বুধবার, ২০শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইরানে হস্তশিল্প

পোস্ট হয়েছে: মে ২২, ২০১৩ 

news-image

বর্তমানে আমাদের গোটা জীবনটাই যেন অনেকটা যন্ত্রনির্ভর। যন্ত্র উদ্ভাবিত হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষকে তার পরিবেশের ওপর নির্ভরতার একটা সম্পর্ক রক্ষা করে চলতে হতো। তখন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং এই সম্পর্কের প্রতি মানুষের যথেষ্ট শ্রদ্ধা ছিল। মানুষের চোখে তখন প্রকৃতিকে মনে হয়েছে যেন একটা ক্যালিডাস্কোপ বা খেলনা দূরবিন-যার ভিতরে তাকালে সতত পরিবর্তনশীল সুন্দর সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়-যা বিস্ময়ের সৃষ্টি করলেও স্থায়ী হতে পারে না-মানুষের মনে একটা রেখাপাত করেই যার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়।

প্রকৃতির সুন্দর সুন্দর অস্থায়ী দৃশ্যগুলোকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখার প্রেরণা থেকেই সম্ভবত মানুষ এমন একটা সৃজনী শক্তিকে আয়ত্ত করেছে যাকে আমরা এখন ‘চারুকলা’ বলে অভিহিত করি। প্রাচীনকালের নিআন ডারটাল উপত্যকার মানুষ তাদের গুহার দেয়ালে দেয়ালে যেসব অতি সাধারণ চিত্র অঙ্কন করেছে সেগুলো থেকে শুরু করে দ্যা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’ সহ আজ পর্যন্ত যত শিল্পী যত চিত্র অঙ্কন করেছেন তাঁদের সকল সৃষ্টির পশ্চাতে একটা উদ্দেশ্যই কাজ করেছে। তা হচ্ছে কোনো দুর্লভ বস্তুকে অথবা মোহিনী মুহূর্তকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখা। এ ক্ষেত্রে রুচির পার্থক্য মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

মানুষের মননশীলতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে চারুকলার প্রতি তার আগ্রহ ক্রমশ সম্প্রসারিত ও এর মর্মোপলব্ধি গভীরতর হতে থাকে। এক পর্যায়ে এসে মানুষের মনে দর্শনের উপলব্ধিও বিকাশ লাভ করে এবং তা থেকেই ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে। তখন থেকেই মানুষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি তার উপলব্ধির মূল্যায়ন ও ব্যাখ্যা করতে শুরু করে। তাই দেখা যায় বিশ্বের এক অংশের শিল্পকলায় প্রকৃতির সহজাত সাদৃশ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এবং অপর অংশে প্রাকৃতিক দৃশ্যের সারল্যের মধ্যে নিহিত যে সৌন্দর্য তাকেই বড় করে দেখা হয়েছে। কালক্রমে মানুষ তার নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র, এমনকি, বাসন-কোসনেও চিত্রাঙ্কন শুরু করে। চিত্রশোভিত একটি ছুরি দিয়ে কোনো জিনিস কাটার সুবিধা হবে এবং চিত্রশোভিত না হলে সে সুবিধা নষ্ট হয়ে যাবে- এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। চামড়ার একটা বেল্টে নকশা থাকলে যেভাবে তা ব্যবহার করা যাবে, নকশা না থাকলেও তেমনি ব্যবহারে কোনো সমস্যাই দেখা দেবে না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ধরে রাখার জন্য মানুষের প্রয়োজন সেই সৌন্দর্যের প্রতি মুগ্ধ দৃষ্টি এবং সেই সঙ্গে তার সাংস্কৃতিক ও মানসিক পটভূমি- যা সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মূল্যায়নে তাকে প্রভাবিত করেছে এবং যার দ্বারা সৌন্দর্যের চিত্রায়নে তার কারিগরি কৌশল ও দক্ষতা প্রয়োগ করেছে, এর সবকিছু মিলে চিত্রকলার একটা স্বতন্ত্র শাখার সৃষ্টি হয়েছে যা ‘হস্তশিল্প’ নামে পরিচিত। বলা যেতে পারে, এসব হস্তশিল্পে শিল্পী হাত দিয়ে তাঁর প্রতিভা ও মননশীলতাকেই ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস পান।

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তির অধিকারী ও বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ মাত্রই প্রতিটি হস্তশিল্পের মধ্যে শিল্পীর ব্যক্তিসত্তার পর্যাপ্ত পরিচয় খুঁজে পাবেন। প্রকৃতপক্ষে, আজকাল হস্তশিল্প বলতে শিল্পকর্মের সেই শাখাটিকেই বুঝায় যার উৎপাদন প্রক্রিয়ার সর্বাংশ অথবা অংশবিশেষে মানুষের সংস্কৃতি, দর্শন এবং তার জাতিগত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শৈল্পিক রুচিবোধ বিধৃত থাকে। হস্তশিল্প যখন একটা জাতির অথবা জাতিগত গ্রুপের সহজাত প্রতিভার ধারক হিসেবে এবং তার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও রীতি-নীতির বাস্তব প্রতীক হিসেবে স্থায়িত্ব লাভ করে তখন তা শুধু উন্নয়নশীল জাতির ক্ষেত্রেই নয়, উন্নত জাতির ক্ষেত্রেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইরানে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে হস্তশিল্পজাত বাসন-কোসন ও অন্যান্য সামগ্রী এক বিরাট স্থান দখল করে রয়েছে। অতি প্রাচীনকাল থেকেই এটা চলে আসছে। ইরানের গ্রাম-গঞ্জে ও উপজাতি অঞ্চলে বহু হস্তশিল্পী ঐতিহ্যগতভাবেই সস্তা কাঁচামাল ও অতি সাধারণ যন্ত্রপাতির সাহায্যে বিচিত্র কারুকার্য খচিত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি প্রস্তুত করে আসছে প্রাচীনকাল থেকেই। ইরানে বিভিন্ন উপজাতির এক বিরাট অংশ এবং বহু গ্রামীণ মানুষ তাদের জাতিগত ঐতিহ্য ও রীতিনীতির ওপর এখনও সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। বহুবিধ অভাব-অভিযোগ, শহরের বিলাসী জীবনের হাতছানি এবং কৃষি ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রের সকল তৎপরতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য বিপ্লবপূর্ব সাবেক সরকারের সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত ইরানে প্রায় ১৫ লাখ লোক বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। ইরানের হস্তশিল্প উন্নয়নের বহু ক্ষেত্র রয়েছে এবং এর সম্ভাবনাও বিরাট। হস্তশিল্পে যে কাঁচামাল ব্যবহার করা হয় তার একটা বিরাট অংশ কৃষিজাত পণ্য থেকেই সংগৃহীত হয়, অথবা বলা যেতে পারে, গ্রামাঞ্চল থেকেই এর যাবতীয় কাঁচামাল সরবরাহ করা সম্ভব। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে হস্তশিল্পে যে কাঁচামাল ব্যবহার করা হয় তার মূল্য দাঁড়ায় গোটা শিল্প সামগ্রীটির বিক্রয় মূল্যের এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র। অপর দিকে হস্তশিল্পের বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ জনশক্তি ইরানে যথেষ্টই রয়েছে।

ইরানে হস্তশিল্পের পুনরুদ্ধার এবং এর বাজারজাতকরণ ইরানীদের এক বিরাট অংশের কর্মসংস্থানই শুধু করবে না, পাশ্চাত্যের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার অবসানেও বিরাট ভূমিকা পালন করবে। কারণ, ইরানের হস্তশিল্প দেশের অর্থনীতিকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। যে মওসুমে কৃষিক্ষেত্রে কৃষকদের কোনো কাজ থাকে না তাদের তখনকার অবসর মুহূর্তগুলোতেও হস্তশিল্প কর্মমুখর করে তুলতে পারে।

ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান একে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। ইরানের ইতিহাস এবং এর জাতিগত বৈশিষ্ট্য ইরানের হস্তশিল্পকে করেছে বৈচিত্র্যময় এবং সুশোভন। গত ৫০ বছরেও ইরানি হস্তশিল্পের এই রূপ কিছুমাত্র ক্ষুণ্ন হয়নি, এর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে সমুজ্জ্বল; বরং অনেক ক্ষেত্রে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তা উন্নীত ও পরিবর্তিত হয়েছে।

ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের পর ‘ইরানের হস্তশিল্প কেন্দ্র’ এবং ‘হস্তশিল্প কেন্দ্র স্টোর্‌স লি.’ নামক সংস্থা দুটিকে একত্র করে ‘ইরানের হস্তশিল্প সংস্থা’ নাম দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হস্তশিল্প কারখানাগুলোকে একটি মাত্র শিল্প ইউনিটে সমন্বিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৬৪ সালে ‘ইরানের হস্তশিল্প কেন্দ্র’ নামক সংস্থাটি গঠিত হয়েছিল। বর্তমানে গঠিত ‘ইরানের হস্তশিল্প সংস্থা’ একটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানি হিসেবে সরকারি নিয়মকানুন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে :

  • পল্লি এবং শহর এলাকার গুণগত মান ও সংখ্যা উভয় দিক থেকে হস্তশিল্পের উন্নয়ন এবং এর পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের জন্য যে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ অথবা সাহায্য-সহায়তা দান।
  • ইরানি হস্তশিল্পের উৎপাদন, ক্রয়, বাজারজাতকরণ ও রপ্তানিকরণ।
  • জনশক্তিকে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান এবং ইরানি হস্তশিল্পের মূল ডিজাইন, জাতিগত বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে উন্নত নির্মাণ কৌশলের ব্যাপক প্রয়োগে সহায়তা।
  • উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আর্থিক, কারিগরি ও ঋণ সহায়তা প্রদান এবং কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি সরবরাহের মাধ্যমে সমবায় প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করা এবং জোরদার করা।
  • হস্তশিল্প এবং সেই সঙ্গে দেশের সাধারণ অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহ করা, পরিসংখ্যান তৈরি করা ও গবেষণার ব্যবস্থা করা।

(নিউজলেটার, জানুয়ারি ১৯৮৬)