বুধবার, ১৯শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইসলামের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ৩১, ২০১৪ 

শের কাভান্দ

‘নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণ সহকারে এবং তাঁদের সঙ্গে দিয়েছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।’ (সূরা হাদীদ : ২৫)

ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিভিন্ন পর্যায়ে মানবতা নির্দিষ্ট কিছু ভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিকশিত হয়েছে। সংস্কৃতি এই মানবতা থেকেই উৎসারিত। এমন কোন জাতি নেই যাদের কোন সংস্কৃতি নেই। বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির আলোকে এই সকল সংস্কৃতি বেড়ে ওঠে ঠিক যেমন শেকড় থেকে খাদ্য নিয়ে একটি গাছ বড় হয়ে ওঠে।

ইরান দেশটা অনেক সংস্কৃতি, সভ্যতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাগার। তবে ইরানে সভ্যতার চরম উৎকর্ষ সাধিত হয় ইসলাম আসার পর। ইসলাম আসে ইরানে মুক্তির বার্তা নিয়ে। ইসলামের আদর্শে প্লাবিত হয়ে ইরান থেকে শ্রেণিবৈষম্য দূর হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত হয় এবং মানবতার উৎকর্ষ সাধিত হয়। তৎকালীন ইরানে ইসলামের আবির্ভাব ছিল শুষ্ক মরুভূমিতে বৃষ্টিপাতের ন্যায়।

সৃষ্টির ঐক্য এবং জাতিসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং সৌজন্যবোধের আলোকে ইসলাম দৃপ্ত কণ্ঠে এই ঘোষণা দেয়ার প্রয়াস পায় যে, জাতীয়তাবাদ, সংকীর্ণ দেশাত্মবোধ এবং বর্ণবাদ দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে জাতিসমূহের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ইসলাম এই সকল বাধা অপসারণ করে মানবজাতির মাঝে একাত্মতা ঘোষণা করে এবং পরস্পরকে আরো গভীরভাবে জানার ও বুঝার জন্য আহ্বান জানায়।

পাক কুরআনে বলা হচ্ছে : ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে। পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার…।’ (সূরা হুজুরাত : ১৩)

ইসলামের এই উদারতা মানব সংস্কৃতির সকল জড়তাকে অপসারিত করে নব সৌরভে প্রস্ফুটিত হয়েছে। তাই আমরা দেখতে পাই, এক ইরানী মুসলিমের হাতে আরবি ব্যাকরণের উন্নয়ন ঘটেছে।

আমরা দেখেছি, মুসলিম স্পেন বা মুসলিম আফ্রিকার বিজ্ঞানীরা জ্ঞান সাধনা এবং জ্ঞান আহরণের জন্য পৃথিবীর দূর-দূরান্তে ছুটে গেছেন। মোটের ওপর আমরা দেখতে পাই, ইসলামের স্বর্ণযুগে সকল মুসলিম দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও পণ্ডিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণা করেছেন এবং মানব সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের এই সকল প্রচেষ্টার মূলে ছিল ইসলামের মহানবী (সা.)-এর অনুপ্রেরণা। কেননা, তিনিই বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা সকল মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য।’

আরবি ব্যাকরণের উৎকর্ষ সাধনে সিবোইয়েহ (Sibooyeh), সমাজ বিজ্ঞানের ফয়েজ কাশানী, গাজ্জালী, তূসী, ভেষজ এবং চিকিৎসাবিদ্যায় ইবনে সীনা, রাযী, রাজনীতি ও নীতিবিদ্যায় নাসিরুদ্দীন তূসী, ইতিহাসে ইবনে খালদুন, নৃতত্ত্ব এবং ভূগোলবিদ্যায় যাকারিয়া কাযভিনী, সাহিত্যে ইবনুল আমিদ, হস্তলিপিবিদ্যায় ইবনুল বাভবার, চারুকলায় আবুল ফারাজ ইসফাহানী ও এরমাভী, কাব্যে ফেরদৌসী, সাদী, হাফেজ, রুদাকী, খাকানী এবং আবদুল ফাত্তাহ বাস্তী, দর্শনশাস্ত্রে ফারাজী, আল-কিন্দী, ইবনে সীনা, বিরুনী, সোহরাওয়ার্দী, মোল্লাহ সাদরা এবং আল্লামা তাবাতাবাঈ, স্বৈরতন্ত্র ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামশীল সাইয়্যেদ জামালুদ্দীন আফগানী, আবদুহু কাওকাবী, ইকবাল, শরিয়তী, ইমাম খোমেইনী (রহ.) প্রমুখ এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় আরো অনেক বিশ্ববিখ্যাত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ইসলামের কালজয়ী চিন্তাধারায় গঠিত এবং প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। বিশ্বজনীন ইসলামী আদর্শই এই সকল প্রতিভাকে মানবজাতির কাছে উপহার দিয়েছে। ইসলামের মহান শিক্ষা মুসলমানদের চিন্তা, চেতনা ও কর্মপন্থায় প্রকাশ পেয়েছে। ইসলামী সংস্কৃতি মানব প্রকৃতির সাথে এতই সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, মানবতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ইসলাম মিশে আছে। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ নিজেই এর সমন্বয় সাধন করেছেন।

কোন সংস্কৃতিই পৃথিবীর বুকে বিকাশ লাভ করতে পারে না যদি না মানব প্রকৃতির সাথে তার সংগতি থাকে। সংস্কৃতি যতই মানব প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল হবে ততই এটি গুতশীল হয়ে সমকালীন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারবে এবং মানব সম্পর্কের শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে সক্ষম হবে। এখানেই ইসলামী সংস্কৃতি আর অন্যান্য সংস্কৃতির মাঝে পার্থক্য বিদ্যমান।

ইসলামী নীতিমালা, মূল্যবোধ, অন্তর্দৃষ্টি এবং অনুশাসনসমূহ সুস্পষ্টভাবে মানুষের মুক্তির কথাই বলেছে, জ্ঞানচর্চার বিশাল দিগন্ত পানে মানুষকে আহবান জানিয়েছে, মানুষের দৃষ্টিপাতের সকল বাধা অপসারিত করেছে যেন মানুষ এই বিশ্ব রহস্যের উদ্যোগ ও বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে পারে।

ইসলামের আদর্শে স্নাত হয়ে মুক্ত মানুষের মধ্য থেকে জ্ঞানের ফল্গুধারা প্রবাহিত হয়। তার মাঝে সৃষ্টিশীল প্রেরণা উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। নতুন নতুন শিল্প-সাহিত্য এবং বিজ্ঞানের উদ্ভাবনে সে ব্রতী হয়। তার সৃষ্টিকর্মে এই পৃথিবী সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।

জ্ঞানের মূল্যবোধ, তাকওয়া, জিহাদ, আনুগত্য, আত্মোৎসর্গ এবং সহিষ্ণুতা মানুষকে একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে সাহায্য করে, যে আন্দোলনের মাধ্যমে সে নতুন মানব সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করে, স্রষ্টার সৃষ্টিকে সুশোভিত করে তোলে। এর ফলে মানুষের প্রার্থনা, তীর্থযাত্রা, শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা এবং শৈল্পিক সৃষ্টিশীলতা স্রোতস্বিনীর মতোই প্রবাহিত হয়। তাওহীদের আশ্রয়ে এটি প্রবহমান হয়ে মানবতা ও মানব পরিচিতির বিকাশ সাধন করে এবং পারস্পরিক বৈষম্য ও হিংসা-বিদ্বেষের সীমারেখাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

ইসলামী সংস্কৃতি উঁচুমানের অর্থাৎ ক্লাসিকধর্মী এই কারণে যে, এতে রয়েছে সংহতি, সুদৃঢ়তা, মানব-শৌর্যের প্রকাশ, জীবনক্ষেত্রে মানুষের কার্যকর ভূমিকা এবং তার অদৃষ্ট সম্পর্কে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস।

ইসলামী সংস্কৃতি রোমান্টিক এই অর্থে যে, এটি বিশ্বাসী জনগণের হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং বিশ্বাস দ্বারা তা বিমণ্ডিত।

ইসলামী সংস্কৃতি বাস্তবধর্মী। অর্থাৎ বাস্তবতা ও প্রকৃতিবিবর্জিত সকল বিপথগামী মূল্যবোধের বিরোধী এই সংস্কৃতি। স্বৈরাচার আর নাস্তিক্যবাদের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান ইসলামী সংস্কৃতি সকল দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার। সেটা সামাজিক আনাচারই হোক বা শ্রেণিবৈষম্যই হোক কিংবা বর্ণবৈষম্যই হোক।

ইসলামী সংস্কৃতি সকল প্রকার বিভ্রান্তি ও বিকৃতির বিরোধী। মানুষকে দেবতা জ্ঞান করা, আত্মম্ভরিতা ও স্বার্থপরতা- সকল প্রকার মানসিক, আধ্যত্মিক ও নৈতিক বিকৃতি ইসলামী সংস্কৃতির পরিপন্থী।

বিশ্বজনীন ইসলামী সংস্কৃতির অবকাঠামো দৃঢ় প্রত্যয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এতে রয়েছে মানবতার সুপ্রকাশ, বিশ্বাস, একত্ববাদ এবং নৈতিকতা। ইসলামী বিপ্লব এই সকল মূল্যবোধ, নীতিমালা ও সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ।

ইসলামী সংস্কৃতি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনার প্রয়াস পায়। মানুষ এবং এই বিশ্বজগৎ সম্পর্কে এর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এর মাধ্যমে ভয়-ভীতি অপসারিত হয়ে মানুষের মনে মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মানুষের আত্ম, মন এবং জীবনের পরিশুদ্ধিতে ইসলামী সংস্কৃতির ভূমিকা ব্যাপক। এর মাঝে ধ্বনিত হয় আশার বাণী। এই সংস্কৃতি জাতিসমূহের ওপর চাপিয়ে দেয়া হীনমন্যতা অপসারণে বদ্ধপরিকর। মানুষের সত্যিকারের ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরে ভক্তিশ্রদ্ধা, আত্মোৎসর্গ, স্নেহ-মমতা এবং আধ্যাত্মিক প্রেরণা জাগ্রত করে। যার ফলে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী মানুষ সঠিক পথে ফিরে আসার সুযোগ পায়।

মোট কথা ইসলামী সংস্কৃতি মানব জীবনের সকল দিকের ওপর আলোকপাত করে। এই সংস্কৃতি প্রাধান্য লাভ করলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি সাধিত হবে। গ্রন্থাগারগুলো জ্ঞান সাধকদের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠবে। লেখকরা সৃষ্টিশীল লেখায় এগিয়ে আসবে। তরুণ প্রজন্ম তাকওয়ার পরিপূর্ণ একটি নতুন উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করবে। সমাজে তারা যথাযোগ্য মর্যাদায় আসীন হয়ে দর্শন, শিল্প ও সাহিত্যে তারা মূল্যবান অবদান রাখবে। প্রচুর গ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে জ্ঞানচর্চার পরিধি বৃদ্ধি পাবে। তখন এই কিংবদন্তীর অপনোদন হবে যে, ‘প্রাচ্যের লোকেরা বই পড়ে না।’

এমনকি ইসলামী সংস্কৃতি পরিচালিত সমাজে নারীদের মর্যাদাও সমুন্নত হবে। লেখাপড়া শিখে পুরুষের পাশাপাশি সমান অধিকার নিয়ে সামাজিক কর্মকাণ্ডে তারাও এগিয়ে আসবে।