রবিবার, ১৯শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৫ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শাহাদাত এবং মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা

পোস্ট হয়েছে: নভেম্বর ২২, ২০১৮ 

 

ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শাহাদাত এবং মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা
মো. আশিফুর রহমান

ভূমিকা
যে কোন জাতি বা জনগোষ্ঠীর সফলতার জন্য যেমন শাসকগোষ্ঠীকে যোগ্যতাসম্পন্ন ও দক্ষ হতে হয়ে এবং যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হয়, তেমনি জনসাধারণকেও তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতে হয়। যে কোন এক পক্ষের দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অমনোযোগিতা সেই জাতির জন্য দুর্ভোগ বয়ে আনে। কোন জনগোষ্ঠী যদি উন্নত বৈশিষ্ট্যের অধিকার হয়, কিন্তু কোনভাবে অপশক্তি ক্ষমতা কুক্ষিগত করে তাহলে সেই জনগোষ্ঠী দুর্গতিতে নিপতিত হয়। কারণ, শাসকের খারাপ বৈশিষ্ট্যের প্রভাব জনগণের মাঝে দ্রুত সংক্রমিত হয়ে পড়ে। অপরদিকে কোন জনগোষ্ঠীর শাসকবর্গ যদি উত্তম হয়, কিন্তু ব্যাপক জনগোষ্ঠী দুরাচারী হয় তাহলেও সেই জাতির ভাগ্যে অকল্যাণ ছাড়া অন্য কিছু জোটে না, যেমনটি ঘটেছিল ইমাম আলী (আ.) খেলাফতকালে।
মানব জাতির ইতিহাসে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শাসকবর্গ শাসনকার্যে স্বেচ্ছাচারিতা করেছে এবং জনগণের ওপর নানা বিষয় চাপিয়ে দিয়েছে। তবে সকল জাতিতে স্বেচ্ছাচারিতার ক্ষেত্র অভিন্ন বিষয়ে ছিল না; বরং একেক জাতি, একেক জনগোষ্ঠীতে শাসকবর্গের স্বেচ্ছাচারিতা ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে ছিল। কোথাও ক্ষমতার লোভ, কোথাও অর্থ-বিত্ত, কোথাও জাতিগত বিদ্বেষ, কোথাও বর্ণপ্রথা, কোথাও গোঁড়ামি, কোথাও কূপম-ূকতা, কোথাও ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান প্রভৃতি বিষয় তাদেরকে স্বেচ্ছাচারী করেছে। যখনই জনগণ এমন শাসকবর্গের বিরোধিতা করেছে, তখনই শাসকবর্গ জনগণের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে, তাদেরকে দমন করেছে।
মুসলিম জাতি ও ইসলাম ধর্ম ব্যতীত যেহেতু অন্যান্য জাতি ও ধর্মের বর্তমান বিধি-বিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্য ও ধরন এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যের বণ্টনের অবস্থা সকলের নিকট স্পষ্ট সেহেতু তাদের সম্পর্কে আলোচনা করায় কোন তেমন উপকারিতা নেই। আর তাই আমরা কেবল ইসলামি সমাজ নিয়ে কথা বলতে চাই।
ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা মানব জীবনের সাথে সম্পৃক্ত সকল বিষয়ে কথা বলেছে, দিক-নির্দেশনা দিয়েছে। মহানবী (সা.) পবিত্র কোরআন থেকে মানুষকে তাত্ত্বিকভাবে যেমন শিক্ষা দিয়েছেন, তেমনি কোরআনের বিধি-বিধান কীভাবে ব্যবহারিকভাবে পালন করতে হয় সেই শিক্ষাও দিয়েছেন।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে শাসনকার্য পরিচালনা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়গুলোর একটি। মহানবী (সা.) মদীনায় হিজরত করার পরই একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন এবং দীর্ঘ দশ বছরের অধিককাল সময় তিনি শাসনকার্য পরিচালনার একটি বাস্তব রূপরেখা মুসলিম সমাজের সামনে উপস্থাপন করেন।
শাসকের বৈশিষ্ট্য, শাসকের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন, শাসকের দায়িত্ব-কর্তব্য ও অন্যান্য খুঁটি-নাটি বিষয় ইসলামে সুনির্দিষ্ট ভাষায় উল্লেখ রয়েছে, তেমনি জনগণের ভূমিকারও উল্লেখ রয়েছে। প্রশ্ন হলো মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর সার্বিকভাবে মুসলিম উম্মাহ তাদের ভূমিকা কি যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছিল? প্রশ্নটি উত্থাপন করার পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। যেমন মহানবী (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর পরিবার-পরিজন (আহলে বাইত) অর্থাৎ ইমাম আলী (আ.), হযরত ফাতিমা (আ.) ও তাঁদের দুই সন্তান বেহেশতের যুবকদের নেতা ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন (আ.)-এর মর্যাদা সম্পর্কে মুসলমানদের সামনে অনেক কথা বলেছেন এবং তাঁদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করা ও তাঁদের প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁর উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইসলামের এই চার মহান ব্যক্তিত্বের প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে তা ইতিহাসের পাতায় লেখা রয়েছে। এখানে কেবল ইমাম হোসাইন (আ.)-এর বিয়োগান্ত শাহাদাতের বিষয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চাই, যেহেতু উম্মতের পূর্ববর্তী সকল অন্যায় আচরণকে তা ছাপিয়ে গিয়েছিল এবং মহানবী (সা.)-এর পরিবারের প্রতি নৃশংসতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছিল।
আমরা জানি, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সা.) দীর্ঘ ২৩ বছর কঠোর সংগ্রামের মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে মহান আল্লাহর কাছে মনোনীত একমাত্র ধর্ম ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর থেকেই ইসলামের ইতিহাসে অনেক অবাঞ্ছিত ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে অনৈক্য দেখা দেয়, কোন কোন মুসলিম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়। এমনকি ভ- নবীদেরও আবির্ভাব হয়। আর মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে। ২৫ হিজরিতে ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্তে ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান নিহত হন। বিভ্রান্তি ছড়িয়ে মুসলিম উম্মাহকে কার্যত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করে ফেলা হয়। ইমাম আলী (আ.)-এর খেলাফতের সময়কালকে বিশৃঙ্খল করে ফেলা হয়। ষড়যন্ত্রকারী মুনাফিকদের চিনতে মুসলিম উম্মাহর ব্যর্থতা ও তাদের অমনোযোগিতা ও অসচেতনতার ফলে হযরত আলীর পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অবশেষে হযরত আলীকেও হত্যা করা হয়। ইমাম হাসানও তাঁর পক্ষের সেনাদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে আমীরে মুয়াবিয়ার কাছে শাসনকর্তৃত্বের ভার ছেড়ে দেন। মুয়াবিয়া তাঁর অযোগ্য ও পাপিষ্ঠ পুত্র ইয়াযীদকে তাঁর পরবর্তী খলিফা নিযুক্ত করেন এবং তাঁর জীবদ্দশায়ই তিনি তার পক্ষে মুসলিম উম্মাহর বাইয়াত গ্রহণ করেন। তবে তিনি ইমাম হোসাইন (আ.)-এর বাইআত আদায়ে ব্যর্থ হন। ৬০ হিজরিতে মুয়াবিয়া মারা গেলে ইয়াযীদ ইমাম হোসাইনের নিকট থেকে বাইআত চায়। কিন্তু ইমাম হোসাইন (আ.) তার বাইয়াত করতে অস্বীকার করেন এবং তার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠভাবে রুখে দাঁড়ান। অবশেষে ইমাম হোসাইনকে কারবালার মরু-প্রান্তরে এক অসম যুদ্ধে বাধ্য করা হয় এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর অবস্থায় সঙ্গী-সাথি ও পরিজনসহ শহীদ করা হয়। 
মুসলিম উম্মাহর ব্যর্থতা প্রসঙ্গ
মুসলিম উম্মাহ বলতে ইসলাম ধর্মাবলম্বী সকল ব্যক্তিকে বুঝায়- পৃথিবীর যে স্থানেই সে বসবাস করুক না কেন অথবা সমাজে তার অবস্থান যেটাই হোক না কেন। মুসলিম উম্মাহর ব্যর্থতার প্রসঙ্গটি একটু ভিন্নভাবে অর্থাৎ শাসক ও শাসিতের দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করতে চাই।
যদি শাসনকর্তৃত্বের দিক থেকে চিন্তা করা হয়, তবে মুসলিম উম্মাহর একদল শাসক আর অপর দলটি শাসিত। সাধারণভাবে শাসকশ্রেণির সাথে সম্পৃক্ত লোকজন বলতে নির্বাহী ও প্রশাসনিক কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ, বিচারকার্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ, সামরিক ব্যক্তিবর্গ এবং শাসকবর্গের পক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের কথা বলা যায়। আর শাসিত শ্রেণি বলতে অবশিষ্ট জনগণকে বুঝায়। এই শ্রেণির মধ্যে রয়েছে আলেম, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী, শ্রমিক, মজুর, সাধারণ মানুষজন ইত্যাদি। যদিও এদের মধ্য থেকে অনেকেই প্রশাসনের সাথেও জড়িত থাকে।
যদি ইমাম হোসাইন (আ.)-এর সময়ে মুসলিম উম্মাহর এই দুই শ্রেণির দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব, শাসক শ্রেণি জালিমের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল আর শাসিত শ্রেণি অন্ধ, বধির ও কালায় পরিণত হয়েছিল।
ইমাম আলী (আ.) বলেন : ‘…সৎ শাসক বিনা নাগরিকরা সৎ হয় না। আবার নাগরিকদের অবিচলতা ব্যতীত শাসকরা সংশোধন হয় না। কাজেই যখন জনগণ শাসকের অধিকার পূরণ করে এবং শাসকও জনগণের অধিকার পূরণ করে, তখন তাদের মাঝে অধিকার সমুন্নত হয়, দ্বীনের পথসমূহ প্রতিষ্ঠিত হয়, ন্যায়পরায়ণতার নিদর্শনসমূহ ভারসাম্য লাভ করে এবং সুন্নাহসমূহ আপন ধারায় প্রবাহিত হয়।…’- নাহজুল বালাগা, খুতবা নং ২৭২
যা-হোক, মুসলিম উম্মাহর পরিচালনার যে দায়িত্ব পালন করতেন সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সা.) সেই অবস্থানে অধিষ্ঠিত করা হয়েছিল ইয়াযীদকে, যে ছিল আকণ্ঠ পাপাচারে নিমজ্জিত; সে প্রকাশ্যে মদ পান ও ব্যাভিচার করত, নামায পরিহার করে চলত, রাজদরবারে বানর নিয়ে খেলা করত। এর কোন্টি মুসলিম শাসকের গুণাবলির অন্তর্ভুক্ত ছিল? এমনকি একজন সাধারণ মুসলমানের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যগুলো থাকলে তাকে ফাসেক বলে গণ্য করা হতো; তাকে নামাযের ইমাম হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হতো। অথচ ইয়াযীদকে এই বৈশিষ্ট্যগুলোসহই উম্মতের কাণ্ডারি বলে মেনে নেয়া হয়!
শাসকবর্গ কি দায়িত্ব পালন করেছিল?
ইমাম আলী (আ.) বলেন : ‘শাসকরাই আল্লাহর জমিনে তাঁর পাহারাদার।’ কিন্তু শাসকরা কেমন ভূমিকা পালন করেছিল? তারা কি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছিল? নিচে এ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।
প্রশাসনিক কর্মকর্তাবৃন্দ
চল্লিশ হিজরিতে ইমাম আলী (আ.)-এর শাহাদাতের পর থেকে প্রায় ২০ বছর আমীরে মুয়াবিয়া মুসলিম উম্মাহর খলিফা হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। এই সময়ে তিনি প্রশাসনের উচ্চতম পদ থেকে শুরু করে নিম্নতম পদ পর্যন্ত বনু উমাইয়্যা ও তাঁর অনুগত লোকদেরকে নিয়োগ দেন। তাঁর নির্দেশে তারা প্রশাসনের বিরোধীদেরকে কঠোরভাবে দমন করে; অনেককে হত্যা করে, অনেককে পঙ্গু করে দেয়, অনেককে জেলে বন্দি করে অথবা নির্বাসনে পাঠায়। অন্যদিকে এই সকল ব্যক্তি জনসাধারণের ওপর ব্যক্তি আক্রোশ মিটানোর জন্য অত্যাচার-নির্যাতন করলেও মুয়াবিয়া তাদেরকে কিছু বলতেন না। আর একারণেই যখন তিনি ইয়াযীদকে তাঁর পরবর্তী উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা দেন ও জনগণের কাছ থেকে বাইআত আদায় করার জন্য বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নরদেরকে নির্দেশ দেন তখন তাঁকে তেমন কোন বেগই পেতে হয় নি। প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের গভর্নর ও অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইয়াযীদকে মেনে নেয়।
বিচারকার্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ যে ভূখণ্ডের শাসনকর্তৃত্বে অত্যাচারীরা অধিষ্ঠিত হয় সেই ভূখণ্ডের বিচারকার্যের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। মুসলিম ভূখণ্ডেও একই রকম ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। বিচারকরা সরকারের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিল। বিচারকরা শাসকগোষ্ঠীর কৃপাদৃষ্টি অর্জনের জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের পক্ষে রায় ঘোষণা করত। আর যারা সরকারের বিরোধিতা করত তাদেরকে তৎক্ষণাৎ বহিষ্কার করা হতো।
সেনাবাহিনী
ইমাম আলী (আ.) সৈন্যদের মর্যাদা ও দায়িত্ব সম্পর্কে বলেন : ‘সৈন্যরা আল্লাহ্র অনুমতিক্রমে জনগণের দুর্গস্বরূপ এবং শাসকদের শোভা, দীনের সম্মান এবং শান্তি ও শৃঙ্খলা বিধানকারী।’
কিন্তু আমীরে মুয়াবিয়ার শাসনামলে নবী-পরিবারের প্রতি অপবাদ ও অপপ্রচারের কারণে সিরিয়ার সেনাবাহিনী প্রথম থেকেই নবী-পরিবারের প্রতি বিদ্বেষী ছিল। সেকারণে তারা মুয়াবিয়ার আনুগত্যের ক্ষেত্রে কখনই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পতিত হয় নি। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের অপরাপর অঞ্চলের সেনাবাহিনীর মধ্যে তাঁর আনুগত্যের ব্যাপারে যে দ্বিধাগ্রস্ততা ছিল মুয়াবিয়া সুকৌশলে তা দূর করেন। তিনি মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের সেনাবাহিনীকে অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে করায়ত্ত করেন। এরপর যখন তিনি ইয়াযীদকে খলিফা বলে ঘোষণা দেন তখন সেনাবাহিনী তাঁর প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য প্রকাশ করে। বিভিন্ন স্থানে যে মুষ্টিমেয় সংখ্যক বিরোধিতা করে তাদেরকে প্রথমে ভীতি প্রদর্শন করা হয়, অতঃপর তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন শুরু হয়। 
সাধারণত সেনাপতির সিদ্ধান্তই সৈন্যরা বাস্তবায়ন করে থাকে। আর তাই সেনাপতি নিয়োগে ইসলামের নির্দেশনা হলো সেই ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি সর্বাধিক নিষ্ঠাবান ও নিবেদিতপ্রাণ হবে; সকলের চেয়ে খোদাভীরু, নম্র-ভদ্র, ধৈর্যশীল, জ্ঞানী এবং সুপরিচালক হবে। দুর্বলদের প্রতি দয়ার্দ্র হবে আর শক্তিমানদের প্রতি হবে কঠোর। ক্ষমতা তাকে জিঘাংসাপরায়ণ করবে না, আবার হীনমন্যতা তাকে পর্যুদস্ত করবে না। তারা ক্রোধে শ্লথ এবং ক্ষমায় দ্রুতগতির হবে।
অথচ এ সকল বৈশিষ্ট্যের বিপরীতে ইয়াযীদের সময় উমর ইবনে সাদ, উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের মতো অধার্মিক, জীঘাংসু মনোবৃত্তিসম্পন্ন ও কঠোর হৃদয়ের অধিকারী লোকদেরকে সেনাপতির পদে নিয়োগ দেয়া হয়। যারা তাদের বিরোধীদের প্রতি সবচেয়ে নির্মম আচরণ প্রদর্শন করে।
সুতরাং বলা যায়, ইয়াযীদের শাসনকালে পুরো শাসনকার্যের সাথে সংশ্লিষষ্ট প্রতিটি বিভাগ চরমভাবে তার আনুগত্য করতে থাকে এবং বিরোধীদের মোকাবিলায় কঠোরতার পরিচয় দেয়।
উম্মতের সাধারণ শ্রেণির ব্যর্থতার প্রসঙ্গ
আলেম শ্রেণি
সাধারণ উম্মাহর ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যে শ্রেণিটির কথা উল্লেখ করতে হয় তা হচ্ছে আলেম শ্রেণি। আলেমগণের সম্মান প্রসঙ্গে হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) এরশাদ করেন : ‘আবেদের (ইবাদতকারীর) ওপর আলেমের শ্রেষ্ঠত্ব তারকাদের ওপর পূর্ণিমার চাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের সমতুল্য।’
‘আল্লাহ্র কাছে আলেমগণ অধিকতর সম্মানিত, নাকি শহীদগণ?’- মহানবী (সা.)-এর এমন এক প্রশ্নের জবাবে জিবরাইল (আ.) বলেন : ‘আল্লাহ্র কাছে একজন আলেম এক হাজার শহীদের তুলনায়ও অধিকতর সম্মানিত। কারণ, আলেমগণ নবী-রাসূলগণের (আ.) অনুসরণ করেন এবং শহীদগণ আলেমগণের অনুসরণ করেন।’
অপর এক প্রসিদ্ধ হাদিসের বক্তব্য অনুসারে আলেমগণ হলেন নবী-রাসূলগণের উত্তরসূরি। তাঁদেরকে মানুষ দুনিয়ার বুকে আল্লাহর বিধান প্রচার ও বলবৎ রাখার ব্যাপারে দায়িত্বশীল মনে করে। জনসাধারণ তাঁদেরকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের পথনির্দেশনা ও পরামর্শ কামনা করে।
ইয়াযীদের শাসনকালে সেই আলেম সমাজ দায়িত্ব পালনে সবচেয়ে বেশি দুর্বলতার পরিচয় দেয়। ইমাম আলী (আ.)-এর খেলাফতকালেই মুয়াবিয়ার শাসনাধীন অঞ্চলে মসজিদের মিম্বার থেকে হযরত আলী (আ.) ও আহলে বাইতকে গালিগালাজ করা হতো, যেটি অব্যাহত ছিল ৯৯ হিজরিতে উমর ইবনে আবদুল আযীযের খেলাফতে অধিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত।
ইমাম হোসাইন (আ.) বলেন : ‘… আর (ইয়াযীদের শাসনকালে) প্রত্যেক জনপদে মিম্বারের ওপরে (তাদের মুখপাত্র হিসাবে) একজন বাকপটু খতীব রেখেছে এবং গোটা দেশ তাদের পদতলে এবং তাদের হাত সর্বত্র প্রসারিত। আর জনগণ তাদের নিয়ন্ত্রণে।’…
ইয়াযীদের শাসনকালে সরকার নিযুক্ত আলেমগণ পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের অপব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করত। তারা আহলে বাইতের মর্যাদা সম্পর্কিত পবিত্র কোরআনের আয়াতের ভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা দিত; পূর্বকালের ইহুদি ও খ্রিস্টান পণ্ডিতদের মতো নিজেদের বিরুদ্ধে যা যেত তা বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকত। অর্থ-বিত্ত ও পদমর্যাদা লাভ তাদের মন-মস্তিষ্ককে আচ্ছন্ন করে ফেলে। অথচ জনগণ তাদের কাছেই হেদায়াত লাভের জন্য যেত। 
অপরদিকে আলেমদের আরেকটি দল সামাজিক ও রাজনীতির বিষয়গুলো থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে রেখে শুধু ব্যক্তিগত আমল ও কোরআন-হাদিস বর্ণনা করার মশগুল হয়ে পড়েন। তাঁরা সত্যের সমর্থনে ভূমিকা পালন না করে নির্লিপ্ত থেকে বরং মিথ্যাকেই প্রতিষ্টিত হওয়ার সুযোগ করে দেন।
ব্যবসায়ী শ্রেণি
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর থেকেই মুসলমানদের মধ্যে একটি ধনিক ও পুঁজিপতি শ্রেণির আবির্ভাব ঘটতে থাকে। তারা যে কোন পন্থায় সম্পদ আহরণের দিকে মনোনিবেশ করে। তারা সরকারি ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার পেছনে ছোটে। ব্যবসায়ী শ্রেণি সম্পদ পুঞ্জিভূত করতে থাকে। অধিকাংশ ব্যবসায়ীর কাছে নিজেদের স্বার্থ বড় হয়ে দেখা দেয়। শাসনক্ষমতায় কে অধিষ্ঠিত হলো তা তাদের মাথাব্যথার কারণ ছিল না। এভাবে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসার কারণে ইসলাম ও মুসলমানদের কল্যাণ তাদের কাছে গৌণ বিষয়ে পরিণত হয়।
সাধারণ জনগোষ্ঠী
সমাজে সাধারণ জনগোষ্ঠীর গুরুত্ব সম্পর্কে ইমাম আলী (আ.) বলেন : ‘সাধারণ প্রজারাই তো দীনের ও মুসলিম সমাজের স্তম্ভ। শত্রুদের মোকাবিলায় প্রধান হাতিয়ারও হলো উম্মাহর মধ্য থেকে সাধারণ জনগণই।’
এর বিপরীতে ইয়াযীদের সময়কালে সাধারণ জনগোষ্ঠী চরমভাবে নিষ্পৃহতার পরিচয় দেয়। অবশ্য সর্বসাধারণ মুসলমানদের মধ্যে পার্থিব জীবনের প্রতি আগ্রহ ও ভোগবাদী প্রবণতা নতুন ছিল বলা যাবে না, এ প্রবণতা আগেও ছিল। এমনকি মহানবী (সা.)-এর যুগে তাবুক অভিযানের ব্যাপারে মহান আল্লাহ রাসূলের একদল অনুসারীর গরিমসির ব্যাপারে আয়াত নাযিল করেছিলেন। একইভাবে আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর সময়ও সত্যের পক্ষে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে অসচেতনতা ও গাফিলতি লক্ষ্য করা যায়। এমনকি তিনি মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেন : ‘আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি অচিরেই যেন তিনি আমাকে এ জনগণ থেকে মুক্তি দেন।’… আর ইমাম হাসানের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি অভিন্ন ছিল।
সাধারণ জনগণের চরিত্র সম্পর্কে ইমাম আলী (আ.) বলেন, ‘…জনগণ রাজা-বাদশাহদের সাথে, (তারা) দুনিয়ার অনুসারী। আর এই দুনিয়াই তাদের অভীষ্ট যা তারা অন্বেষণ করে, শুধু আল্লাহ্ যাকে রক্ষা করেন সে ব্যতীত।’ এমনকি হযরত আলী (আ.) জনসাধারণের অবস্থা সম্পর্কে এই উক্তিও করেন যে, ‘জনগণ তাদের পিতাদের চেয়ে বেশি তাদের শাসকবর্গের সদৃশ।’
বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনা করলে ইমাম আলী (আ.)-এর বক্তব্যের সত্যতা পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। মুসলিম বিশে^র সর্বত্র অধার্মিকতা, অনৈতিকতা, অরাজকতা বিরাজ করলেও জনসাধারণ সেই অবস্থার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়। আর তাই ইমাম হোসাইনের আহ্বান তাদের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। মদীনা থেকে মক্কা ও মক্কা থেকে কুফার পথে যাত্রায় ইমাম হোসাইন ইয়াযীদের হাতে বাইআত না করার কারণ জনগণের সামনে তুলে ধরেন, তাদেরকে তাঁর আন্দোলনে শরীক হওয়ার জন্য আহ্বান জানান, কিন্তু জনগণ নির্লিপ্ততা প্রদর্শন করে। কুফার জনসাধারণ তাঁর প্রতি যে আনুগত্য দেখিয়েছিল তা ছিল নিজেদেরকে একটি কঠিন অবস্থা থেকে মুক্ত করার জন্য তাৎক্ষণিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ। এই আনুগত্যে না ছিল বিবেক-বুদ্ধির ব্যবহার, না ছিল কোনরূপ দূরদর্শিতা। একারণেই উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের কুফায় আগমন তাদেরকে ইমাম হোসাইনের সাথে কৃত অঙ্গীকার পালনে দৃঢ়পদ রাখতে পারে নি।
উম্মাহকে দায়িত্ব সচেতন করার ব্যাপারে ইমাম হোসাইনের প্রচেষ্টা
ইমাম হোসাইন (আ.) তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর অবস্থা সম্পর্কে যেমন পূর্ণরূপে অবগত ছিলেন, তেমনি তিনি তাঁর করণীয় সম্পর্কেও সর্বদা সচেতন ছিলেন। একজন ইমাম হিসেবে তিনি পুরো মুসলিম উম্মাহর প্রতি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর আহ্বান যেমন ছিল শাসকগোষ্ঠীর প্রতি, তেমনি ছিল শাসিত গোষ্ঠীর প্রতি। ইমাম হোসাইনের এই প্রচেষ্টা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করতে চাই।
শাসকগোষ্ঠীর প্রতি দায়িত্ব পালন
ইয়াযীদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে ইমাম হোসাইন (আ.) যে উক্তিটি করেছিলেন তা হলো : ‘উম্মাহ্ যখন ইয়াযীদের ন্যায় শাসকের কবলে পড়েছে তখন ইসলামকে বিদায়!’ অর্থাৎ ইমাম হোসাইন জানতেন যে, ইয়াযীদ এমন এক ব্যক্তি যার উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইসলামকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা। আর তাই তাকে উপদেশ-নসিহত করায় কোন লাভ নেই।
অন্যদিকে ইয়াযীদের অধীন গভর্নরদের অনমনীয়তা সম্পর্কে ইমাম হোসাইন (আ.) খুব ভালোভাবে অবগত ছিলেন। ইমাম হোসাইন (আ.) জানতেন যে, অনৈসলামিক চর্চায় অভ্যস্ত ও পার্থিব বিষয়াদিতে মগ্ন হয়ে যাওয়া শাসকগোষ্ঠীকে কোনভাবে বোঝানো সম্ভব নয়। কোন কোন এলাকার শাসনকর্তা হয়তো তাঁর প্রতি সহানুভূতি দেখাতে পারে-যার উদাহরণ হিসেবে মদীনার গভর্নর ওয়ালীদ ইবনে উতবা ও কুফার গভর্নর নোমান ইবনে বশীরের কথা উল্লেখ করা যায়-কিন্তু তা কোন ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না। আর তাই তিনি তাদের সাথে তেমন কথা বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন নি। কিন্তু যখন কারবালায় তিনি উমর ইবনে সাদ ও শিমারের মুখোমুখী হন তখনও তিনি তাদেরকে উপদেশ দেন, তাদেরকে সতর্ক করেন এবং সঠিক দায়িত্ব পালনের জন্য আহ্বান জানান।
উমর ইবনে সাদকে ইমাম হোসাইন বলেন : ‘তুমি আমাকে হত্যা করবে? আমি মনে করি না যে, পিতৃপরিচয়হীনের পুত্র পিতৃপরিচয়হীন (উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ) রেই ও গোরগানের শাসনক্ষমতা তোমাকে অর্পণ করবে। আল্লাহ্র শপথ, কখনই তা ঘটবে না। আমার এ অঙ্গীকার এমন এক অঙ্গীকার যেন তা বাস্তবায়িত হয়েই আছে। তুমি যা চাও তা করতে পার, কিন্তু জেনে রেখ, আমার (শাহাদাতের) পরে তুমি না দুনিয়ায়, না আখেরাতে- কোথাও আনন্দের মুখ দেখতে পাবে না।…’
পরবর্তী ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, যে পদের লোভে উমর ইবনে সাদ ইমাম হোসাইন (আ.)-কে হত্যা করেছিল সেই পদ তাকে দেয়া হয় নি এবং ইমাম হোসাইনের কথাই সত্যে পরিণত হয়েছিল। 
ইমাম হোসাইন শিমারকে প্রশ্ন করেন : ‘তোমার কি এ ব্যাপারেও কোন সন্দেহ আছে যে, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কন্যার সন্তান? আল্লাহ্র শপথ, এ বিশ্বে পূর্ব ও পশ্চিমের দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী ভূখণ্ডে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কন্যার পুত্র আমি ছাড়া আর কেউ নয়। তোমার জন্য পরিতাপ! আমি কি তোমার কাউকে হত্যা করেছি যে, আমার কাছ থেকে তার রক্তের বদলা আদায় করতে চাচ্ছ? আমি কি তোমার কোন সম্পদ বিনষ্ট করেছি, নাকি আমার কাঁধে কারও কেসাসের দায় রয়েছে যা তুমি কার্যকর করতে চাচ্ছ?’
ইমাম হোসাইন শাসকগোষ্ঠীকে সতর্ক করলেও পার্থিব স্বার্থের মোহ তাদেরকে অন্ধ করে ফেলে। তারা ইমাম হোসাইন (আ.)-এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
আলেমগণের প্রতি দায়িত্ব পালন
আমীর মু‘আবিয়ার জীবনের শেষ বছরে তথা কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার এক বছর আগে হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) পবিত্র মক্কা নগরীর পার্শ্ববর্তী মীনায় মদীনার আলেম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে এক বৈঠকে মিলিত হন। এ বৈঠকে তিনি যে ভাষণ প্রদান করেন তা থেকে কিছুটা এখানে উল্লেখ করা সংগত মনে করছি। তিনি বলেন : ‘হে লোকসকল! আল্লাহ্ তা‘আলা (বনি ইসরাইলের) আলেমদের যে তিরস্কার করেছেন ও উপদেশ দিয়েছেন তা থেকে তোমরা শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ কর। তিনি এরশাদ করেছেন : ‘কেন (তাদের মধ্যকার) রাব্বানিগণ (আরেফ ও দরবেশগণ) ও আলেমগণ তাদের পাপ-কথা বলতে ও হারাম ভক্ষণ করতে নিষেধ করল না?’
আল্লাহ্ আরও এরশাদ করেছেন : ‘বনি ইসরাইলের মধ্যে যারা কুফরীতে লিপ্ত হয়েছিল তাদেরকে দাউদ ও ঈসা ইবনে মারইয়ামের কণ্ঠে অভিসম্পাত করা হয়। কারণ, তারা নাফরমানী করত ও (আল্লাহ্র নির্ধারিত) সীমা লঙ্ঘন করত। তারা যে সব মন্দ কাজ করত তা থেকে তারা পরস্পরকে নিষেধ করত না; তারা যা করত তা কতই না নিকৃষ্ট কর্ম!’ 
ইমাম হোসাইন (আ.) এসব আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, মহান আল্লাহ্ তা‘আলা আলেমদেরকে এভাবে তিরস্কার করেছেন এ কারণে যে, তারা যালেম ও পাপাচারীদেরকে যুলুম ও পাপ কাজ করতে এবং ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করতে দেখত, কিন্তু তাদের কাছ থেকে পার্থিব সুযোগ-সুবিধা লাভ ও যুলুমের হাত থেকে নিরাপদ থাকার উদ্দেশ্যে তাদেরকে এসব থেকে নিষেধ করত না।
আলেমদের প্রতি জনসাধারণের আশা-আকাক্সক্ষার কথা তুলে ধরে ইমাম হোসাইন বলেন : ‘…এ সব কি কেবল এ কারণে সম্ভব হচ্ছে না যে, মানুষ তোমাদের ওপর এ মর্মে আশাবাদী যে, তোমরা আল্লাহ্ তা‘আলা কর্তৃক নির্ধারিত অধিকারসমূহ পুনরুদ্ধারের জন্য রুখে দাঁড়াবে? কিন্তু বেশির ভাগ বিষয়েই তোমরা আল্লাহ্ তা‘আলা কর্তৃক নির্ধারিত দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করেছ এবং ইমামগণের অধিকারসমূহকে খুব হাল্কাভাবে নিয়েছ, আর দুর্বলদের অধিকারকে পয়মাল করেছ।’
পবিত্র কোরআনের বক্তব্য অনুসারে যেহেতু ‘আল্লাহ্র বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমগণই তাঁকে ভয় করে চলে’ সেজন্য তিনি আলেমদেরকে সম্বোধন করে বলেন : ‘…তোমরা আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে কৃত অঙ্গীকারসমূহ ভঙ্গ হতে দেখছ, কিন্তু এ ব্যাপারে টু-শব্দটিও করছ না এবং এ ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে আল্লাহ্ তা‘আলার ভয়ও সৃষ্টি হচ্ছে না। তোমাদের পূর্বপুরুষদের কতক অঙ্গীকার বিপর্যস্ত হয়ে যাওয়ায় তোমরা বিলাপ করছ, অথচ রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সাথে কৃত অঙ্গীকার ও চুক্তিসমূহকে উপেক্ষা করছ।… বরং তোমরা কেবল নিজেদের স্বার্থ ও আরাম-আয়েশের জন্য যালেম-অত্যাচারীদের তোষামোদ করছ।
আলেমসমাজ ইমাম হোসাইনের বক্তব্যের প্রতি ইতিবাচক সাড়া প্রদান করা থেকে বিরত থাকে। তারা অত্যাচারী ও ধর্মহীন শাসনব্যবস্থার মোকাবিলায় হীনতাকে বেছে নেয়। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, ষাট হিজরিতে যখন ইমাম হোসাইন (আ.) ইয়াযীদের বিরুদ্ধে সতর্ককারী প্রচারণার আন্দোলন শুরু করেন তখন ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ বা ফতোয়া দেয়ার কর্তৃত্বশীল (বিচারকশ্রেণি) তিনশ’র অধিক মুফতি ইয়াযীদের অনুকূলে ইমাম হোসাইনকে হত্যা করা জায়েয বলে ফতোয়া প্রদান করে।
জনসাধারণের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য
যে কোন আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য জনসাধারণের অংশগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জনসাধারণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোন আন্দোলন সফল হতে পারে না। ইমাম হোসাইনও চেয়েছিলেন মুসলিম জনগণকে সেই আন্দোলনে শামিল করতে। কিন্তু জনগণ যেমন শাসকবর্গের অধীনতা মেনে নিয়েছিল তেমনি কোন বিচার-বিবেচনা ছাড়াই শাসকের অনুগত আলেমগণের অনুসরণ করত। অথচ হযরত ঈসা (আ.) এমন আলেমদের ব্যাপারে বলেন : ‘নিকৃষ্টতম মানুষ হচ্ছে সেই আলেম যে তার দুনিয়াকে তার দ্বীনের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছে, দুনিয়াকে ভালোবেসেছে, দুনিয়া লাভের জন্য চেষ্টা-সাধনা চালিয়েছে এবং এক্ষেত্রে তার চেষ্টা-সাধনা এমনই যে, তা মানুষকে বিস্মিত করে…।’
আলেমগণের অনুসরণ প্রসঙ্গে হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর একটি হাদিসের প্রতি দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে। তিনি (সা.) বলেন : ‘ফকীহ্গণ নবী-রাসূলগণের আমানতদার, যতক্ষণ না তারা দুনিয়ায় প্রবেশ করে।’ প্রশ্ন করা হলো : ‘হে আল্লাহ্র রাসূল! দুনিয়ায় প্রবেশের মানে কী?’ জবাবে তিনি এরশাদ করেন : ‘আধিপত্যের (রাজা-বাদশাহ্, সরকার ও শক্তিমানদের) অনুসরণ। তারা যখন এরূপ করবে তখন তোমরা স্বীয় দ্বীনের ব্যাপারে তাদের থেকে সতর্ক থেক।’
যখন জনগণ আলেমদের শোচনীয় অবস্থা লক্ষ্য করেছিল, তখন তাদের উচিত ছিল রাসূলের এই হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী সেই আলেমদেরকে পরিত্যাগ করা। কিন্তু তারা তা করে নি।
ইমাম হোসাইন (আ.) জনসাধারণকে অত্যাচারী ও ধর্মহীন শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তিনি আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন। তিনি জনগণকে সম্বোধন করে বলেন : ‘তোমরা কি দেখতে পাচ্ছ না যে, সত্যের ভিত্তিতে কাজ করা হয় না এবং বাতিল থেকে বিরত থাকা হচ্ছে না? অতএব, (এহেন পরিস্থিতিতে) যথার্থভাবেই মু’মিনের উচিত তার রবের সাথে সাক্ষাতের জন্য আগ্রহী হওয়া।’
তিনি তাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন : ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্র কৃত হারামকে হালালকারী, তাঁর (আল্লাহ্র গৃহীত) অঙ্গীকার ভঙ্গকারী ও রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সুন্নাতের বিরোধিতাকারী কোন নিপীড়ক শাসককে আল্লাহ্র বান্দাহ্দের মধ্যে পাপাচার ও দুর্বৃত্তপনা করতে দেখে, সে যদি তার কাজ বা কথার মাধ্যমে তাকে প্রতিহত না করে, তাহলে আল্লাহ্র জন্য দায়িত্ব হয়ে যায় যে, তাকে (প্রতিহতকরণে বিরত ব্যক্তিকে) তার (নিপীড়ক শাসকের) প্রবেশদ্বার দিয়ে (জাহান্নামে) প্রবেশ করাবেন।’
এমনকি যারা কুফা থেকে চিঠি লিখে ইমাম হোসাইনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিল, কিন্তু পরে ইয়াযীদের দলে যোগ দিয়েছিল তাদেরকে উদ্দেশ্য করে আশুরার দিন ইমাম হোসাইন বলেন : ‘হে কুফাবাসী! তোমাদের মায়েরা তোমাদের শোকে ক্রন্দন করুক। তোমরা আল্লাহ্ তা‘আলার এ নেক বান্দাহ্কে দাওয়াত করেছিলে এবং বলেছিলে : আমরা আপনার পথে জীবন বিলিয়ে দেব। কিন্তু এখন তোমরা তার বিরুদ্ধে তোমাদের তলোয়ারগুলোকে উন্মুক্ত করেছ এবং তাকে সকল দিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছ। তোমরা তাকে এ বিশাল পৃথিবীর যেখানে ইচ্ছা চলে যাবার জন্য সুযোগ দিচ্ছ না। এখন সে বন্দির মত তোমাদের হাতে আটকা পড়ে আছে। তোমরা তাকে এবং তার পরিবারের নারী ও কন্যাদের ফোরাতের পানি পান করতে বাধা দিয়েছ, অথচ ইহুদি ও খ্রিস্টান গোত্রসমূহের লোকেরাও সেখান থেকে পানি পান করছে। এমনকি পিপাসায় আমাদের পশুগুলোর প্রাণও ওষ্ঠাগত হয়েছে এবং সেগুলো ছটফট করছে ও গড়াগড়ি দিচ্ছে। তোমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর বংশধরদের ব্যাপারে তাঁর বর্ণিত মর্যাদার সীমারেখাকেও রক্ষা কর নি। মহাপিপাসার দিনে আল্লাহ্ তোমাদের পরিতৃপ্ত না করুন।’
তিনি আরো বলেন : ‘হে লোকসকল! …আমি বলছি, তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর এবং আমাকে হত্যা কর না। কারণ, আমাকে হত্যা করা বা অবমাননা করা তোমাদের জন্য জায়েয নয়। আমি তোমাদের রাসূলের কন্যার সন্তান, আর আমার নানী খাদীজাহ্ তোমাদের রাসূলের স্ত্রী। হয়ত রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সেই কথা তোমাদের কাছে পৌঁছে থাকবে যে, তিনি এরশাদ করেছেন : ‘হাসান ও হোসাইন হচ্ছে বেহেশতবাসী যুবকদের দুই নেতা।’…
প্রকৃতপক্ষে যখন কোন জাতি তার বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে ধর্মহীন পার্থিব বিষয়কে আঁকড়ে ধরতে চায় তখন কোন উপদেশ-নসিহত কাজে লাগে না। তেমনি তৎকালীন মুসলিম সমাজ বিবেক-বুদ্ধিহীন একটি সমাজে পরিণত হয়েছিল যেখানে বেহেশতের যুবকদের নেতা ইমাম হোসাইন (আ.)-এর উপদেশ, নসিহত ও সতর্ক বাণীও সাধারণ মানুষের চৈতন্য ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়।
উপসংহার : অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, যদি জনসাধারণ সেই শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় তাহলে তাদের পতন অবশ্যম্ভাবী- যার বহু নজির বিশ্বে রয়েছে। আর এ রুখে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ব্যাপারে জনগণের সচেতনতা, লক্ষ্যে পৌঁছানোর ব্যাপারে দৃঢ় মনোভাব ও অঙ্গীকারাবদ্ধতা, জনগণের একতাবদ্ধতা, সর্বোপরি বৃহত্তর কল্যাণের লক্ষে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত হওয়া। কিন্তু অবৈধ ও ইসলামবিরোধী শাসকের বিরুদ্ধে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর আন্দোলন ও সংগ্রামে তৎকালীন আলেম সমাজ, বুদ্ধিজীবী শ্রেণি, ব্যবসায়ী, সাধারণ মুসলমান নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়।
মুসলিম উম্মাহ ব্যর্থ হলেও ইমাম হোসাইন (আ.) তাঁর দায়িত্ব সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম পন্থায় আঞ্জাম দেন। তিনি অত্যাচারী ও অবৈধ শাসনব্যবস্থার সামনে আনুগত্য প্রদর্শন করেন নি এবং অপমান ও হীনতাকে মেনে নেন নি। তিনি বলেছিলেন : ‘দূর হোক লাঞ্ছনা আমা থেকে; আমি কখনই লাঞ্ছনা মেনে নেব না।’…
ইমাম হোসাইন (আ.) ইসলামের পুনরুজ্জীবনের জন্য তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাথিদের নিয়ে দায়িত্ব পালন ও আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ আদর্শ স্থাপন করেন। ইমাম হোসাইনের শাহাদাত বরণের পরই মানুষ তাঁর শাহাদাতের কারণ উদ্ঘাটনে তৎপর হলো, শাসকবর্গের চরিত্র অনুসন্ধানের ফলে তাদের চরিত্র প্রকাশিত হতে লাগল। শুরু হলো একের পর বিদ্রোহ। মদীনা, কুফা, মক্কাসহ ইসলামি বিশ্বের নানা অঞ্চলে বিদ্রোহ দেখা দিল। অল্প সময়ের ব্যবধানে কুফায় স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। ইমাম হোসাইনের হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদেরকে শাস্তি দেয়া হয়। এভাবে প্রতিরোধ ও বিদ্রোহের এক পর্যায়ে কুখ্যাত বনু উমাইয়্যার শাসনব্যবস্থার পতন হয়। মওলানা মোহাম্মদ আলী জওহার যথার্থই বলেছেন :
‘কাতলে হোসাইন আসলে মে মার্গে ইয়াযীদ হ্যায়,
ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালাকে বাদ।’
অর্থাৎ হোসাইনের হত্যাকাণ্ডের মধ্যেই ইয়াযীদের মৃত্যু নিহিত ছিল। প্রতিটি কারবালার পর এভাবেই ইসলামের উত্থান ঘটে।
ইমাম হুসাইন (আ.) কারবালায় তাঁর সাথিদের শাহাদাতবরণের পর আহ্বান করেছিলেন : ‘আমাকে সাহায্য করার জন্য কেউ আছ কি?’ এ আহ্বান কেবল সে সময়ের মানুষের প্রতি ছিল না। এ আহ্বান ছিল কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে আগমনকারী সকল মানবের প্রতি। আর তাঁর এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে অতীতে যেমন সত্যের পক্ষে মানুষ সংগ্রাম করেছে, বর্তমানেও তেমনি সংগ্রাম করে চলেছে এবং বিজয় লাভ করছে। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ইরানের ইসলামি বিপ্লব। কারবালায় ইমাম হোসাইনের অনুসারী ছিলেন মাত্র ৭২ জন, আর বর্তমান বিশ্বে  কোটি কোটি অনুসারী আজ ইমাম হোসাইনের সত্যের পতাকাকে উচ্চে তুলে ধরেছে। ইমাম হোসাইনের আন্দোলন ও আত্মত্যাগের সফলতা এখানেই।