শুক্রবার, ১৯শে জুলাই, ২০১৯ ইং, ৪ঠা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইরানে ইসলামি বিপ্লবের ৪০ বছর : অর্জন ও সম্ভাবনাসমূহ

পোস্ট হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৯ 

news-image

রাশিদুল ইসলাম: জনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা, জাতীয় ঐক্য, বিপ্লবী নীতিমালার প্রতি আনুগত্য, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, ইসলামি বিপ্লবী সংস্কৃতির বিকাশ, উন্নয়ন ও এর গভীরতা এসবেরই বিরোধী পরাশক্তি দেশগুলো। ইরানের বিপ্লবের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্পেনের বার্সেলোনায় গত চার দশকের দেশটির চলচ্চিত্র নিয়ে উৎসব চলছে। ইরানের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব আব্বাস কিয়ারোস্তমি থেকে শুরু করে অন্যান্য চলচ্চিত্রকারের চলচ্চিত্র উৎসবে দর্শকরা দেখে সাধুবাদ জানিয়েছে। খোদ মার্কিন মুল্লুকে ইরানের চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে শিল্পকলার আবেদন অসাধারণ সাংস্কৃতিক পরিচয়ের আবহ তৈরি করছে। এছাড়া খেলাধুলা থেকে শুরু করে শিক্ষামূলক তৎপরতা, অলিম্পিয়াড সহ ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানের নাগরিক গড়ে তুলছে। অবাক বিস্ময়ে পরাশক্তিগুলো তাই ইরানের সামরিক অগ্রগতিরও বিরোধী, ক্ষেপণাস্ত্রের বিরোধী, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আইএস জঙ্গিবিরোধী উপস্থিতির বিরোধী। কেননা, এগুলো ইরানের শক্তির উপাদান। এর কারণ হচ্ছে পরাশক্তির সঙ্গে ইরানের সংকটটা মৌলিক। এটা সমাধানযোগ্য নয়। যতদিন দ্বীনী শাসন ব্যবস্থা বিশেষ করে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা থাকবে ততদিন ইরানের সঙ্গে তাদের এই সংকট মিটবে না। তারা চায় বিপ্ল¬বের আগের ইরানের অবস্থায়,ইসলামি শাসনব্যবস্থার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে। সেটা তো অবাস্তব, সম্ভবও না। ইরানে রেজিম চেঞ্জ বা বিহেভিয়ার চেঞ্জএর কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, লিবিয়াসহ একটির পর একটি মুসলিম দেশকে কোথায় নিয়ে গেছে তা বিশ্ববাসীর অজানা নয়। তারা সৌদি আরব, মিসর, আমিরাতসহ বিভিন্ন মিত্রদেশগুলোর সম্পদ লুণ্ঠন ও তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে, কিন্তু এসব দেশে গণতন্ত্র, জনগণের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বা উৎপাদনশীল খাতের বিকাশের জন্যে কিছুই করছে না। এসব দেশের অর্থনীতি বিলাসবহুল সেবাখাত নির্ভর এবং তারা খাদ্যে পর্যন্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। একধরনের বাবলআপ অর্থনীতির কবলে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে এসব দেশ। পশ্চিমা ও ইসরায়েলি পুঁজির দাসত্ব করছে এসব দেশ। ইরান এধরনের পরিণতি কখনো মেনে নিতে পারে না।
অথচ ইসলামি বিপ্লবের আগে সাবেক স্বৈরশাসক রেজা শাহের আমলে ইরান ছিল আমেরিকার আজ্ঞাবহ একটি দেশ। কারণ, এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন করাই ছিল আমেরিকার উদ্দেশ্য এবং রেজা শাহ ছিল তার প্রধান সহযোগী। বিদেশী কোম্পানিগুলো অবাধে ইরানের তেল উত্তোলন করে নিয়ে যেত। এ ছাড়া, তেহরানে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস সমগ্র পশ্চিম এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে গোয়েন্দাবৃত্তির আখড়া হিসেবে ব্যবহৃত হত। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার বলেছিলেন, ইরানকে আমেরিকার জন্য নির্ভরযোগ্য একটি দ্বীপ হিসেবেই দেখা হত। অবশ্য শতাব্দী ধরে আমেরিকা ইরানের সঙ্গে শত্রুতা করে আসলেও বরং তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো হুমকি ও নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় নিজের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা ইরানকে দুর্বল করার এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব ও অগ্রগতির ধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের শুরুতেই আমেরিকা এ বিপ্লবকে ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত ১৫ জুলাই দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা স্বীকার করেছেন। ওই সাক্ষাৎকারে ওবামা স্বাীকার করেন, ‘ইরানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাতে আমরা চেষ্টা চালিয়েছি। ইরাকের সাদ্দাম যখন ইরানের বিরুদ্ধে বেআইনি রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে তখনই আমরা সাদ্দামকে সমর্থন দিয়েছি।’
মার্কিন চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর দেশের শত্রুতার কারণ উদ্ঘাটন করে বলেছেন, ‘মার্কিন কর্তাব্যক্তিরা ও তাদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলো সবসময়ই ইরানকে পৃথিবীর সবচেয়ে ‘বিপজ্জনক দেশ’ হিসেবে প্রচার চালিয়ে আসছে। ডেমোক্রেট নেতা বার্নি স্যান্ডার্স বলেছেন, ইরানের শাসক মোসাদ্দেককে উৎখাত করা ছিল একটি বিপর্যয়। আমেরিকার উচিত নয় কোনো সরকারকে এভাবে উৎখাত করা এবং এটা অনৈতিক। কারণ, এর ফলে ওইসব এলাকায় অস্থিতিশীলতা ও বিপর্যয় নেমে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে এধরনের অস্থিতিশীলতা ও বিপর্যয় অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সৌদি জোট। কিন্তু ইরান আজ হাজার হাজার শহীদের রক্তের ওপর মর্যাদা ও শক্তিমত্তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে এবং জনগণ ইসলামি বিপ্লবকে ধরে রেখেছে।
লক্ষ্য করার মত বিষয় যে, ইরাকের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের সময় ইরানের পররাষ্ট্র নীতিই ছিল জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় শত্রুর হুমকি ও আগ্রাসন মোকাবেলা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। এ ছাড়া, জাতীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা ও ইসলামি বিপ্ল¬বী সরকার ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা ছিল অন্যতম লক্ষ্য। ইরানের বিরুদ্ধে ইরাকের যুদ্ধ শুরুর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি সরকার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা এবং সীমান্তবর্তী খুজিস্তান প্রদেশ দখল করা। যুদ্ধের শুরুতে সাদ্দাম হোসেন বলেছিলেন, ‘ইরানের ইসলামি বিপ্ল¬বী সরকারকে উৎখাত করাই এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য।’
১৯৮১ সালে ছয়টি আরব দেশ নিয়ে পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা পিজিসিসি গঠিত হয়। বলা হয়েছিল, ইরানের ইসলামি বিপ্ল¬বের প্রভাব ও প্রচার ঠেকানোই এ জোট গঠনের উদ্দেশ্য। ইরানের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের সময় একমাত্র সিরিয়া ছাড়া অন্য সব দেশ তৎকালীন ইরাককে সহযোগিতা করেছিল। যুদ্ধের পরও আরব দেশগুলো ইরাকের সাদ্দামকে সহযোগিতা দেয়া অব্যাহত রাখে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে পারস্য উপসাগরের পানিসীমা থেকে ইরাক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে সেসময় পিজিসিসিভুক্ত আরব দেশগুলো ইরাকের প্রতি সহযোগিতার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আমেরিকার সমর্থন নিয়ে এ দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি শত্রুতা করতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৭ সালে হজের সময় বহু ইরানি হাজিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
ইরান তার বিরুদ্ধে এধরনের সকল বৈরিতার অবসান ঘটাচ্ছে কার্যকর এক পররাষ্ট্রনীতির সাহায্যে। পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে ইসলামি ইরানের আরেকটি নীতি হচ্ছে প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্যের কোনো বৃহৎ শক্তির ওপর ভরসা না করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো। মার্কিন নেতৃত্বে পাশ্চাত্য এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে প্রাচ্যের শক্তিকে ইরান সা¤্রাজ্যবাদী হিসাবে মনে করত। এই দুই পরাশক্তির বিরুদ্ধে ইরান একাই রুখে দাঁড়িয়েছিল। তবে একটি শক্তির পতনের পর আরেকটি শক্তির কাছ থেকে কখনো কোনো সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করেনি ইরান সরকার। বরং ইরান নিজের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং পরাশক্তিগুলোর ওপর থেকে নির্ভরতা না করার নীতিতে অটল থাকে। ইরানের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের সময় আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরাকের সাদ্দামকে সহযোগিতা করেছিল। এমনকি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে ওয়াশিংটন বাগদাদকে উস্কানি দিয়েছিল। বাস্তবতা হচ্ছে, ইরানে ইসলামি বিপ্লব ¬বিজয় ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের হাতে মার্কিন কূটনীতিক আটকের ঘটনা আমেরিকার সমস্ত অহংকার চুরমার করে দিয়েছিল।
পশ্চিমা দেশগুলোর ধারণা প্রথমত, ইরানের বিজয় মানেই পাশ্চাত্যে জ্বালানি সরবরাহ হুমকি মুখে পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, মার্কিন মিত্র আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আর তৃতীয়ত, আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। চতুর্থত, সার্বিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগর এলাকায় মার্কিন স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব কারণে আর্থ-রাজনৈতিক ও সামরিকসহ সমস্ত শক্তি ব্যবহার করে আমেরিকা ইরানের বিজয় ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। ইরানের প্রধান নীতি হচ্ছে সারা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাধীন নীতি মেনে চলা। ইরান এমন এক শান্তিময় বিশ্ব গড়ার চেষ্টা করছে যেখানে যুদ্ধ ও মারণাস্ত্র ব্যবহারের কোনো জায়গা থাকবে না। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, তাহলে ট্রিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ব্যবসার কী হবে।
ইরানে ইসলামি বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেইনী (র.) বলেছিলেন, ‘আমেরিকা হোক কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়ন হোক, আমরা কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গেই আপোস করব না।’ 
ইরানের সংবিধানের ১৫২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘ইরানের পররাষ্ট্র নীতি হবে আধিপত্যবাদ প্রত্যাখ্যান করা, দেশের সর্বাঙ্গীন স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, আধিপত্যবাদী পরাশক্তিগুলোর ব্যাপারে জোটনিরপেক্ষ থাকা এবং যুদ্ধে জড়িত নয়Ñ এমন দেশগুলোর সাথে পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা ও বিশ্বের সব মুসলমানদের অধিকার রক্ষা করা।’
ইসলামি বিপ্ল¬বের পর গত ৪০ বছর ধরে পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে ইরান এ নীতি মেনে চলছে। অথচ এই সেই ইরান যেখানে আমেরিকার সামরিক উপদেষ্টাদের সংখ্যা এত বাড়ানো হয় যে, ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের মাত্র এক বছর আগে ৪৫ হাজার মার্কিন উপদেষ্টা ইরানে উপস্থিত ছিল। এমনকি তাদের লাখ লাখ ডলারের বেতনও ইরানকে পরিশোধ করতে হত। ৪৫ হাজার মার্কিন সামরিক উপদেষ্টার উপস্থিতির ফলে ইরানকে বিপুল অংকের অস্ত্র আমেরিকার কাছ থেকে কিনতে হত। এসব অস্ত্র দিয়ে তৎকালীন রেজা শাহ সরকার মধ্যপ্রাচ্যে পুলিশি ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং মার্কিন নীতি বাস্তবায়ন করতেন।
১৯৭৪ সালের ৬ আগস্ট মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের তেহরান সফরের সময় স্বৈরাচারী রেজা শাহের অর্থমন্ত্রী হুশাঙ্গ আনসারি বলেছিলেন, ‘ইরানের অতীতের শাসকরা বলতেন, আমেরিকার একার পক্ষে বিশ্বে তাদের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে না এবং সে কারণে তাদের নির্ভরযোগ্য বন্ধুর প্রয়োজন হবে। তাই ইরান আমেরিকার সর্বোত্তম বন্ধু হতে পারে।’
কিন্তু কথায় আছে, আমেরিকা যার বন্ধু হয় তার শত্রুর অভাব হয় না। ইরান এধরনের বন্ধু ছাড়াই এখন সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে একাই দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণে ‘বাব্র-৩৭৩’ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে যা রাশিয়ার এস-৩০০এর সমকক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কিংবা ফ্রান্সের এয়ারবাস ইরানকে যাত্রীবাহী বিমান দিতে না চাইলেও বিকল্প ৭২ আসন বিশিষ্ট যাত্রীবাহী বিমান তৈরির কাজ ইরানের প্রযুক্তিবিদ ও প্রকৌশলীরা শুরু করেছেন। বিশেষ করে কম খরচে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রযুক্তি ইরানের কাছ থেকে ক্রয়ের জন্যে অনেক দেশই আগ্রহ অপেক্ষা করছে। সস্তা জ¦ালানি একটি কৌশলগত পণ্য এবং তা ব্যবহার করে উৎপাদনশীল খাতের বিকাশ ও আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো দেশ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে টিকে থাক, অর্থনীতিকে গতিশীল করুক যুক্তরাষ্ট্র তা কখনো চায় না। এজন্যেই ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এত মাথা ব্যথা যুক্তরাষ্ট্রের। কিন্তু কোনো দেশে ইরান আগ্রাসন চালিয়েছে বা বোমা ফেলেছে এমন কোনো নজির আজ পর্যন্ত নেই। তারপরও দশকের পর দশক ধরে মিথ্যা অজুহাতে ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার জন্যে ধারাবাহিক অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আইএস জঙ্গি দিয়ে তেহরানে পার্লামেন্ট ভবন ও ইমাম আয়াতুল্লাহ খোমেইনীর মাজারে হামলা চালিয়ে সন্ত্রাস কিংবা বিক্ষোভের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে তথাকথিত মার্কিন রেজিম চেঞ্জ বা বিহেভিয়ার চেঞ্জ ফর্মুলা কোনো কাজে আসেনি। অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে বিকল্প বাজারের সন্ধান ও বিনিয়োগে কূটনৈতিক তৎপরতা যে সফল হচ্ছে তার একটি উদাহরণ হচ্ছে চীন ইরানের তেল ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করছে। চবাহার বন্দরে ভারত বিনিয়োগ করছে এবং সুয়েজখালের মধ্য দিয়ে যাতায়াত ব্যতিরেকে আন্তর্জাতিক এক নৌরুট চালু করছে ইরান যার ফলে বিশ্ববাণিজ্যে কম সময় ও কম অর্থ খরচ করে আমদানি রফতানি করা সম্ভব হবে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীন ও এশিয়ার এক সংযোগ রেলপথ ইউরোপের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে ইরান। ভারতে ইরানের ব্যাংক অব পাসারগাদএর যাত্রা উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ এবং এ অঞ্চলে ডলারের বিকল্প নিজস্ব মুদ্রায় ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের এক নতুন সন্ধিক্ষণের সৃষ্টি হয়েছে।
এমন এক সময় ইরান তার ইসলামি বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে যখন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর রাজনৈতিক যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। এরআগে অন্তত ৪ দশক ধরে অর্থনৈতিক যুদ্ধ মোকাবেলা করে ইরান বিশ্বকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, দেশটি এক ঘরে হয়নি; বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার সার্বক্ষণিক বিরোধিতাকারী যুক্তরাষ্ট্রই এখন একঘরে হয়ে পড়ছে। ইসরায়েলের ইন্ধনে পরমাণু সমঝোতা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা আর আগের মত নেই। একসময় বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে সবার মাথার ওপর ছড়ি ঘুরাতে পারত সেই দিন কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। ইরানের দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থান চীন, রাশিয়া, ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে অর্থনৈতিকভাবেও মোকাবেলা করার সাহস যুগিয়েছে। কানাডা কিংবা জাপানের মত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো বাণিজ্য যুদ্ধে সমানতালে যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবেলা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধনে ব্রিটেন ব্রেক্সিট সংকটে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছে যা দেশটির মারাত্মক হুমকিতে ফেলেছে। বিশ্বপরিস্থিতি এখন অনেকটাই পরিস্কার যে মার্কিন ইন্ধনেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট ধারাবাহিকভাবেই সৃষ্টি হচ্ছে। সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে ভেনিজুয়েলা। ভেনিজুয়েলার তেলের দিকে নজর পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের, গণতন্ত্র সেখানে উপমা মাত্র। আর এ থেকে সংকট নিরসনের নাম করে বা কোথাও সংকটকে পুঁজি করে যুদ্ধময় পরিস্থিতি ও অস্ত্র বিক্রির ব্যবসা ফেঁদে বসছে মার্কিনীরা। অথচ ইরান এ পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রমী এক দেশ। 
এখন পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, ইরানের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতা নস্যাৎ হলে ইউরোপের নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকটে ও অর্থনৈতিক মন্দায় ইউরোপে ইরানের জ¦ালানি রফতানির উদ্যোগ শুধু আশার ঝলক দেখাচ্ছে না, রাশিয়া, তুরস্ক, চীন এক্ষেত্রে যে এক অভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আগাচ্ছে তার নেপথ্যের অন্যতম কারিগর যে ইরান তা দেশটির প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফের গত কয়েক বছরের বিদেশ ভ্রমণ ও বিভিন্ন উদ্যোগ বিশ্লেষণ করলে জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায়। ইসরায়েলের ইন্ধনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক পরমাণু সমঝোতা বা জেসিপিওএ থেকে সরে এসে কথিত আরব ন্যাটো তৈরি করতে চাইলেও কাজ হয়নি। বরং সিরিয়া থেকে মার্কিন সৈন্যকে হটতে হচ্ছে। ইউরোপ তাহলে কেন ইরানের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতা থেকে বের হয়নি। কারণ, সে জানে এটি বানচাল হলে ইউরোপ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। জার্মানি এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচস্থায়ী সদস্যকে নিয়ে গঠিত ছয় জাতিগোষ্ঠী ২০১৫ সালের জুলাই মাসে ইরানের সঙ্গে জেসিপিওএ সই করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আর সবাই এতে এখনো অবিচল রয়েছে।
বরং যুক্তরাষ্ট্র দফায় দফায় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা থেকে সরে আসতে যে চাপ সৃষ্টি করছে তা আগেভাগে জেনেশুনেই বরং ইউরোপ ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিল। মার্কিন ডলার ছাড়া যে বিকল্প লেনদেনে দুটি দেশ অভিন্ন মুদ্রায় নিজেদের মধ্যে আন্তর্জাতিক ব্যবসা অক্ষুণœ রাখতে পারে সে পথও দেখিয়ে দিয়েছে ইরান। ভারত, রাশিয়া, চীন সহ অনেক দেশই এখন ইরানের সঙ্গে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন করতে শুরু করেছে। সেখানে এসপিভি নামে পরিচিত ইরানের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের বিশেষ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে ইউরোপের বিলম্বে সতর্কবার্তা দিয়ে ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খাররাজি পরমাণু সমঝোতার আওতায় অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আইনি অধিকার ইরানের আছে উল্লেখ করে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইউরোপকে এটি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অবরোধে অর্থনৈতিকভাবে যদি ইরান পর্যুদস্ত হয়ে থাকত তাহলে কাতারের ওপর সৌদি জোটের অবরোধে কীভাবে দাঁড়ায় দেশটি। জরুরি খাদ্যসহ অন্যান্য সাহায্য অব্যাহত রাখায় কাতার এজন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে ইরানের কাছে। কিছু দিন আগে লেবাননে আরব দেশগুলোর সামিট হলে সেখানে কাতার যোগ দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ভেতরে ভেতরে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে পরাশক্তির সাহায্য ও লেজুরবৃত্তি ছাড়া কীভাবে ইরান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। ইরান ও প্রতিবেশী আযারবাইজানের মধ্যে সামারিক সহযোগিতা জোরদার করতে চুক্তি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যে ইরাককে ইরানের বিরুদ্ধে ৮ বছরের যুদ্ধে লিপ্ত করতে বাধ্য করেছিল সেই ইরাকের পুনর্গঠনকাজে ইরান কাজ করছে। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের ঘটনায় ইরানকে একমাত্র বিজয়ী বলে আখ্যা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ১,৩০০ পৃষ্ঠার একটি গবেষণা প্রতিবেদনে মার্কিন সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের ভুল ও সফলতা নিয়ে পর্যালোচনা করেছে। এতে ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন ও দখল, সেনা প্রত্যাহার, উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশের উত্থান এবং ইরান ও সিরিয়ার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করা হয়। গবেষকদের সবাই বলেছেন, ২০১৮ সালে এ প্রকল্প শেষ হওয়ার সময় মনে হচ্ছে ‘ইরানই একমাত্র বিজয়ী’।
লক্ষ্য করার মত বিষয় হচ্ছে, ইরানের কাছ থেকে যেসব দেশ তেল কিনছে তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্টের সম্পর্ক বেশ সংবেদনশীল এবং একই সঙ্গে রক্ষণশীল। সেক্ষেত্রে তাদের ইরানের কাছ থেকে তেল না কেনার ব্যাপারে খুব সহজেই চাপ সৃষ্টি করতে পারছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তা ধোপে টিকবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ, তেল উৎপাদন বাড়াতে ইরান সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে দরও কমিয়েছে। দরকষাকষিতে অন্য দেশের চেয়ে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে। আমদানিকৃত তেল দেশটিতে পৌঁছে দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধের সুবিধা তো আছেই। অধিক লাভ ও ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব মুদ্রায় বিকিকিনির এক টেকসই আন্তর্জাতিক লেনদেনও শুরু করেছে ইরান। ইরানের এধরনের কার্যকর অর্থনৈতিক কূটনীতি দেখে ব্রিটেনের শীর্ষ কূটনীতিক রিচার্ড ডালটন, যিনি একসময়ে ইরান ও লিবিয়ায় রাষ্ট্রদূত ছিলেন, তিনি বলছেন, তেহরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক যুদ্ধ মার খেতে বাধ্য। কারণ, এধরনের মার্কিন অবরোধে কার্যত আন্তর্জাতিক কোনো সমর্থন নেই। ট্রাম্প যা করছেন তা একতরফা। বরং ইরানের বিরুদ্ধে এধরনের মার্কিন অবস্থান বৈধ বাণিজ্যকে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের পক্ষে যাচ্ছে এবং মিত্রদের দুর্বল করছে। বলা হচ্ছে মার্কিন জনগণের জন্যে ইরান পয়লা নম্বরের হুমকি। এর কোনো স্বচ্ছতা নেই। ইরানে শাসন পরিবর্তন বা শাসকের আচরণ পরিবর্তনের মার্কিন খায়েশও বিদ্রƒপাত্মক। বরং যুক্তরাষ্ট্র কোনো স্বাভাবিক রাষ্ট্র নয়। ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ইসরায়েল যা কিছু করছে তাকে সমর্থন, ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসনকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে, অস্ত্র বিক্রি কিংবা প্রভাব খাটানো ছাড়া সেখানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বা মানবতার লেশমাত্র নেই।

কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া ট্রাম্পের এধরনের ইরান বিরোধিতা বেশি দূর অগ্রসর হতে পারবে না। মুদ্রাস্ফীতি ও মন্দা কাটিয়ে উঠতে ইরান যা যা দরকার তা করছে। বরং ইরানে মার্কিন বিরোধিতা আরো বাড়বে। ইরানের নেতারা ঝড়োহাওয়ার বিপক্ষে চলতে অভ্যস্ত ও দৃঢ়। সবচেয়ে বড় বিষয় ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্মত কোনো প্রচারণা নেই। এমনকি ইউরোপ বা অন্য কোনো দেশের ওপর ইরান এককভাবে নির্ভরশীল নয়। ইরান সম্পর্কে ট্রাম্প যে ধরনের কথাবার্তা বলেছেন তা যুদ্ধের চেয়ে ভয়াবহ এবং তা তাকে আরো অধিক ঝুঁকিতে নিয়ে গেছে। তিনি ইরানের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার মত ব্রেক থ্রু চেয়েছিলেন। কিন্তু দেশটি ইরান। নেতৃস্থানীয় মার্কিন রাজনীতিবিদরা একমত যে, সমঝোতা থেকে বের হয়ে ট্রাম্প কল্পনাপ্রসূতভাবে ইরানের বিরুদ্ধে একতরফা অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে এক অজানা আশঙ্কার মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া বরং নিজেদের মধ্যে ফারাক আরো কমিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছে। অথচ প্রায় এক যুগের মত ইরান আলোচনার জন্যে উন্মুক্ত থেকে প্রয়োজনে বেশ ছাড় দিয়ে পারমাণবিক সমঝোতায় পৌঁছেছিল। এটি এখনো আলোচনায় অংশ নেয়া দেশগুলো ও জাতিসংঘের কাছে অনুসরণীয় হয়ে আছে।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বরং ইরানের পক্ষে। ইরানের আচরণ নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রকে আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। ওয়াশিংটনকে ফের সম্মানের মাপকাঠি দেখিয়ে বাস্তবসম্মত শর্তাবলির সাথে আলোচনা শুরু করার চেষ্টায় আনলেও ইরান তাকে কেন বিশ্বাস করবে? আর যাই হোক, যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামত ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্রের পরিসীমা নির্ধারণ করবে না। সিরিয়ায় যেভাবে ইসরায়েল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তার বিপরীতে তেলআবিবে হামলার সুযোগ করে দিচ্ছে মাত্র। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে শান্তি বসতির এক যৌক্তিক অবস্থান তৈরি করেছিল ইরান পারমাণবিক সমঝোতায় যেয়ে। কিন্তু তা ছুড়ে ফেলা হয়েছে। মার্কিন খবরদারিত্বে আর কোনো কাজ হচ্ছে না। তাহলে ইরানের সঙ্গে আলোচনার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদভিত্তিক জোট থেকে সরে এসে ওয়াশিংটনকে বরং চিরতরে আফশোস করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতিতে ব্রিটেনে জাতীয়তাবাদের ঢেউ তুলে ব্রেক্সিটের মত যাতে ইউরোপের অন্যকোনো অখ-তা বিনষ্ট করতে না পারে সেজন্যে ফ্রান্স ও জার্মানি চুক্তি করেছে। পুরো পরিস্থিতি এখন কেবল যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতাকে প্রদর্শন করবে মাত্র।

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অবরোধ যতই শক্ত হতে চাইবে ততই মার্কিন ডলারের ক্ষমতা আলগা হতে থাকবে। কারণ, ডলার প্রভাবিত আর্থিক লেনদেনের এক বিকল্প খুঁজে পেয়েছে ইরান। ইরানকে তেল, শিপিং, ব্যাংক ও বিনিয়োগের বিকল্প পথের সন্ধান পাওয়ার জন্যে মার্কিন অবরোধ ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। হ্যা, এজন্যে ইরানের ওপর চরম অন্যায় চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। অমানবিকভাবে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আমদানিতেও বাধা দেয়া হয়েছে। কিন্তু ইউরোপের সঙ্গে যে ডলারের পরিবর্তে ইরান বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে তা ডলারের তেজীভাব রুখে দেয়ার জন্যেই কাজ করবে। সুতরাং মার্কিন ডলারকে অবরোধের মাধ্যমে যে হাতিয়ার হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন ট্রাম্প তা বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে শুরু করেছে। ডলার স্বাভাবিকভাবে প্রভাব হারাতে শুরু করছে। সস্তা তেল বা অন্য কোনো পণ্য যদি বিভিন্ন দেশ ইরান বা অন্য কোনো দেশ থেকে তেজীভাবের ডলারের মাধ্যমে লেনদেনের পরিবর্তে নিজস্ব মুদ্রায় আমদানি বা রফতানি করার সুযোগ পায় তাহলে কেন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কোন ভরসায় থাকবে। আর ইরানের ওপর এই প্রথম কোনো দেশ অবরোধ দিয়ে বসেনি। ইরান অবরোধের বিরুদ্ধে যে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করেছে তা অনুসরণ করে কাতার সৌদি জোটের অবরোধকে পাত্তাই দিচ্ছে না। হ্যা, ইরানের ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক লেনদেন আগের মত করতে পারছে না, কিন্তু বিকল্প যে বাণিজ্য চীন, রাশিয়া ও ভারত সহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গড়ে তুলছে ইরান তা রাশিয়াকেও মার্কিন অবরোধের বিপক্ষে পথ দেখাচ্ছে। এরই মধ্যে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ, কানাডা বা জাপানের মত দেশগুলো আগের মত যুক্তরাষ্ট্রের কথায় ওঠবস করার মত নতজানু অবস্থা থেকে বিকল্প পথের সন্ধানের জন্যে তাগিদ দিচ্ছে।

ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-ইভস লা দ্রিয়াঁ বলেছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরানের সঙ্গে বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক লেনদেন চালু রাখার বিশেষ ব্যবস্থাÑ এসপিভি শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে। মূলত, ইউরোপের সঙ্গে ডলার-বহির্ভূত লেনদেনের জন্য এই ব্যবস্থা চালু হবে; তবে এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে ইরান সারাবিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেন করতে পারবে। লা দ্রিয়াঁ বলেন, ইরান যাতে তার রপ্তানিকৃত তেলের বিনিময়ে ইউরো সংগ্রহ করতে এবং একইসঙ্গে প্রধান তিন ইউরোপীয় শরীকের কাছ থেকে জরুরি পণ্য কিনতে পার সেজন্য এই ব্যবস্থা চালু করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক সমঝোতা থেকে সরে গেলেও তিন ইউরোপীয় দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি এবং চীন ও রাশিয়া পরমাণু সমঝোতায় অটল থাকার ঘোষণা দেয়। একইসঙ্গে এসব দেশ ইরানকেও পরমাণু সমঝোতা ত্যাগ না করার আহ্বান জানায়। তবে ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান আলী আকবর সালেহি অবশ্য বলেছেন,‘এসপিভি’চালুর কথা ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনেক দিন ধরে বলে আসছে। বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই ইউরোপকে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা উচিত।

বরং যুক্তরাষ্ট্রের রেজিম চেঞ্জ সিরিয়া, ইরাক ও লিবিয়া থেকে লাখ লাখ উদ্বাস্তুকে ইউরোপ সহ অন্যান্য দেশে এক অজানা আশঙ্কায় ফেলে দিয়েছে। ইরানের নেতৃত্ব এধরনের বিশৃঙ্খলা যাতে তাদের দেশে সৃষ্টি হতে না পারে সেজন্যে তেলনির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও পুঁজির সঠিক ব্যবহার করছেন। নবায়নযোগ্য জ¦ালানি উৎপাদন বাড়ছে। উৎপাদনশীল খাতের অন্যতম উপাদান ইস্পাত উৎপাদন গত বছরের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৭ শতাংশ। শেয়ার বাজারে ধস, সন্ত্রাস, বিক্ষোভের মত অস্থায়ী গ-গোল করে সরকার ফেলে দেয়ার মার্কিনী কোনো অপচেষ্টা ইরানে পাত্তা পাচ্ছে না। অভূতপূর্ব স্তরের উত্তেজনা বাড়াতে ইরানের তরুণ সম্প্রদায়কে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করে ফল পায়নি যুক্তরাষ্ট্র। ইরানে উত্তেজনা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বিচ্ছিন্ন করা এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দিবাস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এবং ভীতিকর কোনো পরিস্থিতিতে ইরানকে কাবু করার খোয়াব দেখতে যেয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেই দিশেহারা। মার্কিন প্রশাসনে এত ব্যাপক রদবদলও আগে চোখে পড়েনি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেয়ী বারবার হুঁশিয়ার করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে চক্রান্ত ও নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তাজনিত বিপজ্জনক পদক্ষেপের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধময় পরিস্থিতি তৈরির জন্যে চরমভাবে কাজ করছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল ইরানে এবারের গ্রীষ্ম হবে খুবই কঠিন এবং তা ইরানের বিপ্লব কখনো দেখেনি। কিন্তু ইরানের গ্রীষ্ম এবার খুবই ভালভাবে কেটেছে এবং বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী চমৎকারভাবে পালন করছে। আদতেই ট্রাম্পের নীতি কোনো কাজ করেনি। ইতিহাসবিদদের স্মরণে রয়েছে ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি তার আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্র দিবস পালন করেছিলেন এবং তার মাত্র কয়েক বছর পর তার শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। এমনকি ইরানের অনেক কৃতি ব্যক্তিও ধারণা করতে পারেননি যে, ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব দেশটিতে এক পরিণতি লাভ করবে। তেমনি ২০১৩ সালেও কেউ ধারণা করতে পারেননি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির আমলে নির্বাচনের পর ২০১৫ সালে পারমাণবিক সমঝোতায় উপনীতি হবে দেশটি। কোনো কোনো ইরান বিশেষজ্ঞ মনে করেন দেশটির ৮২ মিলিয়ন জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ ডাইহার্ট ইসলামি বিপ্লবের সমর্থক। তর্কের খাতিরে যদি তা সত্যিও ধরে নেয়া যায় কিংবা ২০জন বিপ্লবের সমর্থকের একজনও অস্ত্র তুলে নেয় তাহলেও ৬ লাখ জানবাজ যোদ্ধার একটি দল তৈরি হয়ে যাবে যারা বাসিজ, আনসার, হিজবুল্লাহ বা বিপ্লবী গার্ডের সদস্যের মত সদা প্রস্তুত রয়েছেন যাদের কাছে বেলায়াতে ফকিহ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্যে সংগ্রাম করার সময় জীবন খুবই তুচ্ছ মনে হবে এবং বছরের পর বছর তাঁরা প্রয়োজনে যুদ্ধের ময়দানে লড়ে যাবেন। ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসহাক জাহাঙ্গিরি বলেছেন, ইরান যদি ইরাক ও সিরিয়ার পাশে না দাঁড়াত তাহলে এতদিন আইএস জঙ্গিরা মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের ক্ষমতায় বসে থাকত। মার্কিন প্রভাবশালী সাময়িকী ‘ফরেন পলিসি’ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা চিন্তাবিদ হিসেবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র কুদ্স বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সুলাইমানির নাম ঘোষণা করে। সাময়িকীটি তাদের ১০ম বার্ষিকীর বিশেষ সংস্করণে ১০টি বিভাগে বিশ্বের ১০ জন সেরা ব্যক্তিত্বকে বেছে নেয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ইরানকি তার সঠিক পথেই আছে। ইরানের সমর্থকরা কী বলছে তার চেয়ে বরং দেখা যাক অবরোধকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া কী বলছে। মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে অন্য কোনো মুসলিম দেশই ইরানের মত উপযুক্ত ভূমিকা রাখতে সক্ষম নয়। ইরানের অসাধারণ সম্পদ, অবস্থান, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতার মত বিষয়গুলো অন্য কোনো মুসলিম দেশের নেই বলে দৈনিকটি উলে¬খ করেছে। দৈনিকটি সম্প্রতি ট্রাম্পকে পরামর্শ দিয়ে লিখেছে, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা চাইলে তার উচিত ইরানের সঙ্গে শত্রুতা বাদ দিয়ে আলোচনায় বসা।
দৈনিকটি আরও লিখেছে, ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব হওয়ার হওয়ার পর থেকে গত চল্লিশ বছর ধরে ইরান-মার্কিন সম্পর্ক বিদ্বেষপূর্ণ থেকেছে। ট্রাম্পের শাসনামলে এই সম্পর্ক আরও শোচনীয় হয়েছে। ১৯৭৯ সনে ইরানের বিপ্লবী ছাত্রদের হাতে মার্কিন দূতাবাস দখলের ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত কূটনীতিকদের অন্যতম জন লিমবার্টও বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ না করাটাই সবচেয়ে ভাল পন্থা। সাবেক এই মার্কিন কূটনীতিক তাঁর পরিবার ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে ইরান সফর করতে আগ্রহী ও তিনি ইরানকে মার্কিনীদের কাছে পরিচিত করার ব্যাপারে সাহায্য করতে চান।
ইসলামি বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী উপলক্ষে দেশটির বিভিন্ন স্থানে চলমান সামরিক প্রদর্শনীর প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় চলমান এসব প্রদর্শনীতে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ৫৬০টিরও বেশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হচ্ছে। জেনারেল শেকারচি বলেন, আধিপত্যকামী ও জালিমদের মোকাবেলায় মজলুমদের রক্ষার জন্যই ইরান সামরিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও অগ্রগতি অব্যাহত রেখেছে।
ডলারের বিরুদ্ধে অবস্থান ইরানকে অনেকটা বাধ্য হয়েই নিতে হয়েছে।ইরানের ওপর অবরোধের মূল লক্ষই হচ্ছে দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়া। ইউরোপের কোনো দেশ যদি ইরান, ইরাক বা রাশিয়া থেকে তেল কিনে তাও ইউরো নয়, কিনতে হয় মার্কিন ডলার দিয়ে। কিন্তু এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পক্ষের কোনো ভূমিকাই নেই। অথচ এ লেনদেনে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে ডলার তেজী হয়ে ওঠায় বা এর চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে অনায়াসে এবং এর বলে যুক্তরাষ্ট্র সবার মাথার ওপর ছড়ি ঘুরানোর সাহস পাচ্ছে। তাই নিজস্ব মুদ্রায় ইরান বিভিন্ন দেশের সঙ্গে লেনদেন সম্পর্ক গড়ে তুলছে। গত আগস্টে ইরান থেকে পণ্য আমদানির ব্যাপারে ১৮ মিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজ ঘোষণা করে। পিটাসবার্গের তেল ও গ্যাসবিষয়ক লেখক নিক কানিংহাম মনে করেন এভাবে ডলারের বিকল্প মুদ্রায় আন্তর্জাতিক লেনদেন বাড়তে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রভাব খর্ব হতে বাধ্য। ইরানের তেলের ৭০ শতাংশ আমদানিকারক দেশ হচ্ছে চীন, তুরস্ক, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। এরা ইরানের সঙ্গে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যিক লেনদেন করতে শুরু করেছে। চীন একাই ইরানের তেল রফতানির এক চতুর্থাংশ নিয়ে থাকে। 
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, ইরান নিয়ে এত দুশ্চিন্তায় কেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কেন বিনামেঘে ইরানের বিরুদ্ধে তিনি বাকওয়াজ বজ্রপাত ঘটিয়ে চলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঞ্চল কি ইরান দখল করে নিয়েছে? মার্কিন সীমান্তের কাছে ইরান কি কোনো সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে? আন্তর্জাতিক সভাগুলোতে ট্রাম্প কেন ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্যে এত বকবক করছেন। কেন তিনি তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছেন। কই তেহরান তো কোনো দেশের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছেনা; বরং পুরোপুরি প্রকৃতপক্ষে সঠিকভাবে, শান্তভাবে এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে আন্তর্জাতিক আইন ও আচরণবিধি অনুযায়ী আচরণ করছে। অথচ ইরানের বিরুদ্ধে জন বোল্টন, মাইক পম্পেও ও নিকি হ্যালি গং একই ভাষায় কোরাস গাইছেন? জাতিসংঘে ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি এসহাগ আল হাবিব নিরেট প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো ইরানি নাগরিক কখনো মার্কিন নাগরিকের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করেনি, কিন্তু মার্কিনী শাসকদের আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী নীতির কারণে দুটি দেশের জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ কিংবা আন্তর্জাতিক নীতি ভঙ্গ না করলেও ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক সমঝোতা থেকে যুক্তরাষ্ট্র বের হয়ে গেছে। বিচারবহির্ভূত এধরনের মার্কিন আচরণের জন্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দাঁড়ানো উচিত ছিল। অবরোধ আরোপ করে মধ্যপ্রাচ্যে একটি দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশকে মুখোমুখি শত্রুতে পরিণত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক যেসব কোম্পানি তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করছে সেগুলোতো মার্কিন অনুমোদনের কোনো প্রয়োজন মনে করেনি। অবরোধ দিয়ে তাদের ইরানের সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শক্তি ছাড়া কূটনৈতিক পথে ধীশক্তির ব্যবহার আদতেই ট্রাম্প জানেন না। তাই তেহরানে নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত রিয়ু জিওং বলেছেন, সিওল জানে ইরানের বাজার তাদের জন্যে কত গুরুত্বপূর্ণ! গত বছর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেন ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ইরাকের সঙ্গে ইরানের লেনদেন ছাড়িয়েছে ২০ বিলিয়ন ডলার। যাই হোক, ইরানের শাসকরা সিদ্ধান্ত নিতে জানেন এবং এজন্যে তাঁরা কখনো বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর করেন না। উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন জঙ্গি বিমান ভর্তি যুদ্ধ জাহাজ পাঠালেও তাতে কোনো লাভ হবে না। এটা হিরোশিমা বা নাগাসাকি নয়Ñ ভিয়েতনামও নয়। মার্কিনীরা এসব দেশে যা করেছে তাতে সেখানকার মাটি এখনো বিষাক্ত হয়ে আছে, কোনো সব্জি বা ফল গাছ জন্মে না। একবিংশ শতাব্দীতে দুনিয়া অনেক পাল্টে গেলেও মার্কিন রাজনীতিবিদরা এখনো দাসত্ব ও ঔপনিবেশিক ধ্যানধারণায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়ে বিগ স্টিক পলিসি নিয়ে দেশ দখলের খোয়াব তাঁরা এখনো দেখছেন। আফ্রিকা, এশিয়া ও ল্যাতিন আমেরিকার মানুষকে তাঁরা এখনো দাস মনে করছেন। কিন্তু সেসব দিন কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী শামখানি যথার্থ বলেছেন, তাঁর দেশের বিরুদ্ধে যে কোনো আঘাত পাল্টা ১০গুণ আঘাত হয়েই ফিরে যাবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে ইরানিরা নিজেদের রক্ষার সক্ষমতা অর্জন করেছে।বরং যুক্তরাষ্ট্র যে একঘরে হয়ে পড়েছে তার প্রমাণ হচ্ছে ইউনেস্কো, জাতিসংঘ, ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি ও ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট মার্কিন নীতিকে অনুমোদন দিচ্ছে না।
অথচ মার্কিন অবরোধ সত্ত্বেও সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রদেশ আমিরাতের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য গত বছর মার্চে ১৬.৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দুই দেশ ওমান ও কাতারের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেড়েছে। ইরানের তেল খাতে রাশিয়া ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এর আগে দেশটির সঙ্গে জ্বালানি খাতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ চুক্তি হয়। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং দক্ষিণ আফ্রিকার ব্রিকস সম্মেলনে বলেন, নতুন ধরনের এক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে দেশটি যার অন্যতম অংশীদার হচ্ছে ইরান। ইরান তার ওপর অবরোধ সত্ত্বেও কীভাবে নতুন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ভূকৌশলগত অবস্থান থেকে ভিন্ন মানচিত্র গড়ে তুলছে তা বুঝতে হলে ইসলামি বিপ্লবের রূপকার ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ)-এর সেই চিরন্তন বাণীর কথা মনে পড়ে যায়। তিনি ইরানি জাতিকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘আমার এই শেষ ইচ্ছা ও নির্দেশনামার মাধ্যমে প্রিয় জাতির প্রতি আমার হৃদয়স্পর্শী ও সেবাব্রত মন নিয়ে অসিহত- আপনারা সজাগ দৃষ্টিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করুন। প্রাচ্য ও পাশ্চত্যের ওপর নির্ভরশীল রাজনীতিবিদরা যেন তাদেরই ইবলিসি কু-প্রচারণার মাধ্যমে আপনাদেরকে এই আন্তর্জাতিক লুটেরাদের বশীভূত করে না ফেলে। দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও অক্লান্ত প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরাধীনতার অবশিষ্ট আলামতগুলোকে নির্মূল করার জন্যে জেগে উঠুন।এ সম্পর্কে নিশ্চিত হন যে, আর্য এবং আরবরা ইউরোপিয়ান, আমেরিকান বা সোভিয়েতদের চেয়ে হীন প্রকৃতির নয়। আমি আপনাদের এই নিশ্চয়তা প্রদান করছি যে, একবার যদি আপনারা নিজেদের স্বরূপ আবিস্কার করতে সক্ষম হন, হতাশার চিহ্নটুকু ছুড়ে ফেলে দেন, আর অন্যের সাহায্য পাবার প্রত্যাশা পরিত্যাগ করেন, তাহলে অবশেষে আপনারা আপনাদের কর্মক্ষমতা ও সকল কিছুর উৎপাদন ক্ষমতার জ্বলন্ত প্রমাণ রাখতে সক্ষম হবেন।’ ইমামের এই অসিয়তই ইরানের নাগরিকদের অন্তর্নিহিত শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রসঙ্গত বলা যায়, বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এক হিসেবে ২.৪ ট্রিলিয়ন থেকে ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের অবৈধ অর্থায়ন ঘটে থাকে। এর সঙ্গে যোগ হয় মানব পাচার, অস্ত্র বিস্তার, সন্ত্রাসবাদ, নিষেধাজ্ঞা, ঘুষ ও দুর্নীতি ও জালিয়াতির সঙ্গে আরো কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের তহবিল। এধরনের অবৈধ তহবিলের আন্দোলনকে হ্রাস করার প্রচেষ্টায় বিশ্বব্যাপী সরকারগুলো আর্থিক অপরাধ আইনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। এই যখন আধুনিক বিশ্বের পারিপার্শ্বিকতা তখন এর পাশাপাশি আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও ভূকৌশলগত অবস্থানে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ইরান জানান দিচ্ছে কীভাবে অবরোধ মোকাবেলা করে পরিস্থিতি নিজেদের আয়ত্তে আনতে হয়। অবরোধ যখন পশ্চিমা কূটনীতির এক অমোঘ ও শক্তিশালী অস্ত্র তখন এ অস্ত্রকে ভোঁতা করে দিয়ে নিজস্ব জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও সম্পদ সৃষ্টির বিকল্প কৌশল নির্ধারণে ইরান সারাবিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। পশ্চিমারা এও বলে অবরোধ হচ্ছে শেষ ধাপ বা যুদ্ধ আরম্ভ করার আগের পর্যায়। অন্য কথায়, তারা এও বলে, স্মার্ট অবরোধ,স্মার্ট বোমা দ্বারা সফল হতে পারে। কার্যত দেখা যায় কোনো দেশের ওপর যে রাজনৈতিক শক্তি অবরোধ আরোপ করে ওই দেশটি তা থেকে মুক্ত হতে বিকল্প শক্তির আরো কাছাকাছি সহজেই পৌঁছে যায়। অর্থনৈতিক লাভ লোকসানের অঙ্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে যে, ইরানের ওপর অবরোধ চালিয়ে সে দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করবে, দেশটির নাগরিকদের মনে তাদের শাসকদের সম্পর্কে তীব্র হতাশা তৈরি করবে যা এক পর্যায়ে প্রচ- বিক্ষোভে রাজপথে নেমে পড়বে এবং এর সঙ্গে যোগ হবে বিশৃঙ্খলার সব ধরনের রসদ এবং প্রয়োজনে অবরোধ আরো কঠোর হয়ে চেপে বসবে প্রয়োজনে সামরিক আগ্রাসনও। আদতেই গত ৪০ বছর ধরে ইরান পশ্চিমাদের এই অবরোধের ডিনামিক্স থোরাই কেয়ার করে আসছে। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ যথেষ্ট। ২০০৬ সালে ইরানের ওপর অবরোধের আগে দেশটির কাছে হাজার খানেক সেন্ট্রিফিউজ ছিল। আর এখন এ সংখ্যা ১০ গুণেরও বেশি। বাস্তবতা হচ্ছে অবরোধ আরোপের পর ইরানের পারমাণবিক গতিশীলতা আরো ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যা পশ্চিমাদের উপেক্ষা করা ছাড়া আর কিইবা করার আছে। ইরানের সঙ্গে কূটনীতি বা সৃজনশীল উদ্যোগের পরিবর্তে অবরোধের জন্যে সময় ও শক্তি বেশি ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সঙ্গে দেশটির নাগরিকদের এক বিশাল সামাজিক মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ এবিসি নিউজ ও ওয়াশিংটন পোস্টের জরিপ বলছে, ৪৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলছেন, ট্রাম্পের ওপর তাদের কোন প্রকার আস্থা নেই।
অন্যদিকে এ অবরোধের ফলেই ইরানের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়ে তা ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অবরোধ দিয়ে ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে হোঁচট খাইয়ে দিতে পারলেও তা পরক্ষণেই ব্যাপকভাবে আগ্নেয়গিরির মত বা সুনামি শক্তি নিয়ে বিকল্প পথ ধরেছে। জ্বালানির ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প ধারার অর্থনীতির সন্ধানে ইরান খুব দ্রুত ও সহজে মিত্র হিসেবে পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষ শক্তির দেশগুলোকে। অবরোধ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যতই ইউরোপকে ইরানের বাজার থেকে সরানোর চেষ্টা করুক তা চলে গেছে চীনের হাতে। ভারত ছাড়াও রাশিয়া, তুরস্ক ট্রেড করিডোরের সম্পর্কে লাভবান হচ্ছে ইরানের সঙ্গে লেনদেন বৃদ্ধি করে। যুক্তরাষ্ট্র হুঙ্কারের সঙ্গে যে অবরোধ আরোপ করছে তা স্বভাবতই একধরনের দায়বদ্ধতা তৈরি করছে এবং তা নিরসনে উপযুক্ত শর্ত আরোপ করছে পাল্টাভাবে ইরান। পারমাণবিক সমঝোতা থেকে বের হয়ে যেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক্ষেত্রে দায় আরো বেড়েছে। এখন বল মার্কিনীদের কোর্টে। অবরোধ তারা তুলে নিতে পারে কিংবা বহাল রাখতে পারে তাতে ইরানের কিছুই যায় আসে না। অবরোধ হোক, সামরিক হামলা হোক কিংবা ইরানের বিজ্ঞানীদের হত্যা করা হোক, তেহরান থেমে থাকেনি। কারণ, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অজ্ঞতার ওপর ভরসা করে না। প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের এসব ধারাবাহিক অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা ন্যায়বিচারের ওপর আক্রমণ, যুদ্ধের একটি ক্ষুদ্র ঘোষণা ও ইরানি জাতিকে ভেঙ্গে দেয়ার এক নিষ্ঠুর কৌশল যা ওয়াশিংটন সা¤্রাজ্যবাদী প্রলোভনে যায়নবাদী সহায়তায় ইরানের নাগরিকদের স্বপ্নকে চুরি করতে চায়।
ইরান প্রকৃতপক্ষেই নিজের পায়ে সর্বক্ষেত্রে দাঁড়িয়েছে। ইরানের ইসলামিক ওয়ার্ল্ড সায়েন্স সাইটেশান সেন্টার, আই.এস.সি’র প্রধান মুহাম্মাদ জাওয়াদ দেহকানি বলেছেন, আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী বিপ্লব-পরবর্তীকালে ইরান বৈজ্ঞানিক দিক থেকে পূর্ববর্তীকালের তুলনায় উনিশ গুণ বেশি এগিয়ে গেছে। বৈজ্ঞানিক অবস্থানে ইরান এখন বিশ্বে ষোলোতম অবস্থানে রয়েছে। ন্যানো প্রযুক্তিতে ইরান বিশ্বের দশমতম স্থানে। জেনেটিক বিজ্ঞানে আঞ্চলিক ক্ষেত্রে প্রথম স্থানে রয়েছে। অ্যারোস্পেস সায়েন্সেও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে প্রথম এবং বিশ্বে ১৫তম অবস্থানে রয়েছে। কৃষি, খাদ্য ও শিল্প সহ সকল ক্ষেত্রে নিরন্তর গবেষণা ও জাতীয় স্বার্থের নিরিখে ইরানের সরকার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে যেমন পিছপা হয়নি তেমনি বহিঃশক্তির সঙ্গে কোনো আপোস করেনি। একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরো জানান, ইরান শিগগিরি ‘পাইয়াম’ (বার্তা) এবং ‘দোস্তি’ (বন্ধুত্ব) নামে দুটি স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠাবে। এসব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের বিশাল উন্নয়নের প্রমাণ মিলবে। তিনি জানান, এ দুটি স্যাটেলাইট সম্পূর্ণভাবে দেশীয় প্রযুক্তিতে ইরানি গবেষকরা তৈরি করেছেন এবং এতে কোনো দেশ কোনো রকমের সাহায্য করে নি।
গত নভেম্বরে ইরানের মাশহাদে হৃদরোগ নিয়ে এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে ইউরোপীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানী প্রফেসর ফ্রান্সিস্কো ফ্রেডরিক নাকারলা বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো চিকিৎসা ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শক্তি এখন হার্ড পাওয়ারের স্থান দখল করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল¬াহিল উজমা খামেনেয়ী তাঁর দেশের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদেরকে অবশ্যই বিজ্ঞান গবেষণা অব্যাহত ও তা জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইনস্টিটিউট ফর কগনিটিভ সায়েন্স স্টাডিজ এর কর্মকর্তাদের দেয়া সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে সর্বোচ্চ নেতা বলেন, গত ২০ বছরের বিজ্ঞান গবেষণার উন্নতি ভালো তবে এ উন্নতিকে আরো গতিশীল করতে হবে। সর্বোচ্চ নেতা বলেন, ‘যদি আমরা ধীরে চলি বা থেমে থাকি তাহলে বৈশ্বিক গবেষণায় আমরা পিছিয়ে পড়ব এবং আমরা অন্যদেরকে আর ধরতে পারব না; গবেষণার চূড়ায় আরোহণও করতে পারব না। অতএব, যাই ঘটুক না কেন, বিজ্ঞান গবেষায় বিরতি দেয়া যাবে না।’
ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থা বা এইওআই’র প্রধান আলী আকবর সালেহি বলেছেন, তাঁর দেশ নতুন ধরনের পরমাণু প্রযুক্তি আয়ত্ত করেছে এবং ২০ মাত্রার আধুনিক পরমাণু জ্বালানি তৈরির জন্যে প্রাথমিক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। ২০ মাত্রার জ্বালানির চেয়ে নতুন এ পরমাণু জ্বালানি ভিন্ন। তেহরানের গবেষণা চুলি¬র মতো যেকোনো চুল্লিতে তা ব্যবহার করা যাবে। ইরানের বিজ্ঞানীরা পরমাণু খাতে এমন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন যেখান থেকে পেছনে ফেরার কোনা সুযোগ নেই বরং তাঁরা এখন নতুন ধরনের জ্বালানি উৎপাদনে সক্ষমÑ যা দেশের জন্য বিরাট সাফল্য। তিনি জানান, গবেষণার এ পর্যায়ে ইরানি বিজ্ঞানীদের পক্ষে চুল্লির নকশা করা খুবই সম্ভব।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা যথার্থই বলেছেন, তাঁর দেশের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আরোপের চিন্তা অলীক কল্পনামাত্র। কারণ, ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ ইরানের সকল সামরিক শক্তিই প্রতিরক্ষামূলক। এগুলোর কোনোটাই পরমাণু অস্ত্র বহনের উপযোগী করে বানানো হয় নি। মার্কিন বিশ্লেষক গ্রিস পোর্টার আলজাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরানের ওপর হামলা করার জন্য ইসরাইল এবং সৌদিআরবের কাছে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তাই ইরান প্রতিরক্ষার স্বার্থেই ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অব্যাহত রাখছে। ইরানের ওপর ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সময় এধরনের ক্ষেপণাস্ত্র না থাকায় ইরানের সীমান্ত শহরগুলো এবং তেহরানের ওপর দিনরাত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল।

বরং দিন শেষে ইরান যে একটি খাঁটি আঞ্চলিক শক্তি যার উত্থান বন্ধ করা যাবে না তা বলতে শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত বিশ্লেষকরা। ইতিমধ্যে ভৌগোলিক বাস্তবতাটিকে তাঁরা উপলব্ধি করে বলতে শুরু করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতি বরং রোলার কোস্টারের ওপর থাকবে, যতক্ষণ না ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক না করবে কোনো ফায়দা হবে না। ইরাকের সঙ্গে ইরানের গড়ে ওঠা সম্পর্ক যখন বিনষ্ট করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র তখন ইরান ও ইরাক যৌথভাবে মহাকাশ গবেষণা শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের নীতি আগ্রাসনের এবং ইরান তার বিপরীতে রাশিয়া, চীন, ভারত, ইউরোপ সহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অভিন্ন স্বার্থে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সহযোগিতার নীতি নিয়ে আগ্রাসনের বিকল্প এক মোক্ষম শক্তি সৃষ্টি করে এগিয়ে যাচ্ছে যা ‘ইউরাশিয়ান ইন্টেগ্রেশন’ হিসেবে সবার নজর কেড়েছে। ইরান সহ এসব দেশের পারস্পরিক স্বার্থে কোনো দ্বন্দ্ব নেই, ফলে স্বাভাবিকভাবে বিরল সংহতি গড়ে উঠছে, যা ইসরাইল কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। অন্যদিকে যেসব দেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজের জন্য হুমকি মনে করে তেমন দেশের তালিকায় সৌদি আরবের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণহীন মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসবাদে অর্থ যোগান দেয়ার জন্য এ তালিকা করা হয়। প্যারিসভিত্তিক নজরদারি সংস্থা ফিন্যানসিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স এর মানদ- অনুসারে ইইউ এরই মধ্যে ১৬টি দেশকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ঘোষণা করেছেন, তাঁর দেশ ইরানের মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে আগামী ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়রি পোলান্ডের রাজধানী ওয়ারশ’তে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছেন। তবে রাশিয়া জানিয়ে দিয়েছে, এ সম্মেলনে যোগ দেবে না দেশটি। আমেরিকার ইরানবিরোধী সম্মেলনের স্বাগতিক দেশ হতে সম্মত হওয়ায় পোলান্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ এক টুইটার বার্তায় বলেছেন, ‘পোলান্ডের এই কলঙ্ক কখনো মুছে যাবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে পোলান্ডকে ইরান রক্ষা করেছিল সেই দেশটি আজ ইরানবিরোধী সার্কাস মঞ্চস্থ করতে যাচ্ছে।’ বিপাকে পড়ে পোলান্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট তেহরান সফরে এসে স্বীকার করেছেন আসলে ওই সম্মেলনে দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।
ইরানের বিমান বাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ নাসিরজাদেহ বলেছেন, বিদেশি শক্তির যেকোনো হুমকি মোকাবেলায় তাঁর দেশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত। পরাশক্তি দেশগুলো ইরানের এধরনের প্রস্তুতিকে হুমকি মনে করছে, কিন্তু জেনারেল আজিজ বলেন, ‘আমরা যতই প্রস্তুতি নেব এ অঞ্চলের নিরাপত্তার পরিস্থিতি ততই উন্নত হবে এবং এখানে বিদেশী সামরিক উপস্থিতির কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা আঞ্চলিক জাতি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে শান্তি ও বন্ধুত্বের বার্তা দিচ্ছি।’ এছাড়া ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় প্রদেশ ইসফাহানে বিমান বাহিনীর দুই দিনের বিশাল সামরিক মহড়ার প্রশংসা করেন তিনি। মহড়ায় বোমারু বিমান, পাইলটবিহীন বিমান বা ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র অংশ গ্রহণ করে। অন্যদিকে তেহরানের জুমআ নামাযের অস্থায়ী খতিব বলেছেন, ইরানের ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং প্রতিরোধ ফ্রন্ট আধিপত্যবাদী বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছে। হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলেমিন সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ হাসান আবু তোরাবি ফার্দ আধিপত্যবাদী শক্তিকে এরকম পরিস্থিতিতে ফেলতে পারাকে ইরানের পুণ্য কাজের ফল বলে মন্তব্য করেন।
ইমাম খোমেইনী মহাকাশ কেন্দ্র বা আইকেএসসি থেকে সম্প্রতি ‘সির্মোগ’ উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। ‘সির্মোগ’হলো ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি উপগ্রহ বহনে সক্ষম রকেট। ২৫০ কিলোগ্রাম ওজনের উপগ্রহ ভূপৃষ্ঠ থেকে ৫০০ কিলোমিটার ঊর্ধ্বাকাশের কক্ষপথে বয়ে নিয়ে যেতে পারবে এ রকেট। পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে আমেরিকা ইরানের এই উপগ্রহ পরিবাহী রকেট ‘সির্মোগ’পরীক্ষার ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। তাদের উদ্বেগের কারণ হলো বিজ্ঞানে ইরানের অগ্রগতি এবং পশ্চিমের ওপর তেহরানের নির্ভরতা না থাকা।ওয়াশিংটন দাবি করছে, মহাকাশে রকেট পাঠাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয় যা নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের লঙ্ঘন। মার্কিন পররাষ্ট্রন্ত্রী মাইক পম্পেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ইরানকে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর পরিকল্পনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠাতে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতে পারে। এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আমেরিকার মূল ভূখ-ে আঘাত হানা সম্ভব। কার্যত যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে বশে আনতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। কিন্তু ইরানি জনগণের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বজায় এবং ধৈর্য ধারণ করতে পারছে বলে এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে তাদের বিজয় নিশ্চিত হয়ে গেছে। এধরনের কঠিন সংকল্পের ফলও ইরানি জাতি পাচ্ছে। গত বছর ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন ১ লাখ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। স্থলসীমান্ত রয়েছে এমন দেশগুলোতে ইরান বিদ্যুৎ রফতানি শুরু করার পর দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মাদ হাসান মুতাওয়ালি¬যাদে বার্তা সংস্থা ইসনাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, বর্তমানে বেশিরভাগ বিদ্যুৎ ইরাকে রপ্তানি করা হয়। যদিও আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানেও কিছু বিদ্যুৎ দেয়া হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ রফতানির পরিমাণ দ্বিগুণ করার সামর্থ্য রয়েছে ইরানের। লক্ষণীয় যে, আফগানিস্তানে ১৮ বছর ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সফল হতে পারেনি।