শুক্রবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৩রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান : প্রসঙ্গ স্বাধীনতা, জাতীয় সক্ষমতা ও উন্নয়ন

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ২২, ২০১৮ 

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান : প্রসঙ্গ স্বাধীনতা, জাতীয় সক্ষমতা ও উন্নয়ন
ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় পারস্য উপসাগরের তীরে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। এটি মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ৩৯তম বিজয় বার্ষিকী। আজ থেকে ৩৯ বছর আগে ১৯৭৯ সালের এদিনে প্রখ্যাত মার্জায়ে তাকলিদ (উচ্চ প্রজ্ঞাসপন্ন ফকিহ বা আলেম), বিশ্বব্যাপী ইমাম খোমেইনী নামে সুপরিচিত হযরত আয়াতুল্লাহ আল-উযমা রুহুল্লাহ আল-মুসাভী (রহ.)-এর প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে ইরানের দ্বীনদার সংগ্রামী জনগণ ইসলামি আদর্শে উজ্জীবিত এক অভূতপূর্ব বিপ্লবের মাধ্যমে স্বৈরাচারী খোদাদ্রোহী রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং বিজাতীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদার মুহাম্মদ রেযা শাহ ও তাঁর সরকারকে উৎখাত করে। ফলে কেবল পাহলভী রাজবংশ নয়; বরং আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটে। বিপ্লবের অব্যবহিত পরেই ইরানি জনগণ প্রায় সর্বসম্মত রায়ে ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। উল্লেখ্য যে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মূল স্লোগান ছিল ‘স্বাধীনতা, মুক্তি ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র’। এ স্লোগানে বিধৃত বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ ছিল- অভ্যন্তরীণ স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তি, বহিঃশক্তির তাঁবেদারি থেকে স্বাধীনতা, নিজেদের ভাগ্যনিয়ন্ত্রণকে নিজেদের হাতে গ্রহণ, জনপ্রতিনিধিত্বমূলক ও ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা; অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন এবং নিজস্ব স্বকীয় সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ ইত্যাদি। বিগত ৩৯ বছর ধরে ইরানের সরকার ও জনগণ এ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যাবলি অর্জনে আন্তরিক ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। বিপ্লবের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক শত্রুদের সর্বাত্মক অপপ্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে ইতোমধ্যে ইরানের জনগণ বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান ও নিজেদের ভাগ্যনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিজেদের হাতে গ্রহণের লক্ষ্য পরিপূর্ণভাবে অর্জন করেছে। আট বছরব্যাপী যুদ্ধ (ইরান-ইরাক যুদ্ধ) চাপিয়ে দিয়ে ও একযুগেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ আরোপ করে ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পঙ্গু করে সাম্রাজ্যবাদীদের  কাছে নতজানু ও আত্মসমর্পণে বাধ্য করার অপচেষ্টা ইরানি নেতৃত্ব সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর করে দিয়েছেন। ফলে বিপ্লব-পরবর্তী গত ৩৯ বছরে ইরানে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, পারমাণবিক বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও ন্যানোটেকনোলজিসহ সকল ধরনের জ্ঞান-গবেষণা, সুস্থ সংস্কৃতি ও শিল্পকলা চর্চা ইত্যাদিসহ জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি-অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। গত প্রায় চার দশকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের স্বাধীনতা সুরক্ষা এবং জনজীবনের সর্বক্ষেত্রে তাদের অভাবনীয় উন্নতি ও অগ্রগতি সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনার উদ্দেশ্যেই আলোচ্য নিবন্ধটির অবতারণা।
সাম্রাজ্যবিরোধী অবস্থান ও স্বাধীনতা
‘এস্তেগলাল ও আযাদী’ তথা স্বাধীনতা ও মুক্তি ছিল ইসলামি বিপ্লবের অন্যতম মূল লক্ষ্য। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তার সুদীর্ঘ প্রায় চার দশকের পথ চলায় এ লক্ষ্য অর্জনে সর্বাত্মকভাবে সচেষ্ট থেকেছে। তবে এ কাজটি মোটেই সহজ ছিল না। ইসলামি বিপ্লবের পর সুদীর্ঘ সময় ধরে রক্ষিত কায়েমী স্বার্থ বঞ্চিত হওয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসহ পশ্চিমা শক্তি ইরানকে পদানত ও তাদের তাঁবেদারে পরিণত করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা ও কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য সর্বাত্মক অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। বিলিয়ন বিলয়ন ডলার ব্যয়ে বিপ্লব ও ইরানি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিভ্রান্তি ছড়াবার উদ্দেশ্যে প্রচারযুদ্ধ চালিয়েছে। ইরানকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল করার জন্য সবধরনের অপচেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তাদের কোনো অপকৌশলই কাজে আসে নি। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জ্ঞাননির্ভর নেতৃত্ব তার মেধা ও ধীশক্তি দিয়ে সফলভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। হযরত ইমাম খোমেইনী ও তাঁর উত্তরসূরি ধর্মীয় নেতা ও শাসকগণ ইরানের মযলুম জনতাকে সত্যিকারের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মেধা ও মননকে এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যে, তারা নিঃশঙ্কচিত্ত হয়ে উঠেছে। ফলে আগ্রাসী শক্তির কাছে নতজানু না হয়ে তারা নিজেদের স্বাধীনতা ও মুক্তির উপলব্ধিতে অটুট থাকে। বর্তমান সময়ে মুসলিম দেশগুলোর বেশিরভাগ যখন পরাশক্তি ও তাদের দোসর পশ্চিমা এবং অন্য বৃহৎশক্তির তাঁবেদারে পরিণত হয়েছে সেখানে ইরান স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বে পশ্চিমা দেশগুলোকে যারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলাফেরা করছে ইরান তাদের অন্যতম। বস্তুত ঈমানী শক্তি, সুযোগ্য নেতৃত্ব, মেধার অনুশীলন ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে ইসলামি বিপ্লবের অনুসারীরা একের পর এক বাধা অতিক্রম করে নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে।
সংবিধান ও সরকার ব্যবস্থা
ইসলামি বিপ্লবের অন্যতম লক্ষ্য ছিল রাজতন্ত্রের পরিবর্তে একটি ইসলামি গণভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা- যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারবে। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইসলামি বিপ্লবের মাত্র দুই মাস পর ৩০ মার্চ এক ঐতিহাসিক গণভোটের (শতকরা ৯৮.২ ভাগ ভোটে) মাধ্যমে ইরানের জনগণ ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দেয়। ১ এপ্রিল (১২ ফারভারদিন) ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে এ দিনটি ইরানে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র দিবস’ (রুজ-ই-জমহুরি ইয়ে এসলামি) হিসাবে গণ্য করা হয়। এ দিনটি এখন তাদের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হয়। এ বছরই বিপ্লবী সরকার একটি সংবিধান প্রণয়ন করে এবং ১৯৮৯ সালের ২৮ জুলাই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধান সংশোধন করা হয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধানে ইরানি সমাজের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোগুলোর ব্যাখ্যা ইসলামের মূলনীতি এবং আদর্শের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে, যা ইরানিদের প্রাণের দাবির বহিঃপ্রকাশ। এ সংবিধান ইরানে তাগুতি রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে ইসলামি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে। এর ফলে শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশীদারিত্বের পথ সুগম হয়- যা রাজতান্ত্রিক যুগে অসম্ভব ছিল। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগসহ সব ধরনের ওহভৎধংঃৎঁপঃঁৎব-ই ইসলামি প্রজাতন্ত্রে বিদ্যমান। তবে একথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এক নয়। ১৯৭৯ সালের সংবিধানের মাধ্যমে ইরানে এমন একটি সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় যে সরকার ব্যবস্থায় একজন ন্যায়পরায়ণ মুজতাহিদ বা ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ‘রাহবার’ বা সর্বোচ্চ নেতা সরকার ও প্রশাসনের পথ-নির্দেশক হিসেবে কাজ করেন। একটি নির্বাচিত বিশেষজ্ঞ পরিষদ রাহবার নির্বাচন করে। ইসলামি আইনজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি অভিভাবক পরিষদ ইসলামি মানদণ্ডের ভিত্তিতে এবং পার্লামেন্টের অনুমোদিত আইন অনুযায়ী তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন। ইরানের সরকার ব্যবস্থা প্রেসিডেন্ট শাসিত। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর অনেক গণতান্ত্রিক দেশ দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি। তবে ইরান তা করতে পেরেছে। সেখানকার নির্বাচন ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের আস্থা রয়েছে। শাসন কাজের সুবিধার জন্য সমগ্র ইরানকে ৩১টি প্রদেশে (ওস্তা’ন) ভাগ করা হয়েছে। ইরানের আইন পরিষদ ‘মজলিশ শুরায়ে-এসলামি’ এক কক্ষবিশিষ্ট এবং এর সদস্য সংখ্যা ২৯০। ইরানের সরকার পরিচালিত হয় ইসলামি আইনের বিধিবিধান ও এর সাথে সঙ্গতি রেখে সমকালীন পেক্ষাপট অনুযায়ী পার্লামেন্টে প্রণীত আইন দ্বারা।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তার নাগরিকদের মৌলিক মানবিক অধিকার সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গ্লোবালাইজেশনের এ যুগে সামাজিক নিরাপত্তা একটি বড় ইস্যু। যে কোনো দেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধির বিষয়টি অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ওপর। ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এক্ষেত্রে ইরানের অর্জন অন্য অনেক দেশের জন্য অনুকরণীয়। যেখানে ইউরোপ ও আমেরিকার মতো উন্নত দেশের মানুষ সারাক্ষণ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, আত্মরক্ষার জন্য বাধ্য হয় অস্ত্র বহন করতে, বর্ণবৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য, সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, চরম নৈতিক অবক্ষয়, গভীর পারিবারিক সংকট প্রভৃতি যেখানে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার সেখানে ইরানে বিরাজ করছে উল্টো চিত্র। শিশু ও নারী নির্যাতন, লুটপাট, খুন-খারাবি ও সাইবার ক্রাইম থেকে ইরান অনেকটা মুক্ত। ইরানে বর্তমানে সামাজিক অপরাধ প্রবণতার হারও অনেক কম।
বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ বর্তমান বিশ্বের এক মূর্তিমান আতংক। একসময় ইরানকে সন্ত্রাসের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হতো। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে ধর্মের নামে যে সন্ত্রাস মুসলিম বিশ্বসহ সমগ্র সভ্যতাকে গ্রাস করতে চাচ্ছে তার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বের শান্তিপ্রয়াসী জাতিসমূহকে জাগ্রত করতে ইরান সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
অর্থনৈতিক অগ্রগতি
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান উদীয়মান অর্থনীতির এক সম্ভাবনাময় দেশ। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ইরান সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, পূর্ণ কর্মসংস্থান এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রা আরামদায়ক ও মানস¤পন্ন করা। বিপ্লবী সরকার মনে করতো অর্থনৈতিক বুনিয়াদগুলো মজবুত করাই অর্থনীতির লক্ষ্য নয়; মূল লক্ষ্য হবে প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের গতিপথে মানুষের প্রয়োজন মেটানো। সকলের জন্য কর্ম সংস্থান করা এবং উপযুক্ত ও সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। তবে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা  বিশ্ব, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের কতিপয় মুসলিম রাষ্ট্র ইরানের ওপর নানা রকমের বিধি-নিষেধ ও বাধা-বিপত্তি আরোপ করতে থাকায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও লক্ষ্য অর্জন মোটেই সহজ কাজ ছিল না। এতদসত্ত্বেও ইরান চার দশকের মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ইতোমধ্যে দেশটি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হয়েছে।
ইরান মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ একটি দেশ। তেল ও গ্যাসের বিপুল মজুদ ও মালিকানার কারণে ইরানকে energy superpower হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এক সময় তেল ও খনিজ গ্যাস ছিল ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। ইরান সরকার বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতা এবং সময়ের দাবি মোতাবেক তেলনির্ভর অর্থনীতির পরিবর্তে নতুন নতুন খাত নির্ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে। এতে ইরানি অর্থনীতিতে ক্রমশ শিল্প, কৃষি ও সেবা খাতের বিকাশ ঘটছে। ফলে দেশটির অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো অনেকটাই বদলে গেছে।
জেনেভায় ইরানের সঙ্গে ৫+১ (জাতিসংঘের ৫ সদস্য রাষ্ট্র ও জার্মানি) বিশ্বশক্তির ব্যাপকভিত্তিক পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে ইরানের ওপর থেকে একযুগের বেশি সময় ধরে আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ সম্প্রতি প্রত্যাহার করা হয়। এতে ইরানের অর্থনীতিতে সমৃদ্ধির নতুন ধারা সূচিত হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যে ইরান মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে ইরান এধরনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করবে বলে গ্লোবাল রিস্ক ইনসাইটস আভাস দিচ্ছে। অবরোধ প্রত্যাহার হওয়ায় ইরানের জিডিপি খুব স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। গত অর্থ বছরে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ আর্থিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক আউটলুক ডেটাবেজের পরিসংখ্যান মতে, ২০১৭ সালের এপ্রিলে ইরানের মোট দেশীয় উৎপাদন (জিডিপি) দাঁড়ায় ১ দশমিক ৫৩৫ ট্রিলিয়ন ডলারে। মাথাপিছু গড় আয় প্রায় ২০ হাজার মার্কিন ডলার। বেকারত্ব দূরীকরণ ও কর্মসংস্থানেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইরান অন্যতম সফল দেশ।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ইরান বর্তমানে একটি সফল দেশ। ২০১৬ সালে মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১০৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জাতিসংঘের অধীনস্থ বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক কর্তৃপক্ষ আঙ্কটাডের প্রতিবেদন মতে, ২০১৬ সালে বৈশ্বিকভাবে সর্বমোট বাণিজ্য হয়েছে ৩২ দশমিক ১৩৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের। যার দশমিক ৩৪ শতাংশ অবদান ইরানের। ২০১৬ সালে বিশ্বের সেরা বাণিজ্য সম্পাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় ইরানকে ৪৪তম স্থান দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আঙ্কটাডের প্রতিবেদন মতে, ইরানের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেয়ার পর দেশটির তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়েছে এবং অভ্যন্তরীণ আয়, ভোগ ও বিনিয়োগে এর প্রভাব পড়েছে।
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো রপ্তানি খাত। এ খাতের সাফল্য একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিরও ইঙ্গিত দেয়। রপ্তানি খাতে ইরানের অর্জন উল্লেখ করার মতো। বর্তমানে ইরানের বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণ ৪৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এ রপ্তানির শতকরা প্রায় ৯৭ ভাগ অর্জিত হয় ১০টি রপ্তানি পণ্য থেকে। ইরানের শীর্ষ দশ শ্রেণির রপ্তানি পণ্যসামগ্রীর তালিকায় প্রথমেই রয়েছে তেলসহ খনিজ জ্বালানি। মোট রপ্তানি আয়ের ৭৫ ভাগই অর্জিত হয় এ খাত থেকে। তেলবহির্ভূত যেসব পণ্য ইরান রপ্তানি করে থাকে তার মধ্যে রেয়েছে পেট্রোকেমিক্যাল, প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্য, আয়রন ও স্টিল, কপার, রাসায়নিক ও জৈব সার, বিভিন্ন রকমের কৃষি ও খাদ্যপণ্য (গত বছরে ইরান ৪ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন টন কৃষিপণ্য রপ্তানি করে), খনিজ, অটোশিল্প পণ্য, গালিচা ও ওষধি পণ্য ইত্যাদি। ইরানি পণ্যদ্রব্যের রপ্তানি গন্তব্যের শীর্ষে রয়েছে চীন। এ ছাড়াও ইরানি পণ্য আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে ভারত, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকার দেশগুলোতে ইরানের রপ্তানি বেড়েছে শতভাগ। অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের পর ইউরোপের বাজারেও ইরানের পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানের শুল্ক প্রশাসনের তথ্যমতে, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ইউরোপের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য দাঁড়ায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। আগের বছরের তুলনায় বাণিজ্য বৃদ্ধির পরিমাণ ১৭১ শতাংশ।
অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগে ইরানের বৈচিত্র্য আনার ক্ষমতাও রয়েছে যথেষ্ট। গত বছর ২২টি বিদেশি বিনিয়োগ চুক্তি করতে সমর্থ হয় ইরান। অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের পর বিভিন্ন খাতে ইরানের বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিমাণ পূর্বের তুলনায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোমধ্যে দেশটির পানি ও বিদ্যুত খাতে ৮ বিলিয়ন ডলারের অধিক বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যথেষ্ট স্থিতিশীল বলে ইউরোপ, চীন, আমেরিকা, আফ্রিকা, ভারতসহ লাতিন আমেরিকার দেশগুলো দেশটিতে বিনিয়োগে ছুটছে। অর্থনৈতিক অবরোধের সময় বিভিন্ন দেশে ইরানের আটক অর্থসম্পদের মূল্য দেড়শ’ বিলিয়ন ডলার। অবরোধ প্রত্যারের পর ইতোমধ্যে ইরান ৫০ বিলিয়ন ডলার ফেরত পেয়েছে। সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত পেলে তা ইরানের বিনিয়োগ থেকে শুরু করে সার্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরো গতিশীল হবে এবং তা দেশটিকে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক পরাশক্তির আসল গন্তব্যে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতি
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের পর থেকেই জ্ঞান-বিজ্ঞানে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে ইরান। শিক্ষা এক সময় এলিটদের ভূষণ থাকলেও বিপ্লবোত্তর ইরানে সাধারণ ও প্রান্তিক জনমানুষকে এর আওতায় নিয়ে আসা হয়। শুধু তাই নয়, ইসলামপূর্ব সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়ে ইসলামের চেতনায় ঐশী আলোয় আলোকিত হয়। পশ্চিমা বস্তুবাদী শিক্ষার দাপটে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা ইবনে সিনা, আল-তুসী, জামী, ওমর খাইয়্যাম ও হাফিজের মতো ক্ষণজন্মা বুদ্ধিজীবীদের সৃষ্টিকর্ম ইসলামি বিপ্লবের পর পুনরুদ্ধারের সর্বাত্মক চেষ্টা গৃহীত হয়। বিপ্লবী সরকারের গঠিত সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও শিক্ষা সংস্কার কমিটি রাহবার আয়াতুল্লাহর পরামর্শে এমন এক শিক্ষাধারা চালু করে যা ইরানকে তো বটেই, সারা পৃথিবীর সচেতন ও আলো প্রত্যাশিত মানুষকে আরো সত্য ও সুন্দরের দিকে নিয়ে যায়। এভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে ইরান এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে উন্নীত হয়।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের শিক্ষাব্যবস্থার কিছু মৌলিক দর্শন রয়েছে। যেমন : (ক) ইসলামি শিক্ষা-দর্শনের ভিত্তিতে দেশের প্রয়োজনের প্রতি দৃষ্টি রেখে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা, (খ) জনশক্তির ভিতরে চিন্তা, অনুসন্ধান, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন ক্ষমতার উন্নয়ন, (গ) ইসলামি সংস্কৃতি ও আদর্শের এবং কোরআনিক শিক্ষার বিকাশ সাধন এবং কোরআন মজীদ, হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের সাথে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততাকে কাজে লাগানো। (ঘ) শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং (ঙ) ইরানের ঐতিহ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কারিকুলাম ও পাঠ-পরিকল্পনা অনুসরণ ইত্যাদি।
উপর্যুক্ত লক্ষ্যসমূহকে সামনে রেখে বর্তমানে ইরানে যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীভূত এবং এটি ক-১২ এবং উচ্চ শিক্ষা- এ দু’ভাগে বিভক্ত। ক-১২ ধাপের শিক্ষা Primary school, (Dabestân), Middle school I High school (Dabirestân) এ ৩টি লেভেলে বিভক্ত এবং এগুলো পরিচালিত হয় Ministry of Education এর তত্ত্বাবধানে। বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের শিক্ষা কার্যক্রম, চিকিৎসা শিক্ষা ও কমিউনিটি কলেজ শিক্ষার সমন্বয়ে ইরানের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এবং উচ্চশিক্ষা পরিচালিত হয় Ministry of Science and Technology I Ministry of Health and Medical Education  এর তদারকিতে।

বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ইরান শিক্ষা ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে। বর্তমানে ইরানে শিক্ষার হার ৯৭ শতাংশেরও বেশি। বিভিন্ন তথ্যসূত্র মতে, শিক্ষা ইরান সরকারের অন্যতম প্রাগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত। ইরান সরকার তার জিডিপির ৫ শতাংশ এবং বার্ষিক সরকারি ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ এ খাতে ব্যয় করে।
ইরান সরকার শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন ও সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর এ কারণেই ইরানের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ^দরবারে স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ইনফরমেশন সাইন্স ইনস্টিটিউটের (আইএসআই) এক জরিপ মতে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষা কেন্দ্র ও প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ইরানের ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ইরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৬১টি দেশের ৫৭ হাজার বিদেশি ছাত্রছাত্রী পড়াশুনা করছে। প্রতিবছর দেশটিতে লেখাপড়া করতে আসে ১০ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থীছাত্রছাত্রী। অন্যদিকে ইরানের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন
টেকনোলজির উদ্ভাবন, ব্যবহার ও এর যৌক্তিক মাত্রা নির্ণয়ে বর্তমান বিশে^ মুসলিম দেশসমূহের পশ্চাদপদতা মোটা দাগে চোখে পড়ার মতো। যদিও মুসিলম দেশসমূহের বহু প্রতিভা পাশ্চাত্যের গবেষণাগারসমূহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় বিপ্লবোত্তর ইরানের অগ্রগতি এককথায় বিস্ময়কর। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে নানা রকমের বাধা-বিপত্তি, পাশ্চাত্যের অসহযোগিতা ও বিশেষ অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত ইরানি বিজ্ঞানীরা চরম আত্মত্যাগ ও সাধনার পরিচয় দেয়ায় দেশটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে বৈপ্লবিক উন্নতি ও সাফল্য অর্জন করেছে। ফারসি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সির খবর অনুযায়ী, বিজ্ঞানবিষয়ক নিবন্ধ তৈরিতে ইরানের অবস্থান আঞ্চলিক প্রর্যায়ে শীর্ষতম, বিশ্বে ১৭তম এবং বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতির মানপত্র অর্জনের ক্ষেত্রে বিশে^ অবস্থান ১৮তম। বিশ্বের সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী বৈজ্ঞানিক গবেষকদের তালিকায় নাম রয়েছে ইরানের ৭ বিজ্ঞানীর। ২০১৭ ‘হাইলি সাইটেড রিসারচারস’ শীর্ষক তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন এসব ইরানি বিজ্ঞানী। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মহাকাশ বিজ্ঞান গবেষণা র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে রয়েছে ইরান। এছাড়া এক্ষেত্রে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ১১তম স্থান অর্জন করেছে দেশটি। মহাশূন্যে নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে সক্ষম দেশের মধ্যে ইরানের অবস্থান নবম এবং মহাকাশযানে প্রাণী পাঠানোর ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান ষষ্ঠ। ২০১৭ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান মহাকাশে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতি হিসেবে ২০১৭ সালে সাফল্যের সঙ্গে মহাকাশে দু’বার বানর পাঠিয়েছে। গত বছর গত ২৮ জানুয়ারি ‘পিশগাম’ নামের বায়ো-ক্যাপসুলে করে এবং সম্প্রতি ‘ফারগাম’ নামের আরেকটি বানর মহাকাশে পাঠানো হয়। বানরটি মাত্র ১৫ মিনিটে পূর্ব-নির্ধারিত গতিতে নির্দিষ্ট উচ্চতায় (১২০ কিলোমিটার) পৌঁছার পর জীবন্ত অবস্থায় আবার ভূ-পৃষ্ঠে ফিরে এসেছে।
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এর সাথে সম্পৃক্ত  অন্যান্য কৌশল উদ্ভাবনের মাধ্যমে ইরানে বিগত দু’দশকে বায়োটেকনোলজি বিষয়ে লক্ষণীয় উন্নতি সাধিত হয়েছে। ইরানে আধুনিক বায়োটেকনোলজি গবেষণার সূচনা ১৯৯০ সালে। বর্তমানে ইরানে ১৬০টি সরকারি গবেষণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ২১৮টি বেসরকারি সেন্টার ও কো¤পানি বায়োটেকনোলজি গবেষণা এবং উৎপাদন খাতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বায়োটেকনোলজি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশনার সংখ্যার দিক থেকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে ১ম স্থানে, এশিয়ায় ১ম সারির পাঁচটি দেশের অন্যতম এবং বিশ^ অবস্থান ১৪তম। বায়োটেকনোলজি ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহের মধ্যে ইরানের অবস্থান প্রথম এবং এশিয়ায় ১ম সারির ৫টি দেশের অন্যতম। ভ্যাকসিন উৎপাদনে মধ্যপ্রাচ্যে ১ম। স্টেমসেল গবেষণার ক্ষেত্রে ইরান প্রথম সারির ১০টি দেশের মাঝে অবস্থান করছে। স্টেমসেল রিপ্লেস করার ক্ষেত্রে বিশ্বে ইরানের অবস্থান দ্বিতীয়। হাড়, হার্টভালভ ও ট্যানডন রিপ্লেস করা ও Bio-tech drug উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইরান প্রথম ১২টি দেশের মাঝে অবস্থান করছে।

ন্যানোটেকনোলজি খাতে ইরানের প্রবৃদ্ধি বিস্ময়কর। ২০০০ সালে ইরান বিজ্ঞান গবেষণা পত্র প্রকাশনার দিক থেকে বিশ্বে ৫৯তম স্থান দখল করে। মাত্র এক দশকে ইরান ন্যানোটেকনোলজি খাতে প্রকাশনার দিক থেকে বিশ্বে ৮ম স্থান দখল করতে সক্ষম হয়। ন্যানো প্রযুক্তিতে বর্তমানে ইরানের অবস্থান বিশ্বে ষষ্ঠতম। বর্তমানে ইরানে ৩৭০টিরও অধিক কো¤পানি স্বাস্থ্য, নির্মাণ, কৃষি ও প্যাকেজিং, পেট্রোলিয়াম, বস্ত্র এবং যানবাহন নির্মাণ শিল্পে ন্যানোটেকনোলজির প্রয়োগ নিয়ে কাজ করছে। স্বল্প সময়ে ন্যানোটেকনোলজির যে সকল খাতে ইরান তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো : ক্যান্সার নিরোধক ঔষধ; স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ; ডিপ রিঅ্যাক্টিং আয়ন এচিং; ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইলেকট্রোরিস মেশিন; হাই রেসুলিউশন এনিম্যাল ঝচঊঈঞ ইমেজিং সিস্টেম; আয়ন মোবিলিটি  স্পেক্ট্রোস্কোপি (IMS); প্লাজমা এনহেন্সড কেমিক্যাল ভেপার ডিপোজিশন (PECVD); স্পাটারিং অ্যান্ড এচিং সিস্টেম; প্লাজমা অ্যাসিসটেড কেমিক্যাল ভেপার ডিপোজিশন (PECVD) এবং বহনযোগ্য ন্যানোফিলট্রেশন যন্ত্র ইত্যাদি। বর্তমানে বিশ্বের ৩৫টি দেশে ন্যানো গ্লাস ও ন্যানো আয়না রপ্তানি করছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। দেশটির মাত্র একটি শিল্প গ্রুপ এসব ন্যানো গ্লাস রপ্তানি করছে।

কম্পিউটার সায়েন্স ও রোবোটিক্স খাতেও ইরানের সাফল্য উল্লেখ করার মতো। ২০১০ সালে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব প্রযুক্তিতে Sorena-2 নামক রোবট তৈরি করে যা IEEE কর্তৃক বিশ্বের ৫টি সর্বোচ্চ প্রযুক্তির রোবটের মাঝে স্থান পায়। একই ধারাবাহিকতায় ইরানের automotive industry দশটি রোবট তৈরি করে। ২০১৫ সালে ইরানের বিজ্ঞানীরা নিজস্ব প্রযুক্তিতে রিমোট বা টেলি সার্জারির কাজে ব্যবহৃত রোবট উন্মোচন করেছেন।

ইবনে সিনা নামের এ রোবট দিয়ে রোগীর সংস্পর্শে  না এসেই একজন সার্জন সুনিপূণভাবে রোগীর দেহে অপারেশন করতে পারবেন। তেহরানের আমির কবীর প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৭ সালে একটি সুপার কম্পিউটার তৈরি করে যার প্রতি সেকেন্ডের কর্মক্ষমতা ৮৬০ বিলিয়ন, যদিও ইরান ২০০১ সালেই প্রথম সুপার কম্পিউটার তৈরি করে। পরবর্তীকালে ইরান তৈরি করেছে জঅঐণঅই-৩০০ যার সক্ষমতা 40 Gbit/s। ২০১১ সালে আমির কাবীর ও ইসফাহান বিশ্ববিদ্যালয় ২টি সুপার কম্পিউটার তৈরি করে যার প্রসেসিং ক্ষমতা প্রতি সেকেন্ডে ৩৪০০০ বিলিয়ন – যা বিশ্বের প্রথম সারির ৫০০টি কম্পিউটারের মাঝে রয়েছে।
মোটর গাড়ি শিল্প আধুনিক বিশ্বে অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম বড় মাধ্যম। অনেক বিশেষজ্ঞ এ শিল্পকে শিল্প-উন্নয়নের রেল ইঞ্জিন বলে অভিহিত করে থাকেন। মোটরগাড়ি শিল্প সচল হয়ে উঠলে অন্য অনেক শিল্পও রমরমা হয়ে ওঠে। কারণ, অটোমোবাইল বা মোটরগাড়ি শিল্পের ওপর অন্তত ৮০টি শিল্প নির্ভরশীল বা   সম্পর্কি ত । ১৯৯২ সালে ইরান জাতীয় মোটরগাড়ি নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় এবং সংযোজন শিল্পের গণ্ডি থেকে বের হয়ে গাড়ির মূল ইঞ্জিন ও সব ধরনের যন্ত্রাংশ নির্মাণ শুরু করে। এখন ইরানে নির্মিত গাড়ি ইউরোপ ও এশিয়ার নানা দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হচ্ছে।

বিদ্যুৎ ও  জ্বালানি খাত

একটি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিদ্যুৎ অপরিহার্য। শিল্প, কলকারখানা, কৃষিকাজ, মানব স¤পদ উন্নয়ন, আধুনিক জীবনযাত্রা, চিকিৎসা, যোগাযোগ, কম্পিউটার  প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে শুরু করে উন্নয়নের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই প্রয়োজন বিদ্যুৎ। একথায় বলতে গেলে বিদ্যুৎ সভ্যতা ও আধুনিকতার প্রধান নিয়ামক। দারিদ্র বিমোচন করে একটি দেশকে শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে বিদ্যুতের গুণগত মান ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এ কারণেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন ও পরিচালনা দক্ষতা বৃদ্ধিও উন্নত গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সবিশেষ গুরুত্ব দেয় এবং এরই মধ্যে এ খাতেও ব্যাপক সফলতা লাভ করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার দিক থেকে আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম ইরান। বর্তমানে ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন ৭৭ হাজার ৬৮ মেগাওয়াট। শীঘ্রই দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ৮০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৭৫ ভাগের বেশি হয় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। বাকি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ইরানে কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট, হাইড্রো-ইলেকট্রিক পাওয়ার প্লান্ট, জেনারেশন পাওয়ার প্লান্ট ও রিনিউয়েবল অ্যানার্জি পাওয়ার প্লান্ট থেকে। ইরানের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস ব্যাপক এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। ভূ-তাপ, সৌর ও বায়ু শক্তিসহ নানা নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তি রয়েছে ইরানের। পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে পর্যায়ক্রমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে দেশটি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির অন্যতম উল্লেখযোগ্য উৎস ফুয়েল সেল বা জ্বালানি কোষের প্রোটন বিনিময় ঝিল্লি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন একদল ইরানি বিজ্ঞানী। ইরান সরকার আশা করছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে ২০১৮ সালের মধ্যে সরকার আরো ৫০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হবে। উল্লেখ্য যে, দেশটি বর্তমানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ খাতে কেবল পুরোপুরি  স্বয়ংসম্পূর্ণতা  অর্জন করেছে তাই নয়, একই সাথে দেশটিতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এখন অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

জ্বালানি খাতে ইরানের সাফল্য ঈর্ষণীয়। জ্বালানি খাতে ইরান এখন সম্পূর্ণ স্বনির্ভর। ইরানে কয়েকটি পেট্রোকেমিক্যাল ও শোধনালয় উন্নয়ন প্রকল্প আছে। এসব প্রকল্পে উৎপাদিত পরিশোধিত পেট্রোল এখন বিদেশে রপ্তানি করছে। ইরান বিশ্বের প্রথম সারির চারটি দেশের মধ্যে রয়েছে যারা ঠ ৯৪.২ গ্যাস টারবাইন তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। গ্যাস রিফাইনারির সব পার্টসই ইরান নিজেই তৈরি করছে। তরল গ্যাস তৈরির (GTL) প্রযুক্তি অর্জনে ইরান প্রথম তিনটি দেশের মাঝে রয়েছে। ইরান দেশীয়ভাবে রিফাইনারি, তেল-ট্যাংকার, তেলকূপ খনন, Offshore platform এবং তেল উত্তোলনের ৭০ ভাগ সক্ষমতা অর্জন করেছে। গভীর পানিতে তেলকূপ খনন প্রযুক্তিতে ইরান বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশের মাঝে রয়েছে। ২০১৬ সালে দেশীয় প্রযুুক্তিতে ডিজাইনকৃত ইরানের Darkhovin Nuclear Power Plant চালু করা হয়।।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে সাফল্য

গত প্রায় চার দশকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইরানের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। বিপ্লবের আগে যে দেশটির অনেক শহরে ইরানি ডাক্তার খুঁজে পাওয়া দুরূহ ব্যাপার ছিল, সে ইরানের নাম এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায়। ২০১৬ সালে জানুয়ারিতে প্রকাশিত থমসন রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রথম সারির চিকিৎসা গবেষকদের মধ্যে অন্তত ৩৬ জন ইরানি গবেষক স্থান করে নিয়েছেন। বার্তা সংস্থা ইরনার এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরান বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ওষুধ উৎপাদনকারী দেশের একটি। দেশটি বর্তমানে জার্মানি ও ইতালিসহ বিশ্বের ৪৪টি দেশে চিকিৎসা সরঞ্জাম রপ্তানি করছে। বিশ্বে ওষুধ শিল্পের বৃহত্তম প্রযুক্তি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যাধুনিক ও জটিল। ইরানি বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত জরুরি এ ক্ষেত্রে দর্শনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন। ইরানি বিজ্ঞানীরা শক্তিশালী মৌলিক কোষ তৈরি করতে সক্ষম হওয়ায় ইরান এ ক্ষেত্রে বিশ্বের ৫টি দেশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। ক্যান্সার চিকিৎসায়ও ইরানি বিজ্ঞানীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন। তেহরানের কে এন তূসি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন একটি যৌগ আবিষ্কার করেছেন যার সাহায্যে মানবদেহে ক্যান্সার চিহ্নিত করা যাবে। এ আবিষ্কার ক্যান্সার চিকিৎসাকে বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশা করছেন ইরানের বিজ্ঞানীরা। ইরানের ইসলামিক আজাদ ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান ও গবেষণা শাখার গবেষকরা সমন্বিত থেরাপি পদ্ধতির মাধ্যমে ক্যান্সার মোকাবেলা করার নতুন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন ও হৃদরোগ চিকিৎসায় শীর্ষে অবস্থান করছে ইরান। ইরান বছরে প্রায় ১০০ হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার করে থাকে। পঞ্চম আন্তর্জাতিক ইরানি হার্ট ফেইলিউর সামিট থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। অঙ্গ প্রতিস্থাপন ও কিডনি প্রতিস্থাপনেও ইরানি চিকিৎসকদের দক্ষতা প্রশংসনীয় পর্যায়ের। ইরানে বর্তমানে ২৯টি কিডনি প্রতিস্থাপন কেন্দ্র, যকৃত প্রতিস্থাপনে ৭টি কেন্দ্র, ৮টি হৃদযন্ত্র ও ২টি ফুসফুস প্রতিস্থাপন কেন্দ্র চালু আছে। নিঃসন্তান দ¤পতিদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও ইরানি চিকিৎসকগণ বেশ সফলতা দেখিয়েছেন। স্বল্প খরচে বিশ্বের আধুনিক ইনফার্টিলিটি ট্রিটমেন্ট মেথড অনুসরণ করায় পারস্য উপসাগরের দেশগুলো থেকে অনেক নিঃসন্তান দ¤পত্তি ইরানে চিকিৎসা নিতে আসছেন। বর্তমানে এশিয়ার দেশগুলোর মাঝে মেডিক্যাল ট্যুরিজম ক্ষেত্রে কঠোর প্রতিযোগিতা চলছে। এই প্রতিযোগিতায় ইরানের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে রয়েছে।

শিল্প ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অগ্রগতি

সংস্কৃতি মানুষের জীবনবোধ বিনির্মাণের কলাকৌশল। এটি মানুষের জীবনের একটি শৈল্পিক প্রকাশ। ইসলাম সুস্থ ও মানবিক চিন্তার বিকাশের পথে সাংস্কৃতিক চর্চার বিরোধী তো নয়ই, বরং সংস্কৃতির উন্নত সংস্করণ উপহার দিতে সক্ষম- এটাই প্রমাণ করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। ইরানে বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে নওরোজসহ সকল স্থানীয় সংস্কৃতির পরিচ্ছন্ন ও জোরালো উদ্যাপন বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
মানুষের সুকৃতি আচরণকে বিকশিত করার জন্য ইরান সকল শিল্পমাধ্যমকেই ব্যবহার করছে। এর মধ্যে ইরানি চলচ্চিত্র অন্যতম। চলচ্চিত্র একটি সৃজনশীল গণমাধ্যম। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট দেশের জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। শিল্পকলার প্রভাবশালী মাধ্যম চলচ্চিত্র কেবল শক্তিশালী বিনোদন মাধ্যমই নয়, শিক্ষার অন্যতম সেরা উপকরণ হিসেবেও চলচ্চিত্রের ভূমিকা সুবিদিত। গণযোগাযোগ এবং সৃষ্টিশীল মানুষ ও আলোকিত সমাজ উপহার দেয়ার ক্ষেত্রেও এর রয়েছে জাদুকরি প্রভাব।
ইরানি চলচ্চিত্র আজ বিশে^ একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। পৃথিবীর সকল ফিল্ম ফেস্টিভালে দাপটের সাথে বিচরণকারী ইরানি চলচ্চিত্রকে অস্ট্রেলিয়ান ফিল্মমেকার মিশেল হেনেক ও জার্মান ফিল্মমেকার ওয়ার্নার হারজক ‘One of the world most important artist Cinema’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বাংলাদেশের সকল ফেস্টিভালে ইরানি চলচ্চিত্রের সাবলীল বিচরণ দেখা যায়। বাংলায় ডাবিংকৃত ইরানি চলচ্চিত্র বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়। ইরানি চলচ্চিত্রে সচরাচর ধর্মীয় কোন নির্দেশনা বা ডায়ালগ থাকে না। তবে উপন্যাস ও চরিত্রনির্ভর প্রতিটি ফিল্ম থেকে মানুষ কিছু না কিছু শিক্ষা গ্রহণ করে যা পৃথিবীর অনেক বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি বিশ্বকে দিতে পারে নি। শক্তিশালী চিত্রনাট্য, অসাধারণ ও অভূতপূর্ব অভিনয়, কলাকুশলির মনকাড়া আবেদন ছাড়াও বিশ্বমানের কারিগরি কৌশলের কারণে বিশ্বের সর্বত্র আজ ইরানি সিনেমা ব্যাপকভাবে দর্শক সমাদৃত হচ্ছে। সেইসাথে পুরস্কৃত হচ্ছে শীর্ষ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত ও সম্মানজনক পুরস্কার অস্কার থেকে শুরু করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার ঘরে তুলে নিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটি। গত বছরেই অস্কারের ৮৯তম আসরে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কার জিতে নেয় ইরানি ছবি ‘দ্য সেল্সম্যান’। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এবং প্রভাবশালী চলচ্চিত্র উৎসব কান চলচ্চিত্র উৎসবেও ইরানের সরব উপস্থিতি দেখা যায়। এই উৎসবের ৭০তম আসরে বিভিন্ন শাখায় ইরানি সিনেমা অ্যাওয়ার্ড জিতেছে। পঞ্চদশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তিন বিভাগে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পেয়েছে ইরান। বিশ^ব্যাপী আরো অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ইরানি সিনেমা বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।
শুধু চলচ্চিত্র নয়, পেইন্টিংস, কালিগ্রাফি, ফটোগ্রাফি, মিউজিক ইত্যাদি ক্ষেত্রকেও ইরানি বিপ্লব ধারণ করেছে এবং লালন করছে। মুসলিম বিশ্বে আর্ট ও পেইন্টিং-এর যে স্বতন্ত্র ধারা চালু হয়, এর অনেকটার কৃতিত্ব ইরান দাবি করতেই পারে।
মানুষের সুস্থ বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম খেলাধুলা। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি মানুষের সুস্থ বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে খেলাধুলাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি জনগণের ব্যাপক আগ্রহের কারণে খেলাধুলায় ইরানের খ্যাতি আজ বিশ্বজোড়া। ফুটবল থেকে শুরু করে খেলাধুলার প্রায় সকল ক্ষেত্রেই অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে চলেছেন ইরানি খেলোয়াড়রা। ২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের চূড়ান্ত আসরে সম্প্রতি এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে খেলা নিশ্চিত করেছে ইরান। আধুনিক ও বিশেষায়িত পার্র্ক ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যকীর্তি ইত্যাদির কারণে ইরান এখন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণস্থল। দেশটি এখন বিভিন্ন ফেস্টিভাল, সেমিনার, সি¤েপাজিয়াম, এক্সপো ও আন্তর্জাতিক কার্নিভালের কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানের প্রতিরক্ষা বা সমর শিল্প ছিল পুরোপুরি পাশ্চাত্যনির্ভর। ইসলামি বিপ্লবের প্রায় দেড় বছর পর পাশ্চাত্যের ইশারায় ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া দীর্ঘ ৮ বছরের যুদ্ধের সময় বিকশিত হয় ইরানের প্রতিরক্ষা বা সমর শিল্প। দেশটি এখন প্রচলিত সামরিক সাজ-সরঞ্জাম ও অস্ত্র-শস্ত্রে পুরোপুরি স্বনির্ভর, এমনকি অপ্রচলিত বা অত্যাধুনিক অনেক সমর-সম্ভারেও প্রায় স্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। ইরানের রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপক নৌযান ও রাডারসহ আরো অনেক অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সফ্ট প্রযুক্তির অধিকারী ইরান। ইরান বিমান প্রতিরক্ষা তথা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও রাডার সিস্টেম খাতেও ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। ইতোমধ্যে ইরান সুপারফাস্ট এন্টি সাবমেরিন তৈরি করেছে যা পানির তলদেশ দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ মিটার গতিতে চলে। লেজার টার্গেটিং প্রযুক্তিতে অস্ত্রের ক্ষেত্রে ইরান বিশ্বের পাঁচটি দেশের অন্যতম- যাদের চালকবিহীন বিমান (ড্রোন) নির্মাণ সক্ষমতা রয়েছে। ১৯৯২ সাল থেকেই ইরান নিজস্ব প্রযুক্তিতে ট্যাংক, মিসাইল, সাবমেরিন, ফাইটার প্লেন ও যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার্য সামরিক যান তৈরি করছে। ইরান হালকা এবং রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম দূরপাল্লার নতুন একটি ড্রোন তৈরি করেছে। ড্রোনটির সর্বোচ্চ ১০ হাজার ফুট উঁচু দিয়ে ওড়ার সক্ষমতা রয়েছে। এ ড্রোন রাডার ফাঁকি দিয়ে তিন হাজার কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে আঘাত হানতে সক্ষম বলে জানিয়েছেন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এক সিনিয়র কমান্ডার। ইরানের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র (আইএসআরসি) পার্সেলবাহী ড্রোন তৈরি করেছেন। ইরান রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম স্টিল্্থ ধরনের অত্যাধুনিক জঙ্গি বিমান ‘কাহের-৩১৩’ তৈরি করেছে। ইরানের প্রতিরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে পশ্চিমা শক্তির অনেকটা ধারণা রয়েছে। এ কারণেই বিগত ৩৯ বছরে শতবার হুমকি দিয়েও তারা ইরানকে আক্রমণ করতে সাহস করে নি।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি

ইরান বর্তমান বিশে^র একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়। তবে ইসলামি বিপ্লবের পর মার্কিন সহায়তা প্রত্যাহার করে নেয়া হলেও প্রজাতন্ত্রী সরকার এ কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। ইরানের ইসলামি সরকারের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। তাদের পারমাণবিক শক্তি সম্পর্কে স্লোগান হলো : ‘Nuclear energy for all, Nuclear weapon for none.’ ইরান শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে, ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য। ইরান পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএই এর সদস্য এবং এনপিটি বা পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ। আর এ হিসেবে তার পরিপূর্ণ অধিকার ও স্বাধীনতা আছে জ্বালানি তৈরি থেকে নিয়ে অন্য যে কোনো কাজে পারমাণবিক গবেষণা চালানো এবং প্রয়োজনীয় বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের। এই অধিকার ও স্বাধীনতার ভিত্তিতেই ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি কার্যকর করেছে। ইতোমধ্যে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ পরমাণু রশ্মি বা শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত জাতের বীজ উদ্ভাবন ও সংস্কারের মাধ্যমে কৃষি-উৎপাদন বৃদ্ধি; খাদ্য সামগ্রীর স্টেরিয়ালাইজেশন ও স্বাস্থ্যসম্মত করা; পশু টিকা তৈরি, সংকোচনযোগ্য পলিমারের পাইপ নির্মাণ; বিভিন্ন ধরনের লেজার রশ্মি ব্যবহার এবং হাত-পায়ের ছাপ নির্ণয়ের মতো প্রযুক্তি আয়ত্ত করেছে। এ ছাড়াও আলোক-রশ্মি বা তেজস্ক্রিয় রশ্মির মতো বিভিন্ন রশ্মির মাধ্যমে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি, দেশকে বাইরের সীমান্ত থেকে আসা পারমাণবিক রশ্মির নিঃসরণ বা হামলা থেকে রক্ষা ইত্যাদি কাজে পরমাণু শক্তিকে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে।
পরমাণু ক্ষেত্রে ইরানি বিজ্ঞানীদের একের পর এক নতুন সাফল্যে দিশাহারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের দোসর ইউরোপীয় শক্তিবর্গ দেশটির বিরুদ্ধে নানা ভিত্তিহীন প্রচারণা জোরদার করে এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রভাব খাটিয়ে তেহরানের ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বিশে^র স্বঘোষিত মোড়লদের বাড়াবাড়ি সত্ত্বেও ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে এক চুলও সরে আসে নি; বরং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখে এবং ২০ সালা পরিকল্পনায় ২০টির বেশি নতুন পরমাণু চুল্লি নির্মাণ এবং অন্তত ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট নেয়। ইরান ইতোমধ্যে পারমাণবিক গলনযন্ত্র নির্মাণে সফল হয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে ইরানকে নিবৃত করতে ব্যর্থ হয়ে পশ্চিমা মোড়লেরা শেষ পর্যন্ত তার সাথে একটি চুক্তিতে আসতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও জার্মানিকে নিয়ে গঠিত হয় ৫+১ গ্রুপ ২০১৫ সালে জেনেভায় ইরানের সাথে এক চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য হয়। এ চুক্তিকে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ চুক্তির ফলে একটি  বৈশ্বিক সংকটের সমাধান হয়। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের একটি বড় শক্তি হিসেবে ইরানের সাথে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর বিরোধ নি®পত্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সমস্ত সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। এ চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনায় আগামী ৮ বছর ইরানকে কিছু বিধি নিষেধ মেনে চলতে হবে সত্য, তবে এর ফলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর আরোপিত নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা ইতোমধ্যেই তুলে নেয়ায় এবং ইরানের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাঙ্কিং তৎপরতা ও পুঁজি বিনিয়োগসহ সকল রকম অর্থনৈতিক স¤পর্কের ওপর ইতঃপূর্বে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাসমূহ প্রত্যাহৃত হওয়ায় ইরানের অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে।

উপসংহার

ওপরের আলোচনায় দেখা যায় যে, বর্তমান বিশে^ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান স্বাধীনতা সুরক্ষা, সুসংবদ্ধ রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা গঠনে কেবল সফল নয়, ৩৯ বছরের পথপরিক্রমায় স্বনির্ভর অর্থনীতির বিকাশ, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং পরমাণু, মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসা, বায়োটেকনোলজি, ন্যানোটেকনোলজি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সকল শাখায় ঈর্ষণীয় উন্নতি ও সাফল্য অর্জন করেছে। শুধু তাই নয়, ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, বিশ্বমানবতা ও বিশ্ব-মুসলিমকে ঐক্যবদ্ধ করার অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব বর্তমান অর্জনের মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আজ বিশ^ দরবারে উন্নয়নের অনন্য মডেল রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
(প্রবন্ধটি গত ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইরানের ৩৯তম বিপ্লব বার্ষিকী উপলক্ষে
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে পঠিত হয়।)