বুধবার, ২২শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৮ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইরানের সঙ্গে ৫+১ গ্রুপের পরমাণু সমঝোতা: একটি পর্যালোচনা

পোস্ট হয়েছে: জুন ২২, ২০১৬ 

মিজানুর রহমান মিলন

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ইরানের সঙ্গে ৫+১ বিশ্বশক্তির ব্যাপকভিত্তিক পরমাণু চুক্তি সই হয়েছে। ইরানের সরকার ও জনগণসহ সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণও এই চুক্তিতে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এই চুক্তি স¤পর্কে একটি মন্তব্যই যথেষ্ট যে, সারা বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য চুক্তিটি সকলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ইরান গত ১৩ বছর ধরে পরমাণু ক্ষেত্রে যেসব অধিকার দাবি করে এসেছিল চুক্তিতে ইরানের সেইসব দাবি মেনে নেয়া হয়েছে। নিজ ভূমিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার, পরমাণু প্রযুক্তির উন্নয়ন ও গবেষণার অধিকার, এমনকি পরমাণু বাণিজ্যের অধিকারের স্বীকৃতি পেয়েছে ইরান। অর্থাৎ রাশিয়া, আমেরিকা, ফ্রান্সসহ পরাশক্তিরা অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যেমন পরমাণু চুক্তি করে সে ধরনের পূর্ণ অধিকার পেয়েছে ইরান। কোনো পরমাণু স্থাপনা বন্ধ করতে হয়নি ইরানকে। ইরান আরো পেয়েছে জাতিসংঘে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি।
হ্যাঁ, ইরান যেহেতু দাবি করে আসছে পরমাণু কর্মসূচির উদ্দেশ্যই শান্তিপূর্ণ সেহেতু ইরানের পরমাণু কার্যক্রম মাত্র ১০ বছরের জন্য জাতিসংঘের পরমাণু তদারকি প্রতিষ্ঠান আইএইএ-র পর্যবেক্ষণে পরিচালিত হবে। যদিও ইরান এনপিটির সদস্য হওয়ায় আগে থেকেই ইরানের পরমাণু কার্যক্রম তদারকি করে আসছে আইএইএ এবং এই ১০ বছর ইরান শান্তিপূর্ণ কাজ বাদে সামরিক ও পরমাণু অস্ত্র উৎপাদনে তার কর্মসুচি পরিচালিত করতে পারবে না। তবে এরপর ইরান পূর্ণ স্বাধীন মাত্রায় তার পরমাণু কর্মসূচি চালাতে পারবে। এর অর্থ এই নয় যে, ইরান ১০ বছর পর পরমাণু অস্ত্র বানাবে। বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে আরোপিত জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী যে রেড লাইন বেঁধে দিয়েছিলেন চুক্তিতে সকল রেড লাইন মেনে নেয়া হয়েছে। পশ্চিমারা দাবি করছিল- ইরানের ফোরদো পরমাণু স্থাপনা বন্ধ করতে হবে। চুক্তিতে সে দাবিও তাদের অর্জিত হয়নি। পশ্চিমারা দাবি করেছিল- ইরানের সামরিক ক্ষেত্রগুলোতেও পরিদর্শনের সুযোগ দিতে হবে, পশ্চিমাদের সে দাবিও অর্জিত হয়নি। পশ্চিমারা দাবি করেছিল- ইরানের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে ইরানের মিসাইল সক্ষমতা আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, সে দাবিও ইরান বরাবরই নাকচ করেছে। এমনকি পরমাণু বিজ্ঞানীদের সাক্ষাতের নামে জিজ্ঞাসার অনুমতিও দেয়নি ইরান- যা পশ্চিমাদের অন্যতম দাবি ছিল।
মনে রাখা দরকার- ২০০৩ সালে ইরানীরা ইইউ-র সাথে আলোচনায় গবেষণার জন্য মাত্র কয়েকটা সেন্ট্রিফিউজ রাখতে চেয়েছিল, পশ্চিমারা সে অনুমতিও ইরানকে দেয়নি। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি পশ্চিমাদের দাবি অনুসারে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করেছিলেন, কিন্তু পশ্চিমাদের সামরিক হুমকি ও তাদের দাবি উপেক্ষা করে পরমাণু কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয় এবং পরমাণু ক্ষেত্রে একের পর এক বিভিন্ন সাফল্য আসতে থাকে। প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমারা ইরানের ওপর আরোপ করে একের পর এক কঠোর অবরোধ।
ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও জার্মানিকে নিয়ে গঠিত হয় ৫+১ গ্রুপ। ইরানের ওপর অরোপিত অবরোধের মাত্রা কেমন ছিল তা বুঝতে শুধু এইটুকুই বলা যথেষ্ট হবে যে, ইরানের ব্যাংকিং লেনদেনও আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ইরানকে প্রাচীন বিনিময় প্রথা অনুসরণ করতে হয়েছে; তা আবার সবক্ষেত্রেও সম্ভব হয় নি বা হয় না। এরফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইরানের প্রায় তিন হাজার কোটি ডলার আটকা পড়েছিল। এখন চুক্তি অনুযায়ী ইরান তার এই সমুদয় অর্থ বিদেশি ব্যাংক থেকে নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারবে এবং বিশ্বের যেকোনো দেশের সাথে কোনো বাধা ছাড়াই স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করতে পারবে।
মূলত চুক্তিটা ইরানের জন্য যতটা না জরুরি তার চেয়ে পশ্চিমাদের জন্য অনেক বেশি জরুরি ছিল। আর এই কারণেই চুক্তিটা হয়েছে। ইরানের ওপর সব ধরনের অবরোধ আরোপ করেছে পশ্চিমা বিশ্ব ও জাতিসংঘ। অবরোধের এমন কোনো দিক নেই যা ইরানের ওপর আরোপ করা হয়নি। আমার ধারণা- ইরানের ওপর যেসব অবরোধ আরোপ করা হয়েছে তা ইরান বাদে অন্য কোনো দেশের ওপর অরোপ করা হল সেই দেশটা দেউলিয়া ও তার অর্থনীতি ভেঙে পড়তে বাধ্য হতো, এমনকি তা তেলসমৃদ্ধ দেশ হলেও। ইরান অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পশ্চিমাদের সে আশা পূরণ হয়নি। শুধু পূরণ হয়নি তা নয়, ইরান উল্টো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন করে পশ্চিমাদের তাক লাগিয়ে দেয়। পশ্চিমারা অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইরানকে দুর্বল করে ইরাকের মতো আক্রমণ করতে চেয়েছিল, কিন্তু ইরান নিজস্ব প্রযুক্তিতেই সকল সমরাস্ত্র তৈরি করা শুরু করে। ট্যাংক, ড্রোন, মিসাইল, ব্যালাস্টিক মিসাইল, সাবমেরিন, ডেস্ট্রয়ার, হেলিকপ্টার, জঙ্গিবিমান, উচ্চক্ষমতাস¤পন্ন রাডারসহ সবধরনের সমরাস্ত্র ইরান নিজেই তৈরি করে। ইরানের গ্যাসোলিন আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে পশ্চিমারা, কিন্তু ইরান নিজেই গ্যাসোলিন উৎপাদন করে রপ্তানিরও ঘোষণা দেয়। তেল শিল্প উন্নয়নের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে পশ্চিমারা, কিন্তু তেল শিল্প উন্নয়নের প্রায় সকল ধরনের প্রযুক্তি ইরান নিজেই আবিষ্কার করেছে।
কৃষি, চিকিৎসা, শিল্প, পরমাণু, মহাকাশ গবেষণা, সামরিক, বায়োটেকনোলজি, ন্যানোটেকনোলজিসহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সকল শাখায় ইরান ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। অবরোধের মধ্যেও নিজস্ব প্রযুক্তির স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও মহাকাশে বানর প্রেরণ অন্যতম সফলতা ইরানের। এসব বিভিন্ন কারণেই ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধ আশানুরূপ মাত্রায় কাজ করেনি। এছাড়াও কোনো দেশ আক্রমণ বা ধ্বংস করতে সরকার ও জনগণকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হ­ যেমনটা ছিল সাদ্দামের সাথে ইরাকি জনগণের ও গাদ্দাফির সাথে লিবিয়ার জনগণের, কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে পশ্চিমারা ১৯৭৯ সালের পর থেকে শত চেষ্টা করেও তা পারেনি। কারণ, জনগণকে সাথে নিয়ে নিজস্ব ধারার গণতান্ত্রিক সিস্টেম চালু করেছে ইরান। প্রেসিডেন্টও নির্বাচিত, পার্লামেন্টের এমপিও নির্বাচিত, এমনকি ইরানী সরকারের সকল স্তরের কর্মকর্তাগণও নির্বাচিত। এমতাবস্থায় সকল ধরনের অবরোধ আরোপ করে পশ্চিমারা তাদের সকল সফ্ট উইপনই নিঃশেষ করেছে। বাকি থাকে থার্ড উইপন অর্থাৎ ইরান আক্রমণ!
ইরানের সামরিক সক্ষমতা, সামরিক অফিসারদের ঐক্য, ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং বিশ্ব পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণেই ইরানের ওপর সামরিক আগ্রাসন চালানো পশ্চিমাদের জন্য সম্ভব নয়। এই অবস্থায় ইরানের সাথে চুক্তি না করার অর্থ হলো ইরানকে তার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে স্বাধীনভাবে চলতে দেয়া- যা মেনে নেয়াও পশ্চিমাদের জন্য আপাতভাবে সম্ভব নয়। আর অন্যদিকে ইরানের জন্য জরুরি হয়ে পড়ছে তার ওপর আরোপিত সব ধরনের অবরোধ প্রত্যাহার। পশ্চিমারা ২০১৩ সাল থেকেই ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল।
১৯৭৯ সাল ইরানে ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্বে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের অন্যতম সেবাদাস ও মিত্র প্রবল পরাক্রমশারী রেজা শাহ পাহলভির পতনের মাধ্যমে পশ্চিমাদের সাথে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল। বর্তমান ইরানের অন্যতম চরিত্র হলো- দেশটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র হওয়ার পরেও মার্কিন ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অন্যতম শক্তি যা মুসলিম বিশ্বে বিরল! অন্যদিকে বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সাথে ইরানের বন্ধুত্বপূর্ণ স¤পর্ক রয়েছে। রেজা শাহ পাহলভির পতন যুক্তরাষ্ট্র কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। তারা তাদের ইরানে অবস্থিত দূতাবাসের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল এর ফলে তৎকালীন ইরানী ছাত্ররা মার্কিন দূতাবাস দখল করে যুক্তরাষ্ট্রকে উচিত শিক্ষা দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র কমান্ডো বিমান পাঠিয়েও কুলকিনারা পায়নি! যুক্তরাষ্ট্র এর প্রতিশোধ হিসেবে সৌদি আরব ও অন্যান্য রাজতান্ত্রিক, স্বৈরশাসক আরবদের সহায়তায় ইরাকের সাদ্দামকে লেলিয়ে দিয়েছিল ইরান আক্রমণে। এর ফলাফল সবার জানা আছে।
সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কঠোর অবস্থান নিয়েও সাম্রাজ্যবাদীদেরকে কোনো সম্মানজনক চুক্তি করতে বাধ্য করা যায়- ইরানের সফলতার এটি অন্যতম দিক। চুক্তি হওয়ার পরপরই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীর মন্তব্য পড়লেই বিষয়টা ¯পষ্ট হবেÑ
‘তবুও, এর অর্থ এই নয় যে, এই অহংকারী উদ্ধত শক্তির সাথে আমাদের লড়াই-সংগ্রাম সব এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে বরং, তাদের আঞ্চলিক গোয়েন্দাগিরি ও এ অঞ্চলে তাদের বিভক্তিমূলক রুলিং টেকনিক-এর বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম সবেমাত্র শুরু হলো।
ইরানের সাথে ৫+১ বিশ্বশক্তির পরমাণু চুক্তি বিশ্ব রাজনীতি ও বিশ্ব শান্তির জন্য অন্যতম মাইলফলক! বিশ্ব কূটনীতির অন্যতম সাফল্য। বিশ্বের নানা সংকটেও এ চুক্তি অন্যতম উদাহরণ। ঐতিহাসিক এই চুক্তি উন্নয়নশীল ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য রোল মডেল হয়ে থাকবে ।