সোমবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং, ৮ই কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

English

ইরানের উন্নয়ন বিস্ময়কর ও অভাবনীয় : অধ্যাপক ড. আবদুস সবুর খান

পোস্ট হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৭ 

news-image

তেহরানে ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যানদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে । সেখানে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যানরা। আন্তর্জাতিক এ সম্মেলন এবং তাদের সফর নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবদুস সবুর খান রেডিও তেহরানকে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।

অধ্যাপক আবদুস সবুর খান বলেন, ‘ইরানের উন্নয়ন বিস্ময়কর ও অভাবনীয়’। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন রেডিও তেহরানের পরিচালক সোহেল আহম্মেদ। গাজী আবদুর রশীদের পরিবেশনায় পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো।

রেডিও তেহরান: জনাব অধ্যাপক ড. আবদুস সবুর খান- আপনার এবারের ইরান সফরের উদ্দেশ্য কী? এবারের সফরে কী কী কর্মসূচি ছিল?

ড. আবদুস সবুর খান: আমরা এবার ইরান সফরে এসেছি দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং আল্লামা তাবাতাবায়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত প্রথম ফার্সি ভাষা সাহিত্য এবং ইরানোলোজি বিভাগগুলোর চেয়ারম্যানদের একটি সম্মেলনে অংশ নিতে।

বিশ্বের ৪১ টি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ফার্সি কোর্স বা ইরানোলোজি বিভাগের চেয়ারম্যান এবং পরিচালকরাই মূলত এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।

এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল- বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফার্সি ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বর্তমান কী অবস্থা এবং অতীতে কী অবস্থায় ছিল তা তুলে ধরা। সেই অতীতের অবস্থার তুলনায় বর্তমানে অগ্রগতি হয়েছে কিনা তাও বোঝার চেষ্টা করা। তাছাড়া ফার্সি-ভাষা সংস্কৃতির উন্নয়নে কাজ করতে গিয়ে কোনো ধরনের সমস্যায় আমরা পড়ছি কি না তা জানার চেষ্টা করা। মূলত এসব বিষয় পর্যালোচনার জন্য ১৭ এবং ১৮ জানুয়ারি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

রেডিও তেহরান: এবারের সফর থেকে আপনাদের অর্জন কী?

ড. আবদুস সবুর খান :  দেখুন, অর্জন সম্পর্কে আমি বলব-একটি ভাষা-সাহিত্য এবং সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর ৪১ টি দেশের প্রায় ২০০ প্রতিনিধির এমন একটি সম্মেলনে একত্রিত হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আন্তর্জাতিক ইংরেজি ভাষার কোনো সম্মেলনে এতগুলো দেশের এবং এত সংখ্যাক প্রতিনিধি আসে কিনা তা আমার জানা নেই! ফলে সত্যিই এ সম্মেলনটি খুব বিস্ময়কর ছিল। অংশগ্রহণকারী প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান বা পরিচালকদের দেয়া প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারলাম প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১০ থেকে ১৫ বছরে ফার্সি ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ব্যাপক অগ্রগতি ও উন্নয়ন ঘটেছে। পৃথিবীতে ফার্সি ভাষা–সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নয়ন সত্যিই বিস্ময়কর।

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশের ক্ষেত্রে ইরানের কেমন সহায়তা পাচ্ছেন আপনারা?

ড.আবদুস সবুর খান: দেখুন, ফার্সি ভাষা–সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে অভাবনীয় অগ্রগতির কথা বললাম সেজন্য ইরানের সরকার এবং সেইসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যাপক অবদান রয়েছে। তবে  বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বেশি অবদান রাখছে ইরান সরকার এবং বাংলাদেশের ইরান দূতাবাস ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। তারা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবজেক্ট ম্যাটার এবং বইপত্র সরবরাহ করছে। তেহরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের বিভিন্ন মেয়াদে বৃত্তি প্রদান করছে। এর পাশাপাশি ভৌত অবকাঠামোগত সহায়তাও ইরান দিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৩ সালে কলা ভবনের ৫ তলার পশ্চিমাংশ ইরান সরকারের আর্থিক সহায়তায় নির্মিত হয়েছে। ইরানের সহায়তায় নির্মিত অংশের নাম দিয়েছি হাফেজ সরা।

তাছাড়া আমি ইরানে আসার মাত্র কয়েকদিন আগে ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬ তে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা ল্যাব করার জন্য ইরানের একটা ফান্ড পেয়েছি।

রেডিও তেহরান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার বিভাগে ভর্তির প্রক্রিয়া কী?

ড. আবদুস সবুর খান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া এখনও পর্যন্ত বলা হচ্ছে সবচেয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া। আমাদের এখানে ভর্তির জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা মানদণ্ড আছে। সেই যোগ্যতা থাকলে শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারবে। আর প্রতি বছর একটি ভর্তি কমিটি করা হয়। প্রতিটি বিভাগের চেয়ারম্যান, প্রভোস্ট এবং ডীনদের নেতৃত্বে ওই কমিটি করা হয়। তারাই পুরা ভর্তি প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেন।আমি যদি এবছরের ভর্তির কথা বলি তাহলে আমাদের ‘খ’ ইউনিটের বা কলা অনুষদের ভর্তিতে পাসের হার ছিল সাড়ে এগারো। আমি দেখেছি কলা অনুষদের ভর্তির ক্ষেত্রে সব বিভাগ মিলিয়ে সিট আছে ২২১২ টি। তো সেখানে মেধা তালিকায় যারা উপরের দিকে ছিল অর্থাৎ ১০৫০ থেকে শুরু হয়ে ১৪৮০’র মধ্যে আমার বিভাগের ছাত্র পূর্ণ হয়ে যায়। আর আমার বিভাগে ভর্তির জন্য আলাদা কোনো বিশেষ কিছুর প্রয়োজন হয় না। কলা অনুষদের অন্যান্য বিভাগের মতোই ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে ফার্সি বিভাগে ভর্তি হওয়া যায়।

রেডিও তেহরান: ড.সবুর খান ২০১১ সালে আপনি সর্বপ্রথম ইরান সফরে এসেছিলেন। আর এবার ২০১৭ সালে আবার এলেন। তো এই সময়ের মধ্যে ইরানের আর্থ-সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কি ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন।

ড. আবদুস সবুর খান: জ্বি- গত পাঁচ বছরে ইরানের যে পরিবর্তন হয়েছে তা আমার কাছে বিস্ময়কর ও অভাবনীয় বলে মনে হয়। আমি এবার ইরানে এসে প্রথম দিন বাসে উঠেছিলাম। হোটেল এসত্বেগলাল থেকে তাজরিশে যাওয়ার সময় আমার সহকর্মীরা সবাই ট্যাক্সিতে করে গেলেন আর আমি বাসে উঠে বসলাম। আমার উদ্দেশ্যে ছিল ইরানের সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি কেমন, তারা কিভাবে বাসে চলাচল করে সেটা দেখা। অফিস ফিরতি মানুষেরা কিভাবে বাসে চলাচল করে তা দেখারও ইচ্ছা ছিল। বাসে উঠে আমার খুব বিস্ময় লাগল। দেখলাম বাস ভর্তি যাত্রী কিন্তু টু শব্দ নেই। সবাই নিঃশব্দে বাসে উঠছে আবার নিঃশব্দে নামছে।

এ প্রসঙ্গে যদি ঢাকা শহরের সাথে তুলনা করি তাহলে সেখানে দুর্বিষহ যানজটের চিত্র দেখতে পাই। আর তেহরানে যানজট আছে তবে তা শৃঙ্খলিত। এখানে বাসের জন্য যে লেন সেটা খালি থাকছে অথচ সেখানে ট্যাক্সি ঢুকতে পারছে না বা ঢুকছে না। আমার মনে হয় এখানে সরকার একটা পলিসি করেছে। যাতে মানুষ ট্যাক্সিতে যাতায়াতে নিরুৎসাহিত হয় সেজন্য পরোক্ষভাবে এমন ব্যবস্থা করেছে। এতে করে গণপরিবহনে মানুষের যাতায়াত বাড়বে এবং রাস্তায় যানজট কম হবে। তবে আমাদের দেশে ঠিক তার উল্টো অবস্থা।

আর ভৌত অবকাঠামোর দিক থেকে দেখলাম ইরানের অনেক উন্নতি হয়েছে। আগে যখন ইরানে এসেছিলাম তারপরই গিয়েছিলাম ইস্তাম্বুলে। সেখানে গিয়ে মনে হয়েছিল তেহরান- ইস্তাম্বুলের তুলনায় পিছিয়ে আছে। কিন্তু ৫ বছর পর এবার এসে মনে হলো তেহরান আগের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে গেছে। তাছাড়া সাংস্কৃতিক দিক থেকেও অনেক এগিয়েছে।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক সবুর খান, বাংলাদেশ এবং ইরানের মধ্যেকার সাংস্কৃতিক বন্ধন কোন পর্যায়ে আছে?

ড. আবদুস সবুর খান: দেখুন. প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশ এবং ইরানের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও  ধর্মীয় বন্ধন আছে। খ্রীষ্টপূর্ব পনের শ অব্দে যখন আর্যদের একটা অংশ আমাদের এখানে আসে এবং আরেকটা অংশ ভারতে যায় তখন থেকেই এ সম্পর্ক সৃষ্টি হয় উভয় দেশের মধ্যে। তবে মাঝখানে কিছু সমস্যা থাকলেও তখন ব্যক্তি টু ব্যক্তি সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের সাথে ইরানের একটি সাংস্কৃতিক চুক্তি সম্পাদিত হয়। তারপর ১৯৭৮ সালে ইরান থেকে একজন ভিজিটিং প্রফেসর আসলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর ইরান সরকারের সহযোগিতায় বাংলা একাডেমি থেকে ‘শাহনামা’র পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ প্রকাশিত হলো। তারপর ১৯৯৩/৯৪ সালে আরেকটি সাংস্কৃতিক চুক্তি হলো দুদেশের মধ্যে।

তবে ইরান নিয়মিতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং অধ্যাপক পাঠালেও আমরা সেটা পারছি না। কিন্তু দুদেশের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা চেয়ার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ইরানের সে প্রস্তুতি আছে এবং তারা বেশ কয়েকবার আমাদেরকে এ ব্যাপারে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমরা একজন ভিজিটিং অধ্যাপক সেখানে পাঠাতে পারছি না।

তো আমার মনে হয়- ইরান সরকার যেভাবে আমাদের দেশে তাদের সাহিত্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি বিস্তারে উদ্যোগ নিয়েছে পাশাপাশি আমাদেরও এ ব্যাপারে কিছু উদ্যোগ নেয়া উচিত। আসলে পরস্পরের মধ্যে লেনদেন না হলে তো আর সম্পর্ক হয় না। কেবলমাত্র ইরানই আমাদেরকে সবকিছু দেবে, এখানে আসবে অথচ আমরা কিছু দেব না বা সেখানে যাব না; তাহলে তো সম্পর্কের  উন্নয়ন হবে না।

রেডিও তেহরান: ইরানের কোথায় কোথায় গেলেন এবং কেমন দেখলেন?

ড. আবদুস সবুর খান: ইরানের অনেক জায়গায় ঘুরেছি। আমি এখানে এলেই চেষ্টা করি তেহরানের বাইরে যেতে। ইরানের জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করি। খুব ছোটো বেলা থেকে এ বিষয়টি আমাকে খুব টানে। এবার আমি রাশত প্রদেশের গিলানে গিয়েছিলাম। সেখানের একটি গ্রামে একটি ইরানি পরিবারের সাথে রাত কাটিয়েছি। আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। বলা চলে একেবারেই গ্রাম। চারদিকে ধান খেত। যে পরিবারের সঙ্গে ছিলাম তাদের ঘরে পোষা মুরগির ডিম ভাজি দিয়ে রাতের খাবার খেলাম। এছাড়া ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ-দেখতে মাসুলে  গেলাম। তাছাড়া সেখানকার একটি নদীও দেখলাম। এসব জায়গায় খুব ভালো লাগলো।