রবিবার, ১৯শে আগস্ট, ২০১৮ ইং, ৪ঠা ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

English

ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে সাদী দিবস উদযাপন ও ৬৮তম ফারসি ভাষা শিক্ষা কোর্সের উদ্বোধন

পোস্ট হয়েছে: মে ১৬, ২০১৮ 

বিশ্বখ্যাত ইরানি কবি শেখ সাদীর স্মরণে গত ২৩ এপ্রিল ২০১৮ রাজধানী ঢাকায় এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পরিচালিত ৬৮তম ফারসি ভাষা শিক্ষা কোর্সের উদ্বোধন ও ৬৭তম কোর্সের সনদপত্র ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. আবুল কালাম সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক হাসান হাফিজ বলেন, ইরানের বিখ্যাত কবি শেখ সাদী সম্পর্কে আমরা বাংলা ভাষাভাষীরা কমবেশি সবাই পরিচিত। বিশ্বসাহিত্যের অমর এই প্রতিভার চিরন্তন কাব্যদ্যুতি, শিল্পসুষমা, মরমী ও শাশ্বত আবেদনমনস্ক ও বোদ্ধা পাঠকের হৃদয় খুব সহজেই ছুঁয়ে যায়। আবিষ্ট ও আপ্লুত করে। তিনি বলেন, ফারসি সাহিত্যে প্রচলিত একটি প্রবাদ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। ওই প্রবাদে বলা হয়েছে ‘সাত জন কবির সাহিত্যকর্ম রেখে যদি বাকি সাহিত্য দুনিয়া থেকে মুছে ফেলা হয়, তবু ফারসি সাহিত্য টিকে থাকবে। এই সাত জন কবি হচ্ছেন মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী, ফেরদৌসী, হাফেজ, নিজামী, শেখ সাদী, রুদাকি এবং জামি।’
কবি হাসান হাফিজ বলেন, মহাকবি শেখ সাদীর অনন্য গ্রন্থ ‘গুলিস্তান’ লিখিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সাড়ে সাত শ’ বছর আগে। পদ্য ও গদ্যের সংমিশ্রণে লিখিত গ্রন্থ ‘গুলিস্তান’ এ বিধৃত সৌন্দর্যসুষমা, নৈতিকতা, অলঙ্কার উপমা আভরণ যেভাবে শৈল্পিক বিন্যাসে শোভিত ও আয়ুষ্মান, তা সত্যিই বিস্ময়কর।
মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি নিবেদিত অমর উজ্জ্বল পঙ্ক্তিমালার অনুরণন, শিহরণ বিশ্বমানবের প্রিয়তা ও ভালোবাসা অর্জন করেছে। শেখ সাদী তাঁর গুলিস্তান গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন :
বালাগাল উলা বিকামা’লিহি
কাশাফাদ দুজা বি’জামালিহি
হাসুনাত জামিয়ু খিসালিহি
সাল্লু আলাইহি ওয়া আ’লিহি।
শাশ্বত আবেদনঋদ্ধ এসব পঙ্ক্তিমালার বাংলা অনুবাদ বেশ কয়েকজন করেছেন। বলা হয়, এর যথার্থ ও সঠিক অনুবাদ করা সম্ভবপর হয় নি।
তিনি বলেন, ‘গুলিস্তান’ এর ভূমিকায় বিধৃত এই পঙ্ক্তিমালা শত শত বছর ধরে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় মাহফিলগুলোতে রাসূলে পাকের আশেকগণ ভক্তি ও শ্রদ্ধায় অবনত কণ্ঠে সমস্বরে পাঠ করে অনাবিল তৃপ্তি ও নির্মল আনন্দ পান।
কবি হাসান হাফিজ বলেন, মহাকবি শেখ সাদীর শ্রেষ্ঠ কীর্তি হচ্ছে ‘বুস্তান’ ও ‘গুলিস্তান’। ‘বুস্তান’ লেখা সম্পূর্ণ হয় ১২৫৭ খ্রিস্টাব্দে। আর ‘গুলিস্তান’ রচনাকাল হচ্ছে তার পরের বছর ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন তেহরান সফরে গিয়ে বলেছিলেন, জাতিসংঘ সদর দফতরের প্রবেশপথে রয়েছে জমকালো দৃষ্টিনন্দন একটি কার্পেট। আমার মনে হয় জাতিসংঘের যত কার্পেট আছে, তার মধ্যে এটিই হচ্ছে সবচেয়ে বড়। এটি জাতিসংঘের দেয়ালকে সুশোভিত করে রেখেছে। কার্পেটটি ইরানের জনগণের দেয়া প্রীতি ভালোবাসার উপহার। ওই কার্পেটের পাশেই উৎকীর্ণ রয়েছে ফারসি সাহিত্যের মহান কবি শেখ সাদীর চমৎকার নান্দনিক একটি কবিতার বর্ণোজ্জ্বল পঙ্ক্তিসমূহ –

All human beings are members of one frame,

Since all, at first from the same essence came.

When time afflicts a limb with pain

The other limbs at rest cannot remain.

If thou feel not for other’s misery

A human being is no name for thee.

তিনি আরো বলেন, শেখ সাদীর রচনা বাংলায় আরো বেশিমাত্রায় অনুবাদ হওয়া দরকার। মহান এই কবির জীবনদর্শনও সম্যকভাবে জানা প্রয়োজন। চিরন্তন এই সাহিত্যের রস আস্বাদনের সুযোগ আমাদের উপকৃত, আনন্দিত করবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশ্ব ক্ল্যাসিক রচনা সব কালে সব সময়েই মানবসমাজকে উদ্দীপিত, অনুপ্রাণিত, আলোকিত করে।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়্যেদ মূসা হোসেইনী বলেন, এমন এক মহান কবির স্মরণ অনুষ্ঠানে আজ আমরা উপস্থিত হয়েছি যাঁর নাম জানে না উপ-মহাদেশে এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। ফারসি সাহিত্যে যত কবি, সাহিত্যিক রয়েছেন তাঁদের মধ্যে সাদী উপমহাদেশের মানুষের কাছে অন্যতম জনপ্রিয় কবি। তাঁর বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম ‘গুলিস্তান’ রচনার সমাপ্তির দিনকে সাদী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। সাদী এমন একজন কবি যিনি গদ্যে ও পদ্যে সমান পারদর্শী ছিলেন। তাঁর রচিত গদ্যে-পদ্যে রয়েছে শব্দে শব্দে ঝঙ্কার, ভাবের তরঙ্গ, আনন্দের উচ্ছলতা, তত্ত্বের সমাহার। তাঁর কাব্যের বাচনভঙ্গি অপূর্ব, প্রাঞ্জল, গতিময়। আপনি যখন গদ্যের মাঝে শ্লোক, খণ্ড কবিতা প্রভৃতি পদ্যের সুন্দর সংযোজন দেখবেন, মনে হবে গদ্য-পদ্যের সকল সীমা চুরমার করে দিয়েছে ‘গুলিস্তান’। প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি শ্লোক মুখস্ত রাখার মতো। অফুরন্ত জ্ঞান, তত্ত্ব ও উপদেশ উপচে পড়ে ‘গুলিস্তান’ এর প্রতিটি বাক্য বিন্যাসে। তিনি অত্যন্ত মোহনীয়ভাবে কোরআন, হাদিসের শিক্ষা ও শব্দ সম্ভারের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন ফারসিতে। ফলে মহান আল্লাহর তাওহীদের বাণী ও শিক্ষা বুকে ধারণ করায় ফারসি হয়েছে অপরিবর্তনীয়, অক্ষয়। তিনি বলেন, ফারসি সাহিত্যের এই মহান কবি শেখ সাদীর চমৎকার নান্দনিক একটি কবিতার বর্ণোজ্জ্বল পঙ্ক্তিসমূহ শোভা পাচ্ছে জাতিসংঘের প্রধান ফটকে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. আবুল কালাম সরকার বলেন, যদি কেউ কোনো ভাষা ও সাহিত্যে সমৃদ্ধ হতে চায় তাহলে এর প্রতি যেমন আগ্রহ থাকতে হবে তেমনি সেই ভাষার কবি ও সাহিত্যকদের প্রতিও ভালোবাসা থাকতে হবে। কবি, সাহিত্যিকদের প্রতি ভালোবাসা আমি ইরানিদের কাছে দেখেছি। সম্প্রতি আমি ইরান সফরকালে নিশাপুরে ফারসি সাহিত্যের অন্যতম কবি ফরিদুদ্দিন আত্তারের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেদিন অনেক বৃষ্টি ছিল। কিন্তু বৃষ্টি উপেক্ষা করে শত শত মানুষ যেভাবে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিল তাতেই বুঝা যায় দেশটির মানুষ কবি সাহিত্যিকদের প্রতি কতটা ভক্ত! তিনি বলেন, আমি সাদী ফাউন্ডেশনে গিয়ে দেখেছি, ইরানিরা তাদের মাতৃভাষাকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য কতটা তৎপর। আর ঢাকার ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র যে এক্ষেত্রে অনেকটা সফল আজকের এই অনুষ্ঠানই তার প্রমাণ। এখানে যারা ফারসি ভাষা শিক্ষার কোর্স সম্পন্ন করেছেন তাঁদের দুই একজনের ফারসি কথা থেকেই প্রমাণিত হয় এখানে কত যতœসহকারে ফারসি শেখানো হয়। এখানকার ফারসি ভাষা শিক্ষা কোর্সের সফলতা থেকে অনেকেই অনুপ্রাণিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
অনুষ্ঠানে কবি শেখ সাদী রচিত একটি গান পরিবেশন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রভাষক মেহেদী হাসান। এছাড়া অনুষ্ঠানে ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্যোগে এবছর ইরানি নওরোয ও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে সনদপত্র প্রদান ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়।