বুধবার, ১৬ই আগস্ট, ২০১৭ ইং, ১লা ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

English

বিশিষ্টজনদের দৃষ্টিতে ইরানের ইসলামী বিপ্লব

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ৩০, ২০১৪ 

news-image

হুজ্জাতুল ইসলাম বাকের আনসারী

‘ইসলামী বিপ্লব সফল হওয়ার আগে না মুসলিম আর না বিশ্বদাম্ভিকরা কল্পনা করত যে, আধুনিক বিশ্বে আবার ইসলামের পুনর্জাগরণ হবে। আজ সন্দেহাতীতভাবে এ কথা সত্য যে, এ ইসলামী বিপ্লব বঞ্চিত মানবতার মাঝে ও ইসলামী বিশ্বে এক ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আর এই বিপ্লবের রয়েছে এক নজিরবিহীন সাংস্কৃতিক ভিত্তি।

ড. হামিদ আলগার

এ বিপ্লব বর্তমান শতাব্দীর অন্যান্য বিপ্লব থেকে স্বতন্ত্র, কেননা, ইতিহাসের গভীরে এর শিকড় প্রোথিত। ইরানীদের আবশ্যকীয় ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সাথে সাথে আকস্মিক কোন পরিবর্তন এটা নয়; বরং এ ছিল সুদীর্ঘ বহু বছরের রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের একটি অব্যাহত প্রয়াসের ফলশ্রুতি।…

আমাদের ঘাড়ে চেপে বসা রাজনৈতিক ভূতের দৃষ্টিভঙ্গিতে আলেম সমাজকে বিচার করা হলে সত্যের অপলাপ হবে। মনে রাখতে হবে যে, আলেমগণ শুধু শিয়া মাযহাব বা ইরানেই নয় বরং সারা দুনিয়াতে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষা ও আচারের এক বিশেষ দিকের সংরক্ষণ ও প্রসারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। এটাই শেষ পর্যন্ত সমগ্র সমাজ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রেরণার উৎসে পরিণত হয়। আমরা যদি ইরানের শিয়া মাযহাবের বিশেষ দিকের প্রতি তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে, ষোড়শ শতকের সাফাভী আমল থেকেই আলেমগণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়াশুনা ও জ্ঞানচর্চা করেছেন। তাঁদের বিচরণ শুধু কুরআন, হাদীস, তাফসীর, ফিকাহ বা অনুরূপ বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না- ইসলামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ দর্শন, বিশেষত শিয়া মাযহাবের অধ্যাত্মবাদের ওপরও তাঁদের দখল ছিল। বস্তুত আমরা যদি আয়াতুল্লাহ খোমেইনী এবং তাঁর মহান অবদানের প্রতি তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, ইরানের শিয়া আলেমদের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যেরই চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছেন তিনি। শুধু রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যাপারে অসাধারণ, ব্যাপক এবং অবিসংবাদিত ভূমিকা পালন করেছেন বলেই যে তিনি এ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তা নয়। শিয়া ঐতিহ্যের খাঁটি ও সার্থক অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বের বিকাশও তাঁর মধ্যে ঘটেছে। মোট কথা এ ক্ষেত্রেও তিনি একজন অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব।…

১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দেশে ফিরে আসলেন। কিন্তু তিনি সাথে করে কোন সম্পদ নিয়ে এলেন না। কোন রাজনৈতিক দলও তিনি গঠন করেননি। কোনো গেরিলা যুদ্ধও পরিচালনা করেননি। কোন বিদেশী শক্তির সাহায্য তিনি নিলেন না। অথচ এর মধ্যেই তিনি ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনের তর্কাতীত নেতৃত্বে সমাসীন হলেন।…

আয়াতুল্লাহ খোমেইনীর ক্ষেত্রে ‘বিপ্লব’ কথাটির অর্থ হচ্ছে এই যে, একজন বিপ্লবী নেতা হিসাবে তিনি নিছক জ্ঞানে ও আবেগে কোন বিশেষ লক্ষ্যের প্রতি শুধু নিবেদিতই নন, বরং তিনি এর সাথে একাত্মও। এক্ষেত্রে ‘বিপ্লব’ শব্দটিকে অবশ্য ইরানী প্রেক্ষাপটেই বুঝতে হবে। তিনি ছিলেন পুরোপুরি আপোসহীন। কিন্তু কেন? কারণ, তিনি নিছক ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে প্রচলিত অর্থে কোন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। পক্ষান্তরে, তিনি কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য খোদা নির্ধারিত পথে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন মাত্র।…

আয়াতুল্লাহ খোমেইনী তাঁর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক গুণাবলি দ্বারাই মহান ও অতুলনীয় ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর গুণাবলি এমনকি ইসলামবিরোধীরাও অস্বীকার করতে পারে না। একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো যে, বিপ্লবের সময় যাঁরা ইসলামের প্রতি নিবেদিত ছিলেন না তাঁরাও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইসলাম খুঁজে পেলেন। আয়াতুল্লাহ খোমেইনীর আধ্যাত্মিক ও শক্তিশালী নৈতিক গুণাবলি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরাও বিপ্লবের তথা ইসলামের প্রতি নিবেদিত হলেন। এটা অনস্বীকার্য যে, তিনি এমনই এক ব্যক্তিত্ব যিনি আত্মকেন্দ্রিকতা ও সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে থেকে কেবল ইরানী জাতির অন্তরের অন্তঃস্থলে নিহিত আশা-আকাক্সক্ষারই প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।…

আমাদের এ কথা কিছুতেই ভুলে গেলে চলবে না যে, ইরানের ইসলামী বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদিবাদের জন্য যে মারাত্মক বিপর্যয় এনেছে তা যে কোন যুদ্ধে প্যালেস্টাইনীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম কিংবা আরব রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক গৃহীত যে কোন সামরিক মাধ্যমে অর্জিত সমস্ত সফলতার চাইতেও বেশি। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে যে, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে, এমনকি সকল মুসলিম দেশের হাতে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও ইহুদিবাদ যে প্রাথমিক পরাজয় বরণ করেছে তা সম্ভব হয়েছে একমাত্র ইরানের ইসলামী বিপ্লবের কারণে।

এ বিপ্লবের মধ্যেই এমন শক্তি নিহিত রয়েছে যা সমগ্র মুসলিম মিল্লাতের কল্যাণে আসতে পারে। সুন্নি মুসলিম অধ্যুষিত দেশসমূহ যথা আরব রাষ্ট্রগুলো আফগানিস্তান ও অন্য সব দেশের মুসলমানদের উচিত এ বিপ্লবের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা এবং একে এগিয়ে নেবার জন্য সব রকমের সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান করা।

ড. কালিম সিদ্দিকী

ইরানের ইসলামী বিপ্লব সম্পর্কে ভালোমন্দ যার যা-ই ধারণা থাক না কেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো এই বিপ্লবের আধ্যাত্মিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উৎস পুরোপুরিভাবেই ইসলামের গভীরে নিহিত রয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলের মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তাধারার সাথে জড়িত সকল প্রতিষ্ঠান ও ধ্যান-ধারণা এবং ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ বাইরে এই বিপ্লব অবস্থান করছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগ পর্যন্ত এটা বিশ্বাস করা কঠিন ছিল যে, ইরানে (শাহের ইরানে) রীতিমতো ইসলামী নেতৃত্বের উৎস বিরাজ করছে এবং তাঁরা তখন পর্যন্ত পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা দ্বারা সংক্রমিত হননি। সম্পূর্ণ আলাদা এবং স্বতন্ত্রভাবে বিকশিত শিয়া ধর্মতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ববিদ ও তাঁদের প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং উসুলী আলেম সম্প্রদায়ই সমসাময়িক ইস্যুগুলোর ওপর সক্রিয়ভাবে ইজতিহাদে আত্মনিয়োগ করেন। এর ফলে ঔপনিবেশিক আমলের মুসলিম রাজনৈতিক ভাবধারা এবং এর প্রতিষ্ঠানসমূহের আধিপত্যের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে চ্যালেঞ্জ করার প্রয়োজনীয় ধ্যান-ধারণা এবং নেতৃত্বের উদ্ভব ঘটে।

ইসলামের শক্তির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো মুসলিম সর্বসাধারণ বা জনতা। মুসলিম জনতাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উপনিবেশিক আমলের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা দ্বারা সংক্রমিত ছিল না। জাতীয়তাবাদী আবেগের প্রতি জনতার বিপুল সাড়া পাওয়া যায় যখন ১৯৫১ সালে অ্যাংলো-ইরানিয়ান তেল কোম্পানির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। পৃথিবীর অন্যান্য এলাকায়ও জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ নিজেদের পৃষ্ঠপোষক উপনিবেশিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে জনতাকে সাময়িকভাবে সংঘবদ্ধ করতে কম-বেশি সফল হয়েছিল। কিন্তু এর আগে কোন সময় পৃথিবীর কোন অঞ্চলে সর্বসাধারণ মুসলিম রাজতন্ত্র হতে স্বাধীন এবং উপনিবেশিক আমলের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার বাইরে কোন ইসলামী নেতৃত্বের ছোঁয়া পায়নি। ইরানের মুসলিম জনতার মাঝে উলামা বা ইসলামী শক্তির এক অতলান্ত উৎসের সন্ধান পেয়েছিলেন যা ইতিপূর্বে কোন ইসলামী আন্দোলন আবিষ্কার করতে পারেনি। ইরানে উলামা আর মুসলিম জনতার সম্মিলন (fusion) ইসলামের অনুপম আর অজেয় শক্তির স্ফূরণ ঘটিয়েছিল। এই শক্তির স্ফূরণ প্রতিষ্ঠিত স্বৈরাচারকে পরাজিত করেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ বিপ্লববিরোধী উৎসগুলো নির্মূল করেছে, বিদেশী সামরিক ও অর্থনৈতিক মাতব্বরিকে খামোশ করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক দুশমনদের একটি যৌথ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এই শক্তি এখন প্রলম্বিত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইসলামের এই অনবদ্য শক্তি একটি নতুন রাষ্ট্রও স্থাপন করেছে। এই রাষ্ট্রের রয়েছে একটি নতুন সংবিধান এবং উপনিবেশিক রাজনৈতিক চিন্তা কাঠামোমুক্ত সম্পূর্ণ নতুন ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহ। এভাবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঔপনিবেশিক শক্তি ও তাদের দোসরদের তিনশ’ বছরের অধিককালের কষ্টার্জিত আধিপত্য ব্যবস্থাকে ইসলামী বিপ্লব নাস্তানাবুদ করে ফেলল।

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হলো শাসক ও শাসিতের মধ্যকার এই চির প্রসারমান ব্যবধানে সুদৃঢ় সেতুবন্ধ রচনা। এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে ইসলামের মূল ভূখণ্ডে জনগণ ও উলামাদের মধ্যে স্থিতিশীলতা, শক্তিমত্তা, পারদর্শিতা ও তাকওয়ার নতুন নতুন কেন্দ্র চালু করার মাধ্যমে এবং উপনিবেশবাদ প্রভাবিত জাহেলিয়ার ভূত যা এতদিন পরগাছার মতো ইরানে শেকড় গেঁড়ে বসেছিল তা উপড়ে ফেলার মাধ্যমে।

(নিউজলেটার, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩)