শনিবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

English

ইরানি রূপকথা ‘সী-মোরগ’ ( ৪র্থ পর্ব)

পোস্ট হয়েছে: আগস্ট ১, ২০১৬ 

news-image

শাহজাদি তার চল্লিশ নারী রক্ষীকে ডেকে বললো: তোমরা যে যার কাজে যাও! তারা চলে গেল। শাহজাদির কাছে থাকলো আর মাত্র দুইজন নারী। এরা শাহজাদির যত্ন-আত্তি নিত। শাহজাদি তাদেরকেও এক বাহানায় তাদের নিজ নিজ কামরায় চলে যেতে বলল। সবাই চলে যাবার পর শাহজাদি যুবককে বললো বাইরে মানে আলোতে যাবার জন্য। সেখানে যাওয়ার পর শাহজাদি খুব ভালো করে শাহজাদাকে দেখলো। তার মনে হলো এতো সুন্দর এবং স্মার্ট শাহজাদা এর আগে আর কখনো সে দেখে নি।

শাহজাদি মনে মনে ভাবলো এই ঘটনা যেন কেউ টের না পায়। সে শাহজাদাকে পছন্দ করে ফেললো এবং তাকে তার রুমেই রেখে দিতে চাইলো। সেজন্য শাহজাদি এক সেট নারীর পোশাক এনে দিলো শাহজাদাকে। শাহজাদাকে ওই পোশাক পরতে বললো। কিন্তু বেগানা কোনো পুরুষকে তো তার ঘরে রাখা যায় না! তাই শাহজাদাকে বললো সে যেন তাকে বিয়ে করে।

শাহজাদা বিয়ে প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল এবং শাহজাদিকে বিয়ে করে ফেলল। কিন্তু শাহজাদির সাথে তার বাবার যেহেতু প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল সেজন্য বুঝতে পেরেছিল যে বাবা এই বিয়ে কিছুতেই মেনে নেবে না। সুতরাং শাহজাদি তার সদ্য বিবাহিত স্বামিকে বলল: মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নাও কেননা বাবা কিছুতেই এই বিয়ে মেনে নেবেন না। তাই হলো। বাদশাহ তার মেয়ের বিয়ের কথা শুনেই ক্ষেপে গেল এবং আদেশ দিলো শাহজাদিকে এবং তার স্বামিকে যেন হত্যা করা হয়। শাহজাদা বাদশার কাছে বিনয়ের সঙ্গে আবেদন জানায় যেন মৃত্যুর আগে তাদেরকে মানে স্বামি-স্ত্রী দুজনকে একসঙ্গে দু’রাকআত নফল নামাজ পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়। বাদশা আবেদন মঞ্জুর করে এবং শাহজাদা তার নববধূকে নিয়ে প্রাসাদের ছাদে উঠে নামাজে দাঁড়ায়।

নামাজ পড়া শেষ করেই শাহজাদা সী-মোরগের পালকে আগুন জ্বালায়। তৎক্ষণাৎ সী-মোরগ এসে হাজির হয়ে যায়। সী-মোরগকে সব ঘটনা খুলে বলার পর তাদের এখান থেকে অন্য কোথাও নিয়ে গিয়ে প্রাণে বাঁচাতে বলে। সী-মোরগ দুজনকেই তার পিঠে চড়িয়ে উড়াল দেয় এবং উড়তে উড়তে গিয়ে পৌঁছে এক বনে। বনে তাদেরকে নামিয়ে দিয়ে সী-মোরগ সমুদ্রে গিয়ে তার পাখা ধুয়ে এসে দুই পাহাড়ের দিকে দুই পাখা বিছিয়ে দেয় শুকানোর জন্য। কিন্তু আবহাওয়া ছিল খুব ঠাণ্ডা। তাই শাহজাদা কাঠের টুকরো এটাসেটা জমিয়ে তাতে আগুন জ্বালিয়ে দিলো গরম হবার জন্য। তখনই ঘটে গেল এক মহা বিপত্তি।

শাহজাদার জ্বালানো আগুন গিয়ে লাগলো বনের গাছগাছালিতে। ওই আগুন কিছুতেই আর নিয়ন্ত্রণ করা গেল না। আগুনে পুড়ে গেল বন এবং সেইসঙ্গে সী-মোরগের পাখাতেও লাগলো। সী-মোরগ সঙ্গে সঙ্গে উড়ে চলে গেল পাশ্ববর্তী পাহাড়ের চূড়ায়। পাখা ঝাপটে ঝাপটে আগুন নেভালো সে। তারপর শাহজাদার দিকে তাকিয়ে বলল: আমার পালক তো পুড়ে গেছে এখন আর আমি তোমার সাহায্যে আসতে পারবো না। এই বলে সী-মোরগ উড়াল দিলো। সুতরাং শাহজাদা শাহজাদিকে ওখানেই থেকে যেতে হলো।

এভাবে শাহজাদা এবং তার স্ত্রীর বনবাসে কেটে গেল বেশ কিছু সময়। ইতোমধ্যে আল্লাহর ইচ্ছায় তাদের একটি পুত্র সন্তান হলো। এই শিশুটি যখনই হাই দিতো তখনই তার মুখ থেকে স্বর্ণরত্ন বেরিয়ে আসত। আর যখনই কাঁদতো তার চোখ থেকে অশ্রুর পরিবর্তে মুক্তা বেরিয়ে আসতো। সে কারণে এই ছেলের নাম রাখা হলো ‘রতন-হাই’। শাহজাদা দেখলো এভাবে বসে থাকলে তো না খেয়ে না দেয়ে মরতে হবে। তাই সে তার স্ত্রীকে বললো: তুমি এখানেই থাকো বাচ্চাকে নিয়ে! আমি একটি ঘুরে ফিরে দেখে আসি। এই বলে শাহজাদা চলে গেল সমুদ্রের দিকে। সেখানে গিয়ে দেখলো নৌকা তৈরি করে এমন একজনকে। তাকে বললো শাহজাদার জন্যও যেন একটা নৌকা তৈরি করে।

নৌকায় চড়ে সমুদ্রের অনেকখানি ভেতরে যাবার পর শাহজাদা ভাবলো তার বৌ-ছেলেকেও নিয়ে আসবে। কিন্তু ফেরার মতো অবস্থা আর তার রইলো না। মাঝ দরিয়ার উত্তাল ঢেউ ঠেলে সমুদ্রের তীরে ভিড়বার মতো পরিস্থিতি তার ছিল না। এদিকে তার স্ত্রীও দেখলো যে অনেকদিন হয়ে গেছে তার স্বামী ফিরছে না। তাই বাচ্চাকে কোলে নিয়ে সমুদ্রের তীরে আসলো সেও। এক মুষ্টি মণিমুক্তা নৌকা প্রস্তুতকারীতে দিয়ে বললো তার জন্য যেন একটা নৌকা বানায়। ওই নৌকায় চড়ে তারা চলে গেল সমুদ্রের ওপারের সুন্দর এক শহরে। শাহজাদি ওই শহরে ঘুরে ঘুরে কোথাও এক আশ্রয় পেল না। শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে একটি মসজিদের দরোজার সামনে রেখে এক বুড়ির ঘরে গিয়ে বলল তাকে যেন একটু কাজটাজ দেয়। বুড়ি তার হাত ধরে শাহজাদিকে নিয়ে গেল তার ঘরের ভেতর। শাহজাদি ঘরের টুকটাক কাজ করল।

এদিকে রাত শেষে ভোর হতেই ওই মসজিদের ইমাম গেল নামাজ পড়তে। মসজিদের দরোজায় দেখলো একটা শিশু কান্নাকাটি করছে আর তার চোখের নীচে প্রচুর মুক্তা জমে আছে। ইমাম ওই বাচ্চাটিকে ঘরে নিয়ে গিয়ে বৌকে দিয়ে বলল: ওকে ভালো করে ধুয়ে মুছে পরিস্কার করো। ভালো জামাকাপড় পরাও। আল্লাহ এই বাচ্চাটি আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন। মহিলা বাচ্চাটিকে কোলে নিতেই কান্না থেমে গেল তার। বাচ্চাটিকে আদর করে ঘুম পাড়িয়ে দিলো। এত প্রচুর পরিমাণ মুক্তা তারা পেল যে তাদের আর কোনো অভাব অনটনই রইলো না। সেখানেই শাহজাদার সন্তান বেড়ে উঠতে লাগলো। তারপর কী ঘটলো? সে কথা জানবো পরবর্তী আসরে।

সূত্র: পার্সটুডে