বৃহস্পতিবার, ১৭ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ২রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইরানি রূপকথা ‘সী-মোরগ’ ( ৫ম পর্ব)

পোস্ট হয়েছে: আগস্ট ৮, ২০১৬ 

news-image

কীভাবে এবং কখন শাহজাদির কাছে যাওয়া যাবে সেটা ভালো করেই জানতো বুড়ি। সে অনুযায়ী শাহজাদাকে ঠিকঠাকমতো শাহজাদির পালঙ্কের নীচে পৌঁছিয়ে দিয়ে বুড়ি চলে গিয়েছিল। এক পর্যায়ে তাদের বিয়ে হয় এবং বিয়ের পর শাহজাদির বাবা বাদশা তা মেনে নেয় নি। বাদশা তাদের দুজনকেই হত্যা করার নির্দেশ দেয়। শাহজাদা তখন বাদশার কাছে অনুরোধ রাখে মরার আগে তাদের দুজনকে একসাথে যেন দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ার সুযোগ দেয়।

বাদশা সুযোগ দিলে শাহজাদা তার স্ত্রীকে নিয়ে প্রাসাদের ছাদে গিয়ে নামাজ পড়েই সী-মোরগের পালকে আগুন জ্বালায়। সী-মোরগ সব ঘটনা শুনে তাদেরকে নিয়ে যায় এক বনে। সেই বনে আগুন লাগলে সী-মোরগ চলে যায়। শাহজাদা জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে সমুদ্রে গিয়ে ফিরে না আসায় তার স্ত্রীও ওই সমুদ্রের দিকে যায় এবং সমুদ্রের ওপারে সুন্দর এক শহরে গিয়ে এক বুড়ির ঘরে কাজ নেয়। তার ছেলেটিকে মসজিদের দরোজায় রেখে যায়। মসজিদের ইমাম শিশুটিকে নিয়ে নেয় এবং তার হাই থেকে সোনারত্ন আর চোখ থেকে যে মুক্তা ঝরেছিল সেগুলো কারণে তার আর কোনোরকম অভাব অনটন রইলো না।

শাহজাদার ছেলে তো ইমামের ঘরে দিব্যি বেড়ে উঠলো। কিন্তু মা-বাবা কারোরই খবর নেই। একদিন শাহজাদি মানে ছেলেটির প্রকৃত মা ছেলেকে দেখতে পেল। তার কাছে কেমন যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছিল। মায়ের মন, মায়ের চোখ তো, দৃষ্টি ভেদ করে সহজেই ভেতরে গিয়ে কড়া নাড়ে। যাই হোক শাহজাদি ছেলেটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো: তুমি কার ছেলে গো! দেখি আমার দিকে তাকাও! ছেলেটির গালে,মুখে, মাথায়, পুরো শরীরে হাত বুলিয়ে ভালো করে দেখলো শাহজাদি। ছেলেটি আলতো করে বললো: আমি মোল্লার ছেলে। মোল্লা মানে হলো আলেম অর্থাৎ মসজিদের ইমামকে বোঝানো হচ্ছে।

বাদশার মেয়ে মানে শাহজাদি বললো: অসম্ভব। তুমি আমার ছেলে। আমার সন্তান তুমি। আমার রতন-হাই।ছেলেকে আরও বললো: তুমি নিজেকে একবার আয়নায় দেখো! ভালো করে দেখো। দেখবে তোমার চেহারাটা হুবহু আমার মতো।

মহিলার কথা শুনে ছেলেটা একবার তার মানে শাহজাদির দিকে তাকালো এবং একবার নিজের দিকেও তাকালো। এরপর মাটির দিকে মাথা নীচু করে মনে মনে ভাবলো: এই মহিলার কথা তো মনে হয় ঠিক। আমার চেহারা আর তার চেহারার মধ্যে তো মিল আছে দেখছি। কিছুক্ষণ সে নীরব হয়ে রইলো। ছোট্ট মানুষ কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। মহিলাকে কোনো কিছু না বলে মাথা নীচু করেই সে ঘুরে ধীরে ধীরে পা ফেলে ফেলে চলে গেল যে ঘর থেকে সে এসেছিল সেই ঘরে অর্থাৎ ইমামের ঘরে।

ওই মহিলাকে দেখার পর থেকেই ছেলেটার মনটা কেমন কেমন করছিল। আবার চেহারাও দেখতে একইরকম। এসব ভাবছিল ছেলে। রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে ভাবতে সিদ্ধান্ত নিলো তার নিজের সঠিক পরিচয়টা জানতে হবে। কিন্তু কীভাবে! ভেবে উঠতে পারছিল না। রাতটা কোনোরকমে কেটে যাবার পর সকালে সে দেখলো ইমাম সাহেব ঘরে বসে কুরআন তিলাওয়াৎ করছেন। ছেলেটা আস্তে আস্তে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ইমাম জিজ্ঞেস করলেন: কী, কিছু বলবে? ছেলেটা সাহস পেয়ে বলল: হ্যাঁ! বলবো।

ইমাম জিজ্ঞেস করলেন: কী?

ছেলে বললো: আচ্ছা আমাকে সত্য করে বলবেন কে আমি? কী আমার পরিচয়? কার সন্তান আমি? সত্যিকারের ঘটনাটা আমাকে একটু খুলে বলুন।

ছেলের কথায় ইমাম একটু ভড়কে গেলেন। কুরআন শরীফ পড়া বন্ধ করে পুরো ঘটনা আদ্যোপান্ত ছেলেকে খুলে বললেন। ঘটনা শোনার পর সেদিন থেকে ছেলেটা যত হাই দিত আর যত মণিমুক্তা বের হত সব জমিয়ে রাখতো। তারপর সেগুলো দিয়ে আসতো তার মায়ের কাছে। এভাবে কাটতে লাগলো তার জীবন। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাসের পর বছর যায় ছেলেটাও শৈশবের পর যৌবনে পা দেয়। শাহজাদা এবং শাহজাদীর সন্তান সে। দেখতেই অন্যরকম লাগে, সত্যিকারের রাজপুত্রের মতোই। তার পালক পিতা ইমাম এবার তার জন্য সুন্দরী এক কন্যা বেছে নিয়ে অ্যাঙ্গেইজমেন্ট করালেন। সুন্দরী কন্যা আর কেউ নয় সেই শহরেরই বিশাল এক ধনীর কন্যা। রাজদরবারে তার অনেক কদর। এইসব ঘটনা সে তার মাকে বলে দিল।

কিছুদিন পর তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। ছেলের মা এবার ভাবলেন,এখনই সময়। ছেলে তার বৌকে নিয়ে ইমামের বাসায় আসছিল। কী সুন্দর দেখাচ্ছে তাদের। বৌ লম্বা স্কার্ফ পরে লাজুক লাজুকমতো বসে আছে ঘোড়ার পিঠে। ঘোড়াকেও সাজানো হয়েছে রাজকীয়ভাবে। ছেলের ঘোড়াও তেমনি। মা সোজা ছেলে এবং মেয়ের ঘোড়ার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল: এই ছেলে আমার সন্তান। সুতরাং এই কন্যাও আমার বৌ-মা। কণের সঙ্গে বাদশাহও এসেছিলেন। তিনি ভীষণ আনন্দিত ছিলেন। হঠাৎ এই ঘটনায় তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আদেশ দিলো মহিলাকে তার সামনে হাজির করতে। তাই করা হল।

বাদশাহ এবার মহিলাকে বললেন: ইমামের ছেলেকে তুমি নিজের সন্তান বলে দাবি করছো কেন? মহিলা এই প্রশ্নের জবাবে তার পুরো জীবনের ঘটনা বাদশাকে খুলে বললো। বাদশা সব ঘটনা শুনে বুঝলেন এই মহিলা তো তারই স্ত্রী যাকে সে বনে রেখে চলে গিয়েছিল। আর এই ছেলেও তার নিজের সন্তান। দীর্ঘদিন তাদের খুঁজে পায় নি সে। ইতোমধ্যে সে ওই শহরের বাদশা হয়ে যায়। সবকিছু পরস্পরে জানাজানি হয়ে যাবার পর সবাই আনন্দিত হয়। বাদশা পুরো শহরকে ভালো করে সাজাতে বলে। চল্লিশদিন ধরে উৎসব হয়। নিজের ছেলের হাতে পুত্রবধূর হাত তুলে দিয়ে বাদশাহ বলেন: এই ঘরে নয়,চলো তোমরা রাজপ্রাসাদে।

বৌকে বলেন: তোমাদের খুঁজতে আমি বনে গিয়েছিলাম। খুঁজে না পেয়ে অগত্যা তোমাদের ছাড়া দীর্ঘদিন কাটালাম। এবার চলো তোমার প্রাসাদে। বর-কণেসহ সবাই ফিরে গেল প্রাসাদে। সূত্র: পার্সটুডে