে জনৈক শিক্ষিকা তাঁর ক্লাসরুমে বলছেন যে, আজ ১৯ মে, তারা ম্যালকম এক্সের জন্মদিন পালন করছে; কারণ, তিনি ছিলেন একজন মহান আফ্রো-আমেরিকান। শিক্ষিকার কণ্ঠ উচ্চারিত হয়েছে এভাবে- ‘ম্যালকম এক্স ছিলেন তোমাদেরই প্রতিভূ। তোমরাই ম্যালকম এক্সের প্রতিনিধি।’ তখন সাত বছর বয়েসী একদল আফ্রো-আমেরিকান বালক উঠে দাঁড়িয়ে এক সাথে ঘোষণা করে : ‘আমি ম্যালকম এক্স’।

এরপর পর্দায় তাদের জায়গায় দেখা যায় দক্ষিণ আফ্রিকার একদল বালক। পরেই ক্লাসরুমের সামনে ভেসে ওঠে (দাশিকি) দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় পোশাক পরিহিত নেলসন ম্যান্ডেলার ছবি। তিনি ছাত্রদের উদ্দেশে বলছেন : ‘ভাই ম্যালকম যেমন বলেছেন, এই পৃথিবীর বুকে একদল মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার জন্য, একজন মানুষের মর্যাদা লাভের জন্য, এই সমাজে আজকের এই দিনে আমরা আমাদের অধিকার ঘোষণা করছি এবং এই অধিকার বাস্তবায়নের জন্য আজ আমাদের দৃঢ় শপথ…।’

এই ভাষণ শেষ করা হয় ম্যালকমের নিজের একটি বাণী দিয়ে- ‘এই অধিকার বাস্তবায়িত করব আমরা যে কোন উপায়ে…।’

তারপর পর্দাজুড়ে দেখা যায় একটি ধূসর রংয়ের X এবং সেই সাথে শোনা যায় সংগীত কণ্ঠ- ‘কোন একদিন আমরা সকলেই হব মুক্ত।…’

এ ছায়াছবির বাণী আমাদের কাছে সুস্পষ্ট, সংগ্রাম চলবে। ম্যালকম এক্সের সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে আমরা বিজয় লাভ করবই।

আমরা বিজয় লাভ করব এজন্য যে, অন্যায় আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে আমরা সেই মুক্তিসংগ্রাম চালিয়ে যাব।

ছবিটির নাটকীয় উপস্থাপনা এবং সমাপ্তির মাঝখানে নির্মাতা ম্যালকম এক্সের ঘটনাবহুল জীবনের বিভিন্ন দিক চমতকারভাবে তুলে ধরেছেন। এই ঘটনাচিত্র ম্যালকমের আত্মজীবনী থেকে নেয়া।

ছোট বেলায় তাঁর নাম ছিল ম্যালকম লিটল (Malcolm Little)। ১৯২৫ সালে নেব্রাডা অঙ্গরাজ্যের ওমাহাতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যখন ছোট তখন শ্বেতকায় সন্ত্রাসী দল কু ক্লাক্স ক্লান (K K K) তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। তাঁর পিতাকে হত্যা করে। আর তিনি ইয়াতিম খানায় লালিত পালিত হন। স্কুল জীবন থেকেই তিনি শ্বেতকায়দের বৈষম্যের শিকার হন। তিনি আইন পড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকে এই বলে নিরুতসাহিত করা হয়েছিল যে, একজন কালোর জন্য এ ধরনের উচ্চাশা পোষণ করা উচিত নয়। প্রথম জীবনে রেলওয়েতে তিনি একটি চাকরি করতেন। পরে নানারকম সামাজিক অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েন। অপরাধে লিপ্ত থাকার কারণে তাঁকে বন্দি করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

কারাগারে থাকতেই এলিজা মুহাম্মাদ এর জনৈক ভক্তের সাথে ম্যালকমের পরিচয় হয়। এলিজা মুহাম্মাদ ‘ন্যাশন অব ইসলাম’ নামের একটি দলের গুরু ছিলেন। তাঁর প্রচারিত ইসলাম ধর্মে অনেক বিকৃতি থাকলেও তাঁর শিক্ষার মাধ্যমেই ম্যালকম এক্স ইসলামের পরিচয় জানতে পারেন। কারাগারেই তিনি এলিজার শিষ্যের কাছ থেকে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কীভাবে মাথা তুলতে হয় সে শিক্ষা লাভ করেন।

১৯৫২ সালে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে ম্যালকম পুরোদস্তুর এলিজা মুহাম্মাদের শিষ্য হয়ে যান। তিনি ‘নেশন অব ইসলাম’ এর সেবায় নিজেকে উতসর্গ করেন। কিন্তু নেশন অব ইসলামের কার্যকলাপ ম্যালকমকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তিনি এলিজা মুহাম্মাদের বিশিষ্ট শিষ্যদের ভোগবিলাসিতা দেখে অসন্তুষ্ট হন এবং স্বয়ং এলিজার বহু বিবাহ তাঁর মাঝে সন্দেহকে আরও জোরালো করে তোলে। ক্রমে তিনি এলিজা মুহাম্মাদ প্রচারিত ইসলামের বিকৃতি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন এবং ‘নেশন অব ইসলাম’ ত্যাগ করেন। কিন্তু এতে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও প্রবল হয়ে ওঠে। মক্কায় হজ করতে এসে তিনি সত্যিকার ইসলামের পরিচয় লাভ করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে, সকল সাদা মানুষই খারাপ নয়। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে তার গুণাবলির ওপর, বর্ণ বা বংশের ওপর নয়।

ম্যালকম ইউরোপ ও আফ্রিকায় বিভিন্ন দেশ সফর করেন। ইউরোপ থেকে স্বদেশে ফিরে তিনি দেখতে পান তাঁর বাড়ি বোমা নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই তাঁর অনেক শত্রু সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনীর সাথে সাথে এলিজা মুহাম্মাদের অনুসারীরাও ম্যালকমের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগে। কিন্তু ইসলামের সন্ধানপ্রাপ্ত ম্যালকম এক্স নির্ভয়ে তাঁর প্রচারণা চালিয়ে যেতে থাকেন। কালো আমেরিকানদের প্রতি যে যুক্তরাষ্ট্র অমানবিক আচরণ করছে তা তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় জাতিসংঘের কাছে তুলে ধরেন। তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ভীষণ ততপর হয়ে ওঠে।

নিজের শেষ দিনগুলোতে ম্যালকম এক্স গোপন জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। কিন্তু শত্রুরা শেষ পর্যন্ত তাঁর হদিস বের করতে সক্ষম হয়। ১৯৬৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি হার্লেমের এক ক্লাব কর্তৃক আয়োজিত জনসভায় তিনি ভাষণ দিতে আসেন। ইসলামের সত্য প্রকাশের অদম্য আগ্রহ তাঁর মাঝে গুমরে মরছিল। মঞ্চে উঠে সকলকে সম্ভাষণ জানিয়ে ‘সালামুন আলাইকুম’ বলার সাথে সাথেই অসংখ্য বুলেট এসে তাঁর দেহ ঝাঁঝরা করে ফেলে। সভার মাঝেই আততায়ীরা লুকিয়ে ছিল। এভাবেই এই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর শাহাদাত বরণ করেন।

স্পাইক লীর এই ছায়াছবিটি বিংশ শতাব্দীর এক মহান বীরের প্রতি অসাধারণ এক শ্রদ্ধাঞ্জলি। ম্যালকম এক্স ছিলেন এমন এক প্রতিবাদী পুরুষ যিনি অপরাধ জগতের গভীর অন্ধকার থেকে ঊর্ধ্বে এসে সত্য ও সুন্দরের প্রতি ধাবিত হয়েছিলেন। তাঁর এই যাত্রা ছিল অপরাধ আর পাপ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা আর শাহাদাতের পথে অভিযাত্রা। সত্যের সন্ধানে নিজের জীবন উতসর্গ করে ম্যালকম এক্স প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন যে, আল্লাহ সকল শক্তির মালিক এবং সত্যের জন্য আত্মোতসর্গ করাই জীবনের শ্রেষ্ঠ লক্ষ্য হওয়া উচিত।

এ সত্যটিই স্পাইক লী তাঁর নির্মিত ‘ম্যালকম এক্স’ ছায়াছবির মাধ্যমে বেশ চমতকারভাবে আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন।