বৃহস্পতিবার, ২০শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইমাম রেযা (আ.)-এর ইবাদত-বন্দেগি ও মহানুভবতা

পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৮ 

ইমাম রেযা (আ.)-এর ইবাদত-বন্দেগি
ইমাম রেযা (আ.) তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ ইবাদত গুজার ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর শত্রুরাও এই বাস্তবতাকে স্বীকার করত এবং তাঁর চরিত্রের এই বিশেষ দিকটিকে তারা অস্বীকার করতে পারত না। এমনকি আব্বাসী খলিফা মামুনুর রশিদও তাঁর ‘আনুগত্যের অঙ্গীকারনামা’য় ইমাম রেযা (আ.)-এর এই ধর্মনিষ্ঠতার প্রশংসা করেছিলেন-যে অঙ্গীকারনামার মাধ্যমে তিনি ইমাম রেযা (আ.)-কে তাঁর উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করেন।
রেযা বিন যাহহাক, যে ব্যক্তি ইমাম রেযা (আ.)-কে আব্বাসী খলিফা মামুনুর রশিদের নির্দেশে মদীনা থেকে মার্ভে (খোরাসানে) নির্বাসনে বাধ্য করেছিল সেই ব্যক্তি রেযা (আ.)-এর ধর্মপরায়ণতা ও তাঁর ইবাদত-বন্দেগি সম্পর্কে বর্ণনা করেছে : ‘আমি মদীনা থেকে মার্ভ পর্যন্ত তাঁর সাথে ছিলাম। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি এমন কোন ব্যক্তিকে দেখিনি যে তাঁর মতো আল্লাহকে সবসময় স্মরণ করে এবং এমন কোন ব্যক্তিকেও দেখিনি যে তাঁর মতো সর্বশক্তিমান ও সুমহান আল্লাহকে ভয় করে। দিনের শুরুতে তিনি ফজর নামায আদায় করতেন। নামায আদায় শেষ হলে তিনি সেই স্থানেই সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসায় রত থাকতেন এবং এই সকল তাসবিহ বারবার পাঠ করতেন-‘আলহামদুলিল্লাহ’(সকল প্রশংসা আল্লাহর), ‘আল্লাহু আকবার’ (আল্লাহ সুমহান),‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই), ‘আল্লাহুম্মা সাল্লিআলা মুহাম্মাদ ওয়াআলে মুহাম্মাদ’ (হে আল্লাহ! মহানবী (সা.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর দরুদ প্রেরণ করুন)। এরপর তিনি পূর্বাহ্ন পর্যন্ত সিজদা রত থাকতেন। অতঃপর তিনি জনসাধারণের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন, তাদের বিষয়াদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন এবং তাদেরকে সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করতেন। এ সমস্ত কাজ তিনি দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত রাখতেন।
মামুনুর রশিদের শাসনামলের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ইবরাহীম ইবনে আব্বাস ইমাম রেযা (আ.)-এর ইবাদত-বন্দেগি সম্পর্কে বলেন : ‘ইমাম রেযা (আ.) রাতের অধিকাংশ সময় জেগে থাকতেন ও খুব অল্প সময় ঘুমাতেন। বেশির ভাগ সময়ই তিনি সকাল পর্যন্ত জাগ্রত থাকতেন। তিনি প্রায়শ রোযা রাখতেন, বিশেষ করে প্রতিমাসেই তিন বিশেষ দিনের রোযা রাখতেন। তিনি এই রোযাকে ‘সারা জীবনের রোযা’ নামে অভিহিত করতেন। তিনি অত্যন্ত দানশীল ছিলেন এবং গোপনে এবং প্রায়শই রাতের বেলা অভাবীদেরকে দান করতেন। ’
ইবরাহীম আরো বলেন : ‘কেউ যদি দাবিকরে যে, সে ইমাম রেযা (আ.)-এর মতো ধার্মিক কোন ব্যক্তিকে দেখেছে তাহলে তা বিশ্বাস করোনা।’
দান-সাদাকাহ
ইমাম রেযা (আ.) খোরাসানে অবস্থান কালে একবার আরাফাত দিবসে তাঁর সকল সম্পদ গরীবদের মাঝে দান করে দেন। তখনতৎকালীনখলিফামামুনুররশিদের গভর্নরফযলইবনেসাহ্লতাঁকেবলেন : ‘আপনি তোএখন দেউলিয়া ও নিঃস্ব হয়ে গেছেন।’ইমাম রেযা (আ.) জবাবেবলেন : ‘বরংএরবিপরীত। আমিএখনঅতীতেরসকলসময়ের চেয়েওসম্পদশালী। আল্লাহরপুরস্কারও সন্তুষ্টিরজন্য আমি যেসম্পদের বাণিজ্য করেছিতাকেতুমিদেউলিয়াবলে গণ্য করোনা।’
ইমাম রেযা (আ.) অন্যদের ভালোবাসাঅর্জনবাতাদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ারজন্য ধন-সম্পদ দানকরতেননা; বরং  তিনি দান-সাদাকাহ করাকে মহান স্রষ্টার নৈকট্য লাভের একটি উপায় মনে করতেন, যে সৃষ্টিকর্তা অনুগ্রহ করে তাঁর বান্দাকে ধন-সম্পদ দিয়ে ধন্য করেছেন।

গীরব-দুঃখীদের খাদ্য দান

মুআম্মার ইবনে খাল্লাদ বর্ণনা করেন, ইমাম রেযা (আ.) যখনই খাবার খেতে বসতেন তখন তিনি একটি বড় পাত্র আনতেন এবং সবচেয়ে উৎকৃষ্ট খাবারগুলো ওইপাত্রে তুলতেন এবং সেইখাবার গুলো গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার আদেশ দিতেন। এরপর তিনি এই আয়াত পাঠ করতেন : ‘অতঃপর সে ধর্মের ঘাঁটিতে প্রবেশ করেনি।’ (সূরা বালাদ : ১১) অতঃপর বলতেন : ‘আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা জানেন যে, সকলেরই দাস মুক্ত করার সামর্থ্য নেই, তা সত্তে¡ও তিনি তাদের জন্য জান্নাত লাভের পথ করে দিয়েছেন (অপরকে খাদ্য দানের মাধ্যমে)।’

মানবতার প্রতিশ্রদ্ধা

গরীব-দুঃখী, দাস-দাসী, চাকর-চাকরাণী এবং নিঃস্বদের প্রতি ইমাম রেযা (আ.) সবচেয়ে বেশি মানবিকতাপূর্ণ আচরণ প্রদর্শন করতেন। ইমাম রেযা (আ.) তাদেরকে সমধর্মী এবং মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে ভাই হিসেবে দেখতেন। তাঁর একজন অনুসারী নিম্নোক্ত ঘটনাটি উল্লেখ করেন :
ইমাম রেযা (আ.)-এর খোরাসানে ভ্রমণের সময় আমি তাঁর সাথে ছিলাম। একদিন তিনি তাঁর খাবারের দস্তরখানা বিছালেন এবং তাঁর সকল কর্মচারীকে একত্রিত করলেন। আমি বললাম : ‘আমি আপনার জন্য উৎসর্গিত হই। তাদের জন্য আলাদা দস্তরখানাবিছানোহলে সেটা কি উত্তম হতো না?’ ইমাম রেযা (আ.) বলেন : ‘এটি বলনা।’ এরপর তিনি বলেন : ‘মহিমান্বিত ও সুমহান আল্লাহ এক এবং সকল মানুষই আদম ও হাওয়ার সন্তান এবং প্রত্যেকেই তাদের কর্ম অনুযায়ী পুরস্কার বা শাস্তি পাবে।’
ইমাম রেযা (আ.)-এর একজন কর্মচারী নাদির বলেন : ‘ইমাম রেযা (আ.) আমাদের কোন কর্মচারীকে খাওয়ার সময় কোন কাজের দায়িত্ব অর্র্পণ করতেন না, যতক্ষণ আমাদের খাওয়া শেষ নাহয়।’
ইমাম রেযা (আ.)-এর অপর একজন কর্মচারী ইয়াসিনও একই কথা বলেন। তিনি বলেন : ইমাম রেযা (আ.) আমাদেরকে বলেছিলেন : ‘আমি যদি তোমাদেরকে কোন কিছু করতে বলি আর তোমরা খাবার খাওয়ারত অবস্থায় থাক, তাহলে তোমাদের খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত উঠবেনা।’ কোন কোন সময় তিনি আমাদের কাউকে ডাকতেন, কিন্তু যখন তাঁকে বলা হতো যে, সে খাবার গ্রহণ করছে তখন তিনি বলতেন : ‘তাদের খাবার শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর।’
অবসর সময়ে ইমাম রেযা (আ.) তাঁর সকল কর্মচারীকে একত্রিত করতেন এবং তাদের সাথে কথা বলতেন। ইমাম রেযা (আ.) তাদেরকে আনন্দিত করার জন্য তাদের প্রতি তাঁর সন্তুষ্টির কথা ব্যক্ত করতেন। রাতের খাবার খাওয়ার সময় তাঁর আশপাশে যারা আছে তাদের সকলকে তাঁর সাথে খাওয়ার জন্য আহবান জানাতেন।

অনুবাদ :সরকার ওয়াসি আহম্মেদ