রবিবার, ২১শে জুলাই, ২০১৯ ইং, ৬ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিপুল সম্ভাবনাময় খনিজ সম্পদ

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ১৯, ২০১৬ 

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ সমৃদ্ধ অন্যান্য দেশের ন্যায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানও পুরোপুরিভাবে তেল রফতানিনির্ভর একটি দেশ। কিন্তু এ ধারণা মোটেই ঠিক নয়। অবশ্য এখন পর্যন্ত ইরানের প্রধান রফতানি পণ্য খনিজ জ্বালানি তেল, বিশেষত অশোধিত তেল বটে, তবে অন্য অনেক পণ্য, বিশেষত পেট্রো-রসায়ন শিল্পজাত সামগ্রী, খনিজ সম্পদ, কার্পেট ও কৃষিজাত দ্রব্যাদি ইরানের রফতানি খাতে উল্লেখযোগ্য অবস্থানের অধিকারী। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ২০১৩ সালে ইরানের রফতানি খাতে অশোধিত তেল ও ইথাইলিন পলির্মা-এর পরে খনিজ লৌহ (আয়রন র্ও)-এর অবস্থান ছিল তৃতীয়। ঐ বছর ইরানের মোট ৪৮.৯ বিলিয়ন ডলার রফতানির মধ্যে আয়রন র্ও রফতানিজাত আয়ের পরিমাণ ছিল ২.০২ বিলিয়ন ডলার (৪.১৩%)।
কিন্তু ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের তেল-বহির্ভূূত খনিজ সম্পদ বলতে কেবল আয়রন র্ও-কেই বুঝায় না, বরং ইরান বিভিন্ন ধরনের খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ। সম্প্রতি ইষড়ড়সনবৎম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয় যে, ইরানের ভূগর্ভে যেসব খনিজ সম্পদের রিজার্ভ রয়েছে তার উন্নয়ন ও উত্তোলনের লক্ষ্যে যদি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় তাহলে দেশটি এ খাত থেকে অশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি থেকে লব্ধ আয়ের তুলনায়ও অনেক বেশি আয় করতে পারে।
উক্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, বর্তমানে তেল রফতানিকারক দেশসমূহের সংস্থা (ওপেক)-এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ইরান হচ্ছে পঞ্চম বৃহত্তম অশোধিত তেল উৎপাদনকারী দেশ। কিন্তু দেশটি এমন এক সম্ভাবনার অধিকারী যে, দেশটির সরকার যদি তার ধাতব খনিজ সম্পদের উন্নয়ন ও উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাহলে দেশটি অশোধিত তেলের তুলনায় খনিজ সম্পদ থেকে অনেক বেশি আয় করতে সক্ষম।
উক্ত প্রতিবেদনে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সরকারের শিল্প, খনিজ দ্রব্য ও বাণিজ্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী জনাব মুজতাবা খসরুতাজ-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয় যে, ইরানে তামা, দস্তা ও উচ্চ মূল্যের বিভিন্ন ধরনের খনিজ সম্পদ রয়েছে যেগুলো থেকে ইরানের তেল শিল্প থেকে লব্ধ আয়ের চেয়েও বেশি আয় করা যেতে পারে।
উল্লেখ্য, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত বিরোধের প্রেক্ষিতে ২০১২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, তা সত্ত্বেও ২০১৩ সালে ইরানের মোট রফতানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪৮.৯ বিলিয়ন ডলার এবং এর মধ্যে অশোধিত তেল রফতানি থেকে আয় হয়েছিল ৩৩.১ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ মোট রফতানি আয়ের ৬৭.৬৯% ভাগ।
ইষড়ড়সনবৎম-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে ইরান দৈনিক গড়ে ২০ লক্ষ ব্যারেল অশোধিত তেল রফতানি করে থাকে, তবে দেশটির ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেয়া হলে দেশটি তার তেল ও অন্যান্য রফতানি বৃদ্ধির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠে যাবার পর ইরান ৩০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়সাপেক্ষ এনার্জি প্রকল্পসমূহ ও ২৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় সাপেক্ষ খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ও উত্তোলন প্রকল্পসমূহ বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে।
ইষড়ড়সনবৎম-এর প্রতিবেদনে ইউএস জিওলোজিক্যাল্ সার্ভে-র উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয় যে, ইরানে বর্তমানে তিন হাজারেরও বেশি এমন খনি রয়েছে যেগুলো থেকে নিয়মিত খনিজ সম্পদ উত্তোলন করা হচ্ছেÑ যেগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই বেসরকারি মালিকানাধীন।
উপমন্ত্রী জনাব মুজতাবা খসরুতাজ জানান, ইরানের খনিজ সম্পদ খাতে এখনো ১৫ থেকে ২০ বছর আগেকার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। কারণ, পাশ্চাত্যের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে উদ্ভূত বিনিয়োগ সমস্যার কারণে এগুলোর পরিবর্তে সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠে যাবার পর ইরানের খনিজ সম্পদ খাতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
ইউএসজিএস্-এর দেয়া তথ্য অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহের মধ্যে যদিও অশোধিত তেল উৎপাদনের দিক থেকে সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমীরাত (ইউএই) ও কুয়েতের পরে ইরানের অবস্থান পঞ্চম, কিন্তু ধাতব পদার্থ উৎপাদনের ক্ষেত্রে, বিশেষত আয়রন র্ও, অশোধিত ইস্পাত, ম্যাঙ্গানিজ, দস্তা, সিমেন্ট, জিপসাম ও তামা উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইরান হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী দেশ।
উপমন্ত্রী জনাব মুজতাবা খসরুতাজ বলেন, ইরানের খনিজ সম্পদ খাতের উন্নয়ন ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনের জন্য দেশি ও বিদেশি কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ ইরান হচ্ছে এমন একটি দেশ যেখানে অর্থনীতির প্রধান খাত হিসেবে খনিজ সম্পদ খাত ক্রমান্বয়ে তেল খাতের স্থলাভিষিক্ত হতে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, তাই আমরা সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের প্রতি আমাদের খনিজ সম্পদ খাতের প্রতি মনোযোগ দেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছি।
এ পর্যন্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মোট আয়তনের মাত্র শতকরা ৭ ভাগ এলাকায় খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান চালানো হয়েছে এবং ভূগর্ভের ৫০ মিটার (১৬৪ ফুট) গভীর পর্যন্ত খনিজ দ্রব্যাদি অনুসন্ধান চালানোর ফলে ৩৭ বিলিয়ন টন খনিজ সম্পদ আবিষ্কৃত হয়েছেÑ যার মূল্য ৭০০ বিলিয়ন ডলার। নতুন আবিষ্কারের ফলে এর পরিমাণ কম পক্ষে দ্বিগুণে দাঁড়াবে বলে আশা করা যাচ্ছে। অবশ্য এখনো ইরানের খনিজ সম্পদ খাতে কাম্য পর্যায়ে উন্নয়ন সাধন করা হয় নি এবং বর্তমানে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে (জিডিপিতে) খনিজ সম্পদ খাতের অবদান মাত্র শতকরা এক ভাগেরও কম। আরো ব্যাপক ভিত্তিতে ও ভূগর্ভের অধিকতর গভীরে অনুসন্ধান চালানো হলে খনিজ সম্পদের এ রিজার্ভের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।
ইরানের মোট খনিজ সম্পদ রিজার্ভের পরিমাণ ৬০ বিলিয়ন মেট্রিক টন প্রাক্কলিত হয়েছে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সরকার স্বীয় খনিজ সম্পদ খাতে যে ২৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে তাতে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের অংশ ১৫ বিলিয়ন রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ইস্পাত থেকে শুরু করে এলুমিনিয়াম, তামা ও স্বর্ণের খনি, কয়লা এবং বিরল ধরনের বিভিন্ন মৃত্তিকা উপাদানসহ আরো অনেক খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ও উত্তোলনের জন্য এসব বিনিয়োগ ব্যবহার করা হবে বলে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
জনাব মুজতাবা খসরুতাজ বলেন, ইরানে যে পরিমাণ তামা, আয়রন র্ও ও বিভিন্ন ধরনের ভারী মৃত্তিকা উপদান রয়েছে তার মূল্য দেশের মোট অশোধিত তেল রিজার্ভের মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি হবে।
টাইটানিয়াম উত্তোলনে বিনিয়োগ আকর্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাগণ জানান যে, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের ফানুজ্ নামক স্থানে টাইটানিয়ামের বিরাট রিজার্ভ আবিষ্কৃত হয়েছে এবং এ খনিজ সম্পদের উন্নয়ন ও উত্তোলনের জন্য বিনিয়োগ আকর্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তাঁরা বলেন, এ খাতে আগামী পাঁচ বছরে ৪.২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
মাক্রান্ স্টীল্ কোম্পানির পরিচালনা বোর্ডের প্রধান জনাব জামশীদ জাহানবাখ্শ্ তেহ্রানী বলেন, ফানুজ্ থেকে বছরে তিন কোটি টন টাইটানিয়াম্ র্ও উত্তোলন করা হলে চারশ’ থেকে পাঁচশ’ বছর পর্যন্ত এ খনি থেকে টাইটানিয়াম উত্তোলন করা যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
ফানুজে ৩.৬ বিলিয়ন টন টাইটানিয়ামের নিশ্চিত রিজার্ভ রয়েছে বলে প্রাক্কলিত হয়েছে। এখানে টাইটানিয়ামের ত্রিশটি গুচ্ছ রিজার্ভ রয়েছে যেগুলোর প্রতিটি থেকে বছরে দশ লাখ টন টাইটানিয়াম র্ও উত্তোলন করা যাবে।
উল্লেখ্য, টাইটানিয়াম হচ্ছে শতাব্দীর কৌশলগত ধাতব পদার্থ। শক্তি, কম ওজন ও ক্ষয়রোধ ক্ষমতার বিচারে এ ধাতব পদার্থটির মূল্য অনেক বেশি এবং এটি বিমান নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া এটি সামরিক শিল্প, এয়ারোস্পেস্ শিল্প, মেরিন ইন্ডাস্ট্রিজ, ডেন্টাল ইমপ্লান্ট ও আরো বহু শিল্প প্রক্রিয়ার কাজেও ব্যবহৃত হয়।
জনাব তেহরানী আরো জানান, বিগত পাঁচ বছরে ফানুজে আশিটিরও বেশি টাইটানিয়াম, আয়রন র্ও ও তামার খনি আবিষ্কৃত হয়েছে। তিনি বলেন, ঐ অঞ্চল থেকে যে খনিজ টাইটানিয়াম উৎপাদন করা হবে তা প্রক্রিয়াজাতকরণের লক্ষ্যে দুই হাজার ৪০০ ভারী ট্রাকের সাহায্যে ওমান সাগরের তীরবর্তী ইরানী সামুদ্রিক বন্দর চ-বাহারে পাঠানো হবে এবং এরপর সেখান থেকে জাহাজ যোগে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হবে। তিনি জানান, প্রাক্কলন অনুযায়ী, উত্তোলনের কাজে ফানুজের টাইটানিয়াম রিজার্ভ এলাকায় চার হাজারেরও বেশি জনশক্তি নিয়োগের প্রয়োজন হবে, এছাড়া চ-বাহার বন্দর এলাকায় প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে আরো নয় হাজার লোকের প্রয়োজন হবে।
উল্লেখ্য, ফানুজের টাইটানিয়াম রিজার্ভ এলাকা ইরানের একমাত্র টাইটানিয়াম রিজার্ভ এলাকা নয়। এছাড়াও কেরমান প্রদেশের কাহ্নূজ এলাকায় চল্লিশ কোটি টন টাইটানিয়াম রিজার্ভ আছে বলে প্রাক্কলিত হয়েছে। আর উরূমীয়ার নিকটবর্তী ক্বারা আগ¦ায হার্ড রক্ রিজার্ভ এলাকায় এর ঘন সংবদ্ধ রিজার্ভ রয়েছেÑ যার রিজার্ভের পরিমাণ আনুমানিক ২০ কোটি টন।
এ পর্যন্ত জাপানের ইস্পাত উৎপাদনকারী বিভিন্ন কোম্পানি ইরানে টাইটানিয়াম উৎপাদনের কাজে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহ প্রদর্শন করেছে। গত আগস্ট মাসে (২০১৫) জাপানের কোবে স্টীল লি. এবং সে দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান জাপান অয়েল, গ্যাস অ্যান্ড মেটাল্স্ ন্যাশনাল কর্পোরেশন (জেওজিএমইসি)-এর নির্বাহী কর্মকর্তাগণ তেহরান সফরে আসেন এবং এ ব্যাপারে সহযোগিতা পরিকল্পনা নিয়ে ইরান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনায় মিলিত হন।
নূর হোসেন মজিদী