বুধবার, ১৬ই আগস্ট, ২০১৭ ইং, ১লা ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

English

ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবস

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ১০, ২০১৬ 

news-image

১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিতে হযরত ইমাম খোমেনী (রহ) এর নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের মাত্র দুই মাস পর দেশটিতে ৩০ মার্চ এক ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ওই গণভোটের মাধ্যমে ইরানের জনগণ ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। জনগণ ইসলামী প্রজাতন্ত্র চায় কিনা জানতে চেয়ে এই গণভোটের আয়োজন করা হয়। এতে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পড়েছিলো। এরপর ১ এপ্রিল ১৯৭৯ ইরানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে প্রতি বছরের ১ এপ্রিল ইরানে পালিত হচ্ছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবস।

ঐতিহাসিক ওই গণরায়ের মধ্য দিয়ে ইরানে রাজতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়া হয় এবং ইরানের জন্য রাজতন্ত্রকে চিরদিনের জন্য প্রত্যাখ্যান করে। এ ছাড়াও এর ফলে ইরানে নিষিদ্ধ হয় মানব-রচিত মতাদর্শ-ভিত্তিক সব ধরনের শাসন-ব্যবস্থা।

ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থা এমন এক ব্যবস্থা যা জনগণের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া যায় না। আর এ জন্যই জনগণের মতামত নেয়ার পদক্ষেপ নেন মরহুম ইমাম খোমেনী (র)। জনগণ অবাধে যাতে তাদের মতামত ব্যক্ত করতে পারে সে জন্য নির্বাচন ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রশ্নে ঐতিহাসিক গণভোটের প্রাক্কালে ইসলামী ইরানের অবিসংবাদিত নেতা ও ইসলামী বিপ্লবের মহান রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (র) বলেছিলেন, ‘এই গণভোট আমাদের জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করবে। এ গণভোট হয় আপনাদের স্বাধীনতা ও মুক্তি দেবে তথা ইসলামী গণতান্ত্রিক শাসন উপহার দেবে অথবা অতীতের মতই পরাধীনতা এবং রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসন বজায় থাকবে। আপনারা এ দুই পথের যে কোনো একটি পথ বেছে নিতে পারেন। এটা এখন আপনাদের স্বাধীন ইচ্ছার বিষয়।’

প্রথম ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবসে ইমাম খোমেইনী (রহ.) এক বাণীতে বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে যাদের হীনবল করা হয়েছে মহান আল্লাহ তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন বলে সূরা আল কাসাসের ৫ নম্বর আয়াতসহ কুরআনের নানা আয়াতে ওয়াদা করেছেন। মহান ইরানী জাতির প্রতি আমার আন্তরিক অভিনন্দন যারা রাজতন্ত্রের যুগে শাসকগোষ্ঠী ও রাজাদের জুলুমের কারণে অপমানিত হয়েছেন এবং দূর্ভোগ সহ্য করেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সম্মানিত করেছেন, তাঁর শক্তিশালী হাত দিয়ে জালিম শাসককে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আল্লাহর শক্তিই বঞ্চিত ও শোষিত শ্রেণী তথা মুস্তাজআফদের শক্তি। তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র কায়েম করে দিয়ে ইরানী জাতিকে তাদের ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকার দান করেছেন।

ইরানের জনগণের বিজয় সাফল্য এবং জনগণের নেতৃত্বের এই শুভদিনে আমি ইরানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করেছি। আমি বিশ্বের সামনে ঘোষণা করছি যে, এ ধরনের গণভোট তথা ইরানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র কায়েমের প্রশ্নে গণভোট ইরানের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এটা এমন একটি গণভোট যেখানে গোটা দেশের জনগণ উৎসাহ ও আনন্দের সাথে এবং ভালোবাসা ও আগ্রহের সাথে ব্যালট বাক্সের পাশে দলে দলে গিয়ে উপস্থিত হয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ভোট দিয়েছেন এবং খোদাদ্রোহী শাসনকে চিরদিনের জন্য ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করেছেন।’

ইমাম খোমেইনী (রহ.) আরও বলেছেন, ‘আমি এ ধরনের অনন্য ঐকমত্যকে অত্যন্ত মর্যাদার চোখে দেখছি যেখানে গোলযোগকারী ও খোদা-বিমুখ অল্প কিছুসংখ্যক লোক ছাড়া সবাই ‘আল্লাহর রজ্জুকে সম্মিলিতভাবে ও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর’- (আলে ইমরান : ১০২) শীর্ষক আল্লাহর আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া প্রদান করেছে। প্রায় সর্বসম্মতভাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে মতামত দিয়ে তারা প্রাচ্য ও পাশ্চাতের ব্যাপারে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ উপস্থাপিত করেছে।

আজ আপনাদের প্রতি অভিনন্দন। সাহসী তরুণদের শাহাদাত এবং সন্তানহারা পিতামাতার মাতম ও অসহ্য যাতনার মধ্য দিয়ে আপনারা বর্বর দুশমন ও যুগের ফেরাউনকে পরাভূত করেছেন এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য সিদ্ধান্ত প্রদানকারী ভোট দিয়ে ইনসাফপূর্ণ খোদায়ী শাসনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এটি এমন একটি শাসন যে শাসনে জাতির সকল স্তরের লোকের প্রতি সমানভাবে দৃষ্টি দেয়া হয়, খোদায়ী ইনসাফের আলো সবার উপর সমানভাবে পতিত হয় এবং কুরআন ও সুন্নাহর আশীর্বাদ সবাই সমানভাবে লাভ করে। সেই সরকারের প্রতি অভিনন্দন যার দৃষ্টিতে গোত্রে গোত্রে, কালা-সাদা, তুর্কী, ইরানী, কুর্দি বা বেলুচির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সবাই ভাই ভাই এবং সমান।’

ইমাম খোমেইনী (রহ.) ইসলামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে গিয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবসে আরও বলেছেন, ‘এ রাষ্ট্র এমন এক স্থান যেখানে খোদাভীতি, ধার্মিকতা, নৈতিকতা ও সৎকর্মের উপরই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভরশীল। এমনি দিনে আপনাদের প্রতি মোবারকবাদ। আজ জাতির সব স্তরের মানুষ তাদের অধিকারের নিশ্চয়তা পেয়েছে, ইনসাফের ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অন্যদের মধ্যে কোন বৈষম্য নেই। তার তথা শাহের পেছনে পেছনে খোদাদ্রোহিতাকেও কবর দেয়া হয়েছে। দেশ ঘরোয়া ও বাইরের শত্রুর থাবা থেকে এবং ডাকাত ও লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। এখন আপনারা সাহসী জনগণই ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পাহারাদার। শক্তি দিয়ে ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে তরুণদের এখন খোদায়ী এ উত্তরাধিকার রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে হবে। দুর্নীতিবাজ সরকারের অবশিষ্ট চিহ্ন বিশ্ব লুটেরাদের দালাল এবং পরগাছা তৈল গ্রাসকারীরা আপনাদের ঘনিষ্ঠতা অর্জনের জন্য অপেক্ষমাণ। জনগণের মধ্যেই খোদায়ী শক্তির অভিব্যক্তি ঘটে। এখন খোদায়ী শক্তির উপর ভরসা করে নিজের ভাগ্য গড়ার কাজ নিজের হাতেই নিতে হবে এবং সুযোগ সন্ধানীদের আর কোন পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ দেয়া যাবে না।’

ইমাম খোমেইনী (রহ.) প্রথম ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবসে আরও বলেছেন, ‘ জ্ঞানী গুণীদের মধ্য থেকে আপনাদের আস্থাভাজন লোক বাছাই করে সাংবিধানিক সংসদে পাঠানো এখন আপনাদের দায়িত্ব। তাঁরা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য সংবিধান তৈরি করবেন। আপনারা যেভাবে উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ভোট দিয়েছেন তেমনি অকল্যাণকামীদের সকল পথ বন্ধ করে দিয়ে জাতির জন্য ভোট প্রদান করুন। ১ এপ্রিল প্রথম খোদায়ী সরকার প্রতিষ্ঠার দিন। এদিন ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসবের মহান দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ দিন উদযাপন করা ও জীবন্ত করে রাখা জাতির কর্তব্য। এ দিনে ২৫০০ বছরের পুরাতন খোদাদ্রোহী সরকারের পতন ঘটেছে, শয়তানের রাজত্ব চিরদিনের জন্য উৎখাত হয়েছে এবং এর পরিবর্তে মজলুমের রাজত্ব কায়েম হয়েছে, যে রাজত্ব আল্লাহর রাজত্ব।

হে মহান জাতি! আপনাদের তরুণরা রক্ত দিয়ে আপনাদের অধিকার আদায় করেছে। আপনারা এ অধিকার লালন করুন, রক্ষা করুন এবং ইসলাম ও কুরআনের পতাকা তলে থেকে নিজেদের সমর্থনের ঘোষণাসহ খোদায়ী ইনসাফ কায়েম করুন। আমি সব শক্তি প্রয়োগ করে আমার জীবনের শেষ দিনগুলো আপনাদের সেবায় ব্যয় করব। আপনাদের সেবা ইসলামের সেবারই নামান্তর।’

ইমাম খোমেইনী (রহ.) প্রথম ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবসে আরও বলেছেন, ‘জাতির প্রতি আমার আশা, তারা তাদের সব শক্ত দিয়ে ইসলাম ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের হেফাজত করবে। সরকারের প্রতি আমার নির্দেশ আপনারা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের কাউকে ভয় না করে খোদাদ্রোহী সরকারের অবশিষ্ট চিহ্ন অপসারিত করুন এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সাধন করুন। খোদাদ্রোহী সরকারের প্রভাব এখনো দেশের সব ক্ষেত্রে শিকড় গেড়ে বসে আছে। বিচার মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগ পাশ্চাত্য কায়দায় প্রতিষ্ঠিত। এগুলোকে অবশ্যই ইসলামী কায়দায় পরিবর্তন করতে হবে। পৃথিবীকে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা দেখিয়ে দিন। আমি মহান আল্লাহ তাআলার কাছে ইসলামী রাষ্ট্র ও জনগণের শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বাধীনতার জন্য প্রার্থনা জানাই। সূত্র: আইআরআইবি