শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইরান পরিচিতি : বন্দর আব্বাস

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ২৫, ২০১৬ 

-কামাল মাহমুদ
ইরানের বন্দর আব্বাস সুদীর্ঘকাল থেকে অনেকগুলো নামে সুপরিচিত ছিল। নদীবন্দর হবার সুবাদে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি এখানে এসেছে, ব্যবসা-বাণিজ্য করেছে, দখল করেছে, বিভিন্ন নামে ডেকেছে। পর্তুগীজরা বন্দর আব্বাসের নাম দিয়েছিল ‘ক্যামবারাত’ বা ‘পোর্ট কমোরাও’। ইংল্যান্ডের ব্যবসায়ীরা এর নাম দিয়েছিল ‘গোমবারান’, ডাচরা ডাকতো ‘গামরুন’ বা ‘গোমরুন’ বলে। এটি মূলত দক্ষিণ ইরানের একটি নদীবন্দর এবং হরমুজান প্রদেশের রাজধানী যা পারস্য উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত। এখানে রয়েছে ইরানী নৌবাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। এখানে ২৪টি জেটি রয়েছে। বন্দরের আয়তন ২৪৬৭৭০০ স্কয়ার মিটার। ২০১২ সালের হিসেব অনুসারে বন্দর আব্বাসের জনসংখ্যা ৫,৬৭,৫০৮ জন এবং পরিবার সংখ্যা ১,৫০,৪০৪টি। তেহরান থেকে বন্দর আব্বাসের দূরত্ব হলো ১৫০১ কিলোমিটার। আর হরমুজান প্রদেশের কেন্দ্র থেকে ৩২ কিলোমিটার।
ইতিহাস
প্রাচীনকাল থেকেই বন্দর আব্বাস নদীবন্দর হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করে। এর প্রাচীন নাম ছিল ‘গোমরুন’ যার অর্থ কাস্টম হাউস বা শুল্ক ভবন। গ্রীক নাম ছিল ‘কোমেরকীয়ান’ ও ল্যাটিন নাম ‘কোমারসিয়াম’Ñ ইংরেজিতে যার অর্থ দাঁড়ায় কমার্স (বাণিজ্য)।
প্রাক-ইসলামী যুগের ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, প্রথম দারিউশের সময়কালে (খ্রিস্টপূর্ব ৫২২ থেকে ৪৮৬ পর্যন্ত) দারিউশের কমান্ডার জাহাজে চড়ে প্রথম বন্দর আব্বাস থেকে যাত্রা করে লোহিত সাগর দিয়ে ভারত গমন করেন। আলেকজান্ডারের সময়কালে বন্দর আব্বাসের নামকরণ করা হয় ‘হরমিজাদ’। পর্তুগীজ আমলে ১৬ শতকে বন্দর আব্বাসের নামকরণ করা হয় ‘গামরুন’। ১৫৬৫ সালে ইউরোপীয় নাবিকরা এর নামকরণ করেন ‘বামদেশ গোমরুম’ যার অর্থ বন্দর গোমরুম বা শুল্ক ভবন পোর্ট- যা তুর্কি নাম থেকে উদ্ভূত।
১৫১৪ খ্রিস্টাব্দে বন্দর আব্বাস পর্তুগীজদের দখলে চলে যায় এবং পারস্য উপসাগর হয়ে ভারতের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ১৬১৪ সালে শাহ আব্বাস পর্তুগীজদের হাত থেকে দখল মুক্ত করেন। ইংল্যান্ডের নৌবাহিনীর সহায়তায় শাহ আব্বাস এ নদীবন্দর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেন। ১৬২২ সালে পর্তুগীজ ও ইংরেজি নাম একত্র করে নামকরণ করা হয় ‘কোমরু’ বা ‘কম্বো’। যদিও সেখানকার অধিবাসীরা বন্দর আব্বাস বলেই ডাকতো। স্যার থমাস হার বার্য বলেন, বন্দর আব্বাসের অফিসিয়াল ইংরেজি নাম ছিল ‘গোমবোরুন’Ñ যার উচ্চারণ করা হতো ‘গোমরুন’। তাঁর ভাষ্যমতে ১৬৩০ সালে কতিপয় অফিসিয়াল লিখতো ‘গামবৌ’ এবং অন্যরা লিখতো ‘গোমর’ আবার কেউ কেউ লিখতো ‘গামেরুন’। ১৬২২ সালে শাহ আব্বাস ব্রিটিশ ও পর্তুগীজদের পরাজিত করে সম্পূর্ণরূপে বন্দরকে নিজের করায়ত্ত করেন। এ বিজয়ের স্মারক স্বরূপ পোর্টের নামকরণ করেন ‘বন্দর আব্বাস’। বর্তমানে এটিকে ‘শহীদ রাযী পোর্ট’ নামেও অভিহিত করা হয়। যা বর্তমানে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর, নদীবন্দর ও বাণিজ্য কেন্দ্র। শুধু বন্দরের বিস্তৃতি ২৪০০ হেক্টর। এ বন্দরে প্রতিদিন প্রায় ৭০ মিলিয়ন টন মালামাল ওঠানামা করা হয়।
১৭৯৪ সাল থেকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত বন্দর আব্বাস একটি লীজ চুক্তির মাধ্যমে ওমান ও যানযীবর সালতানাতের অধীনস্থ হয়, যে চুক্তিটি ফারসি ও আরবি ভাষায় লেখা হয়েছে। ওমান সালতানাত ১০০ মাইল সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা (সাজীদ থেকে খামীর পর্যন্ত) এবং যানযীবর সালতানাত ৩০ মাইল সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত যার বিস্তৃতি ছিল সামীল পর্যন্ত। তারা হরমুজ প্রণালি ও কেসম আইল্যান্ডও নিয়ন্ত্রণ করতো।
১৮৫৪ সালে সুলতান যানযীবরের সময় ইরানীরা বন্দরকে পুনরুদ্ধার করে। কিন্তু ব্রিটিশ চাপের মুখে ১৮৫৬ সালে অ্যাংলো-পার্সিয়ান যুদ্ধের সময় পারসীয়ানরা আবার ওমানের সাথে লীজ নবায়ন করে; তবে অনেক সহজ শর্তে, যা পারস্যের জন্য লাভজনক ছিল। যেখানে একটি শর্ত ছিল যে, বন্দর আব্বাসে নিয়মিত পার্সিয়ান পতাকা উড্ডীন হবে এবং ভাড়ার হার পূর্বের তুলনায় অনেকগুণ বেশি হবে।
১৮৬৮ সালে ব্রিটিশদের চাপের মুখে পুনরায় পারস্য চুক্তি নবায়ন করে; তবে এবার ভাড়ার রেট ছিল খুব চড়া ও সময়কাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। চুক্তি নবায়নের দুই মাস অতিবাহিত হতে না হতেই পারস্য সরকার চুক্তি বাতিল করে এবং বন্দর ওমানীদের হাত থেকে দখলমুক্ত করে।
পরবর্তীকালে রেযা শাহ পাহলভী বন্দর আব্বাসের উন্নয়নে মনোযোগী হন এবং তাঁর সময়কালে পোর্টের অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেন। প্রতি বছর অনেক পর্যটক বন্দর আব্বাস পরিদর্শন করতে আসেন। বন্দর আব্বাসে শুধু আমদানি-রপ্তানির মালামাল ওঠানামা করে তাই নয়, এখানে একটি ফিশিং পোর্টও রয়েছে। ১৯৯০ সালের রিপোর্ট মতে ইরানের প্রায় ৭৫% পণ্য বন্দর আব্বাস পোর্ট হয়ে আসে। এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি ফিশিং ইন্ডাস্ট্রি শিপ ইয়ার্ড। সমুদ্র লেভেল থেকে ৩০ ফুট উচ্চতায় বন্দর আব্বাস অবস্থিত।
এখানে বিভিন্ন প্রকৃতির জাহাজ আসা-যাওয়া করে। যেমন : কার্গো শিপ, লাইটার, বাল্ক কেরিয়ার, কোস্টার, বার্জ, সিমেন্ট কেরিয়ার, কন্টেইনার শিপ, ড্রাই কার্গো, অয়েল কেরিয়ার, লাইভস্টক কেরিয়ার, রো-রো শিপ, ভেসেল কেরিয়ার, ফরেস্ট প্রোডাক্ট কেরিয়ার, ট্যাঙ্কার, কেমিক্যাল কেরিয়ার, লিকুইড গ্যাস কেরিয়ার, প্যাসেঞ্জার শিপ, মটর বোট, হাইড্রোগ্রাফিক শিপ, আইস ব্রেকার, পেট্রোল শিপ, হসপিটাল শিপ, ক্রুজার, এয়ারক্রাফ্্ট কেরিয়ার, ট্রেনিং শিপ, মেডিকেল ট্রান্সপোর্ট প্রভৃতি।
আবহাওয়া : বন্দর আব্বাসের আবহাওয়া সাধারণত উষ্ণ। গ্রীষ্ণকালে এখানকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ৪৯০ সেন্টিগ্রেড (১২০ ফারেনহাইট) আবার শীতকালে ৫০০ সেন্টিগ্রেড (৪১ ফারেনহাইট) এ নেমে আসে। বার্ষিক বৃষ্টির গড় ১৭০ মিলিমিটার এবং গড় আর্দ্রতা ৬৫%।
যাতায়াত : বন্দর আব্বাস মূলত পোর্টের কারণে বিখ্যাত হলেও এটি একটি শহরও বটে। এখানে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট যেখানে যাত্রীবাহী বিমানের পাশাপাশি অনেক কার্গো বিমানও ওঠানামা করে। বন্দর আব্বাস থেকে সিরজান পর্যন্ত ৩০০ কিলোমিটার, কেরমান পর্যন্ত ৪৮৪ কিলোমিটার, সিরাজ পর্যন্ত ৬৫০ কিলোমিটার এবং যাহেদান পর্যন্ত ৭২২ কিলোমিটার সড়কপথ রয়েছে। ১৯৯৩ সালে বন্দর আব্বাস থেকে ইয়ায্্দ, কোম, তেহরান ও কাজভীনসহ ইরানের বিভিন্ন এলাকার সাথে রেল যোগাযোগ শুরু হয়। নদী পথে যাতায়াতের জন্যও বন্দর আব্বাস ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
ভাষা : বন্দর আব্বাসের লোকেরা সাধারণত আঞ্চলিক ফারসি ‘বন্দরী’ ভাষায় কথা বলে। বন্দরী ভাষাতে ইউরোপীয়, আরবি, ফারসি ও বেলুচী শব্দের মিশ্রণ রয়েছে।
দর্শনীয় স্থান : এখানে দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে- মসজিদ, মাযার ও সিমেট্রি। বিখ্যাত আবাসিক হোটেলের মধ্যে রয়েছে হরমুজ হোটেল, এটিলার হোটেল, বন্দর আব্বাস হোমা হোটেল, পার্সিয়ান গাল্ফ হোটেল, দরিয়া হোটেল, হোটেল আমিন, হাফ্্ত রঙ প্রভৃতি।
রপ্তানি পণ্য : বন্দর আব্বাস থেকে যে সকল পণ্য রপ্তানি করা হয় তন্মধ্যে রয়েছে টেক্সটাইল, রিফাইন্ড অয়েল, অ্যালুমিনিয়াম, স্টীল, ক্রোমিয়াম, রেড অক্সাইড, লবন, সালফার, মাছ, মৃৎশিল্প, খেজুর, লেবু, তামাক প্রভৃতি। কেনাকাটার জন্য রয়েছে সিটি সেন্টার মল।
খেলাধুলা : বন্দর আব্বাসের খেলাধুলার মধ্যে ফুটবল সবচেয়ে জনপ্রিয়। জনপ্রিয় ফুটবল ক্লাবগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যালুমিনিয়াম হরমুজগান ও শহরদারী বন্দর আব্বাস।
শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান : বন্দর আব্বাসের বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সাইন্স, ইউনিভার্সিটি অব হরমুজগান, ইসলামিক আযাদ ইউনিভার্সিটি অব বন্দর আব্বাস প্রভৃতি।
বন্দর আব্বাসের রয়েছে সুদীর্ঘকালের ঐতিহ্য। নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী এই বন্দর আব্বাস। নানা হাত বদল হয়ে বন্দর আব্বাস আজ স্বমহিমায় অবস্থান করছে। ইরানের নদীপথের ঐতিহ্য অনেকখানি বন্দর আব্বাসকে ঘিরেই। ইরানের পণ্য আমদানি ও রপ্তানিতে বন্দর আব্বাস ব্যাপক ভূমিকা পালন করে আসছে সুদীর্ঘকাল থেকেই। ইরানী ও বহিঃবিশ্বের পর্যটকদের কাছে বন্দর আব্বাস একটি আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।