শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে মহাকবি হাফিজের কবিতা সন্ধ্যা

পোস্ট হয়েছে: ডিসেম্বর ২২, ২০১৮ 

news-image

ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্যোগে শুক্রবার সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিলনায়তনে ইরানের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান শাবে ইয়ালদা’ (বছরের দীর্ঘতম রজনী) উপলক্ষে মহাকবি হাফিজের কবিতা সন্ধ্যা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুস সবুর খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকাস্থ ইরানি রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ রেযা নাফার ও বিশিষ্ট কবি আসাদ চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ রেযা নাফার বলেন, ইরানের যেসব বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক রয়েছেন হাফিজ শিরাজি তাদের অন্যতম। ফারসি ভাষাভাষী কোন কোন অঞ্চলের মানুষ ইরানের কোন কোন কবিকে তাদের অঞ্চলের কবি বলে দাবি করলেও আমি বলব ইরানের যেসব কবি সাহিত্যিকের নাম সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে তারা কেবল কোন অঞ্চলের বা কেবল পারস্যের কবি নন তারা বিশ্ব জাহানের কবি। হাফিজ ছিলেন তেমনি এক বিশ্ব কবি, মানবতার কবি। তিনি যেমন পবিত্র কুরআনের হাফেজ ছিলেন তেমনি কুরআনকে তিনি হৃদয়ে ধারণ করতেন। যেকারণে পবিত্র কুরআনের ভাষাকে কাব্যিকরূপে মানুষের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। তাই বলা হয়, পবিত্র কুরআন যেমন অবিনশ্বর, তার রচিত দিওয়ানে হাফিজও তেমনি অবিনশ্বর। আর হাফিজকে বলা হয় অমর কবি। তিনি ছিলেন একাধারে কাবি,সাহিত্যিক ও আরেফ। তার কাব্যগ্রন্থ ছিল আধ্যাত্মিকতায় পরিপূর্ণ। অতীতের অনেক খ্যতনামা কবি, সাহিত্যিক রাজা, বাদশাহদের প্রশংসা করে কাব্য-সাহিত্য রচনা করেছেন। কিন্তু হাফিজ সাধারণ মানুষের সুখ, দুঃখ নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন, তাদের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। হাফিজকে বাদ দিলে ইরানি সংস্কৃতির পরিচয়কেই অস্বীকার করা হবে।

অনুষ্ঠানে কবি আসাদ চৌধুরী বলেন, আমাদের সংস্কৃতির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পারস্যের দেশ ইরান। এদেশে ইসলাম এসেছে ইরানি সুফিদের থেকে। কয়েকশ’ বছর এ অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা ছিল ফারসি।বাংলা সাহিত্যে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। কারবালার ঘটনার পর ইরানের মহাকবি ফেরদৌসির শাহনামা আমাদেরকে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে। তাই আমাদের ইসলামকে সত্যিকারভাবে জানতে হলে আরবি,ফারসির বিকল্প নেই। তিনি ইসলামকে প্রেমের ধর্ম উল্লেখ করে বলেন, প্রেম ছাড়া খোদাকে চেনা যায় না। আজকে আমরা যাকে কেন্দ্র করে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছি তিনি ছিলেন প্রেমের কবি, সাধক কবি, আধ্যাত্মিকতার কবি।তার প্রেমের কবিতা যেন সুফিবাদের এক অমিয় বাণী।অনুষ্ঠানে তিনি কবি হাফিজের একটি কবিতা আবৃত্তি করেন।

অনুষ্ঠানে কবি হাসান হাফিজ বলেন, পারস্যের যেসব কবি, সাহিত্যিক বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন হাফিজ তাদের অন্যতম। কবি হাফিজের কাব্য সাহিত্যের আধ্যাত্মিক দর্শন বাংলা সাহিত্যেও বিরাজমান। আমাদের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য সাহিত্যে যে দুটি মতবাদ লক্ষ্য করা যায় তার একটি হলো বৈষ্ণবাদ আর অপরটি হলো সুফিবাদ। হাফিজের কাব্য সাহিত্য থেকেই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য কর্মে সুফিবাদের প্রভাব রয়েছে। তিনি দুই বার ইরান সফর করেছেন। ‘পারস্যে’ নামে রবী ঠাকুর একটি প্রবন্ধও লিখেছেন। অনুষ্ঠানে কবি হাসান হাফিজ ইরানের মহাকবি হাফিজের ওপর একটি স্বরচিত কবিতা পড়ে শোনান। 

অনুষ্ঠানে ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়্যেদ মাহদী হোসেইনি ফায়েক বলেন, পারস্যের কবি হাফিজ শিরাজি ছিলেন অমর কবি। দিওয়ানে হাফিজ’ ফারসি গ্রন্থগুলোর মধ্যে সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ যদি নাও হয়ে থাকে তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যেফারসি যেকোন গ্রন্থের চেয়ে দিওয়ানে হাফিজ’ সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।

এখনও প্রতিবছর কবি হাফিজের বিভিন্ন গ্রন্থের নতুন নতুন সংস্করণ বাজারে আসে এবং খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে তা বিক্রি হয়ে যায়। ইরানে এমন কোন শিক্ষিত পরিবার নেই যাদের ঘরে হাফিজের কাব্যগ্রন্থ নেই। হাফিজের কবিতায় শেখ সাদিওমর খইয়াম ও মৌলানা জালাল উদ্দিন রুমি-পারস্যের এই তিন মহাকবিরই সাহিত্যকর্মের স্বাদ পাওয়া যায়। তিনি ইরানের এই তিন মহাকবির সাহিত্যকর্মের নির্যাস থেকে নতুন এক সাহিত্য জগত তৈরি করেছেন।

তিনি আরও বলেনযে রাতটি উপলক্ষে আজকের এই কবিতা সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে সেটি হল বছরের দীর্ঘতম রাত। যে রাতটি কল্যাণময় রাত হিসাবে ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজার বছর আগে থেকে আনন্দ উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। কেননাএ রাতেই আলোর কাছে আঁধার পরাস্ত হয়েছে। এ রাত থেকেই মানবজাতির জন্য সুদিনের পালা বইতে শুরু করে বলেও মনে করা হয়। ইরানের অনেক কবি সাহিত্যিকের গ্রন্থেও এই রাতের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরও কবিতা আবৃত্তি করেন কবি শাহ নেওয়াজ তাবিব। অনুষ্ঠানে ফারসি শাবে ইয়ালদা’ অর্থাৎ (বছরের দীর্ঘতম রজনী) ও মহাকবি হাফিজের উপর কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়।