রবিবার, ১৬ই জুন, ২০১৯ ইং, ২রা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম বীর নায়ক শহীদ ড. মোফাত্তেহ্

পোস্ট হয়েছে: নভেম্বর ১০, ২০১৬ 

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে যেসব শীর্ষস্থানীয় আলেম ও বুদ্ধিজীবী এ বিপ্লবের অনুকূলে জনমত গঠন ও জনগণকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন এবং এ কারণে বিপ্লবের বিজয়ের অব্যবহিত পরে ইসলাম ও মুসলমানদের দুশমন গোষ্ঠীর হাতে শহীদ হন তাঁদের মধ্যে প্রথম কাতারের ব্যক্তিত্ববর্গের অন্যতম ছিলেন শহীদ ড. মোহাম্মাদ মোফাত্তেহ্। তিনি মাত্র ৫১ বছর বয়সে শাহাদাতের অমৃত পেয়ালা পান করেন।
মোহাম্মাদ মোফাত্তেহ্ ১৩০৭ ইরানী সালের ২৮শে খোরদাদ (মোতাবেক ১৮ই জুন ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ) ইরানের হামেদান প্রদেশের ফামেতীন জিলার কালের সার নামক গ্রামের এক আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৩৫৮ ইরানী সালের ২৭শে অযার (মোতাবেক ১৮ই ডিসেম্বর ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ) রাজধানী তেহরানে ইসলামের দুশমনদের হাতে শহাদাত বরণ করেন। তাঁর পিতা মাহমূদ মোফাত্তেহ্ হামেদানের একজন স্বনামখ্যাত আলেম ছিলেন।
মোহাম্মাদ মোফাত্তেহ্ হামেদানে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর তিনি সেখানে অখুন্দ মোল্লা আলীর ন্যায় স্বনামখ্যাত ওলামায়ে কেরামের কাছে ফিকাহ্শাস্ত্রের ওপর প্রাথমিক পর্যায়ের অধ্যয়ন সমাপন করেন। এরপর মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি উচ্চতর পর্যায়ের দ্বীনী ইল্ম অর্জনের লক্ষ্যে ইরানের প্রধান দ্বীনী জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত ধর্মীয় নগরী কোমে গমন করেন।
কোমে তিনি বরেণ্য ওলামায়ে কেরামের নিকট জ্ঞানার্জন করেন। তাঁর উস্তাদগণের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ববর্গ ছিলেন আয়াতুল্লাহ্ উযমা সাইয়্যেদ রূহুল্লাহ্ খোমেইনী (রহ্.) [পরে যিনি হযরত ইমাম খোমেইনী হিসেবে বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত হন], আয়াতুল্লাহ্ উযমা সাইয়্যেদ হোসাইন তাবাতাবাঈ, বুরুজেরদী (রহ্.), আয়াতুল্লাহ্ উযমা সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ রেযা গোলপায়গনী (রহ্.), স্বনামখ্যাত মুফাস্সিরে কোরআন আল্লামা সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ হোসাইন তাবাতাবাঈ (রহ্.), স্বনামখ্যাত দার্শনিক মীর দামাদ (রহ্.) ও হাজ অগা রাহীম আরবাব (রহ্.)। তিনি এসব মহান উস্তাদের র্দাসের মজলিসগুলোতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। তবে তিনি মানবিক জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়ও ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। দ্বীনী ইল্মে ব্যাপক দখলের কারণে অচিরেই তিনি কোমের দ্বীনী জ্ঞানকেন্দ্রের অন্যতম উস্তাদ্-এর মর্যাদা লাভ করেন। তবে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্বীয় জ্ঞানভাণ্ডারকে অধিকতর সমৃদ্ধ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় তিনি দর্শনশাস্ত্রে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি বিভিন্ন উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলেও শিক্ষকতা করেন।
মোহাম্মাদ মোফাত্তেহ্ জ্ঞানার্জন ও শিক্ষকতার পাশাপাশি ইল্মী বিতর্কেও অংশগ্রহণ করতেন এবং জনগণকে দ্বীনী ও রাজনৈতিক বিষয়ে পথনির্দেশ প্রদানের লক্ষ্যে বক্তৃতা করতেন। একই সাথে তিনি লেখালেখিও করতেন এবং বিভিন্ন দৈনিক ও ইসলামী সাময়িকীতে তৎকালীন শাহী সরকারের সমালোচনা করে প্রবন্ধ লিখতেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও দ্বীনী জ্ঞানকেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের নিকট তাঁর লেখা খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ফলে ইরানের বিভিন্ন শহর থেকে বক্তৃতার জন্য তাঁকে দাওআত করা হতো। এসব দাওআতে সাড়া দিয়ে তিনি বিভিন্ন শহরে, বিশেষত আবাদান, আহ্ওয়ায, খোররাম শাহ্র, কেরমান, ইসফাহান, ইয়ায্দ ও শীরাযে সফর করতেন। তিনি যেসব সভা ও মাহ্ফিলে বক্তৃতা করতেন সেসব সভা ও মাহ্ফিলে তাঁর বক্তৃতা শোনার জন্য, বিশেষ করে তিনি পাহ্লাভী সরকারের সমালোচনা করে যেসব বক্তৃতা করতেন সেগুলোতে হাজার হাজার লোকের সমাবেশ ঘটতো।
মোফাত্তেহ্ শাহী সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তৃতা করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করায় সরকার তাঁর ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে এবং তাঁকে গ্রেফতার করে পূর্ব ইরানের যাহেদানে নির্বাসিত করে। এছাড়া, বিশেষভাবে পশ্চিম ইরানের খুযেস্তান প্রদেশে তাঁর সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করে সরকার তাঁর জন্য খুযেস্তান প্রদেশে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
নির্বাসিত জীবনে তাঁর অনেকগুলো বছর অতিক্রান্ত হবার পর ১৩৪৮ ইরানী সালে (১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর ওপর থেকে নির্বাসনের আদেশ তুলে নেয়া হয়। তখন তিনি যাহেদান থেকে রাজধানী তেহরানে চলে আসেন এবং তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলাহীয়্যাত (স্রষ্টাতত্ত্ব) ও ইসলামিক স্টাডিজ ফ্যাকাল্টিতে অধ্যাপক হিসেবে বরিত হন এবং তিনি শহীদ অধ্যাপক আয়াতুল্লাহ্ র্মোতাযা মোতাহ্হারীর পাশাপাশি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদেরকে দ্বীনী জ্ঞান শিক্ষা দেয়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
মোফাত্তেহ্ তেহরানে দ্বিনী শিক্ষার নিবেদিত অনুসারীদের বিখ্যাত দ্বীনী জ্ঞানকেন্দ্র ও মিলনায়তন হোসাইনীয়ায়ে এরশাদ-এ নিয়মিত বক্তব্য রাখতেন। সরকার হোসাইনীয়ায়ে এরশাদ বন্ধ করে দিলে মোফাত্তেহ্ তেহরানের মসজিদে জাভীদ-এ প্রাণচঞ্চল দ্বীনদার যুবকদের একটি গ্রুপ গঠন করেন এবং স্বয়ং তার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। বহুদর্শী মোফাত্তেহ্ এ মসজিদে নিয়মিত অর্থনীতি, দর্শন ও সমাজতত্ত্বের ওপরে বক্তৃতা করতেন এবং আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর বাণী ও ভাষণের সংকলন নাহজুল বালাগাহ্-এর ব্যাখ্যা করতেন। এছাড়া তিনি এখানে কোরআন মজীদের তাফসীর করতেন। এভাবে তিনি যুব সমাজকে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদেরকে মসজিদের প্রতি আকৃষ্ট করেন।
ড. মোফাত্তেহ্র এ কর্মকাণ্ডে পাহ্লাভী সরকার প্রমাদ গণে, ফলে ১৩৫৪ ইরানী সালে (১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ) মসজিদে জাভীদ বন্ধ করে দেয় এবং মোফাত্তেহ্কে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করে। তবে বছর খানেকের মধ্যেই তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়।
কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর মোফাত্তেহ্ অনেকটা আধা গোপনীয় আন্দোলন সংগঠনের কর্মসূচি বেছে নেন এবং আরো কতক আলেমের সাথে মিলে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে থাকেন। এ সময় (১৩৫৫ ইরানী সাল মোতাবেক ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ) তেহরানের মসজিদে কাবা-র ইমামতীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৩৫৬ ইরানী সালের মাঝামাঝি সময়ে (১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ) মোফাত্তেহ্ প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন। এ সময় তেহরানের কাইতারীয়াহ্ নামক স্থানে তিনি কয়েক লক্ষ লোকের সমাবেশে ঈদের নামাযে ইমামতী করেন এবং সেখানকার একটি টীলার ওপর দাঁড়িয়ে জনগণের উদ্দেশে জ্বালাময়ী বক্তৃতা করেন। নামায শেষে তিনি এ দ্বীনদার জনতার বিরাট মিছিলে নেতৃত্ব দেন। এছাড়া তিনি ১৬ই শাহ্রীভার (৫ই সেপ্টেম্বর) পরবর্তী বিক্ষোভ মিছিলের তারিখ নির্ধারণ করে ঘোষণা দেন।
শাহী সরকারের কুখ্যাত পুলিশ ও গুপ্ত পুলিশ বাহিনী সাভাক্-এর সদস্যরা ১৬ই শাহ্রীভারের মিছিলের ওপর হামলা চালায়। তারা বিশেষ করে মোফাত্তেহ্কে নির্মমভাবে প্রহার করে এবং এরপর তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করে। অবশ্য বিপ্লবী জনতার সর্বাত্মক রাজনৈতিক তৎপরতার ফলে বিপ্লবের বিজয় আসন্ন হয়ে উঠলে গ্রেফতার করার দুই মাসের মাথায় তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়।
এরপর ১৩৫৭ ইরানী সালের শেষ দিকে (১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে) ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলে বিপ্লবের মহান নায়ক হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে বিপ্লবের অন্য নেতৃবৃন্দ তাঁকে অভ্যর্থনা করার জন্য যে কমিটি গঠন করেন মোফাত্তেহ্ সে কমিটির অন্যতম পরিচালক সদস্য ছিলেন। আর বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয়ের পরে ইসলামী বিপ্লবী কমিটিসমূহ গঠিত হলে ড. মোফাত্তেহ্ ৪ নং কমিটির প্রধান নিয়োজিত হন। এছাড়া তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলাহীয়্যাত ও ইসলামিক স্টাডিজ ফ্যাকাল্টির প্রধানের দায়িত্ব লাভ করেন।
ড. মোফাত্তেহ্ ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের এক বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে ১৩৫৮ ইরানী সালের ২৭শে অযার (১৮ই ডিসেম্বর ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ) ফোরকান নামক একটি বিভ্রান্ত গোষ্ঠীর হাতে শাহাদাত বরণ করেন। তিনি যখন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলাহীয়্যাত ফ্যাকাল্টিতে প্রবেশ করছিলেন তখন এ গোষ্ঠীর কয়েক জন সদস্য তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। তাঁর সাথে তাঁর দু’জন দেহরক্ষীও শহীদ হন। ঘাতকরা অবশ্য ধরা পড়ে। তারা আদালতে স্বীকার করে যে, এর আগেও তারা তাঁকে হত্যা করার জন্য কয়েক দফা প্রচেষ্টা নিয়েছিল, কিন্তু সুবিধাজনক অবস্থায় না পাওয়ার কারণে তখন সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে নি।
শহীদ মোফাত্তেহ্র লাশ ধর্মীয় নগরী কোমে হযরত মাসুমাহ্ (সালামুল্লাহি ‘আলাইহা)-এর মাযারের আঙ্গিনায় দাফন করা হয়।
ইসলামী বিপ্লবের মহান নায়ক হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.), দ্বীনী জ্ঞানকেন্দ্রের শিক্ষক ও শিক্ষার্থিগণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থিগণের কাছে সমভাবে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ড. মোফাত্তেহ্র শাহাদাতকে স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে ইরানী সালের ২৭শে অযার (১৮ই ডিসেম্বর)-কে ‘রূযে ওয়াহ্দাতে হাওযাহ্ ও দানেশগাহ্’ (দ্বীনী জ্ঞানকেন্দ্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐক্য দিবস) নামকরণ করেন এবং এর ভিত্তিতে প্রতি বছরই ইরানী জনগণ এ দিনটিকে এ নামে পালন করে থাকে।
শহীদ ড. মোফাত্তেহ্ কেবল বাগ্মীই ছিলেন না, একজন সুলেখকও ছিলেন। তিনি তাঁর ৫১ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে বহু ব্যস্ততার মধ্যেও বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ইসলাম বার সারে দোরাহী (দুই পথের/ দুই ধারার মাঝখানে ইসলাম), যিয়ারাতে খোরাফেয়ে হাকীকাত (প্রকৃত সত্যের কুসংস্কারাচ্ছন্ন যিয়ারাত), কুদাকে নীল ইয়া র্মাদে ইনকিলাব (নীল শিশু বা বিপ্লবী ব্যক্তি), রাহ্ অভার্দহয়ে এস্তে‘মার (উপনিবেশবাদের উপহার), রাভেশে আন্দিশে (চিন্তার পদ্ধতি) ও দো‘আ ‘আমেলে পিশ্রাফ্ত ইয়া রুকূদ্ (দো‘আ উন্নতির বা স্থবিরতার কারণ)।
ইরান সরকার ২০০৯ সালে ড. মোফাত্তেহ্র ছবি সম্বলিত একটি ডাকটিকেট প্রকাশ করে। হামেদান প্রদেশের একটি গ্রামের নামকরণ করা হয় ড. মোফাত্তেহ্র নামে। এছাড়াও হামেদান প্রদেশে একটি ১০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ১৫০০০ দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি ফুটবল স্টেডিয়াম, মাশহাদের একটি হাইওয়ে, তেহরান মেট্রোর একটি স্টেশন প্রভৃতির নামকরণ করা হয় ড. মোফাত্তেহ্র নামে। ফামেনীন গ্রামে শহীদ মোফাত্তেহ্র বাড়িকে ইরানের জাতীয় স্মৃতিচিহ্নগুলোর অন্যতম হিসাবে রেজিস্ট্রিভুক্ত করা হয়।
(সূত্র : ইন্টারনেট)
সংকলন ও অনুবাদ: নূর হোসেন মজিদী