শুক্রবার, ২০শে জুন, ২০১৯ ইং, ৭ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইরানের ফজর ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশ সন্ধ্যা

পোস্ট হয়েছে: মে ৯, ২০১৮ 

news-image

মুমিত আল রশিদ: ‘বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, শান্ত-স্নিগ্ধ হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ। এর রয়েছে নয়নাভিরাম সৌন্দর্য…কিন্তু কিছুদিন হলো সে অন্যের ব্যথায় বিমর্ষ, কণ্ঠ নিস্তব্ধ…।’ ভাষ্যকার খন্দকার মর্জিনা আখতার লাভলির কণ্ঠে বাংলা বিবরণী শুনে সারা শরীরের লোমগুলো শিহরিত হচ্ছিল! লালনের বিখ্যাত গান ‘আমি অপার হয়ে বসে আছি…’ ব্যাকগ্রাউন্ড সুরে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিপন্ন জীবন নিয়ে চিত্রিত এই প্রামাণ্যচিত্রের নাম ‘শারমে বুদা’ (বাংলা নাম বিমর্ষ বুদ্ধ)।

বঙ্গোপসাগর উত্তাল তরঙ্গমালার গর্জন দিয়ে শুরু হয় বিমর্ষ বুদ্ধ

৩৬তম ফজর আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের (২০১৮) শেষ দিনে ইরানের রাজধানী তেহরানের তালারে ওহাদাত’ (ঐক্য হলে) ইরানি চিত্রনির্মাতা মুর্তজা অতাশ জমজমের ব্যক্তি উদ্যোগে নির্মিত এই হৃদয়স্পর্শী প্রামাণ্যচিত্রটি দেখার জন্য উপচে পড়া ভিড় পরিলক্ষিত হয়। বাংলা, ফারসি, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় রূপান্তরিত এই প্রামাণ্যচিত্রটি দেখে উপস্থিত অসংখ্য দর্শক অশ্রুসিক্ত নয়নে বাড়ি ফিরেছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রচার সংস্থার বাণিজ্যিক বিপণন প্রধান হাকশেনাস বলেন, প্রামাণ্যচিত্রটির সংগীতের সুর শুনলেই কেমন যেন একধরনের অসহায়ত্ববোধ জেগে ওঠে! নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবতে লজ্জা লাগে!

বিমর্ষ বুদ্ধ স্মারকে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত

 

ইরানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ কে এম মজিবুর রহমান ভূঁঞা বলেন, এখানে কেবল একটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। আরেকটি দিক হচ্ছে, এই সব শরণার্থীদের আবাসন, খাদ্য, বস্ত্র সংকট নিরসনে বাংলাদেশ সরকার নিরলস পরিশ্রম করে যাওয়া। তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থাকে এগিয়ে আসতে এবং দ্রুত এই শরণার্থীদের তাদের নিজভূমে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

বিমর্ষ বুদ্ধু দেখার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রয়াত হাশেমি রাফশানজানির পুত্র বর্তমানে তেহরানের মেয়র মুহসেন রাফসানজানি বলেন, পৃথিবীতে গৌতম বুদ্ধের ধর্মকে বলা হয় অহিংস ধর্ম। কিন্তু কিছু সন্ত্রাসী বুদ্ধ বিশ্বের বুকে এই ধর্মের অহিংস বাণীর অপমান করে যাচ্ছে। তিনি পরাশক্তিগুলোকে এই জাতি বিনাশকারী কর্মকাণ্ডে আরও বেশি সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

বিমর্ষ বুদ্ধ দেখার জন্য উপচেপড়া দর্শক

দর্শকের সারিতে ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাওলি মাহবুব। তিনি বেশ আবেগ ঝরা কণ্ঠে বললেন, বিখ্যাত এই আন্তর্জাতিক ফজর ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের মাধ্যমে সারা বিশ্বের চলচ্চিত্রকারদের নিকট রোহিঙ্গা সংকট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। চলচ্চিত্র যেহেতু মানুষের কথা বলে, তাই এটি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তেহরানের মেয়র

 

পরিচালক মুর্তজা অতাশ জমজম বাংলাদেশের মানুষের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, প্রামাণ্য দলিলটি নির্মাণ করতে গিয়ে বাংলাদেশের মানুষের রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব দেখে চোখ দিয়ে বারবার অশ্রু গড়িয়ে পড়েছে। বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশে, মানুষ রাতদিন পরিশ্রম করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। আমার এই প্রামাণ্যচিত্রের গতিপথ বাংলাদেশের মানুষই ঠিক করে দিয়েছে। পুরো প্রামাণ্য দলিলটিতে তিনি বাংলাদেশের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

বিমর্ষ বুদ্ধ প্রামাণ্যচিত্রের পর্দার অন্তরালের বাংলাদেশি ও ইরানি সদসস্যদের একাংশ

 

প্রামাণ্যচিত্রটি দেখতে বাংলাদেশ দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর মো. সবুর হোসেনসহ অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি উপস্থিত ছিলেন। এই সন্ধ্যাটি মূলত বাংলাদেশ সন্ধ্যা হিসেবেই এবারের ফজর ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পরিচিত হবে। উল্লেখ্য, লেখক প্রামাণ্যচিত্রটি মূল ফারসি ভাষা থেকে বাংলায় ভাষান্তর করেছেন। এটি বর্তমানে ফ্রান্স ফেস্টিভ্যালে যাওয়ার পথে রয়েছে। এ ছাড়া, আল জাজিরা টেলিভিশন চ্যানেলে খুব শিগগিরই প্রচার হবে বলে পরিচালক জানিয়েছেন। ইরানের বিখ্যাত পরিচালকেরা ইতালি, ফ্রান্স, ভারত, সিরিয়া ও লেবাননের সঙ্গে মিলে যৌথ ছবি তৈরি করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় খুব শিগগিরই বাংলাদেশের সঙ্গেও যৌথ ছবির উদ্যোগ নেবেন বলে জানালেন মুর্তজা অতাশ জমজম।

 

উৎসবে বাংলাদেশ ছাড়াও জার্মানি, ভারত, রোমানিয়া, ফ্রান্স, চেক রিপাবলিক, মোনাকো, লেবানন, বসনিয়া, তাইওয়ান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, রাশিয়া, ইতালি, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, আফগানিস্তান, আজারবাইজান, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে ও কাজাখস্তানসহ অনেক দেশ অংশগ্রহণ করে। ইরানের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় চলচ্চিত্র নির্মাতা রেজা মীর কারিমির তত্ত্বাবধানে ২১ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত এই উৎসবে বিশ্ব বরেণ্য সব চিত্রনির্মাতা ও বিচারকেরা উপস্থিত ছিলেন। ১৯৮২ সাল থেকে এই উৎসবটি চালু রয়েছে।