মঙ্গলবার, ১৯শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে প্রেসিডেন্ট রুহানির সরকারের বিগত দুই বছরের কর্মকাণ্ডের প্রতি এক নজর

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ২৬, ২০১৬ 

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. রুহানির সরকার ক্ষমতায় এসেছে এখন থেকে দুই বছর আগে। দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে সরকারের কর্মকাণ্ডকে বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে পর্র্যালোচনা করা হচ্ছে। এ সম্পর্কিত সরকারের নিজস্ব প্রতিবেদনটি আমরা নিউজলেটারের পাঠকদের সামনে তুলে ধরছি। 

দেশের ভবিষ্যতের ব্যাপারে জাতির মাঝে আশা জাগানোর লক্ষ্য নিয়ে জনগণের সেবায় নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তারা কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন দুই বছর আগে। আজ আমরা গর্বের সাথে বলতে চাই যে, দেশের অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা ও সংস্কৃতিতে স্থিতিশীলতা ও প্রশান্ত অবস্থা সৃষ্টির যে লক্ষ অর্জনের জন্য সরকার প্রচেষ্টা শুরু করেছিল, তাতে আমাদের কর্মপ্রচেষ্টা সফলকাম হয়েছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার পথ ধরে সরকারের এই অর্জনে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা এবং সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে এবং জনসাধারণ উন্নততর ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী হওয়ার অবলম্বন খুঁজে পেয়েছে। এক কথায় তা সুষ্ঠু রাষ্ট্রপরিচালনার ব্যাপারে জাতির মনে নতুন আশা জাগ্রত করেছে। একই সাথে বিনয়ের সাথে বলতে চাই যে, সরকারের এ সাফল্য দেশের জনগণের প্রাপ্য অধিকারের তুলনায় অতি নগণ্য এবং দেশবাসীর এর চেয়ে অনেক বেশি খেদমত পাওয়া উচিত ছিল।
দেশের বিভিন্ন পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আন্তর্জাতিক নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানসমূহের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে অনায়াসে বলা যায় যে, সরকারের নিয়োজিত সেবকদের প্রতি জনগণের আস্থা, অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের বেলায় জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের কার্যকর সমর্থন ও সহযোগিতা প্রভৃতির কারণে দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে যে অস্থিরতা বিরাজ করছিল তার অবসান হয়েছে। পক্ষান্তরে ইরানের অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট্যের রূপ নিয়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজমান হয়েছে।

বিগত ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছিল শতকরা ৪০ ভাগের বেশি। চলতি সালের জুলাই মাসে সেই হার শতকরা ১৫.৬ ভাগে হ্রাস পেয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ২৪ মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে মুদ্রাস্ফীতি শতকরা ২৫ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। আমরা ২০১৬ সাল নাগাদ মুদ্রাস্ফীতির হার এক অঙ্কের কোটায় নামিয়ে আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

ইসলামী ইরানের এগারতম সরকারের অর্জনসমূহের শিরোভাগে রয়েছে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে প্রাণচাঞ্চল্য, নতুন নতুন কর্মসংস্থান, কর্মস্থল, ব্যবসাকেন্দ্র ও পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রসমূহের পরিবেশগত উন্নতি ও সহজলভ্যতা। গেল বছর কর্মপরিবেশের সহজতার ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান যেখানে বিশ্বে তালিকার ১৫২ নম্বর ক্রমিকে ছিল আমরা সেখানে তা ১৩০তম ক্রমিকে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। আমরা আয়-উপার্জন ও কর্মপরিবেশকে আরো উন্নত করার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং আশা করছি যে, ২০১৭ সালে তালিকায় আমাদের ক্রমিক ১০০-এর আগে নিয়ে আসতে সক্ষম হব।
বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মাত্র ২৪ মাসে সরকার আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য ইউনিটের উইন্ডোজ খুলে কাস্টমস কার্যক্রমের মেয়াদ ২৪ দিন থেকে ৪ দিনে কমিয়ে এনেছে। কাস্টমসের প্রচুর পরিমাণ কাগজপত্র বর্তমানে অনলাইনে পূরণ করা হয়। এছাড়া সমন্বিত কৃত্রিম কাস্টমস গেইট খোলা হয়েছে এবং দেশের প্রধান কাস্টম্স কেন্দ্রগুলোতে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সিস্টেম চালু করা হয়েছে।

অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত খাতগুলোতে সরকারের অর্জন
শিল্প ও খনিজ খাতে- দেশের অর্থনীতির শতকরা ১.৩ ভাগ যার সাথে জড়িত- সংযোজিত মূল্যের হার যেখানে ২০১৩ সালে শতকরা ২.৯ ভাগ ছিল, সেখানে ২০১৪ সালে তা শতকরা ৫ ভাগে উন্নীত হয়। শিল্পকারখানা খাতে ৮০০০ হাজারের অধিক অর্ধ সমাপ্ত প্রকল্প সম্পূর্ণ এবং পুরোদমে চালু হয়েছে।
তেলের ক্ষেত্রে-  তেলের উৎপাদন দৈনিক ২.৭ মিলিয়ন ব্যারেলের স্থলে বর্তমানে ২.৯ মিলিয়ন ব্যারেলে উন্নীত হয়েছে। আর তেল ও গ্যাস অয়েলের রপ্তানি দৈনিক ১২ লক্ষ ব্যরেলের স্থলে বর্তমানে দৈনিক সাড়ে ১৩ লক্ষ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।
গ্যাস এর ক্ষেত্রে- ২০১৪ সালে দৈনিক ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট পরিশোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন ফেজ-১২ যেখানে চালু আছে, সেখানে ফেজ-১৩, ১৬ ও ১৭ নং প্রকল্পগুলো চালু করা হয়েছে। যার সর্বমোট উৎপাদন ক্ষমতা হচ্ছে ১২০০ মিলিয়ন ঘনমিটার। গ্যাসের পরিশোধন ও সরবরাহ ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে প্রায় শতকরা ১২ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ছোট ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের কাজ বর্তমান সরকার পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে। এর আওতায় ২০১৭ সালের মাঝামাঝি প্রায় আড়াই লক্ষ নতুন পরিবার দেশের গ্যাস নেটওয়ার্কের আওতায় চলে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এ হিসেবে দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ গ্যাস সরবরাহ সিস্টেমের আওতায় চলে আসবে। সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশে গ্যাস সরবরাহের কাজও এ বছর পূর্ণতা পাবে। এই বঞ্চিত অঞ্চলের জনগণ এবার গ্যাস সুবিধা পুরোপুরি ভোগ করতে পারবে। পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদনের পরিমাণ ২০১৪ সালে সাড়ে ২২ মিলিয়ন টনে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫.৯ মিলিয়ন টন বিদেশে রপ্তানি হয়েছে আর ১৬.৭ মিলিয়ন টন দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি হয়েছে। এই পরিমাণ উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় শতকরা ৯.৬ ভাগ বৃদ্ধির প্রমাণ বহন করে।

কৃষিক্ষেত্রে আমরা
দেশের খাদ্যজাত পণ্যের নেতিবাচক ভারসাম্যকে- যা ২০১৩ সালে ৮ বিলিয়ন ডলার ছিল, ২০১৪ সালের শেষে তা ৫.৪ বিলিয়ন ডলারে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। এছাড়া

  • খাদ্যজাত পণ্য রপ্তানির পরিমাণ শতকরা ২৭ ভাগ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
  • খাদ্যজাত পণ্য আমদানির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে শতকরা ৯ ভাগ।
  • চিনি উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে শতকরা ২০ গুণ।
  • নিরাপত্তামূলক অভ্যন্তরীণ গম ক্রয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে ৪০৮ টনের স্থলে ৬০৭ মিলিয়ন টন।
  • মুরগির গোশত ও মুরগির ডিমের ক্ষেত্রে বর্তমানে ভাল রেকর্ড অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। যেমন ২০১৩ সালের পর থেকে এই খাতে আমরা বিদেশ থেকে কোনরূপ আমদানি করি নি। এছাড়াও গত বছর আমরা ৭৬,০০০ টন মুরগি ও ৭০,০০০ টন মুরগির ডিম দেশের বাইরে রপ্তানি করেছি। তাতে ২০১৩ সালের তুলনায় মুরগির গোশত উৎপাদনে শতকরা ৬৭ ভাগ এবং ডিম উৎপাদনে ৮৫ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
  • টাটকা গোশতের ক্ষেত্রে আমদানির পরিমাণ ২০১২ সালে ছিল ২০৭,০০০ টন আর ২০১৪ সালে তা ৬৮,০০০ টনে হ্রাস পেয়েছে। তা ছাড়াও ২০১৪ সালে ৭০০০০০টি গবাদি পশু এবং ১৫ সালে এ পর্যন্ত ৪২০০০০টি গবাদি পশু জীবিত রপ্তানির আওতায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে রপ্তানি করা হয়েছে। টাটকা গোশত আমদানির পরিমাণ হ্রাস পাওয়া এবং জীবিত গবাদি পশু রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া এ কথার সাক্ষ্য বহন করে যে, দেশে টাটকা গোশতের উৎপাদন ও ভোগ ব্যবহারের ভারসাম্য সমান্তরালে চলে আসছে এবং এতে আমরা বড় ধরনের স¦নির্ভরতা অর্জন করতে যাচ্ছি।
  • কৃষিপণ্য, মৎস সম্পদ, পশু-পাখিজাত উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমরা শতকরা ৬০৬ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি।
  • দেশের পরিবহন খাতে ২৭০০ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। তাতে শামিল রয়েছে ২২০ কিলোমিটার উন্মুক্ত সড়কপথ, ১৫০০ কিলোমিটার মহাসড়ক।
  • এছাড়া ২৮০ কিলোমিটার রেলপথ চালু এবং প্রায় ৭০০ কিলোমিটার রেলপথ জুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ করা হয়েছে।
  • রেলযোগে মালামাল পরিবহনে প্রবৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ২০১৪ সালে শতকরা ৫৬ ভাগ আর চলতি ইরানী সালের প্রথম চার মাসে ছিল শতকরা ৯২ ভাগ। রেলখাতে তিন হাজার পরিবহন ওয়াগন এবং ১০০টি যাত্রীবাহী ওয়াগন তৈরির বিষয়ে প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। রেলের সুবিধা গ্রহণ সম্পর্কিত আনুষাঙ্গিক খরচ ২০১৩ সালে শতকরা ৫৭ ভাগের তুলনায় বর্তমানে শতকরা ৩২ ভাগে উন্নীত হয়েছে।
  • ১০০০ কিলোমিটার প্রধান সড়কপথ এবং ৩০০০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক নির্মাণও এর আওতাভুক্ত রয়েছে।
  • সামুদ্রিক জলযান নির্মাণে আমরা শতকরা ১১ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি।
  • তদুপরি বাণিজ্যিক বন্দরগুলোতে মালামাল ওঠানামার ধারণক্ষমতায় প্রবৃদ্ধি এসেছে শতকরা ১১ ভাগ।
  • বাণিজ্যিক সমুদ্র বন্দরগুলোতে নৌপথে যাত্রী পরিবহণের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ২৫ ভাগ।

প্রতিরোধমূলক অর্থনীতি, স্থানীয়করণ নির্ভরশীলতা হ্রাস করার লক্ষ্যমাত্রা
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের যাবতীয় পদক্ষেপ পরিচালিত হচ্ছে প্রতিরোধমূলক অর্থনীতি বাস্তবায়নের সামগ্রিক নীতিমালা বাস্তবায়নের লক্ষ্যকে সামনে রেখে। এক্ষেত্রে অন্যতম লক্ষ্য ছিল তেলখাতে আয়ের ওপর জাতীয় বাজেটের নির্ভরশীলতা কমানো। ২০১১ সালে যেখানে এই নির্ভরতার পরিমাণ ছিল শতকরা ৪৮ ভাগ, সেখানে তা ২০১৪ সালে ৩৬.১ ভাগে নেমে এসেছে।
প্রতিরোধমূলক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার আওতায় তেলবহির্ভূত পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে, তাতে ২০১৪ সালে শতকরা প্রায় ১৯ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। একই সময়ে আমদানি বৃদ্ধির যে পরিমাণ শতকরা ৬ ভাগ অর্জিত হয়েছে তা তেলবহির্র্ভূত বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্যে ইতিবাচক প্রবণতা নির্দেশ করছে। তদুপরি আমদানি পণ্যের শ্রেণিভুক্তির বিষয়েও আমাদের লক্ষ্য ছিল মৌলিক ও মাধ্যম শ্রেণির পণ্য আমদানি। হস্তশিল্প জাতীয় পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, দুই হাজারের অধিক হস্তশিল্প কারখানা চালু করা এবং ১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে হস্তশিল্পজাত পণ্য শতকরা ৪০ ভাগ বৃদ্ধি পাওয়া অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও সামাজিক সহায়তাসমূহ
২০১৪ সালে সরকারি হাসপাতালসমূহে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৬০ লক্ষের অধিক। তবে ভর্তি ও চিকিৎসা সেবার ব্যয় হ্রাস ছিল দেশে সুস্বাস্থ্য রক্ষা ও চিকিৎসা সেবায় এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। সরকারি হাসপাতালসমূহে জনগণের পক্ষ হতে প্রদেয় ফির পরিমাণ শতকরা ৩৭ ভাগ হতে গড়ে শতকরা ৪.৫ ভাগে হ্রাস করা হয়েছে। চিকিৎসা সেবায় একে সর্ববৃহৎ অর্জন হিসেবে গণ্য করা যায়। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আনুমানিক ৩ হাজার বিলিয়ন তুমান অর্থ যোগান দিতে হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বিভিন্ন কোম্পানি ও হাসপাতালসমূহ এবং বাইরে থেকে হাসপাতালের সরঞ্জাম ইত্যাদি যোগান দেয়ার ক্ষেত্রে যেসব অসুস্থ সম্পর্ক ছিল সেগুলো সম্পূর্ণ ছিন্ন করা হয়েছে।

  • ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল দেশের সাধারণ জনগণকে বীমা পলিসির অন্তর্ভুক্ত করা। সৌভাগ্যবশত গেল বছর তা বাস্তবায়িত হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় এক কোটি লোক বীমার আওতায় এসেছে। এর ফলে রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসা সেবা পাওয়ার ব্যাপারে জনগণের দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তার অবসান হবে।
  • গেল এক বছরে সরকারি হাসপাতালসমূহে ৪৮০০০০-এর অধিক স্বাভাবিক সন্তান প্রসব সম্পন্ন হয়েছে।
  • ঔষধ শিল্পে সত্যিকার অর্থেই অসামান্য কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ অর্জনটি কেবল তারাই বুঝবে যারা এই ক্ষেত্রটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঔষধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের মূল্য, বিশেষ করে যেগুলো আমদানিকৃত, সেগুলো গত দুই বছরে অন্তত শতকরা ৩০ ভাগ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
  • কেন্দ্রীয়ভাবে টেন্ডার এবং ক্রয় ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনার ফলে অসদুপায়ের সকল পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আর ঔষধ আমদানির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে শতকরা ৩০ ভাগ।
  • মূল্য হ্রাসের পাশাপাশি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা সরঞ্জামাদির ব্যাপক হারে সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ

  • সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা, ব্যাপকভাবে বই-পুস্তক মুদ্রণ ও প্রকাশ, পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি প্রদান প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং লেখক, প্রকাশক ও সংবাদপত্র মালিক ও প্রকাশকদের মনে আশার সঞ্চারের ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য অসামান্য। শুধু বিগত সালেই ৭২ হাজার বই প্রকাশের অনুমতিপত্র প্রদান করা হয়েছে, যার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৮ হাজার বেশি।
  • শিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রী ব্যবস্থার সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতা মজবুত করার ক্ষেত্রেও সরকারের সাফল্য প্রসংশনীয়। উদাহরণস্বরূপ, খনেয়ে সিনেমা পুনরায় চালুকরণ, তেহরানের সিম্ফোনিক অর্কেস্ট্রা ও মিল্লী অর্কেস্ট্রা পুনঃচালুকরণ, শিল্পী, লেখক ও সাংবাদিকদের বীমার আওতায় আনা সরকারের সাফল্যের তালিকার এক একটি ফলক।
  • এর সাথে রয়েছে সংবাদপত্রের মূল্য যুক্তিগ্রাহ্য করা।
  • প্রচার ও সম্প্রচার আইন প্রণয়ন।
  • দেশজুড়ে ক্রুআন বিষয়ক কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং কুরআন প্রশিক্ষণ বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাসমূহকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান বিগত দুই বছরে সরকারের সাফল্যকে উজ্জ্বল করেছে। যেমন ২০১৪ সালে প্রায় ৫০০ কুরআন বিষয়ক প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

শিক্ষা সম্প্রসারণ

  • শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে নিয়ে কাজ করার ফলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্টান্ডার্ড মান নিশ্চিত হয়েছে।
  • দ্বিতীয় মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ৮২.২৪ ভাগ। এই হারটি আগে ছিল ৭৭.৫ ভাগ। তন্মধ্যে ছাত্রীদের অনুপাত ৭৯.৫৬ ভাগ এবং ছাত্রদের হার ৮৪.১৫ ভাগ।
  • প্রাথমিক স্তরে লেখাপড়া থেকে বাদপড়া ৩৫১৪৫ জন শিশু-কিশোরকে পাঠশালায় নিয়ে আসতে পারা নিশ্চয়ই সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
  • ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে প্রাইমারি পর্যায়ে শিক্ষার্থীর হার ছিল শতকরা ৯৭.৪ ভাগ। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে তা উন্নীত হয়েছে ৯৮.৫ ভাগে।
  • প্রথম মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রছাত্রীর হার ছিল শতকরা ৯০ ভাগ। এটি শতকরা ৯০ ভাগে উন্নীত হয়েছে। এতে ছাত্রদের হার শতকরা ৯৫.৫৮ ভাগ আর ছাত্রীদের হার শতকরা ৯২.১৭ ভাগ।
  • প্রাক-প্রাইমারি শিক্ষার হার ২০১৩-১৪ সালে ছিল ৩৮.২ ভাগ। ২০১৪-১৫ সালে তা শতকরা ৫২.৪ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তাতে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে দেশের বঞ্চিত অঞ্চলগুলোর দিকে।
  • বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন আগের শতকরা ৮.৫ ভাগের স্থলে ১০.৫৩ ভাগে উন্নীত হয়েছে।
  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও সম্প্রসারণে দানশীল ব্যক্তিদের প্রতিশ্রুতি বৃদ্ধি পেয়েছে ৬৯৪ বিলিয়ন তুমান। এ পর্যায়ে দাতাদের সহায়তায় ১৬০০ স্কুল এবং ১৩০০.০০০ বর্গমিটার আয়তনের ৯০০০ ক্লাসরূম নির্মিত হয়েছে।
  • প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে ২১.৮ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে এই বৃদ্ধি ঘটেছে ২৪.৪ ভাগ। আর মোট শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দ ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে শতকরা ৮ ভাগ এবং ২০১৫ সালে ৯.২ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • সরকার এরই মধ্যে ৬৫০টি দারুল কুরআন প্রতিষ্ঠা করেছে।
  • প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শতকরা ৩০ ভাগ ক্লাসে শ্রেণি পাঠাগার চালু করা হয়েছে।
  • স্কুল পর্যায়ে অলিম্পিয়াড আয়োজন, জ্ঞান প্রতিযোগিতায় ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি, আন্তঃস্কুল অলিম্পিয়াডে ৪৫০০০ স্কুলের প্রায় সাড়ে তিন মিলিয়ন ছাত্রছাত্রীর অংশগ্রহণ শিক্ষাখাতে সরকারের সাফল্যের তালিকার অন্তর্ভুক্ত।
  • পেশাগত দক্ষতা ও আগ্রহ সৃষ্টি এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষকদের শ্রেণিবিন্যাস ও তা কার্যকর করা হয়েছে।
  • ৩ লক্ষ ৩০ হাজার আফগান শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।
  • উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে দক্ষতাকে সমন্বিত করার লক্ষ্যে যথাযথ মানসম্পন্ন নয়- এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত করা হয়েছে।
  • বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০০-এর অধিক শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
  • বিশ্বের প্রভাবশালী ও শ্রেষ্ঠতর ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় প্রথমবারের মতো ইরানের ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান করে নিয়েছে। (লায়ডেন এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী)

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে

  • জোট নিরপেক্ষ দেশসমূহের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনবিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠান।
  • ৪০০০-এর অধিক বিদেশি ছাত্র ভর্তির ব্যবস্থা করা। তন্মধ্যে ২৮৯ জন ছাত্র ভর্তি করা হয়েছে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে।
  • বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৩২ জন ভিজিটিং প্রফেসর প্রেরণ। এছাড়া ৪২টি ফারসি ভাষা শিক্ষাদান চেয়ার পরিচালনা।
  • ইরানের অভ্যন্তরীণ বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ৩০০ বিদেশি ছাত্রকে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান।
  • ১৫-এর অধিক উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের ইরান সফর এবং মন্ত্রী বর্গের সঙ্গে তাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা।
  • বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪৭ জন অধ্যাপককে ইরানে অধ্যাপনা, গবেষণা ও শিক্ষাশিবিরসমূহ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে আমন্ত্রণ ও তাদের আতিথ্য করা।
  • প্যারিসে ইউনেস্কো অফিসকে সক্রিয় করা এবং ইউনেস্কোর মহাসচিবের তেহরান সফর।
  • তাবরীযে ককেশাস অঞ্চলের ৫০ জন ভাইস-চ্যান্সেলরের বৈঠক অনুষ্ঠান।
  • কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দেশসমূহের জোটভুক্ত ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বৈঠক আয়োজন।
  • গণিত, কম্পিউটার, পদার্থ ও রসায়নবিষয়ক বিভিন্ন অলিম্পিয়াডের আয়োজন, বিজ্ঞানবিষয়ক অলিম্পিয়াডসমূহের মানোন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান প্রতিযোগিতাসমূহের অঙ্গন হতে ৩২টি মূল্যবান পুরস্কার হস্তগত করা।

পররাষ্ট্রনীতি

  • বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রতি সর্বসাধারণের আস্থার মান উন্নত করা। সবচেয়ে কঠিন ও জটিল ইস্যুর মোকাবিলার ক্ষেত্রে জাতীয় ভূমিকার প্রতি মানুষের আস্থা অর্জন।
  • পারমাণবিক আলোচনা এগিয়ে নেয়া, এর পাশাপাশি আমেরিকান ও যায়নবাদী ভূমিকাকে দুর্বল করা এবং ইরানের অবস্থানকে সংহত করা।
  • ইরান আতঙ্ক বা ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে হুমকি মনে করার প্রবণতা অপেক্ষাকৃত হ্রাস পাওয়া এবং বিশ্বজনমতের কাছে ইরানের ভাবমূর্তি উন্নত হওয়া।
  • ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলে যে জোট ছিল, তার মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি হুমকিপূর্ণ বলে যে ভুল ধারণা ছিল তা ভেঙে দেয়া।
  • ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির স্বীকৃতি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ব্যাপারে ইরানের অধিকারের বিষয়টি সংহত হওয়া, বিদ্যমান পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উন্নয়ন স্থগিত না হওয়া ইত্যাদি ব্যাপারে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়।
  • আন্তর্জাতিক ও এতদঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইরানের অনুকূলে পরিবর্তিত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে ইরানের সক্রিয় ভূমিকা পালনের পরিবেশ তৈরি হওয়া।
  • আন্তর্জাতিক ভারসাম্যে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শক্তিমত্তার স্বীকৃতি অর্জন এবং এই উপলব্ধি জোরদার হওয়া যে, ইরান হচ্ছে আঞ্চলিক সংকটসমূহ নিরসনের অন্যতম অংশ।
  • বিদেশনীতি দর্শনীয়ভাবে সক্রিয় হওয়া এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সফর বিনিময়।
  • জনগণশাসিত ধর্মীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচ্ছন্নতা আসায় ইরানের ভূমিকা সুসংহত হওয়া।
  • আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে বিশেষত সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা, উগ্রবাদ প্রভৃতির মোকাবিলা এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিস্তার রোধে ইরানের গঠনমূলক ভূমিকা পালন।
  • ইউরোপ ও এশিয়ায় সনাতনভাবে সুসম্পর্ক ছিল- এমন দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন।
  • মুসলিম ও মযলুম জাতিসমূহ, বিশেষত ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনের জনগণের প্রতি সাহায্য ও সমর্থন প্রদান।
  • দেশের বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে- দেশের ভেতরকার এ ধরনের সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও মহলগুলোর সাথে সক্রিয় যোগাযোগের মাধ্যমে বিদেশনীতির বিষয়ে সমন্বিত মতামত গঠন।

অনুবাদ : ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী