শুক্রবার, ২০শে জুন, ২০১৯ ইং, ৭ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইরানে সামাজিক নিরাপত্তা

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ২৫, ২০১৬ 

মোহাম্মদ রেজওয়ান হোসেন

ইতিহাসের বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৭৯ সালে ইরানে সংঘটিত হয় ইসলামী বিপ্লব। নবী-রাসূলদের ঐশী চিন্তা-ভাবনা ও খোদাপ্রদত্ত বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন করাই যার প্রধান উদ্দেশ্য।
মহানবী (সা.) ও পবিত্র আহলে বাইতের (আ.) অনুসারী আলেম ও জনতা বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রামের পর ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের মধ্য দিয়ে এমন এক উন্নত সমাজের ভিত্তি স্থাপনে সফল হয়েছেন যেখানে মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে, চলাফেরা করবে স্বচ্ছন্দে এবং সর্বক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা অনুভব করবে। সত্যিকারের ইসলামী সমাজব্যবস্থার অসংখ্য সুফলের মধ্যে এসব হচ্ছে অন্যতম।
পৃথিবীর সব দেশ ও সমাজেই কম-বেশি অন্যায় ও অপরাধ সংঘটিত হয়, রয়েছে সামাজিক নানা সংকট ও নিরাপত্তাহীনতা। বর্তমানে ইসলামী ইরানও এসব সমস্যা থেকে মুক্ত নয়। তবে সেই সমস্যার মাত্রা কোন্ সমাজে কতটুকু সেটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী বিপ্লবের পর পর্যবেক্ষকরা ইরানের ইসলামী সমাজব্যবস্থার সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশের সমাজব্যবস্থার, এমনকি পাশ্চাত্যের সমাজব্যবস্থার পার্থক্য খোঁজার চেষ্টা করছেন। চরম নৈরাজ্য, ধ্বংস ও অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হওয়া গোটা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোসহ হাজারো দুর্দশায় জর্জরিত অন্যান্য মুসলিম দেশের সঙ্গে ইরানের তুলনা করলে এ পার্থক্য ¯পষ্ট হয়ে উঠবে।
যে কোনো দেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধির বিষয়টি অনেকাংশই নির্ভর করে সেই দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ওপর। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর দেশটির সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তাই তো সারা বিশ্বের নজর আজ শান্ত ও স্থিতিশীল ইরানের দিকে, দেশটির সামাজিক নিরাপত্তার দিকে। যেখানে ইউরোপ ও আমেরিকার মতো উন্নত দেশের মানুষ সারাক্ষণ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, আত্মরক্ষার জন্য বাধ্য হয় অস্ত্র বহন করতে, বর্ণবৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য, সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, চরম নৈতিক অবক্ষয়, গভীর পারিবারিক সংকট, তালাক প্রভৃতি যেখানে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার সেখানে ইরানে বিরাজ করছে উল্টো চিত্র। এ প্রসঙ্গে ইরানের সামাজিক নিরাপত্তার কিছু দিক তুলে ধরলে বিষয়টি আরো ¯পষ্ট হয়ে উঠবে।
পার্ক : তেহরানের পার্কগুলোসহ গোটা ইরানের পার্কের দিকে তাকালে ইরানীদের পরিবেশ ও সৌন্দর্য-সচেতনতার ছাপ পাওয়া যায়। আর এ বাগবাগিচা ইরানী স্থাপত্যকলার অনিবার্য অনুষঙ্গ। ইরানে প্রাচীনকাল থেকেই বাগবাগিচা ও পার্কের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হতো, তবে বিশেষ করে ইসলামী বিপ্লবের পর পার্ক তৈরির দিকে আলাদা দৃষ্টি দেয়া হয়। জনবহুল রাজধানী তেহরানের কথাই ধরা যাক। তেহরানের যেখানেই একটু ফাঁকা জায়গা পড়ে আছে, সেখানেই তেহরান সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে গাছ লাগিয়ে ছায়াময় পরিবেশ গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সময়ের ব্যবধানে যুগের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিনোদন উপযোগী করে এখনকার পার্কগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে। পুরনো তেহরানে পার্কের ব্যবস্থা একটু কম। তবে আধুনিক তেহরান শহরের যে বিশাল এলাকা তাতে ঢাকার রমনা বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো কিংবা তার চেয়েও অনেক বড় পার্ক আছে শতাধিক। এছাড়া, মাঝারি ও ছোট আকারের পার্ক তো প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় রয়েছে। প্রতিটি পার্কে রয়েছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। শিশু-কিশোরদের জন্য যেমন খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকে, তেমনি বড়দের জন্যও থাকে নানা আয়োজন। অনেক পার্কে রয়েছে সাইকেল চালানোর ব্যবস্থা। সব পার্কেই রয়েছে নানা রকমের ব্যায়াম করার স্থায়ী যন্ত্রপাতি। এসব যন্ত্রপাতি নিরাপদেই থাকে; চুরি হওয়ার আশঙ্কা নেই। বন্ধের দিনগুলোতে তেহরানের লোকজনকে দেখা যাবে বিকাল হলেই গাড়িযোগে স্ত্রী-পরিজন ও সন্তানাদি নিয়ে পার্কে যেতে। তাদের রাতের খাবারের আয়োজন সঙ্গেই থাকে। বয়োবৃদ্ধদের জন্য পার্কগুলো খোশগল্প করার উত্তম স্থান।
যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, পার্কগুলোর অসাধারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রতিটি বড় কিংবা মাঝারি আকারের পার্কে পুলিশ বক্স রয়েছে। আর মহল্লার মধ্যে অবস্থিত ছোট পার্কগুলোতে সাধারণ পাহারাদারের ব্যবস্থা রয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ায়। সেখানে রয়েছে টয়লেট ও খাওয়ার পানির সুব্যবস্থা। কেউ এখানে অনাকাক্সিক্ষত কিছু করা বা কাউকে উত্যক্ত করার সাহস পায় না। এছাড়া, কোন কোন দেশে পার্ক হচ্ছে পথভ্রষ্ট ও উচ্ছন্নে যাওয়া যুবক-যুবতীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আড্ডার স্থল। কিন্তু ইরানে আমরা দেখতে পাই ঠিক তার উল্টো চিত্র।
সরকারি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি পার্কে আগমনকারী সাধারণ মানুষও বেশ সচেতন। অপ্রয়োজনে কেউ পার্কের ঘাস মাড়ায় না, গাছ থেকে কেউ ফুল ছেঁড়ে না। যেখানে সেখানে কেউ থুথু নিক্ষেপ করে না। কেউ যত্রতত্র ময়লা ফেলে না। এমনকি বাচ্চারাও জানে পার্কের ফুল ছিঁড়তে হয় না এবং ময়লা ডাস্টবিনে ফেলতে হয়। কয়লার আগুনে কাবাব বানাতে চাইলে তার জন্যও রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা যাতে আগুনের তাপে ঘাস নষ্ট না হয়। পার্কে রয়েছে ওজু ও নামাযের ব্যবস্থা।
তেহরানের পার্কগুলোতে নিরাপত্তার বিষয়টি আরো ¯পষ্ট হয়ে ওঠে ফারসি ১৩ ফারভারদিন (সিজদা বেদার) অর্থাৎ ‘ন্যাচারাল ডে’-তে। এদিনে তেহরানসহ অন্য সব এলাকার মানুষজন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাবা-মা, সন্তান, ভাই-বোনসহ সপরিবারে কিংবা কয়েকটি পরিবার মিলে দল বেধে সারা দিন পার্কে অবস্থান করে। এদিনে কেউ ঘরে থাকে না। এদিনে পার্কে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে। এতো মানুষের নিরাপত্তা বিধান সত্যিই বিস্ময়কর। এ নিরাপত্তা যে ইরানে ইসলামী বিপ্লবেরই সুফল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
রাস্তা-ঘাট : রাজধানী তেহরানসহ ইরানের ছোট-বড় সব শহরেই রাস্তা-ঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন; সাজানো গোছানো পরিপাটি। সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত পরিচ্ছন্ন কর্মীরা রাস্তার সব অলি গলি ঝাড়– দেয়, নর্দমা পরিষ্কার করে। ফলে দিনের বেলা ধুলাবালি তেমন চোখে পড়ে না। রাতের অন্ধকারেই প্রতিটি মহল্লায় ডাস্টবিনে রাখা শহরের বাসাবাড়ির আবর্জনা নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে আবর্জনা পরিষ্কার করার দৃশ্যও দেখতে হয় না। কোথাও কোনো গন্ধ থাকে না। ব্যস্ততম শহরেও ময়লা ও ধুলামুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে সবাই। এতে মানুষের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষও শহরের রাস্তা-ঘাট, ফুটপাত নোংরা করে না। ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য রাস্তার পাশে, পার্কে কিংবা দোকানের সামনে সব জায়গায় ছোট ছোট ডাস্টবিন রাখা আছে।
দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, রাস্তা-ঘাটের নিরাপত্তা। কেউ যদি রাস্তা অতিক্রম করতে চায় তাহলে সাথে সাথে গাড়ি থেমে যায়। রাস্তার নীতিই হচ্ছে রাস্তা গাড়ির জন্য নয়, মানুষের পথ চলার জন্য। তাছাড়া, আইন কড়াকড়ি হওয়ায় ও তা বাস্তবায়িত হওয়ায় গাড়ি চালকরা সর্বোচ্চ সতর্ক থাকেন। ইরানে যিনি চালক তিনিই গাড়ির মালিক। পথিকের মৃত্যু হলে চালককে অনেক বছরের জেল প্রদান করা হয় কিংবা প্রচুর পরিমাণ অর্থ জরিমানা করা হয়। গাড়ির চালক পালিয়েও যেতে পারে না। কারণ, সব জায়গায় সিসি ক্যামেরা বসানো রয়েছে। গাড়ির নম্বর দেখে কয়েক মিনিটের মধ্যে চালককে ঠিকই ধরে ফেলবে পুলিশ। কিন্তু তারপরও দুর্ঘটনা ঘটে না, এটা বলা যাবে না, তবে সেটা অহরহ নয়। এছাড়া, রাস্তার বিভিন্ন স্থানে এমন সব ক্যামেরা পাতা থাকে যার ফলে নির্ধারিত গতির সীমা ছাড়িয়ে জোরে গাড়ি চালালেই নম্বর প্লেটসহ গাড়ির পেছন থেকে অটোমেটিক ছবি তুলে রাখা হয় এবং মাস শেষে দ্রুত গাড়ি চালানোর অপরাধে জরিমানার একটি বিল গাড়ির চালক বা মালিকের হাতে পৌঁছে দেয়া হয়।
তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে, যারা গাড়ি চালানোর জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে চায় তাদের অবস্থা অনেকটা সমুদ্র পাড়ি দেয়ার মতো। তেহরানে অসংখ্য গাড়ি চালনা প্রশিক্ষণ সেন্টার রয়েছে। কিন্তু সরকারের যে বিভাগটি লাইসেন্স দেবে সেখানে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়। থিওরি কিংবা প্র্যাকটিক্যালে সামান্য ভুল হলে ফের প্রশিক্ষণ সেন্টারে পাঠানো হয়। ফলে সাধারণ মানুষ রাস্তা-ঘাটে অনেক বেশি নিরাপত্তা অনুভব করে।
চতুর্থ বিষয়টি হচ্ছে, নিরাপদ ফুটপাত। তেহরানে রাস্তার ফুটপাতে অবৈধভাবে পণ্য সাজিয়ে বিক্রি বা ব্যবসা করা নিষিদ্ধ। ফুটপাতে কেনাবেচা নিষিদ্ধ হলেও তুলনামূলক কম দামের জিনিস বেচাকেনার সুবিধার্থে তেহরানের বিভিন্ন স্থানে সপ্তাহে একদিন খোলা মাঠে মিনি বাজারের আয়োজন করা হয়। সেই বাজারে কমদামে পোশাকসহ গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত নানা ধরনের পণ্য সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। এভাবে ফুটপাতে কাউকে বসার অনুমতি না দিয়ে এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে যাতে কম আয়ের মানুষজন স্বল্প মূল্যে পণ্য কিনতে পারে অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও স্বার্থ রক্ষা হয়। ফলে মানুষ চলাচলের জন্য ফুটপাত থাকছে নিরাপদ। যেখানে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপের কোনো কোনো দেশে ফুটপাতে ব্যবসা চলে সেখানে ইরানে ফুটপাতের চেহারা অনেকটাই ভিন্ন। বিশেষ করে ইরানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাজার করে মহিলারা। ফলে অনায়াসে তাঁরা ফুটপাতে হাঁটাচলা করতে পারছেন এবং বাজার এলাকায় মহিলাদের বিব্রত হতে হয় না। এ ছাড়া, কর্মজীবী মানুষও দ্রুত পায়ে হেঁটে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারছেন। এখানে পুলিশকে ম্যানেজ করে ফুটপাত দখলের কোনো সুযোগ নেই। এভাবে তেহরানের রাস্তা-ঘাটকে সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য নির্ঝঞ্ঝাট ও নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পরিচয়পত্র : প্রত্যেক ইরানী নাগরিকের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে পরিচয়পত্র নেয়া বাধ্যতামূলক। পরিচয়পত্রের সঙ্গে নাগরিকত্ব, শিক্ষা, চিকিৎসা, ভ্রমণ, হোটেল ও বাড়ি ভাড়া নেয়া, চাকরি, নাগরিক সব সুযোগ-সুবিধা জড়িত। ওই ব্যক্তির রক্তের গ্রুপসহ যাবতীয় পরিচয় ও ইতিহাস ক¤িপউটারে এন্ট্রি করা থাকে। পরিচয়পত্রের নম্বর থাকে। নম্বর দিয়ে ক¤িপউটারে সার্চ দিলে সঙ্গে সঙ্গে তার যাবতীয় পরিচয় উদ্ঘাটন করা সম্ভব। এ কারণে ইরানে কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ করে তাহলে তার পরিচয় উদ্ঘাটন করা কঠিন কোনো কাজ নয়। অপরাধীকে ধরা পড়তেই হবে। এত সব নিয়মের বেড়াজালে থাকার কারণে মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা অনেকটাই কম।
সামাজিক নিরাপত্তা : সামাজিক নিরাপত্তা নিয়েই মূল কথাটা বলতে চাই। আসলে রাজধানী তেহরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখে অবাকই হতে হয়। এখানে নেই কোন মারামারি, নেই চুরি-ছিনতাই, নেই গোলাগুলি-অস্ত্রবাজি। প্রতিদিনের পত্রিকায় কিংবা টেলিভিশনের খবরে খুন-হত্যাকাণ্ডের খবর ‘মাস্ট আইটেম’ হিসেবে থাকে না যা অনেক উন্নত দেশেও কল্পনা করা যায় না। এখানে মানুষ অনেক বেশি নিরাপদে পথ চলে। সেই নিরাপত্তা দিনে-রাতে একই রকম। রাতের আঁধার নামার সঙ্গে সঙ্গে এখানে ভয় নেমে আসে না। নিশ্চিন্তে পথ চলা যায় একাকী। ভাবতেও হয় না- ‘কেউ জানতে চাইবে কাছে কী আছে!’
বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে- এই নিরাপত্তা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য সমান। একজন নারী কিংবা তরুণী যদি একাকী রাতের বেলায় পথে হেঁটে যায় তাকেও আলাদা করে ভাবতে হয় না নিরাপত্তার কথা। পথ চলতে গেলে ডাকাত-ছিনতাইকারীর সামনে পড়ার ভয় নেই। রাস্তায় নেই কোন উটকো মাস্তানি। কেউ পথ আগলে দাঁড়াবে না, কেউ অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করবে না বা শিস দেবে না। এ এক অন্যরকম সমাজ; সামাজিক নিরাপত্তাই যার বড় বৈশিষ্ট্য। সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আসলে ইরানকে নিয়ে গেছে অন্যরকম উচ্চতায়।
যেখানে আমেরিকা, ব্রিটেন কিংবা কানাডার মতো উন্নত ও ধনী দেশে সামান্য সময় বিদ্যুতের অনুপস্থিতিতে খুন, ডাকাতি, রাহাজানি, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয় অবলীলায়; সেখানে ইরানে এগুলো কল্পনাই করা যায় না। বিশ্বের বহু দেশ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে যখন হিমশিম খাচ্ছে তখন ইরানে এমন ধরনের নিরাপত্তা একেবারেই স্বাভাবিক ব্যাপার। এ নিরাপত্তার কারণ হলো দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ধর্মীয় চেতনা এবং সর্বোপরি জনগণের কল্যাণকামী ইসলামী বিপ্লবী সরকার ব্যবস্থা। তবে সামাজিক অপরাধের ঘটনা যে একেবারেই ঘটে না তা কিন্তু নয়। তবে এসব যতটুকু ঘটে তা পাশ্চাত্য কিংবা তৃতীয় বিশ্বের অন্য দেশের তুলনায় এতটাই সামান্য যে, তা হিসাবেই ধরা হয় না।
নারীর সামাজিক অবস্থান : ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে নারীর অধিকার ও তাদের সামাজিক মর্যাদা কিংবা তাদের নিরাপত্তা কেমন? এ প্রশ্ন প্রতিটি সচেতন মানুষের বিশেষ করে নারী সাংবাদিক ও নারী-অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সবার। ইরানের সংবিধানের ৩য় পরিচ্ছেদের ১৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘জাতি-বর্ণ-নির্বিশেষে সকল ইরানী নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। বর্ণ, গোত্র, ভাষা এবং নারী-পুরুষ ভেদে কাউকে পার্থক্য করা হবে না।’
২০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিকই রাষ্ট্রীয় আইনের দ্বারা সমানভাবে সুরক্ষিত এবং ইসলামী মাপকাঠিতে সকল প্রকার মানবিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকার ভোগ করে থাকে।’
২১ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘ইসলামী আদর্শের মাপকাঠিতে নারীদের অধিকার-এর নিশ্চয়তা বিধানের দায়িত্ব রয়েছে সরকারের।’
ইরানে নারীর অধিকার ও তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলার আগে প্রথমেই যে কথাটি বলা দরকার তা হচ্ছে, এ ইস্যুতে পশ্চিমা সরকার ও গণমাধ্যমগুলো অপপ্রচার চালায়। পশ্চিমা গণমাধ্যমের খবর দেখলে মনে হবে ইরানে নারীর অধিকার বলতে কিছু নেই; তারা ঘরের ভেতরে বন্দি, কর্মক্ষেত্রে তারা যৌন হেনস্থার শিকার ইত্যাদি। কোথাও বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ঘটলেও সেটাকে তিল থেকে তাল বানিয়ে প্রচার চালায় পাশ্চাত্য মিডিয়াগুলো। কিন্তু বাস্তবতা স¤পূর্ণ ভিন্ন। আবার ইরানে নারীঘটিত ব্যাপার নিয়েও মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা চালানো হয় ইরানে নারীরা নির্যাতিত, অধিকারবঞ্চিত এবং তারা সুবিচার পায় না। উদাহরণস্বরূপ, কিছুদিন আগে ইরানে রেহানা জাব্বারি নামে এক মহিলার মৃত্যুদণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পাশ্চাত্য মিডিয়ার অপপ্রচারের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ওই অপপ্রচারের ঢেউ বাংলাদেশের মিডিয়াতেও আছড়ে পড়ে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা হলো বিদেশি খবরের ব্যাপারে যাচাই-বাছাই করার তেমন সুযোগ নেই। সে কারণে পশ্চিমা গণমাধ্যম বিশেষ করে এএফপি, রয়টার্স, এপি, ভোয়া বা বিবিসি যা প্রচার করে তা-ই অনুসরণ করতে হয়।
পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোতে বলা হচ্ছে রেহানাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। আরো বলা হচ্ছে, ধর্ষণ থেকে আত্মরক্ষা করতে গিয়ে মহিলাটি ওই লোকটিকে খুন করেছেন। অর্থাৎ নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে, ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে খুনের ঘটনাটি ঘটেছে। তারপরও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে! তার মানে হচ্ছে নারীর এই প্রতিরোধকে স্বীকার করা হলো না। নারীর অধিকারকে স্বীকার করা হলো না। কেউ কেউ বলছেন, এই বিচারের মাধ্যমে ধর্ষণকে উৎসাহ দেয়া হলো। অথচ প্রকৃত বিষয় হলো, রেহানা ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে খুন করেন নি। ঘটনাটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ইরানের বিচার বিভাগ নারীবিদ্বেষী নয় যে, অন্যায়ভাবে একজন নারীকে ফাঁসি দেবে। হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল। ওই মহিলা তার দোষও স্বীকার করেছেন আদালতে। রেহানা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণেও ব্যর্থ হয়েছেন।
ঘটনাটি হচ্ছে দু’জনের অবৈধ স¤পর্কের জের ধরে এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে টানাপড়েন সৃষ্টি হয় এবং এই খুনের ঘটনা ঘটে। সে ক্ষেত্রে পুরুষ লোকটি যে ভালো মানুষ ছিলেন তা বলার সুযোগ নেই। টানাপড়েনের একটি পর্যায়ে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। যার কারণে রেহানা লোকটিকে খুনের সিদ্ধান্ত নেন। এ ছাড়া, এই মহিলার সঙ্গে ইরানের আদালতের এমন কোনো ঘটনা ঘটে নি যে, তাকে ফাঁসি দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় দিয়ে দেবে। অথবা এই মহিলা ইরানের জন্য কোনো হুমকি ছিলেন সে কারণে তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হলো। বরং যদি এমন হতো যে, খুনের ঘটনা সংঘটিত হয় নি; বরং অবৈধ স¤পর্ক বা ধর্ষণের ঘটনার বিচার হচ্ছে, তাহলে ওই পুরুষ লোকটাও মৃত্যুদণ্ডের মুখে পড়ত এবং এ ক্ষেত্রেও ইরানের আইন অনুসরণ করা হতো। দেখা হতো না যে, কে পুরুষ আর কে নারী। যেমনটি দেখা হয় নি রেহানার ক্ষেত্রে। বাস্তবতা হচ্ছে, এটা নিতান্তই পশ্চিমা গণমাধ্যম ও কথিত মানবাধিকার কর্মীদের প্রচারণা। বরং মুখ্য হচ্ছে আইন এবং তার বাস্তব প্রয়োগ। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর বহু খুনের ঘটনার বিচার হয়েছে এবং দোষীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে; সেখানে নারী-পুরুষ কখনো বিবেচ্য বিষয় হয়ে ওঠে নি; বিচার হয়েছে অপরাধের। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। ইরানে নারীরা প্রায় সব ধরনের কাজই করতে পারেন এবং করে থাকেন। ইরানের বর্তমান সরকারের ১০ জন ভাইস প্রেসিডেন্ট রয়েছেন, তার মধ্যে চারজন হচ্ছেন নারী। চারজন ভাইস প্রেসিডেন্ট সবাই আবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। শুধু ভাইস প্রেসিডেন্ট নয়, ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি ক্ষমতায় আসার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মারজিয়ে আফখাম। তিনি একজন নারী। সম্প্রতি মারজিয়ে আফখামকে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এসব রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছাড়াও ইরানের যে কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সংস্থায় গেলে দেখা যাবে নারীর ব্যাপক উপস্থিতি। তেহরানের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, বীমা, রেডিও-টেলিভিশন সব জায়গাতেই নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ রয়েছে। হাসপাতালগুলোতে গেলে দেখা যাবে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যাই বেশি। সহজ কথায় বলা যায়, সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ থেকে শুরু করে এমন কোনো বিভাগ নেই যে বিভাগে নারীর উপস্থিতি নেই। তেহরান শহরে ট্যাক্সি সার্ভিসের কথাই বলি। তেহরান ট্যাক্সি সার্ভিসে চালক হিসেবেও বহু নারী কাজ করে থাকেন। আর ব্যক্তিগত গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে ইরানী নারীদের রয়েছে অবাধ স্বাধীনতা। তেহরানে বড় বিআরটি বাসের চালক একজন নারী হওয়ায় সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। যে কোনো নারীই পারেন প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে গাড়ি চালাতে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কোনো বাধা নেই। অথচ বহু আরব দেশে নারীর গাড়ি চালানোর কোনো স্বাধীনতা নেই।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, তেহরানে যেসব বাস চলাচল করে সেগুলোর মাঝখানে পার্টিশন দেয়া থাকে। সম্মুখভাগে মহিলাদের বসার জায়গা আর পেছনের অংশটা পুরুষদের জন্য। ফলে প্রচণ্ড ভীড়ের মধ্যেও কাউকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় না। মেট্রো রেলেও মহিলাদের জন্য আলাদা বগি রয়েছে। তাই বাসে বা অন্য পরিবহনে চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের নারীরা অত্যন্ত নিরাপদে থাকেন এবং তাঁদেরকে ভোগান্তির শিকার হতে হয় না।
রাস্তা কিংবা বাসে নিরাপত্তার বিষয়টি ছাড়াও তেহরানে যত ধরনের সেবামূলক প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার বেশির ভাগ জনশক্তি হচ্ছে নারী। তেহরান শহরের টেলিফোন অফিসগুলোতে কিংবা মেট্রো স্টেশনগুলোতে দেখা যাবে নারী জনশক্তিই বেশি। একই চিত্র দেখা যাবে খাবার রেস্টুরেন্ট কিংবা বড় মার্কেটগুলোতে। আর এসবই সম্ভব হয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার কারণে।
বাসাবাড়িতেও নারীর পদচারণা একই রকম; পরিবারগুলোতে নারীর প্রভাব অনেক বেশি। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কারণেই শরীরচর্চা ও ক্রীড়াঙ্গনেও ইরানী মেয়েদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তবে তেহরান তথা ইরানের নারীদের যে কাজটি অবশ্যই করতে হয় তা হচ্ছে হিজাব পরা। এটি বাধ্যতামূলক; কোনো নারী চাইলেই হিজাববিহীন চলাফেলা করতে পারেন না।
কারণ, ইসলামী বিপ্লবের পর ইরান ইসলামী আইন অনুসারে পরিচালিত হচ্ছে। সে কারণে ইরানে নারীর জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সম্ভবত এ হিজাবব্যবস্থাকে পুঁজি করেই পশ্চিমা দেশগুলো ইরানে নারীর স্বাধীনতা নেই, নারীর মর্যাদা নেই, নারীর সামাজিক নিরাপত্তা নেই বলে নানা নেতিবাচক প্রচারণা চালায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, হিজাব বাধ্যতামূলক করার কারণে ইরানে নারীর মর্যাদা বেড়েছে বৈ কমে নি। এ প্রসঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীর একটি বক্তব্য উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছেন, ‘ইসলামী বিপ্লবের আগে নারী স্বাধীনতার নামে নারীদের শুধু পোশাকহীন করে প্রদর্শনের সামগ্রী বানানোর সংস্কৃতি ছিল। কিন্তু ইসলামী বিপ্লব নারীকে কার্যকর অর্থেই সম্মানের স্থানে উন্নীত করে যাচ্ছে এবং বেড়েছে তাদের সামাজিক নিরাপত্তা।’
মাদক : বিশ্বের অন্য দেশের মতো মাদক ইরানের যুবসমাজের জন্যও বিরাট হুমকি। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা ইরানেও তৎপর। বিশেষ করে নির্জন পাহাড়ী এলাকায়। তবে সরকারও মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে গোপন ক্যামেরা বসিয়ে কিংবা গোয়েন্দা বাহিনী দিয়ে অপরাধীদের ধরা হয়। মাদকের ভয়াবহ থাবা থেকে সবাইকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সীমান্তে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীকে মাশুল দিতে হচ্ছে। ইরানে মাদকসহ ধরা পড়লে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এসংক্রান্ত বিচারে অপরাধীদের জেল-জরিমানা হচ্ছে, ফাঁসিও হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার জন্য সরকার নানাভাবে গণসচেতনতামূলক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। মাদক সমস্যা থাকলেও সরকারের কড়া নীতির কারণে ইরানের যুবসমাজ অন্তত এদিক থেকে অনেকটাই নিরাপদে রয়েছে যা খুব কম দেশেই দেখা যায়। এছাড়া, যারা ইরানে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে সরকারি উদ্যোগে তাদের জন্য রয়েছে আলাদা চিকিৎসাব্যবস্থা। চিকিৎসাশেষে অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে।
এছাড়া, আফগানিস্তান থেকে মাদক উৎপাদিত হয়ে বিভিন্ন রুটে তা পাচার হচ্ছে। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে ইরানকে ব্যবহারের চেষ্টা করে মাদক ব্যবসায়ীরা। ইরান থেকে সেই মাদক মধ্য-এশিয়া ও ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মাদকের বিরুদ্ধে ইরান সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে একদিকে যেমন ইরানের যুবসমাজ রক্ষা পাচ্ছে অন্যদিকে মধ্য-এশিয়া ও ইউরোপীয় সরকারগুলোও সর্বনাশা মাদকের ছোবল থেকে নিজ দেশের জনগণকে অনেকাংশে রক্ষা করতে পেরেছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলো ইরানের কাছে ঋণী।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন : বিজাতীয়দের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনও সামাজিক সমস্যার অন্যতম মারাত্মক ও বিপজ্জনক দিক। শত্রুরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালিয়ে ভেতর থেকে ইরানের ইসলামী সমাজব্যবস্থা ও মানুষের চিন্তাচেতনাকে ধ্বংসের চক্রান্ত করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। আধুনিকতার নামে মানুষকে ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে বস্তুবাদের দিকে ধাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে তারা ফারসি ভাষায় অসংখ্য রেডিও ও টিভি অনুষ্ঠান চালু করেছে। ইরানের জনগণকে বিভ্রান্ত করতে এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাতে শত্রুরা চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে ইরানের নীতিনির্ধারকগণ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবেলা করার জন্য বহু পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইরান অনেকটাই সফলতার পরিচয় দিয়েছে যেখানে অন্য মুসলিম দেশগুলো বহুগুণে পিছিয়ে রয়েছে।
অভিযোগ কেন্দ্র ‘১১০’ : এটি হচ্ছে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোর জন্য পুলিশ দপ্তরের বিশেষ নম্বর। তেহরানে যেকোনো ব্যক্তি যদি বিপদ অনুভব করে, কিংবা কারো দ্বারা কোনো লাঞ্ছনা বা হুমকির সম্মুখীন হয়, যদি ঝগড়া-বিবাদ লাগে অথবা প্রতিবেশীর কোনো অন্যায় আচরণের সম্মুখীন হয়, জোরজবরদস্তি কিংবা অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে, এলাকায় কেউ উৎপাত করলে, এমনকি যদি ফোনে কেউ বিরক্ত করে তাহলে যে কেউ ‘১১০’ নম্বরে ফোন করে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে পারে। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ডিউটিরত স্থানীয় পুলিশকে অবহিত করার পর তৎক্ষণাৎ পুলিশ গিয়ে হাজির হয় অভিযোগকারী ব্যক্তির কাছে। পুলিশ তখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। অর্থাৎ এখানে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেয় না। আদালতে গিয়ে মানুষ বিচার পাচ্ছে, অপরাধী তার সাজা পাচ্ছে।
ইসলামী সরকারব্যবস্থা থাকার কারণে এবং বিচারকরা নিজের ধর্মীয় অনুভূতির কারণে সঠিকভাবে বিচার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে মানুষ অন্তত নির্ভরযোগ্য একটা আশ্রয় পাচ্ছে। আর এ সবই ইরানের ইসলামী বিপ্লবী সরকারেরই অবদান নিঃসন্দেহে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ : ইরানের ইসলামী বিপ্লবী সরকারের আরেকটি বড় অবদান হচ্ছে অনাচার ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। যে কোনো ব্যক্তি তার নিজস্ব কাজের জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগে যাচ্ছে নির্দ্বিধায়। স¤পত্তি কিংবা বাড়ি রক্ষা, গাড়ি নিয়ে সমস্যা, টেলিফোন লাইন সমস্যা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সমস্যা, পরিচয় পত্র নিয়ে যে কোনো কাজের জন্য অর্থাৎ পৌরসভায় যেকোনো কাজের জন্য কেউ গিয়ে হয়রানির স্বীকার হয়েছে এমন অভিযোগ শোনা যায় না বললেই চলে।
তবে হ্যাঁ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রসেসিংয়ের কারণে কিংবা কর্তব্যে অবহেলা বা ঢিলেমির কারণে ব্যক্তির কাজ আঞ্জাম দেয়া হয়তো কিছু দেরি হতে পারে কিন্তু সে নিরাশ হবে না। আর যদি কোনো ব্যক্তি সমস্যার সম্মুখীন হয় কিংবা অসহযোগিতা করা হয় তাহলেও তার অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। কারণ, প্রশাসনে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে ঘুষ দুর্নীতির কথা শোনা যায় না। ফাইলও আটকে থাকে না। মানুষ ভাবতেই পারে না ঘুষ দিয়ে পৌরসভা কিংবা সরকারি অফিস থেকে নাগরিক সুবিধা আদায় করে নিতে হবে।
সবশেষে যে কথা না বললেই নয় তা হচ্ছে, সন্ত্রাসবাদ কিংবা জঙ্গিবাদ সমস্যা নেই ইরানেÑ যা বর্তমানে সারা বিশ্বের মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, ব্যাহত হচ্ছে তাদের সামাজিক নিরাপত্তা। ইরান হচ্ছে বর্তমান জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে একখণ্ড বরফের টুকরার মতো। অর্থাৎ উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিম এশিয়াজুড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা আজ উগ্র সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন নিহত হচ্ছে অগণিত নিরীহ মানুষ, ঘরবাড়ি ছাড়া হচ্ছে লাখ লাখ আদমসন্তান। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের হিংস্র থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছে না পাশ্চাত্যের দেশগুলোও। প্রতিটি মুহূর্ত আশঙ্কায় কাটছে এসব দেশের সরকার ও জনগণের। এত সব দুর্যোগের মধ্যেও ইরানে শান্ত অবস্থা বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ শঙ্কামুক্ত। শত্রুরা সীমান্ত দিয়ে ইরানের মধ্যে সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ ঘটানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতার মূল কারণ হচ্ছে ইরানে রয়েছে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরকার এবং দেশের মধ্যে কোনো বিভাজন নেই। রয়েছে শক্তিশালী নেতৃত্ব ও ধর্মীয় নেতাদের প্রতি জনগণের আনুগত্য। অন্যদিকে সীমান্ত রক্ষা করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর বহু সদস্যকে জীবন দিতে হয়েছে। কিন্তু রক্ষা পাচ্ছে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মূল্যবান মানব স¤পদ। এ ভাবে সামাজিকসহ সার্বিক নিরাপত্তা বিধানে ইরান আজ সারা বিশ্বের মডেলে পরিণত হয়েছে।
লেখক : রেডিও তেহরানের সংবাদকর্মী