রবিবার, ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি বনাম অপপ্রচার ও মার্কিন অবরোধের নেপথ্যে

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ২৫, ২০১৯ 

রাশিদ রিয়াজ –
ইরান দীর্ঘদিন থেকে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে আসছে যা কৃষি, শিল্প, জ¦ালানি, চিকিৎসা প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অবদান রাখার ফলে তেহরানের সক্ষমতা বাড়ছে। এর ফলে বিশ^ব্যাপী পশ্চিমা মিডিয়া ও পরাশক্তি দেশগুলো এ কর্মসূচির বিরুদ্ধে শুধু অপপ্রচারই চালাচ্ছে না, বরং রাজনৈতিক কারণে এ কর্মসূচি থেকে ইরানকে বিরত রেখে অর্থনৈতিকভাবে পর্যুদস্ত ও নির্ভরশীল করে তোলার ব্যর্থ অপপ্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। এধরনের অপপ্রচারের কারণে ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অনেকে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যান এবং মনে করেন ইরান সত্যি সত্যি পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ এধরনের অপপ্রচার ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে গেলেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী রীতিমত ফতোয়া জারি করে পারমাণবিক বোমা তৈরি ইসলামের যুদ্ধ নীতি অনুসারে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করেছেন। কারণ, ব্যাপক ধংসযজ্ঞ, গণহত্যা ছাড়াও ফসলের মাঠ ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করে বলে পারমাণবিক বোমা তৈরি ইরান নিষিদ্ধ করেছে।
বস্তুত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাবৎ বিশে^ একাধিপত্য চাপিয়ে দিচ্ছে যার কাছে ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করে নি। কাতারের রাজধানী দোহায় ‘এশিয়া সহযোগিতা সংলাপ’-এর মন্ত্রী পর্যায়ের ষোড়শ সম্মেলনের অবকাশে ‘আশ-শার্ক’ পত্রিকাকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বলেছেন, আমরা ঠিকই পথ খুঁজে নেব। গত ৪০ বছর আমরা এটাই করেছি এবং এখনো তাই করব। মার্কিন চাপ উপেক্ষা করা সহজ কাজ নয়, তবু আমরা আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে কোনো চাপকে কখনো মেনে নেব না।
পঞ্চাশের দশক থেকে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত ইরান শান্তিপূর্ণভাবে এ কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। তাই আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা আইএইএ অব্যাহতভাবে ইরানের এ কর্মসূচির দিকে নজর রাখছে এবং বলতে বাধ্য হচ্ছে যে, ঘোষিত নীতি অনুসরণ করেই ইরান এ ধরনের কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। তাই এ নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে তা আলোচনার মাধ্যমে সহজেই সমাধান সম্ভব। একই কারণে বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনায় যেতে চায় না পরাশক্তি দেশগুলো। এর আগে প্রায় এক যুগ ধরে আলোচনার টেবিলে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ প্রজ্ঞার সঙ্গে আলোচনার পর পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার নিয়ে যে ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছান তা থেকে শুধু যুক্তরাষ্ট্র সরে এসেছে। জাতিসংঘসহ এ চুক্তিতে অংশগ্রহণকারী অন্য একটি দেশও সরে আসে নি এবং তা বহাল রেখে চলছে।
ইরান সরকার নিজেদের ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; কৌশলগত অবস্থান, আধ্যাত্মিক ও আদর্শিক মতবাদের অনুসারী। এজন্য শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক চুক্তির অখ-তা ও কর্তৃত্ব বৃদ্ধিতে ইরানের দৃঢ় আগ্রহ রয়েছে। এ ধরনের আগ্রহ অপ্রতিরোধ্য শাসনভিত্তিক। সেখানে মার্কিন রেজিম চেঞ্জ ফর্মুলা কখনোই কার্যকর হতে পারে না। জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাপক ধ্বংসযোগ্য অস্ত্র তৈরি না করার ব্যাপারে ইরান আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতার ব্যাপারে ইরান সজাগ বলেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে উৎসাহী নয়। রাসায়নিক অস্ত্র তো নয়ই। গত আড়াই শ’ বছরে ইরান কোনো দেশকে আক্রমণ করে নি।
একই সঙ্গে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি তদারকি ও পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা আইএইএ’কে সবসময় সহযোগিতা করে যাচ্ছে। ২০০৩ সাল থেকে ১৭শ’ দিবসে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে তদারকিতে সহযোগিতা করেছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, ভারী পানি তৈরিতে গবেষণা, সেন্ট্রিফিউজ পদ্ধতি উন্নীতকরণসহ যেকোনো বিষয়ে ইরান আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা মেনে চলছে। বহুবার আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার ইন্সপেক্টররা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও দেশটির পরিবেশের ওপর এর কী প্রভাব পড়ছে তার নমুনা সংগ্রহ করেছেন এবং কোনো ব্যত্যয় ঘটতে দেখেন নি। কারণ, এসব নমুনায় কোনো পারমাণবিক উপাদান পাওয়া যায় নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো কর্মসূচিও দেখতে পায় নি আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা। এক্ষেত্রে সংস্থার সকল দিকনির্দেশনা মেনে চলছে ইরান। আর এসব দিকনির্দেশনা সঠিকভাবে মেনে চলতে ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াও নিজস্ব তদারকি ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে দেশটি। এজন্য প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারে সহায়তা দিয়েছে দেশটির সংসদ। স্থায়ী আইন করা হয়েছে যাতে ইরান থেকে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, মজুদ বা রপ্তানি না হতে পারে। প্লুটোনিয়াম উৎপাদনও বন্ধ রেখেছে ইরান। পারমাণবিক উপাদানগুলো একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় উৎপাদন সীমাবদ্ধ রেখেছে যাতে তা কোনো মারণাস্ত্রের কাজে ব্যবহৃত না হয়। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করতে যে বিপুল অংকের টাকা খরচ করে অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল তাও জ¦ালানিতে রূপান্তর করা হয়েছে, বিনষ্ট করা হয়েছে অবকাঠামো। আন্তর্জাতিক বিশ^, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থাকে আস্থায় রেখেই ইরান তার শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি এভাবে চালিয়ে যাচ্ছেÑ যা উন্নয়নের কাজে লাগে মাত্র, ধংসাত্মক নয়। এমনকি পারমাণবিক কর্মসূচির নিরাপত্তায় ইরান একটি আঞ্চলিক কনসোর্টিয়াম প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়ে আসছে। অন্যান্য দেশের সরকার বিশেষ করে রাশিয়া ফেডারেশন ইরানের এধরনের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির প্রতি আস্থা রেখে বলছে, এধরনের কর্মসূচি নিরাপত্তার স্বার্থেই এমন হওয়া উচিত। তবে ইরান বারবার বলে আসছে তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো রাষ্ট্রের চাপ বা হুমকিকে সে পাত্তা দেবে না। খোলা মন নিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছায় কোনো দেশ যদি আলোচনা করতে চায় তাহলে ইরান তাকে স্বাগত জানায়।
২০১৫ সালে ‘ইরান নিউক্লিয়ার ডিল’ নামে যে চুক্তি হয় তা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্লান অব অ্যাকশন বা সংক্ষেপে জেসিপিওএ নামে অভিহিত। বিশে^র ৬ পরাশক্তি ব্রিটেন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স ও জার্মানি এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এ চুক্তি হলেও তা থেকে একতরফা বের হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে আন্তর্জাতিক কোনো চুক্তির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে চরম আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রসহ কোনো দেশই প্রমাণ করতে পারে নি যে, ইরান চুক্তির কোনো শর্ত ভঙ্গ করেছে। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সরকারের পক্ষ থেকে এ চুক্তিকে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বলে উল্লেখ করা হয়। সেদিক থেকে আগের সরকারের কোনো ধারাবাহিকতা বজায় রাখে নি ট্রাম্প প্রশাসন। ফলে মার্কিন সরকারের সঙ্গে কোনো চুক্তির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে চুক্তি ভঙ্গ অন্যদিকে একতরফা অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর যে চাপ সৃষ্টি করছে তা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিতিশীল পরিবেশ, এমনকি যুদ্ধের হুমকি সৃষ্টি করছে। ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই তা ভঙ্গ করায় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির চরম ব্যর্থতা শুধু আন্তর্জাতিক বিশে^ উন্মোচিত হয় নি; বরং এটি ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতের একটি যুদ্ধকে ন্যায্য করার এক নৃশংস পরিকল্পনা বলে অভিহিত করছে আন্তর্জাতিক মহল। মধ্যএশিয়ায় ও মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য যখন দেশগুলোর সঙ্গে ইরান প্রয়োজনে একে অপরকে আক্রমণ না করার নীতিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে চুক্তির আহ্বান জানিয়েছে তখন ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র চাইছে না ইরান পাল্টা এক ভারসাম্যপূর্ণ এক আঞ্চলিক শক্তিশালী দেশ হিসেবে গড়ে উঠুক। একারণেই দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের অবরোধ আরোপ করছে তেহরানের ওপর।
একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিয়ে চলছে পশ্চিমা মিডিয়ার টানা অপপ্রচার। এধরনের মিডিয়া প্রচার করছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের দিকেই মোড় নেবে। তবে এর কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা বা প্রমাণ তারা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এধরনের প্রপাগান্ডার অংশ হিসেবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত বছর ৩০ এপ্রিল বলেই বসেন, তাঁর গোয়েন্দারা তেহরান থেকে পারমাণবিক বোমা তৈরির গোপন কাগজপত্র উদ্ধার করেছে। এ বিষয়ে বিরাট এক বয়ান দেন। এরপর আল-জাজিরা তাঁকে লাইভ টেলিফোনে জিজ্ঞাস করে ইসরাইলের কাছে কয়টি পারমাণবিক বোমা আছে। এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেতানিয়াহু দেন নি এবং তাঁর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আল-জাজিরার। এর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি করে তা ভঙ্গের মতো বিশ^াসঘাতকতার পর উল্টো ধারাবাহিক অবরোধ আরোপ করে বসে আছে।
কিন্ত বসে নেই ইরান। পরমাণু সমঝোতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া এবং নিজেদের প্রতিশ্রুতি পালনে ইউরোপীয় দেশগুলোর ব্যর্থতার বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে অতিরিক্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও ভারী পানি বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। দেশটি পরমাণু সমঝোতা বা জেসিপিওএ’র কিছু শর্ত বাস্তবায়ন স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে বলেছে, এখন থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও ভারী পানি বিক্রি করা হবে না যদি না চুক্তির সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এব্যাপারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে। একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় ইউরেনিয়াম ও ভারী পানি উৎপাদন পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু গত বছর ৮ মে যুক্তরাষ্ট্র এ সমঝোতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর ইউরোপীয় দেশগুলো এব্যাপারে ইরানের স্বার্থ রক্ষায় তেমন কোনো অঙ্গীকার করতে না পারায় তেহরান এ সিদ্ধান্ত নিল। এক রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি এ ঘোষণা দিয়ে এ ব্যাপারে ৬০ দিনের সময় সীমা বেঁধে দিয়েছেন। ৬ জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে এ সমঝোতা ২০১৫ সালে সই করেছিল ইরান।
তেহরানে নিযুক্ত ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি, রাশিয়া এবং চীনের রাষ্ট্রদূতদের ওই দিনই এ বিষয় অবহিত করে ইরান। প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সই করা একটি চিঠির মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। চিঠিতে ইরানকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বিশেষ করে তেল এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য পরমাণু সমঝোতায় সই করা দেশগুলোকে ৬০ দিনের সময় সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে।
এদিকে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এক বিবৃতিতে বলেছে, দেশটির সঙ্গে ৬ জাতিগোষ্ঠীর পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি পরিবর্তন করা হয়েছে এ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর এধরনের পরিবর্তন করতে হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে সতর্ক করে দিয়ে এ বিবৃতিতে বলা হয়, পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি অনুসারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো যদি কোনো ব্যবস্থা না নেয় তাহলে ইরান তার উৎপাদিত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও ভারী পানি উৎপাদন, মজুদ ও বিক্রির ব্যাপারে কোনো শর্ত মানবে না।
গত বছরের মে মাসে ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার পর নভেম্বরে তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে ট্রাম্প প্রশাসন। অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো এ সমঝোতা বাস্তবায়নের কথা মুখে বললেও কার্যত তারা কোনো পদক্ষেপ নেয় নি। ইরান এতদিন বলে আসছিল, তার ধৈর্যের সীমা আছে এবং পশ্চিমারা যেন তেহরানের কাছ থেকে ধৈর্যের পরীক্ষা না নেয়। সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি গত ৭ মে তেহরানে বলেন, পরমাণু সমঝোতা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যাওয়ার অধিকার ইরানেরও রয়েছে। এটির ২৬ ও ৩৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন স্থগিত রাখবে তেহরান। যেখানে বলা আছে, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করা হলে তেহরান কিছু কিছু ধারা বাস্তবায়ন থেকে সরে আসতে পারবে। বিষয়টি নিয়ে ইরানের পার্লামেন্টে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়।
তবে পরমাণু সমঝোতা লঙ্ঘন হয় এমন কিছু করবে না ইরান এমন আশ^াস দিয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ বলেন, পরমাণু সমঝোতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার পর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তেহরান যে পদক্ষেপ নিয়েছে তার সবই ২০১৫ সালে সই হওয়া পরমাণু সমঝোতার আওতায় করা হচ্ছে। কোনোভাবেই ইরান পরমাণু সমঝোতা লঙ্ঘন করবে না।
এপ্রসঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বলেন, গত বছর মার্কিন সরকার পরমাণু সমঝোতা লঙ্ঘন করলে ইরানের ‘কৌশলগত ধৈর্য’ শেষ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায় পদক্ষেপের বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রুখে দাঁড়াতে সক্ষম নয়। এ কারণে ইরান পরমাণু সমঝোতার আওতায় স্বেচ্ছায় নতুন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের এক গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে। প্রথমত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান বিবেচ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি। কিন্তু চীন, রাশিয়া, ইউরোপসহ বিশে^র অধিকাংশ দেশ ইরানের তেল রপ্তানিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য পারমাণবিক সমঝোতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসাকে সমর্থন দেয় নি। ইউরোপের দেশগুলো জানে আরব বিশে^ যেভাবে আইএস জঙ্গিদের পেছনে অর্থ ও অস্ত্র যুগিয়ে সন্ত্রাস ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তা ওসব দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এবং এধরনের বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ইউরোপ। সিরিয়া ও ইরাকে আইএস নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরান এক বিশাল ভূমিকা রেখেছে। কারণ, ইরান জানে সিরিয়া আইএস জঙ্গিদের কাছে হাতছাড়া হয়ে গেলে সেখান থেকে জঙ্গিরা তেহরান পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার প্রচেষ্টা শুরু করবে। তাই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যতই শান্তিপূর্ণ হোক না কেন যুক্তরাষ্ট্র তাকে অজুহাত হিসেবেই তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছে। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান অংশ ছিল এটি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাস দমনের নামে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ শুরু করে, কিন্তু তারা শেষ করতে জানে না।
অথচ ইরানকে পঞ্চাশের দশকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিতে প্রথমে তেহরান নিউক্লিায়ার রিসার্চ সেন্টারকে ৫ মেগাওয়াটের একটি গবেষণা চুল্লি দিয়ে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৬৭ সালে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করে ইরান। ১৯৭৩ সালে দেশটি ২৩ হাজার মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সে অনুযায়ী যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে লোকবল তৈরি করা হয়। ফ্রান্স ও নামিবিয়ার সাথে পারমাণবিক কর্মসূচির অংশীদারিত্বে যায় ইরান। এজন্য বিলিয়ন ডলার খরচ করে। এরপর ৭শ’ মিলিয়ন ডলার দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ইউরেনিয়াম ইয়েলো চক কেনে ইরান। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর পারমাণবিক কর্মসূচি স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়। দীর্ঘমেয়াদে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে পারমাণবিক শক্তি গবেষণায় সহযোগিতা চুক্তি করে ইরান। এ সহায়তায় যুক্ত হয় রাশিয়া। আর্জেন্টিনার সঙ্গে ইরান যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সহায়তা গড়ে তোলে তাতে বাধা সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্র। বাধা সৃষ্টি করে ভারী পানি উৎপাদন সহযোগিতায়। এরই মধ্যে ১৯৯৫ সালে রাশিয়া ইরানে বুশেহর-১ পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণে সহায়তা করতে রাজি হলে যুক্তরাষ্ট্র এর বিরোধিতা করে। এধরনের বিরোধিতা নাকচ করে ইরানের আরাকে ৪০ মেগাওয়াট ভারী পানি উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। ২০০২ সালে দি ন্যাশনাল কাউন্সিল অব রেজিস্টেন্স অব ইরান নাতাঞ্জ এনরিচমেন্ট কমপ্লেক্স উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নেয়। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা আইএইএ’র তদারকিকে স্বাগত জানায় ইরান। অব্যাহত আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে সীমাবদ্ধ ও ভারী পানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে একই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ইরান। এক্ষেত্রে ইরান কূটনৈতিক আলোচনাকে প্রাধান্য দেয়। আলোচনায় দরকষাকষিতে ইরানের আলোচকরা সবসময় প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী একটি চুক্তিতে উপনীত হতে চাইলেও জাতীয় স্বার্থকে কখনো বিসর্জন দেন নি। ২০০৫ সালে ইউরোপের সঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা থেকে সরে দাঁড়ায় এবং চুক্তি করতে অস্বীকৃতি জানায়। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে বিদেশে ইরানের অর্থ সম্পদ আটকের ঘোষণা দেয়। ২০০৬ সালে ইরান নাতাঞ্জে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুনরায় শুরু করে। এর পরের বছরেই ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি সমঝোতা চুক্তিতে যেতে ৬ জাতি আলোচনা শুরু হয়। তেহরানে ২০০৮ সালের ১৪ জুন ইইউ’এর পররাষ্ট্রনীতি প্রধান জাভিয়ার সোলানা ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানোচেহের মোত্তাকির সঙ্গে আলাপের পর ৬ জাতি আলোচনা শুরুর ঘোষণা দেয়া হয়। ইরানের পক্ষে প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিলেন সাইদ জালিলি। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এধরনের আলোচনার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে একের পর এক অবরোধ দেয়া হয়। তারপরও ইরান আলোচনা থেকে পিছু হটে নি। এমনকি তুরস্কে চিকিৎসা গবেষণা চুল্লির জন্য ইরানের পাঠানো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়েও অভিযোগ তোলা হয়। শর্ত মেনে চলার মধ্য দিয়ে রাশিয়া ইরানের ওপর থেকে ধারাবাহিকভাবে অবরোধ তুলে নেয়ার প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ অনেক দেশ তাতে রাজি হয় নি। ২০১১ সালে নভেম্বরে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক কমিশনের দেয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে ইরানের ওপর ফের অবরোধ দেয়ার ব্যাপারে চীন ও রাশিয়া প্রতিবাদ জানায়। এই প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যাংক ও সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেনে অবরোধ আরোপ করে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের ওপর অবরোধ আরোপ করা হয়। চীন, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, শ্রীলংকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, তাইওয়ান, ভারত ও মালয়েশিয়া ছাড়াও ১০টি ইউরোপীয় দেশের ওপর ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ আটকের নির্দেশ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এধরনের ধারাবাহিক অবরোধের মধ্যে ইরান পারমাণবিক সমঝোতায় পৌঁছতে আলোচনা অব্যাহত রাখে এবং শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই একটি চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়। ২০ জুলাই ইরান পার্লামেন্টে এটি অনুমোদিত হয়। ২০১৩ সালে হাসান রুহানি নির্বাচনে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার পর পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনায় একটি গতি আসে। এই চুক্তিতে উপনীত হবার জন্য ইরানকে বেশ কিছু ছাড় দিতে হয়। প্রথমত ২০২৫ সাল পর্যন্ত নাতাঞ্জ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে সেন্ট্রিফিউজিং ১৯ হাজার থেকে ৫ হাজার ৬০টিতে নামিয়ে স্থির রাখতে হবে। চুক্তির প্রতি আস্থা রেখে এক্ষেত্রে অবকাঠামো পর্যন্ত বিনষ্ট করে ইরান। এরপর আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে চলে ইরান। কিন্তু ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি হওয়ার বিষয়টি সৌদি আরব, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিতে পারে নি বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর এ চুক্তির বিরুদ্ধে তিনি তাঁর অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কথা বলতে শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত এ সমঝোতা থেকে বের হয়ে যান।
তবে সর্বশেষ ইরান নির্দিষ্ট মাত্রায় ভারী পানি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ব্যাপারে দুই মাসের আল্টিমেটাম দেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ওপর লৌহ, ইস্পাতসহ ধাতব পণ্য রপ্তানির ওপর নতুন করে অবরোধ দিয়ে বসে। এখাতটি ইরানের চতুর্থ রপ্তানি খাত। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের এ আল্টিমেটামকে নাকচ করে বলেছে, ইউরোপীয় জোট এখনো পরমাণু সমঝোতায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান ফেডেরিকা মোগেরিনি এবং ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক যৌথ বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ সম্পর্কে মোগেরিনি বলেন, যেকোনো ধরনের সময়সীমা আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। পরমাণু সংক্রান্ত ইরানের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইরানের সহযোগিতা সম্পর্কে আমরা পর্যালোচনা করে দেখব। এর পাশাপাশি মার্কিন ডলার এড়িয়ে ইরানের সঙ্গে বৈধ চ্যানেলে লেনদেন করার জন্য ইনসটেক্স চালুর প্রচেষ্টা জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।
একই সঙ্গে ইউরোপের ২২ জন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ক্ষতিকর। এতে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন ইরান নতুন করে বেশি মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করলে তা পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হবে। এছাড়া, কোনো কোনো দেশ বিশেষ করে সৌদি আরব আঞ্চলিকভাবে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে পারে।
তার মানে ইরানের প্রেসিডেন্ট পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আল্টিমেটাম দিয়ে যথার্থই বলেছেন যে, এই চুক্তিতে একটি অস্ত্রোপচার দরকার। কারণ, এক বছর ধরে যে ঘুমের ওষুধ আমাদের দেওয়া হচ্ছিল, তাতে ফল হয় নি। আর এই অস্ত্রোপচার চুক্তিটিকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজন। সেটাকে ধ্বংস করতে নয়।
আন্তর্জাতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর একের পর এক অবরোধ জারি করেই ক্ষান্ত নয়। উপসাগরীয় অঞ্চলে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ এবং বি-৫২ বোমারু বিমান পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র যা সুয়েজ খাল অতিক্রম করেছে। আচমকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইরাক সফরেও যান। তবে তাঁকে শুনতে হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে না বাগদাদ। একই কথা বলেছে ইসলামাবাদ। যদিও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তেহরানকে কোন মতেই পরমাণু অস্ত্র বানাতে দেওয়া যাবে না। ইরানের বিরুদ্ধে আমাদের এ যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। তবে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, আমাদের মনে হয় এখন সমাধানের সময়। আর তার জন্য ইউরোপের বাকি দেশগুলোর উচিত চুক্তির বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলা। মার্কিন মুসলিম আইন প্রণেতা ইলহান ওমর বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন মিথ্যা গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার পাঁয়তারা করছে। টুইট বার্তায় তিনি বলেন, ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন চালানোর আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যে ধরনের অজুহাত সৃষ্টি করেছিল চরম ইরানবিদ্বেষী নীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে তারা একই পন্থা অবলম্বন করছে।
এরপরও ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার মুখপাত্র বেহরুজ কামালবান্দি বলেছেন, পরমাণু স্থাপনাগুলোতে সমৃদ্ধ ৩০০ কেজি অতিরিক্ত ইউরেনিয়াম ও ১৩০ টন ভারী পানি বিদেশে রপ্তানি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তেহরান। কিন্তু পাঁচ জাতিগোষ্ঠী দুই মাসের মধ্যে তাদের প্রতিশ্রুতি পালন না করলে ইরান আর কখনো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও ভারী পানি রপ্তানি করবে না। অন্যদিকে ইরানের উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধান পরমাণু আলোচক সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি বলেছেন, তাঁর দেশ ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতা থেকে ‘ধাপে ধাপে’ বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর ফলে ইরান কেন পরমাণু সমঝোতা ত্যাগ করলো সে অভিযোগে বিশ্বের কোনো দেশ তেহরানকে অভিযুক্ত করতে পারবে না। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, পরমাণু সমঝোতায় শর্ত ছিল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩.৬৭ মাত্রায় সীমাবদ্ধ রাখবে ইরান। বেঁধে দেয়া সময়সীমা শেষ হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা আর সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। আরাক হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টরকে পরিপূর্ণতা দেওয়ার কাজ শুরু করব। ইরানের এ পদক্ষেপকে অজুহাত হিসেবে বিষয়টিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠালে তেহরান অত্যন্ত কঠিন পদক্ষেপ নেবে। তিনি বলেন, ইরান কখনোই যুদ্ধের সূচনা করে নি, ভবিষ্যতেও যুদ্ধের সূচনা করবে না। তবে কারো তর্জন-গর্জনের কাছেও তেহরান কখনোই মাথানত করবে না। সঙ্গত কারণে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি মাজিদ তাখতে রাভাঞ্চি বলেছেন, গত এক বছর ধরে ইউরোপ ইরানের ব্যাপারে পারমাণবিক সমঝোতা নিয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে যে ব্যর্থ হয়েছে তার অন্যতম কারণ ছিল রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি নেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করলেন এমন এক সময়ে যখন দুটি দেশের মধ্যে চরম বাকযুদ্ধ চলছে। ইরানের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিক অবরোধ আরোপ ও দেশটির তেল রপ্তানি শূন্যে নামিয়ে আনার হুমকির মুখে ট্রাম্পকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছে না তেহরান। ট্রাম্পের কথা বলতে চাওয়ার ব্যাপারে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি মাজিদ তাখতে রাভাঞ্চি বলেছেন, আলোচনার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি নন এবং তাঁর ওপর আস্থা রাখা যায় না।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, আমি ইরানের ব্যাপারে যা দেখতে চাই তা হলো তারা (আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য) আমাকে টেলিফোন করছে। তিনি বলেন, আমি চাই ইরানি কর্মকর্তারা একটি ভালো চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আলোচনা করতে আমাকে টেলিফোন করুক। এ ধরনের চুক্তি ইরানকে চলমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সহযোগিতা করবে। ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি ইরানিদের কাছ থেকে বেশি কিছু চান না, শুধু চান ইরানিরা পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করুক।
মার্কিন নিউজ চ্যানেল এনবিসি’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি মাজিদ তাখতে রাভাঞ্চি বলেন, আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই ব্যাখ্যা দিতে হবে তিনি কেন আলোচনার টেবিল থেকে উঠে গেলেন? তিনি বলেন, ট্রাম্প এমন সময় আলোচনার টেবিল থেকে উঠে গিয়েছিলেন যখন বিশ্ব শক্তিগুলোর পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ওই টেবিলে বসে ছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন এক সময় ইরানের সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন যখন পশ্চিমাদের ভাষায় ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে বাধা দেয়ার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় বিশ্বশক্তি ২০১৫ সালে তেহরানের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতা সই করে। কিন্তু ট্রাম্প গত বছরের মে মাসে গোটা বিশ্বের বিরোধিতা উপেক্ষা করে সেই সমঝোতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন।
হোয়াইট হাউজে সাংবাদিক সম্মেলনে ট্রাম্প আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেয়ারও হুমকি দেন। পাশাপাশি সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, তাঁর প্রশাসনের ইরান নীতি প্রত্যাখ্যান করে জন কেরি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ‘লোগান আইন’ লঙ্ঘন করছেন এবং এজন্য তাঁর বিচার হতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, জন কেরি (টেলিফোনে) তাদের (ইরানিদের) সঙ্গে অনেক বেশি কথা বলছেন এবং তিনি তাদেরকে বলছেন তারা যেন আমাকে ফোন না করে। এটি লোগান আইনের লঙ্ঘন এবং অকপটে বলতে গেলে এজন্য তাঁর বিচার হওয়া উচিত। ট্রাম্পের এ বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জন কেরির একজন মুখপাত্র সিএনএন’কে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আজ যা কিছু বলেছেন তার সব ভুল এবং কল্পকাহিনী। তিনি বাস্তবতা বুঝতে পারেন নি, আইন বোঝেন নি এবং সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে নিরাপদ রাখতে হয় সেই কূটনীতি তিনি রপ্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
জন কেরি গত বছর এক বক্তব্যে বলেন, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফের সঙ্গে ‘তিন থেকে চারবার’ সাক্ষাৎ করেছেন এবং এসব সাক্ষাতে পরমাণু সমঝোতাসহ অন্যান্য বিষয়ে কথা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৭৯৯ সালে অনুমোদিত লোগান আইনে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুভাবাপন্ন কোনো দেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের অনুমতি ছাড়া আলোচনা করাকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৮০২ এবং ১৮৫২ সালে মাত্র দুই ব্যক্তি এই আইন লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধীদের পাশাপাশি কোনো কোনো মার্কিন গণমাধ্যম বলছে, ট্রাম্পের সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিন ক্ষমতা গ্রহণের আগে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত তৎকালীন রুশ রাষ্ট্রদূত সের্গেই কিসলিয়াকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে লোগান চুক্তি লঙ্ঘন করেছিলেন।
এদিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি বলেছেন, আবার আলোচনায় বসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে উঠে যাবেন না তার নিশ্চয়তা কোথায়; বিশেষ করে তিনি যখন একের পর এক আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি লঙ্ঘন করে যাচ্ছেন। ইরানকে তাঁর ভাষায় পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার জন্য আলোচনায় বসতে চান বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছেন তার জবাবে তাখতে রাভাঞ্চি বলেন, ইরান যে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে চায় না তা বোধ হয় ট্রাম্পের জানা নেই। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা ১৪টি ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলেছে, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না। এছাড়া, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এই অস্ত্র নিষিদ্ধ করে ফতোয়া জারি করেছেন।
ওদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ এক টুইট বার্তায় বলেছেন, ইরানকে একতরফাভাবে পরমাণু সমঝোতা মেনে চলার পরামর্শ না দিয়ে ইউরোপের নিজের উচিত এ সমঝোতা মেনে চলা। জারিফ বলেন, পরমাণু সমঝোতা সম্পর্কে ইইউ’র বিবৃতি দেখে মনে হয়, ইরান কেন এর কিছু ধারা স্থগিত রাখল সেজন্য তারা বিস্মিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এক বছর ধরে ইউরোপসহ গোটা বিশ্বকে ভয় দেখিয়ে পরমাণু সমঝোতা লঙ্ঘন করে পায়ের তলায় পিষে ফেললেও ইইউ ‘দুঃখ প্রকাশ’ ছাড়া আর কিছুই করতে পারে নি। ইইউ’র নিজের উচিত ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করাসহ পরমাণু সমঝোতায় দেয়া প্রতিশ্রুতি মেনে চলা।