মঙ্গলবার, ১২ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ২৮শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইরানে নওরোয : শাশ্বত ঐতিহ্যের ধারা

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ৪, ২০১৬ 

news-image

অধ্যাপক সিরাজুল হক : নওরোযের আলোচনা করতে গেলেই ইরানের কথা স্মরণ করতে হয়। কারণ, নওরোজ হচ্ছে শাশ্বত ইরানী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। নওরোয মানে ‘নতুন দিন’। বাংলাদেশে ও বাংলা ভাষায় এটা এখন আর অপ্রচলিত ও অপরিচিত নয়। ‘রোয’ ফার্সি শব্দ হলেও তা বাঙলার মূল ভাষায় মিশে গিয়েছে আর ‘নও’ কথাটিও বাংলা ভাষার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। যেমন এখানকার একটি পত্রিকার নাম ছিল ‘নওবেলাল’। আরেকটি পত্রিকার নাম ছিল ‘জাহানে নও’। বর্তমানে ‘নওরোয’ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে ঢাকা থেকে। এছাড়া বহু যুগ আগ থেকে দিনাজপুরে ‘নওরোজ সাহিত্য মজলিস’ নামে একটি সংগঠনও রয়েছে। ‘নওরোয’ কথাটির সাথে অর্থ ও তাৎপর্য এ উভয় দিক দিয়েই আমাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। কাজেই এক অর্থে ‘নওরোয’ একটি সুপ্রাচীন ও শাশ্বত ইরানী ঐতিহ্য হলেও তা ইরান বা পারস্য ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রূপ পরিগ্রহ করেছে- যে কারণে এর তাৎপর্য আরও গভীরে প্রোথিত হয়েছে।

এই ভারতবর্ষে বিশেষ করে মোগল যুগে জাঁকজমকের সাথে নওরোয উৎসব পালিত হয়েছে। এখনও বিক্ষিপ্তভাবে এই পাক-ভারত-বাংলাদেশে তা পালিত হচ্ছে। এছাড়া আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক, আজারবাইজান, কুর্দিস্তান এবং কোনো কোনো আরব ও ইউরোপীয় দেশেও নওরোয উৎসব পালিত হয়ে থাকে।

সম্রাট হুমায়ূন ভারতের উত্তরাঞ্চলে ইরানী এই উৎসবটির প্রচলন ঘটান। এরপর সম্রাট আকবরের রাজত্বের (১৫৫৬-১৬০৫) প্রথম থেকেই নওরোয উৎসব উদযাপিত হতে থাকে। এই উপলক্ষে হেরেমবাসিনী মহিলারাও শখের বশে দোকান সাজিয়ে মীনাবাজার বসাতো।

ইরানী সৌরবর্ষের প্রথম মাসের নাম হচ্ছে ‘ফারভারদিন’। আর ফারভারদিনের প্রথম দিনকেই বলা হয় ‘নওরোয’। পৃথিবীর সকল জাতি-গোষ্ঠীর বর্ষপঞ্জীতে নতুন বছরের প্রথম মাসের প্রথম দিনটি উৎসবের দিন হিসাবে পরিগণিত ও পালিত হয়ে এসেছে সকল যুগে। সূর্যের চতুর্দিকে পৃথিবীর ঘূর্ণন, রাত ও দিনের আবর্তন, বিভিন্ন ঋতুর পরিক্রম, পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের পরিক্রম প্রভৃতি মানুষকে দিনক্ষণ, মাস ও বছরের হিসাব-নিকাশে উদ্বুদ্ধ করেছে, প্রকারান্তরে বাধ্যও করেছে। আর এভাবেই বর্ষপঞ্জীর জন্ম দিয়েছে। বছরের শেষ দিনগুলো যেমন অন্তিমের সুর তুলে মানব জীবনে এবং কিছুটা হলেও বেদনাকর; তেমনি বছরের শুরুটা মূলত এক নতুনত্বের সূচনা- যা মানুষকে নতুন অনুভূতি, নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করে তোলে।এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সূচনা বা শুরু সব সময়ে আনন্দের হয়ে থাকে। এই খুশী ও আনন্দের অভিব্যক্তির জন্য অর্থাৎ তার প্রকাশ ও বিকাশ ঘটানোর জন্য মানুষ সমাজে বিভিন্ন ধরনের উৎসব ও আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করে থাকে। এখানে একটি কথা প্রণিধানযোগ্য যে, প্রাগৈতিহাসিক কালের ইরানীরা নৈসর্গিক জীবনের সমাপ্তি উপলক্ষে ফার্সি সনের শেষ ১১ দিন অর্থাৎ খ্রিস্টীয় হিসাবে ১০ থেকে ২০ মার্চ শোক পালন করতো বলে জানা যায়। নওরোয বা নববর্ষ উপলক্ষে বিশ্বপ্রকৃতিতে নতুন করে জীবনের উপস্থিতিতে এই শোকের সমাপ্তি হতো এবং এ উপলক্ষে আনন্দ উৎসব হতো। ইরানী সমাজে নওরোয এমনই একটি উৎসব যে, তা অন্যান্য দেশ ও সংস্কৃতির তুলনায় ব্যতিক্রমধর্মী বলা চলে। আর এ কারণেই এর এতোটা প্রসিদ্ধি ও হৃদয়গ্রাহীতা রয়েছে।

নওরোয উৎসবের প্রচলনের সঠিক সন তারিখ অদ্যাবধি যদিও জানা যায়নি, তবে এটি যে অতীব প্রাচীন উৎসব তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর নিদর্শনগুলো হাখামানশী (Achaeminian) রাজবংশের শাসন আমলের (খ্রিস্টপূর্ব ৭০০-৩০০ অব্দ) সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। হাখামানশী সম্রাটদের যুগে নওরোয উৎসব কিভাবে পালন করা হতো সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আমাদের জানা নেই, তবে সাসানী রাজাদের শাসন আমলে (২৬২-৬৫২ খ্রিস্টাব্দ) নওরোয উৎসব বিশেষ আড়ম্বরতার সাথেই পালিত হতো বলে বিপুল তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া তাখ্তে জামশিদে রক্ষিত একটি শিলালিপি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় যে, হাখামানশী-পূর্ব যুগে মা’দ রাজাদের শাসন আমলেও নওরোয উৎসব পালিত হতো।

আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, ইরানী সৌরবর্ষপঞ্জীর ফারভারদিন মাসের প্রথম দিনকে ফার্সি ভাষায় ‘নওরোয’ বলা হয় যা শুধু নতুন দিনই নয়, উৎসবের দিন হিসাবেও অভিহিত। হিজরী ৪৬৭ অথবা ৪৭১ সালে জালালী বর্ষপঞ্জীর উৎপত্তির পূর্ব পর্যন্ত সৌর বৎসরের হিসাবটা হতো এভাবে : বছরকে ভাগ করা হতো ৩০ দিনের বার (১২) মাসে- যাতে মোট ৩৬০ দিন হিসাব হতো। বাকী ৫ দিনকে আবান বা এসফান্দ মাসের সাথে যুক্ত করা হতো। উল্লেখ্য, আবান হচ্ছে সৌরবর্ষের অষ্টম মাস এবং এসফান্দ হচ্ছে একাদশ মাস। এভাবে মোট ৩৬৫ দিন পাওয়া যেত; কিন্তু এ সত্ত্বেও ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৫১.৪৫ সেকেন্ড অবশিষ্ট থেকে যেতো। যার কারণে প্রতি চার বছরে এক (১) দিন পার্থক্য হতো। এর ফলে ক্রমান্বয়ে ফারভারদিনের প্রথম দিনটি এগিয়ে আসতে থাকে। অর্থাৎ, বসন্তের সূচনা লগ্নের ওপর নওরোয স্থির ছিল না। ইরানের সর্বশেষ সাসানী রাজা (সম্রাট) ইয়াযদেগার্দ ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহন করেন। সে দিনটি ছিল ফারভারদিন মাসের প্রথম দিবস মোতাবেক ১৬ই জুন। এরপর নওরোয প্রতি চার (৪) বছরে একদিন এগিয়ে আসে। ৪৭৬ হিজরী সালে নওরোয ছিল মার্চ মাসের ৩ তারিখ। ঠিক এই বছরই মালিক শাহ সালজুকি (সালজুকি সম্রাট) জ্যোতির্বিদদের একটি দলকে একত্র করে সৌর বৎসরের একটি চূড়ান্ত ও সূক্ষ্ম হিসাবে তৈরি করে ফারভারদিন মাসের প্রথম দিনটি নির্ধারণের আদেশ জারি করেন। এই ব্যাপারে আরেকটি অভিমত, যা ইতিহাসে উল্লিখিত আছে তা এই যে, প্রখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী ও কবি ওমর খৈয়াম তুর্কী সালজুক শাসক মালেক শাহের নির্দেশনায় সৌর বা শামসী হিজরী ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করেন এবং ফারভারদিন মাসের ১লা তারিখ থেকে (যা ২১ই মার্চ) নওরোয হিসাবে চিহ্নিত ও নির্ধারণ করেন। মার্ভের জ্যোতির্বিদ খাজা আবদুর রহমান খাযেনীর নিরীক্ষার ভিত্তিতে ফারভারদিন মাসের প্রথম দিবসটি ১৬ দিন পিছিয়ে। আর এভাবেই নওরোয বসন্তের সূচনালগ্নে স্থিরিকৃত হয়। স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, নতুন হিসাব অনুসারে প্রতি বছরকে চার দফায় ৩৬৫ দিন হিসাব করা হয় (১২টি ৩০ দিন, তার সাথে ৫ দিন যুক্ত যা আবান বা এসফান্দ মাসের শেষে বর্ধিত করা হয়) আর পঞ্চম বছরকে ৩৬৬ দিন ধরা হয়। এ হিসাবের মধ্যে ৫ ঘণ্টা এবং আরও কিছু সময়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর এভাবেই সেই বৎসর থেকে নওরোয বসন্তের প্রথম দিনে নির্ধারিত হয়ে যায়।

বিভিন্ন ইসলামী পার্বণ ও অনুষ্ঠানাদি চান্দ্রবর্ষ হিসাবে গৃহীত ও পালিত হয়ে এসেছে। এর পাশাপাশি ঋতু নির্ধারণে স্থিতিশীলতা বাজায় রাখা এবং কৃষিজমির খাজনা বা কর ফসলী রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে বাঙলা সনের মতো সৌরবর্ষপঞ্জীর সমধিক গুরুত্ব রয়েছে।

১৩০৪ ফার্সি সালে (১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১৩৪৩ হিজরী) সৌরবর্ষপঞ্জী সরকারি বর্ষপঞ্জী হিসাবে গৃহীত হয়- যাতে উল্লিখিত হিসাব বিবেচনাধীন রাখা হয়। শুধু বছরে ৫ দিন বৃদ্ধি করার পরিবর্তে বছরের প্রথম ছয় (৬) মাসকে ৩১ দিনে এবং পরবর্তী পাঁচ (৫) মাসকে ৩০ দিন আর এসফান্দ মাসকে (একাদশ) ২৯ দিনে ধার্য করা হয়। এভাবে প্রতি চার বছরে এসফান্দ মাসকে ৩০ দিনে গণনা করা হয়। আর উক্ত বছরটিকে ফার্সি ভাষায় বলা হয় কাবিশা সাল অর্থাৎ লিপ ইয়ার। উল্লেখ্য, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সুবিধার্থে বৎসর গণনার মানদন্ড হচ্ছে সৌরবর্ষপঞ্জী। এছাড়া চান্দ্রবর্ষকেও এর পাশাপাশি ধর্মীয় বর্ষপঞ্জী হিসাবে গুরুত্ব দেয়া হয়।

নওরোয উৎসবের ইতিহাস যে অতিশয় প্রাচীন এ ব্যাপারে ইতিহাসবিদগণ ঐকমত্য প্রকাশ করেন। তবে এর পটভূমি সম্পর্কে নানাজন নানা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। যেমন ঐতিহাসিক মাসউদী প্রণীত ‘মুরুজুয যাহাব’’ গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে যে, পারস্য তথা ইরানের কিংবদন্তী সম্রাট জামশিদের সময় তিন বছরব্যাপী স্থায়ী একটি টাইফুন বা ঝড় ইরানের ভূমিতে আঘাত হানে এবং দেশ ও জনগণের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। এরপর বসন্ত (Spring) কালের শুরুতে টাইফুন স্তিমিত ও শান্ত হয়ে আসে। ভয়াবহ ও বিপদসংকুল এই টাইফুন অবসানের পর জনগণ স্বস্তির নিশ্বাস ত্যাগ করে এবং ‘নওরোয’ বা নতুন দিনের উৎসব আনন্দ পালন করে। জানা যায় দীর্ঘ শীতকাল ও শৈত্য প্রবাহের পর মানুষ গুহা, কুঠুরি ও অন্যান্য আশ্রয় স্থল থেকে বের হয়ে এসে বসন্ত উৎসব পালন করে। ইরানের বিখ্যাত কবি আবুল কাশেম ফেরদৌসি (৯৪০-১০২০ খ্রি:) আবু রায়হান আল বেরুনি, বিজ্ঞানী ও কবি ওমর খৈয়াম আরও অনেক ক্লাসিকেল কবি ও মণীষী নওরোয উৎসবকে সম্রাট জামশিদের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন।

সে প্রাচীন কালে ইরানীরা প্রধানত দুটি উৎসব জাঁকজমকের সাথে পালন করতো বলে জানা যায়। এ সম্পর্কে ‘লোগাত নামেয়ে দেহ্খোদা’ এ (আলী আকবার দেহখোদা প্রণীত অভিধান)- উল্লেখ করা হয়েছে। নওরোয বলতে সাত মাসব্যাপী গ্রীষ্মকালের শুরুকে বোঝাতো আর মেহেরগান শরৎকালের প্রথমভাগে যা বর্তমানেও ইরানের আদি জাতি যারতুস্তগণ (জরথুস্ত্র) পালন করে থাকে। আমরা হাখামানশী সম্প্রদায় বা রাজবংশের কথা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি। তাদের আমলের অর্থাৎ ২৫০০ বছর পূর্বের নওরোয উৎসবের ব্যাপারে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও রেকর্ড পাওয়া যায়। হাখামানশী রাজবংশ সেই ফারস অঞ্চলে (প্রকৃতপক্ষে এই অঞ্চলটাই হলো ইরান যা পারস্য নামে পরিচিত ছিল) প্রথম সর্ববৃহৎ সামাজ্য প্রতিষ্ঠা করে এবং ফারস-এর রাজধানী শিরাজ নগরীর সন্নিকটে পারসেপোলিস কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করে। এই জাঁকজমকপূর্ণ রাজপ্রাসাদ বা বালাখানা এবং তদসন্নিহিত স্থাপনাসমূহ আলোকজান্ডার দি গ্রেট ধ্বংস করেন।

ঋতু বৈচিত্র্যের দেশ ইরান। ওখানে বার মাসে ৪টি ঋতু বা মওসুম রয়েছে : যেমন- বাহার (বসন্ত), তাবিস্তান (গ্রীষ্ম), পায়িয (শরৎ) এবং যেমিস্তান (শীতকাল)। এই চার ঋতুর জন্য হাখামানশীদের চারটি ভিন্ন ভিন্ন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছিল। পারসেপোলিস ছিল তাদের বাহার বা বসন্তকালীন আবাসস্থল এবং নববর্ষ উদযাপনের কেন্দ্র। প্রাচীন ভাস্কর্য ও নকশাসমূহে পরিদৃষ্ট হয রাজা (সম্রাট) সিংহাসনে বসে তার প্রজাবর্গ ও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা এবং আঞ্চলিক প্রতিনিধি বা দূতদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন এবং তারাও সম্রাটের জন্য উপঢৌকনাদি অর্পণ করছেন। এ থেকে বুঝা যায়, নওরোয উৎসব ইরানের জাতিগত ঐক্য ও সংহতি গঠনে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা রেখেছে- যার ধারাক্রম আজকের এই একবিংশ শতাব্দীতেও বহাল রয়েছে।

প্রাচীন ইরানীদের নিকটও নওরোযের তাৎপর্য অনুপস্থিত ছিল না। সেকালে নওরোযকে দু’ভাবে বিভক্ত করে পালন করা হতো। পাঁচদিনব্যাপী পালিত নওরোয- যাতে আপামর জনসাধারণই অংশগ্রহণ করতো। বছরের প্রথম দিন ১ ফারভারদিন থেকে শুরু হয়ে ৫ ফারভারদিন পর্যন্ত বিরামহীন চলতে থাকতো। এই পাঁচ দিন রাজা-বাদশাহগণ জনসাধারণকে বালাখানা বা রাজপ্রাসাদে সাক্ষাৎ দিতেন। তাদের আপ্যায়ন করাতেন কারাগারের দরওয়াযাগুলো খুলে দিয়ে বন্দীদের মুক্তি দিতেন, অভাবী লোকদের অভাব অনটন দূর করার জন্য চেষ্টা করতেন। মাওলানা রুমী তার এক কবিতায় মুক্তির বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন :

‘‘যেহেতু নতুন উৎসবের দিন তাই ফিরে এসেছি কারাগারের তালা ভাঙবো বলে, আর এই মানুষখেকো কালচক্রের থাবা চূর্ণ করবো বলে।’’

কথিত আছে যে, বাদশাহরা এই দিনগুলোতে সিংহাসন ও মুকুট ত্যাগ করতেন এবং জনসাধারণের রায়ের ভিত্তিতে একজন নতুন বাদশাহ নির্বাচন করতেন- যাকে বলা হতো মীর-ই-নওরোযী (নওরোযের অধিনায়ক)। এই মনোনীত বাদশাহর শাসন ও আদেশ ৫ দিন পর্যন্ত রাজা-বাদশাহদের আদেশ-নিষেধের ন্যায়ই কার্যকর ছিল বলে জানা যায়। তবে এটা ছিল একটি প্রতীকী কর্তৃত্বস্বরূপ। ড. মাহমুদ বাশীরীর মতে, এই প্রাচীন নিয়ম অনুসরণে এখনও কুর্দিস্তান প্রদেশসহ আরও কোনো কোনো প্রদেশ ও অঞ্চলে এ প্রথাটি চালু রয়েছে। এই প্রথাটির সত্যতা কবি হাফিজের কবিতায়ও পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে এটি চালু রয়েছে বলে আমার মনে হয় না। আমি চার বছর ইরানে অবস্থানকালে নওরোয নিয়ে অনেক পড়াশোনা করেছি, অনেক আলোচনা শুনেছি। তবে এরূপ প্রথা এখনও বিদ্যমান আছে বলে শুনিনি। হাফিজ বলেন : ‘‘শোনো, অন্তরলোক থেকে বলছি ফুলের মতো কলি ছেড়ে বেরিয়ে এসো, কারণ, পাঁচ দিনের বেশি চলবে না মীরে নওরোযীর ফরমান।’’

এই পাঁচ দিনকে ইরানী লোকজন ‘নওরোযে ছাগীর’ বলে থাকে- যার অর্থ হচ্ছে ছোট নররোয। এই নামটি বর্তমানে প্রচলিত নেই। তবে সে অতীতকালের অনেক নিয়ম এখনও বিদ্যমান। বর্তমান কালেও সমগ্র ইরানব্যাপী ফারভারদিন মাসের প্রথম পাঁচদিন সাধারণ ছুটি রয়েছে এবং অতীতের মতোই উৎসব আনন্দে মেতে থাকে।

এছাড়া উপরোক্ত পাঁচদিনের পরও একটি বিশেষ শ্রেণী ফারভারদিন মাসের ১৩ তারিখ পর্যন্ত আনন্দ উৎসবের আয়োজন করে থাকে। ইরানীরা এই ১৩ তারিখটাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় এবং একে বলে ‘ছিযদা বেদার’ ফার্সি ভাষায় ‘ছিযদাহ মানে তের। আর ‘বেদার’ অর্থ ঘরছাড়া। এই দিন ঘরে থাকা তাদের জন্য দূষণীয়। সবাই পার্ক, মাঠ-ময়দান বা অনুরূপ বিশেষ স্থানে বেড়াতে যায় এবং সন্ধ্যার পর ঘরে ফিরে আসে। এ দিনটি সর্বজনীন ছুটির দিন।

কাজেই ৬ ফারভারদিন থেকে এই ১৩ তারিখ পর্যন্ত দিনগুলো বিশেষ নওরোয হিসাবে খ্যাত। প্রাচীনকালের ইরানীদের নিকট ফারভারদিন মাসের প্রথম, ষষ্ঠ এবং ত্রয়োদশ দিনটি বিশেষ প্রিয় ও সম্মানিত দিন হিসাবে গণ্য হতো- যা বর্তমানেও চালু আছে। প্রাচীন ইরানী জাতির বিশ্বাস ফারভারদিন মাসের ১ তারিখে আল্লাহ বিশ্বলোক সৃষ্টি করেছেন। এ ছাড়া প্রজ্ঞার প্রতীক সাতটি নক্ষত্রও এইদিন সৃষ্টি হয়েছিল বলে তাদের বিশ্বাস- যা ইরানের প্রাচীন মনীষী বা জ্ঞানীদের দৃষ্টিতে সাত আসমানী পিতা নামে অভিহিত। পানি, মৃত্তিকা, অগ্নি ও বাতাস- এই চারটি উপাদানের ওপর উক্ত সাতটি নক্ষত্রের প্রভাবের কারণে যে তিনটি বস্তু সৃষ্টি হয় তা হচ্ছে- জড় পদার্থ, বৃক্ষ ও প্রাণীকুল, আর এই চারটিকে বলে ‘উম্মাহাতে আরবা’ বা চার জননী।

প্রাচীন ইরানীদের বিশ্বাস মতে প্রথম মানব আদমও বসন্তের এই প্রথম দিনে সৃষ্টি হন। হাপেজ শিরাজীর একটি গযল যা ‘বার-ই-আমানাত’ (আমানাতের বোঝা) নামে খ্যাত, তা এই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট।

৬ই ফারভারদিন থেকে আরম্ভ বিশেষ নওরোযের একটি আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। তা এ কারণে যে, ইরানে রূপকথার প্রাচীন বাদশাহ জামশীদ- যার মাধ্যমে প্রথম এই নওরোয উৎসবের সূচনা হয়; তার মর্যাদা হযরত সোলায়মানের সমতুল্য। এই মতটি সঠিক কি ভুল সেটা অন্য কথা, তবে ফার্সি সাহিত্যে কেউ কেউ জামশীদকে সোলায়মান এবং সোলায়মানকে জামশীদ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি (জামশীদ) এই দিন তার প্রজাসাধারণকে একত্ববাদ ও আল্লাহর উপাসনার প্রতি আহবান জানিয়ে ছিলেন। আর সে কারণে এই দিনটিকে ‘নওরোয’ নামে অভিহিত করেন বলে জানা যায়।

উল্লেখ্য যে, জামশীদের আসল নাম ছিল ‘জাম’। তিনি এই দিনে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন এবং তা এমনভাবে সজ্জিত ও আলোকমন্ডিত করা হয়েছিল যে, দেখতে তা সূর্যের মতো ছিল যা প্রাচীন ভাষায় ‘শীদ’ বলা হতো। এ কারণে ইরানীরা ‘জাম’কে জামশীদ বলে থাকে।

এইসব কথা থেকে প্রমাণ মিলে যে, ‘রওরোয’ মূলত ইরানী জাতির একটি প্রাচীন ঐতিহ্য- যা খ্রিস্টপূর্ব কাল থেকেই চলে এসেছে এবং সমহিমায় এখনও ইরানী জাতি এবং ইরান বহির্ভূত অনেক জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপ্ত রয়েছে, তবে এর উৎসমূল ইরানে। এর প্রাচীনত্বের আরও অনেক প্রমাণ রয়েছে। পারসিকরা যারতুশতদের ধর্ম পুস্তক ‘বুন্দাহেশন’- এ-ও নওরোয পরিভাষাটি উল্লিখিত আছে। এই গ্রন্থের বস্তু হচ্ছে বিশ্বের বস্তুনিচয়ের সৃষ্টি সংক্রান্ত। ড. মাহমুদ বাশীরী ‘নওরোয উৎসবের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য ও ইরানী সমাজ’ প্রবন্ধে বলেন : যেহেতু (অর্থাৎ উপরোক্ত কারণে) নওরোয উৎসবেরও জগতসৃষ্টির সাথে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক থাকতে পারে। অপর যে সূক্ষ্ম বিষয়টি উল্লেখযোগ্য তা হচ্ছে বুন্দাহেশ্ন গ্রন্থের বিষয়বস্তু।

বসন্ত উৎসব

পৃথিবীর সব জাতির মধ্যেই ঋতুরাজ বসন্তের একটি আবেদন রয়েছে। সব দেশেই বসন্ত ঋতুর আগমন একই সময়ে অথবা বছরের শুরুতে ঘটে না। যেমন- বাংলাদেশেও নববর্ষ বা ১ বৈশাখে শুরু হয় না বসন্তকাল। বরং ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশের ফাল্গুন-চৈত্র এই দু’মাস হলো বসন্তকাল আর গ্রীষ্মের দাবদাহ নিয়ে শুরু হয় ১ বৈশাখ বা নববর্ষ। এভাবে অন্যান্য জাতির কথাও বলা যেতে পারে। খ্রিষ্টবর্ষ শুরু হয় ১ জানুয়ারি-যখন বিশ্বের সর্বত্রই শীত মওসুম।

ইরানে বসন্ত উৎসব আর নববর্ষ তথা ‘নওরোয উৎসব’ সবসূত্রে গাঁথা। বিষয়টি ধর্মীয় সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের সাথে সাথে তাদের আনন্দ অনুভূতি বা নান্দনিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে এসেছে যুগ যুগ ধরে। সৃষ্টিজগতের অন্যান্য সময়ের তুলনায় বসন্তের মাঝে সে নিসর্গ চেতনা, আল্লাহ সৃষ্টিশোভা, সতেজতা ও সৃষ্টি কৌশলের নিদর্শনগুলো রয়েছে তা এই ঋতুতেই অধিকহারে প্রত্যক্ষ করা যায়। পৃথিবীর সব দেশেই ঋতুবৈচিত্র্যের নিদর্শন অতি সহজেই খুঁজে পাওয়া যাবে, তবে ইরানের এই ঋতু বৈচিত্র্যের তুলনা হয় না। ইরানের দ্বাদশ মাস বাহমানের শেষ দিন এবং নববর্ষের প্রথম মাস ফারভারদিনের প্রথম দিনের মধ্যে একটি চমৎকার পার্থক্য পরিদৃষ্ট হবে প্রকৃতিতে-গাছগাছরা, লতাগুল্ম এবং বন-বনানীতে। এ সময় যারা ইরান ভ্রমণ করবেন এ দৃশ্য নিশ্চয়ই তাদের দৃষ্টি এড়াবে না। আমি নিজেও এই দৃশ্যটি প্রত্যক্ষ করে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছি।

ইরানের বিখ্যাত কবি শেখ মুসলেহ উদ্দিন সা’দী শিরাজীর একটি শ্লোক এইরূপ :

‘সচেতন চিন্তাশীলদের দৃষ্টিতে সবুজ বৃক্ষের

পত্র পল্লবগুলোর প্রতিটিই স্রষ্টার অভিজ্ঞান

তথা পরিচিতি লাভে যেন একটি দফতর।’

আল্লামা ইকবাল তাঁর কোন কোন কবিতায় ‘ফাভারদিন’কে বসন্তের সমঅর্থে ব্যবহার করেছেন-যদিও ফার্সি ভাষায় বসন্তকে বলা হয় বাহার আর ফাভারদিন হচ্ছে বছরের প্রথম মাস যা বসন্ত ঋতুরই দ্যোতক। তাই বলা যায়, নওরোয উৎসব হলো প্রকৃতির পুনর্জন্ম উৎসব। এ সময় বিশেষত ইরানে প্রকৃতি নতুন সাজে সজ্জিত হয়ে পৃথিবীবাসীকে আনন্দদান করে। এতে চিন্তাশীল মানুষের জন্য অফুরন্ত খোরাক রয়েছে। ইরানের একজন প্রসিদ্ধ কবি যাকারিয়া আখলাকী বসন্ত ঋতু থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য বলেছেন :

‘(এই বসন্তে) ফুল কলি আল্লাহর রহস্যের দফতর খুলে দিয়েছে

মরুভূ ও বনবনানী উপদেশের নতুন নতুন পত্রপল্লব উন্মুক্ত করে দিয়েছে।’

বসন্ত ঋতু হচ্ছে (ইরানী জনগণ, বিশেষ করে কবি-সাহিত্যিকদের দৃষ্টিতে) ন্যায়-ইনসাফ ও ভারসাম্যের মওসুম। ইরানে বসন্ত নাতিশীতোষ্ণ। দেই (ডিসেম্বর) মাসের শীতের প্রকোপ যেমন তখন থাকে না, থাকে না তীর ও খোরদাদ মাসের (জুন-জুলাই) তথা গ্রীষ্মের দাবদাহ। তাই এই ‘ফাভারদিন’ মাসটাকে তারা দেখে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে।

ন্যায়বিচারকামী কবি নাসের খসরু কুবাদিয়ানী বলেন :

‘হ্যাঁ, যখন দিন ও রাত একটি ভারসাম্যের ওপর দন্ডায়মান হয়,

জরাজীর্ণ এই পৃথিবীর জীবনটা তখন যৌবনে পূর্ণ হয়।

দেই (ডিসেম্বর) মাসের নিষণে নার্গিস ও ফুল কলি অন্ধ হয়ে গিয়েছিল বটে,

কিন্তু দেখো! ‘ফাভারদিনের ইনসাফে তা দৃষ্টিমান হয়ে উঠলো।’

ফেরদৌসীর ভাষায়-

বসন্তের মেঘমালা থেকে নেমে আসে বৃষ্টির ফোঁটা

মাটির বুক থেকে ধুয়ে ফেলে যতসব দুশ্চিন্তা

পৃথিবী পূর্ণ হয় সবুজের সমারোহে এবং পানিতে নদী

দুঃখীর জীবনে এখন থাকে না কোন উদ্বেগ উৎকণ্ঠা।

ধরাতল সজ্জিত হয় যেন এক বেহেশত রূপে

ইনসাফ ও দানের মহিমায় পৃথিবী পূর্ণ হয়

আর কল্যাণ ও নিরাপত্তায়, আর

দুষ্ট ও দুরাচারের হাত হয় অবরুদ্ধ।

নওরোযের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দিক :

ইরানীরা ‘নওরোয’কে ‘ঈদ-ই-নওরোয’ বলে। ঈদ মানে খুশি বা আনন্দ। প্রাচীনকালে যাই থাক মুসলিম ইরানে ইসলাম প্রবর্তিত দু’টি ঈদ পার্বন/যেমন ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা পালিত হওয়ার সাথে সাথে তাদের জাতীয় উৎসব ঈদ-ই-নওরোযও পালিত হয়ে এসেছে যা আমরা পূর্ববর্তী দীর্ঘ আলোচনায় ব্যক্ত করেছি। ইসলামের আগমনের পর উমাইয়া ও আববাসী শাসকরা নওরোয উৎসবের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করতেন বলে জানা যায়। বিশেষ করে প্রাচ্য অঞ্চলে শাসকরা নওরোযের উপহার উপঢৌকনও গ্রহণ করতেন।

রাসূল জা’ফারিয়ান তার ‘শিয়া সংস্কৃতিতে নওরোয’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন : হিজরী ষষ্ঠ শতকের প্রথমার্ধে রচিত দোয়া কবুল সংক্রান্ত ‘‘যাখীরাতুল আখেরা’’ গ্রন্থে পারস্যবাসীর নওরোয দিবসের আমল সম্পর্কে একটি অধ্যায় রয়েছে। এর ব্যাখ্যায় মু’আল্লা ইবনে খুনবাইস-এর হাদীসটি এভাবে উল্লিখিত হয়েছে : হযরত ইমাম (জাফর) সাদেক (আঃ) বলেন : ‘নওরোযে তোমরা রোযা রাখো, গোসল করো, সবচেয়ে পরিষ্কার জামা পরিধান করো, খুশবো ব্যবহার করো, যাদি পূর্বের নামাযও সুন্নাতগুলো আদায় করে থাক, তাহলে দু’টি সালামের সাথে চার রাকাত নামায পড় …।

এ দ্বারা নওরোযের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায়। প্রাচীন রীতিনীতি ও পন্থার অনুকীর্তিতে বর্তমান যুগের ইরানীরাও সেই মূল্যবোধগুলো এখনও রক্ষা করে চলছে। বলা বাহুল্য, শুধু সামাজিক রসম রেওয়াজ বা দেশীয় সংস্কৃতিই নয় নওরোযের সূচনা পর্বে তথা এই দিনের শুরুতে আল্লাহর দরবারে দোয়া করা হয় এইভাবে : ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব ওয়াল আবসার, ইয়া মুদাবিবরাল লাইলি ওয়ান্নাহার, ইয়া মুহাভ্ভিলাল হাল ওয়াল আহওয়াল, হাভ্র্ভিল হালানা ইলা আহসানিল হাল। ‘‘হে অন্তরসমূহ ও দৃষ্টিসমূহের বিবর্তনকারী, হে রাত ও দিবসের পরিচালনাকারী, হে বৎসর ও অবস্থাসমূহের পরিবর্তনকারী আমাদের অবস্থাকে উত্তম অবস্থায় পরিবর্তন করুন।’’

নওরোযে বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজন :

নওরোয উৎসবের কালগত গুরুত্ব এখানে যে এ উৎসব এমন এক সময় শুরু হয় যখন প্রকৃতিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে থাকে; পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে আরেকবার প্রদক্ষিণ শুরু করে।

প্রাচীন ইরানের ফারস এলাকায় যরথুস্ত্রীরা নববর্ষের সূচনায় বিভিন্ন প্রতীকী বস্তু দ্বারা সাতটি ট্রে পূর্ণ করে আহুরমাযদা (আল্লাহ তা’আলা)-এর উদ্দেশ্য উৎসর্গ করত। এই সাতটি ট্রে ছিল সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ঈমান, সদুপদেশ, সৎকর্ম, সৌভাগ্য এবং ক্ষমা ও অমরত্বের প্রতীক।

অতীতের এইসব আনুষ্ঠানিকতা বর্তমানে যে পরিবর্তিত রূপ নিয়েছে তা হচ্ছে এই যে, এ উপলক্ষে বিশেষ ধরনের দরস্তরখান বিছানো হয় এবং তার ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী জিনিস অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়। এ উপকরণসমূহ হতে হবে বিভিন্ন ধরনের সাতটি উপকরণ যেগুলোর নাম ফার্সী বর্ণমালার ‘সীন’ (সাত সীন) নামে বিখ্যাত। হাফ্ত সীন্ সাধারণত: নিম্নোক্ত উপকরণগুলোর মধ্য থেকে বেছে নেয়া হয়।

সাবযেহ (সজুজাভ) : গম বা ডালের কচি চারার গুচ্ছ যা নওরোযের অব্যবহিত পূর্বে গজিয়েছে একটা ট্রে বা প্লেটের ওপর বসিয়ে হাফ্ত সীন্ দস্তরখানায় রাখা হয় যা নব জীবনের প্রতীক।

সামানু : কচি, গম, বার্লি বা অন্যান্য শস্যদানার আটা দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের হালুয়া যা প্রাচুর্য ও নেয়ামতের প্রতীক।

সেনজাদ : এক প্রকার শুষ্ক ফল যা ভালোবাসা ও প্রেমের প্রতীক।

সীর (রসুন) : সৌন্দর্য ও সুস্বাস্থ্যের প্রতীক।

সোম্মাগ : মসুরের ডালের চেয়ে সামান্য বড় লাল রঙের টক ফল বিশেষ যা উদীয়মান সূর্যের প্রতীক।

সিরকা : দীর্ঘায়ু ও ধৈর্যের প্রতীক।

সোমবোল : ছোট আকারের পুবৎ উদ্ভিদ বিশেষ যা বসন্তের আগমন বার্তা বহন করে নিয়ে আসে।

সেক্কেহ্ (কয়েন বা মুদ্রা) : সম্পদ ও সমৃদ্ধির প্রতীক।

এ দেশে বিভিন্ন রসম-রেওয়াজ ও সংস্কৃতির উদ্ভব ও মিলন ঘটে যা অন্য কোন দেশে পাওয়া দুষ্কর। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে এবং সুপ্রাচীনকালে ইরানীদের ধর্মবিশ্বাস ও জাতিসত্তায় বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রান্ত হয়। এর অন্যতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে এক খোদার ইবাদাত এবং শিরক ও বহু দেব-দেবীর পূজা প্রতিহতকরণ। যরথুস্ত্রীয় ধর্ম এর অন্যতম দৃষ্টান্ত। যরথুস্ত্রীয় ধর্মমতে আহুর মায্দার প্রতি বিশ্বাস পোষণ করা হয় যাতে তাওহীদে বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটে।

ইসলামের আবির্ভাব বিশেষত ইরানীদের ধর্ম ও জাতীয় ধ্যান-ধারণার সাথে ইসলামের শান্তিবাদী আচরণের দরুন ইরানীদের ইসলাম গ্রহণ করার পরেও তাদের আগেকার কতক ধ্যান-ধারনা ও রসম-রেওয়াজ অব্যাহত থাকে। অবশ্য ইরান-বিজেতা আরব মুসলমানদের ইরানীদের সাথে সদয় আচরণের তারা ইসলামকে সম্পূর্ণরুপে বরণ করে নেয় এবং তাদের আদর্শ ব্যক্তিবর্গ, বীর পুরুষ ও প্রাচীন কাহিনীগুলোকে ইসলামের রঙে রঞ্জিত করে নেয়।

প্রাচীন ইরানীদের কিছু কিছু উপলক্ষ ও রেওয়াজ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও জনগণের ধ্যানধারণার সাথে মিশে গিয়েছিল। নওরোয-এর অন্যতম। সুদীর্ঘ কয়েক সহস্রাব্দের পুরনো এ ঐতিহ্যটি ইরানের মুসলমানদের মনে একটা স্থায়ী আসন তৈরি করে নিয়েছে এবং ইরানের মনীষীরা এ ব্যাপারে যথেষ্ট লেখালেখি করেছেন। বিশেষ করে আল বিরুনী (ওফাত ৪৪০ হিঃ) তার গ্রন্থ ‘আত্হারুল বাক্বীয়াহ’তে প্রাচীন ইরানেরও ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন। এছাড়া অনেক মুসলিম কবিও তা তুলে ধরেছেন। এখনও ইরানের অধিকাংশ লোকই পুরাতন বছরের বিদায় ও নতুন বছরের আগমন ক্ষণে নতুন পোশাক পরিধান করে মিষ্টি মধুর আচরণ সহকারে পবিত্র স্থানে বা পরিবারের মুরুববীদের সাথে কাটাতে পছন্দ করে। সে মুহূর্তে তারা কুরআন তেলওয়াত করে ও দু’হাত তুলে মহান আল্লাহর কাছে নিজেদের ও পরিবারবর্গের জন্য একটি সুন্দর এবং সুস্থতা ও সমৃদ্ধিপূর্ণ বছর কামনা করে।

নওরোযের পছন্দনীয় অন্যান্য রীতির মধ্যে রয়েছে পরস্পরের সাথে দেখাসাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়, কারও প্রতি রাগ বা ক্ষোভ থাকলে পরস্পরকে ক্ষমা করে দেয়া এবং নববর্ষের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করা। এছাড়া এ দিনে তারা এমন সব ব্যক্তির সাথে দেখা করতে যায় যারা পুরাতন বছরে কোন প্রিয়জনকে হারিয়ে তার শোকে মুহ্যমান হয়ে আছে।

এভাবে নওরোয প্রাচীন ইরান থেকে পর্যায়ক্রমে বর্তমানরূপে এসে দাঁড়িয়েছে এবং ইসলামের পছন্দনীয় রীতি-নীতিগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই ইসলামের মূলনীতির সাথে এর কোন নিরোধ নেই, বরং নওরোয উৎসবে ইরানী সমাজের জন্য নৈতিক ও সামগ্রিক শিক্ষার সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।

নওরোযের আন্তর্জাতিকতা :

আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছিলাম যে, ইরান ছাড়াও বেশকিছু দেশে নওরোয উদযাপিত হয়ে থাকে। এটা স্ব স্ব জাতিগোষ্ঠীর অভিরুচি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অংশ বিশেষ, তবে ভাষাও এখানে একটি ফ্যাক্টর বা বিষয়। মানে, ইরান ছাড়াও এর পাশ্ববর্তী কয়েকটি দেশে যে আদলে ও পরিমাণেই হোক না কেন ফার্সি ভাষার প্রচলন রয়েছে। আর যেখানকার ভাষা বা মাতৃভাষা ফার্সি নয় সেখানেও দেখা যাচ্ছে ঐতিহ্যগত কারণে কিছু কিছু ফার্সির চর্চা রয়েছে। এইভাবে এর সাথেও নওরোযের একটি যোগসূত্র সৃষ্টি হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।

এদিকে ইরানের জন্য একটি সুখকর দিক হলো যে, আন্তর্জাতিক বলয়ে নওরোযের অফিসিয়াল স্বীকৃতি। এই ১ লা ফারভারদিন তথা ইরানী নববর্ষের প্রথম দিন নওরোযকে ‘মিরাছে জাহানী’ Universal Heritage দিবস হিসেবে ২০০৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ইউনিসেফ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে যা ইরানের জন্য গৌরব বয়ে এনেছে। ইউনিসেফ কর্তৃক এই ঘোষণা বা অনুমোদনের পর ইরান সরকারের আতিথ্যে আন্তর্জাতিকভাবে বর্তমানে ‘নওরোয’ উৎসব পালিত হচ্ছে।

নওরোয ও পহেলা বৈশাখ :

নওরোয ও ১লা বৈশাখের মধ্যে অনেকক্ষেত্রে বিশেষ সাযুজ্য রয়েছে। বেশ কাছাকাছি সময়ের ব্যবধানে ইরান ও বাংলাদেশে বসন্তকালের আগমন ঘটে থাকে। ইরানে বসন্ত শুরু হয় হিজরী শামসী সাল বা সৌরবর্ষের প্রথম মাস ফারভারদিনের প্রথম দিন (২১ মার্চ) থেকেই আর বাংলাদেশে বাংলা সনের একাদশ মাস ফাল্গুনের প্রথম দিন (১৩ ফেব্রুয়ারি) থেকে শুরু হয় বসন্তকাল যা প্রলম্বিত হয় ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। অর্থাৎ ইরানে বসন্তকাল শুরু হওয়ার পর ২৩/২৪ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশ অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও একই সঙ্গে ঋতুরাজ বসন্তের স্বাদ ও গন্ধ অনুভব করে। অন্যদিকে ইরানী নববর্ষ ও বাংলা নববর্ষের মধ্যে দূরত্বটাও তেমন দীর্ঘ নয়, ইরানে যেমন নওরোয বা নববর্ষ শুরু হয় ২১ মার্চ থেকে তেমনি বাংলাদেশে ১লা বৈশাখ শুরু হয় ১৪ এপ্রিল থেকে।

১ লা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। ‘বৈশাখ’ নামটি বিশাখা নক্ষত্রের নামানুসারে হয়েছে। জ্যোতির্বিদদের হিসেব অনুযায়ী এ মাসে বিশাখা নক্ষত্রের উদয় অথবা গ্রহনক্ষত্রের যে প্রভাব সেই অনুযায়ী এ মাসে উক্ত নক্ষত্রের প্রভাব রয়েছে বলে এ মাসের নাম বৈশাখ। অবশ্য পূর্বে অগ্রহায়ণ ছিল বছরের প্রথম মাস। মোগল আমলে তা পরিবর্তিত হয় এবং বৈশাখকে বছরের প্রথম মাস ধরা হয়।

ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে পূর্বে কৃষিকাজ ছিল ঋতুনির্ভর। বর্তমানে কৃষি বা ফসল উৎপাদনে যেমন কিছুটা বিবর্তন ও পরিবর্তন এসেছে, পূর্বে ছিল এর অনেক ব্যতিক্রম। ফসল উৎপাদনের সাথে সরকার বা মনিবের খাজনা আদায়ের বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তাই বাদশা আকবর পরিবর্তনশীল হিজরী চান্দ্রবর্ষকে ১৪৮৪ খ্রিস্টাব্দে (১০/১১ মার্চ বাংলা সন (হিজরী সনেরই আদলে) প্রবর্তন করেন। আর এ সন তারিখ কার্যকরী হয় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে নবেম্বর থেকে, অন্যমতে ১৫৫৭ থেকে। ইরানের মতোই আমাদের দেশেও বৈশাখ মাসকে এ ফসলী সনের প্রথম মাস ধরা হয়। সৌরবছর গণনা শুরু হলো হিজরী চন্দ্রবছরের পরিবর্তে। ইরানে ফার্সি সৌরবর্ষের সাথে বিশেষত ধর্মীয় হিসেব নিকেশে হিজরী চন্দ্র বছরও ব্যবহৃত হয়। অপরদিকে আমাদের দেশেও বাংলা সনের সাথে সাথে ধর্মীয় কাজকর্ম এবং হিসেব নিকেশে হিজরী সনের ব্যবহার রয়েছে। তবে আমাদের দেশে দাফতরিক কাজে ঈসায়ী সাল ব্যবহার হলেও ইরানে তা হয় না।

নওরোযের আদলে বাংলা নববর্ষ পালন শুরু হয় মূলত মোগল সম্রাট আকবরের আমল থেকেই। অতীতকালে এবং ইংরেজ আমলেও এর পরে বিশেষত জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার (১৯৫৬) পূর্ব পর্যন্ত বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষ দিন পর্যন্ত মনিবের খাজনা পরিশোধ করতো এবং জমিদার ও ভূ-স্বামীদের জন্য উপহার উপঢৌকন নিয়ে যেতো-আর এ প্রথার মিল ইরানেও ছিল। এইভাবে এ দিনটি বাঙালি সমাজে জীবনঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। অর্থাৎ মহাজনী ও ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের নবায়ন যা সীমিত আকারে হলেও বর্তমানেও চাল আছে। ইরানের মতো বাংলাদেশেও ১ বৈশাখের অনেক আগে থেকেই ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এমনকি অফিসেআদালত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং ধোয়া মোছার কাজ শুরু হয়ে যেতো। ১ বৈশাখের এই অনুষ্ঠান এখনও যেমন তখনও ছিল সর্বজননী। মুসলিম রাজা বাদশা কর্তৃক এর প্রবর্তন হলেও হিন্দু-মুসলিম-খৃস্টান-বৌদ্ধ, উপজাতীয় জনগোষ্ঠী সকলেই একযোগে এক বাংলা নববর্ষ পালন করে এসেছে শুরু থেকে। ১লা বৈশাখ উদযাপনের সাথে ধর্মীয় অনুভূতিও কাজ করতো। বিশেষ করে মুসলমানদের ঘরে ঘরে এবং দোকানপাটে মিলাদ ও দোয়ার অনুষ্ঠান হতো, মিষ্টি বিতরণ করা হতো। এখানেও ইরানের মতো নববর্ষের সূচনাতে আল্লাহর দরবারের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি সমভাবে কাজ করতো। ইরানের মতোই এই দিনে সামাজিকভাবে জাতিধর্ম নির্বিশেষে একে অন্যের প্রতি সম্ভাষণ জানানোর রীতি রয়েছে।

১ বৈশাখ তথা নববর্ষ নিয়ে ইরানের মতোই আমাদের কবি-সাহিত্যিকরা প্রচুর লেখালেখি করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ প্রমুখের অবদান এ ব্যাপারে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

নববর্ষ উদযাপন অতীতকালের তুলনায় বর্তমানে ব্যাপকতর হয়েছে। অতীতে এ উপলক্ষে মেলা বসতো- যাকে আঞ্চলিক ভাষায় বলা হতো গলৈয়া। বর্তমানেও বৈশাখি মেলা বসে থাকে। মোটকথা, নববর্ষ বা ১লা বৈশাখ উদযাপনে জনতার ঢল নামে বটে। তবে পূর্বের সে শালীন পরিবেশ এখন ক্ষুণ্ণ হয়েছে বিদেশি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ছোঁয়ায়।

অতীতে যা-ই থাকুক না কেনো বর্তমানে বিশেষত ইসলামী বিপ্লবোত্তর ইরানে নওরোয উদযাপনের কোনো প্রকার প্রগলভতা নেই। নওরোয পালনে যেমন ইসলামী বিপ্লব বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, তেমনি এর অনুষ্ঠানমালায় শালীনতা বিবর্জিত হওয়ার সুযোগ এখানে এখনও নেই। নির্দোষ এসব মানবীয় উৎসব আনন্দমার্জিত ও পরিশীলিত অনুষ্ঠানাদি উদযাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হলেই তা হবে সমাজ ও মানবতার জন্য কল্যাণকর।

লেখক, নিউজ লেটারের সাবেক সম্পাদক এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য