রবিবার, ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইমাম খোমেইনী (র.) ও বেলায়েতে ফকিহ

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ২৫, ২০১৯ 

মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দিন খান-

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে (১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে) ইরানের বুকে সংঘটিত হয় মহান ইসলামি বিপ্লব। ইমাম খোমেইনী (র.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত কালজয়ী এ বিপ্লব প্রকৃতপক্ষে সহস্রাব্দের সবচেয়ে বড় ও বিস্ময়কর ঘটনা। ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে যতই দিন অতিবাহিত হচ্ছে ততই আমরা মধ্যপ্রাচ্যসহ সারাবিশ্বে এ বিপ্লবের ধারার গভীরতা ও এর ক্রমবর্ধমান বিস্তৃতি লক্ষ্য করছি। এ বিপ্লবের বিজয়ের মাধ্যমেই ‘বেলায়েতে ফকিহ’ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। ইসলামের ইতিহাসে প্রথমবারের মত বেলায়েতে ফকিহ বাস্তবরূপ লাভ করে। যার রূপরেখাও স্বয়ং ইমাম খোমেইনী (র.) পবিত্র কোরআন-সুন্নাহর আলোকে ইতিপূর্বেই প্রদান করেছেন। ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত চার দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। বেলায়েতে ফকিহ দর্শনের কার্যকারিতা ও গতিময়তা ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক চিন্তাধারার ওপর ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। এ প্রভাব এতটাই গভীর যে, বিশ্বের যেখানেই ইসলামি রাষ্ট্র বা ইসলামি বিপ্লবের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয় সেখানেই সকলের দৃষ্টি বেলায়েতে ফকিহ্ দর্শনের দিকে নিবদ্ধ হয়। কারণ, ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইমাম খোমেইনী (র.) একটি প্রগতিশীল ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। যেখানে ইসলাম ও গণতান্ত্রিক মূলবোধের একটি চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে।
বেলায়েতে ফকিহ কী?
বেলায়েত শব্দের অর্থ কর্তৃত্ব বা শাসনক্ষমতা, আর ফকিহ শব্দের অর্থ ফিকাহবিদ অর্থাৎ যিনি ইসলামের বিধিবিধান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখেন। বেলায়েতে ‘ফকিহ’ বা ‘ফকিহর শাসনক্ষমতা’ মূলত ‘বেলায়েতে রাসূল (সা.)-এর ধারণা থেকে উৎসারিত। সত্যিকার অর্থে এ বেলায়েত বা শাসনক্ষমতা হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব, যার অধিকারী ছিলেন স্বয়ং মহানবী (সা.) ও তাঁর ন্যায়পরায়ণ খলীফাগণ। আর পরবর্তীকালে বা বর্তমানে তাঁদের অনুপস্থিতিতে এ কর্তৃত্বের অধিকারী ওয়ালী এ ফকিহ। ফকিহদের মধ্যে যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ আর মৌলিক মানবীয় গুণাবলি, যেমন প্রশাসনিক যোগ্যতা, নেতৃত্বের গুণাবলি ও ন্যায়পরায়ণতা ইত্যাদির দিক থেকেও যিনি অগ্রগণ্য, এরূপ ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব মুসলিম উম্মাহকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব প্রদান করা। মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও সংহতি জোরদার করা এবং স্বার্থ সংরক্ষণ করা সহ উম্মতের সকল বৈষয়িক ও আধ্যাত্মিক বিষয়ের নেতৃত্ব সুচারুরূপে প্রদান করার দায়িত্ব ওয়ালী-এ ফকিহর ওপরই ন্যস্ত।
বেলায়েতে ফকিহ দর্শনের পুনরুজ্জীবন
ফুকাহা বা ফিকাহবিদ আলেমগণ যুগ যুগ ধরে ফিকাহর বিভিন্ন অধ্যায়ে বেলায়েতে ফকিহগণ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ফিকাহশাস্ত্রের উৎপত্তিকাল থেকেই জিহাদ, গণিমত, খুমস, আনফাল, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ ইত্যাদি সহ বিভিন্ন অধ্যায়ে বেলায়েতে ফকিহ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। কিন্তু পুরাতন যুগের ফকিহদের মধ্যে কেউই এ বিষয়ে একটি সুবিন্যস্ত ও পরিপূর্ণ আলোচনা করেন নি। তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার দিকে দৃষ্টি দিলেই এর প্রকৃত কারণ খুঁজে পাওয়া যায়।
নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী কাজার বংশীয় বাদশাহদের আমলের ফকিহদের মরহুম মোল্লা আহমাদ নারাকী (ওফাত ১২৪৫ হিজরি) প্রথম বেলায়েতে ফকিহ সম্পর্কে বিস্তারিত ও পরিপূর্ণ একটা ধারণা উপস্থাপন করেন। তিনি হাদীসের ভিত্তিতে প্রমাণ করেন যে, যেসব বিষয়ে রাসূল (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের ইমামগণ কর্তৃত্ব প্রাপ্ত ছিলেন সেসব বিষয়ে ফকিহগণও পরিপূর্ণভাবে বেলায়েতপ্রাপ্ত। তবে এক্ষেত্রে শুধু সেসব বিষয় বাদ যাবে যেগুলো একান্তভাবে মাসুমদের (নিষ্পাপ ব্যক্তিবর্গ) জন্য নির্ধারিত। তাঁর এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সুস্পষ্ট যে, তিনি সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকে বেলায়েতে ফকিহর অন্তর্ভুক্ত মনে করতেন।
মোল্লা আহমাদ নারাকীর পরে ইমাম খোমেইনীই আধুনিক যুগের একমাত্র ফকিহ যিনি বেলায়েতে ফকিহ সম্পর্কে বিস্তারিত ও পরিপূর্ণ আলোচনা করেছেন। প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি এ ব্যাপারে একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রদান করেছেন। তিনি তাঁর ঐতিহাসিক বেলায়েতে ফকিহ গ্রন্থে কোরআান, হাদীস ও বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল উপস্থাপন করে প্রমাণ করেছেন, সবধরনের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কর্ম বেলায়েতে ফকিহর অন্তর্ভুক্ত। যদিও পবিত্র কোরআনে এ প্রসঙ্গে সরাসরি ফকিহ্ শব্দটি ব্যবহৃত হয় নি, কিন্তু বেলায়েতে ফকিহর প্রমাণ্য দলিল হিসাবে কয়েকটি আয়াত প্রণিধানযোগ্য। এগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়াত এক বা একাধিকবার কোরআনে উল্লিখিত হয়েছে-
‘হে তোমরা যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছ! আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তাদের যারা তোমাদের মধ্যে কর্তৃত্বের অধিকারী।’- সূরা নিসা : ৫৯
ইমাম খোমেইনী (র.) যেসব বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়কে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অপরিহার্যতার দলিল হিসাবে উল্লেখ করেছেন সেগুলো নি¤œরূপ :
১. মহানবী (সা.) স্বয়ং ইসলামি রাষ্ট্্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং নিজেই তার কর্ণধার ছিলেন।
২. ইসলামি বিধি-বিধান বা আইন-কানুন অব্যাহত থাকার প্রয়োজনীয়তা অর্থাৎ ইসলামি আইন-কানুনের প্রয়োগ শুধু রাসূল (সা.) ও তাঁর ন্যায়পরায়ণ খলীফাবৃন্দের যুগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা কিয়ামত পর্যন্ত সব যুগের জন্যই প্রযোজ্য।
৩. ইসলামি আইন-কানুনের স্বরূপ ও ধরণ প্রমাণ করে যে, একমাত্র ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনেই এসব আইনের পরিপূর্ণ প্রয়োগ সম্ভব।
ইমাম খোমেইনী (র.) তাঁর উপস্থাপিত বেলায়েতে ফকিহ তত্ত্বের ধারাবাহিকতায় ইসলামি নেতৃত্বের অপরিহার্য শর্তাবলির কথা উল্লেখ পূর্বক বলেন, ইসলামি নেতৃত্বের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজ্ঞা ও প্রশাসনিক যোগ্যতার মতো সাধারণ বৈশিষ্ট্যাবলি ছাড়াও আরো অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য অপরিহার্য। আর সেগুলো হচ্ছে : ইসলামি আইন-কানুনের ওপর ব্যুৎপত্তি ও ন্যায়পরায়ণতা। বেলায়েতে ফকিহর ক্ষমতার পরিসর কতটুকু হবে সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, সবদিক থেকে যোগ্যতাসম্পন্ন এবং উপরিউক্ত দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যেরও অধিকারী এরূপ কোন ব্যক্তি যদি কিয়াম করে এবং ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে কোন তারতম্য সৃষ্টি করে না।
বেলায়েতে ফকিহ ব্যবস্থার স্বরূপ
কালের প্রবাহে আজ এটা সবার সামনে সুস্পষ্ট যে, ইমাম খোমেইনী (র.) বেলায়েতে ফকিহ্ দর্শনকে শুধু বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করেই ক্ষান্ত হন নি; বরং তৎকালীন খোদাদ্রোহী স্বৈরাচারী, জালিম রাজতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মাধ্যমে ইরানি জনগণের সর্বাত্মক সহযোগিতায় ইসলামি বিপ্লব ঘটিয়েছেন। আর বেলায়েতে ফকিহ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ইরানের ভূমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামি প্রজাতন্ত্র। ইতোমধ্যে আমরা ইমাম খোমেইনী (র.) কর্তৃক প্রণীত বেলায়েতে ফকিহ দর্শনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি উপস্থাপন করেছি। এ পর্যায়ে আমরা এ ঐশী দর্শনের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বরূপ নিয়ে আলোচনা করব।
১. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব
বেলায়েতে ফকিহ্ দর্শন অনুসারে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব মহান আল্লাহর। মহাবিশ্বের সকল শক্তির উৎস মহাপ্রভু আল্লাহ। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে মানব জাতিসহ সমগ্র মহাবিশ্বের একমাত্র মালিক সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী। আল্লাহ্র অনুমতি ছাড়া কারো পক্ষে কোন কিছুর ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। সুতরাং মানুষের ওপর শাসনক্ষমতা প্রয়োগ করার অধিকারও একমাত্র আল্লাহর নিকট সংরক্ষিত। তাঁর অনুমোদন ছাড়া শাসনক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার কারো নেই।
সুতরাং প্রথমত ও মৌলিকভাবে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস মহান আল্লাহ। তাই এক্ষেত্রে শুধু তাঁরাই শাসনক্ষমতার অধিকারী হবেন, যাঁরা আল্লাহর পক্ষ থেকে অধিষ্ঠিত হবেন। মহানবী (সা.)-এর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রও এ পথেই বৈধতা লাভ করেছে অর্থাৎ তিনি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অধিষ্ঠিত ছিলেন। বেলায়েতে ফকিহর বৈধতাও এই একই সূত্রে গাঁথা।
২. জনগণের সম্মতি ও অংশগ্রহণ
বেলায়েতে ফকিহ্ ব্যবস্থার অধীনে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে ফকিহ্র শাসন ক্ষমতা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব থেকে উৎসারিত। কিন্তু এ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জনগণের ভূমিকাই মুখ্য। কারণ, সমাজে বা রাষ্ট্রে বেলায়েতে ফকিহ্ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু জনগণের আকাক্সক্ষাই যথেষ্ট নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক এরূপ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। প্রথমত এ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকল্পে ফকিহর শাসনক্ষমতাকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে আল্লাহর দ্বীনকে মেনে নেয়া। আর দ্বিতীয়ত ফকিহর শাসনক্ষমতাধীনে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অব্যাহত সক্রিয় অংশগ্রহণ। মোটকথা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া বেলায়েতে ফকিহ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বরং জনগণের ইচ্ছায় প্রতিষ্ঠিত ফকিহর শাসনাধীন রাষ্ট্রে জনগণের অংশগ্রহণ, ইসলামি চেতনার প্রসার ও পারস্পরিক ঐক্য ও সংহতি যত বেশি হবে, এ রাষ্ট্রব্যবস্থা ততই সফল ও শক্তিশালী হবে।
৩. জনমতের প্রতিফলন
বেলায়েতে ফকিহ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হচ্ছে সকল রাষ্ট্রীয় কর্মকা-ে জনমতের প্রতিফলন। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বলা হয়েছে :
‘আর তাদের কর্মকা- হচ্ছে পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে।’- সূরা শূরা : ৩৮
তা ছাড়া কোরআনের অন্যত্র মহানবী (সা.) সরাসরি এ ব্যাপারে নির্দেশিত হয়েছেন :
‘আর কর্মের ব্যাপারে তাদের সাথে পরামর্শ করুন, আর যখন সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করুন।’- সূরা আলে ইমরান : ১৫৯
সুতরাং বেলায়েতে ফকিহ্ ব্যবস্থার অধীনে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ তাঁদের সকল রাষ্ট্রীয় কর্মকা-ের ব্যাপারে জনগণের সাথে পরামর্শ করেন এবং সবক্ষেত্রে তাদের মতামতের প্রতিফলন ঘটান। তবে পরামর্শের এ ধরন কী হবে এ ব্যাপারে ইসলামে কোন সীমাবদ্ধতা নেই। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধান অনুযায়ী মজলিশে শূরায়ে ইসলামি বা সে দেশের পার্লামেন্ট- যার সদস্যরা জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন, এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তাছাড়া প্রতিটি গ্রাম, জেলা ও শহর পর্যায়েও শূরা বা পরিষদ রয়েছে, যেগুলো সার্বিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা জন্য জনমতের প্রতিফলন ঘটাবার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে সংগত কারণেই বেলায়েতে ফকিহ ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের এই পরামর্শ প্রক্রিয়া সার্বিকভাবে ইসলামি শরীয়তের বিধি-বিধানের আলোকেই পরিচালিত হয়।
৪. সকল নাগরিকের সমঅধিকার
বেলায়েতে ফকিহ্ ব্যবস্থার অধীনে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন ফকিহ্ কোন অতিরিক্ত নাগরিক অধিকার ভোগ করেন না। এমনকি নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হওয়ার কারণে যেসব হুকুম বা ফতোয়া তিনি জারি করেন, সেগুলো তাঁদের নিজের জন্যও অবশ্য পালনীয়। উল্লেখ্য যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধানের ১০৭ নং ধারায় বলা হয়েছে, আইনের দৃষ্টিতে রাহবারের (ওয়ালীয়ে ফকিহ্) ব্যক্তিগত অধিকার দেশের অন্যান্য নাগরিকের সমান।
তা ছাড়া যে ইসলামি বিশেষজ্ঞ পরিষদ কর্তৃক ওয়ালীয়ে ফকিহ বা ক্ষমতাসীন ফকিহ নির্বাচিত হন তাঁদেরই সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকেন তিনি। এক্ষেত্রে সামান্যতম বিচ্যুতি বা অনধিকার চর্চা তাঁর পদচ্যুতির জন্য যথেষ্ট।
৫. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা
বেলায়েতে ফকিহ ব্যবস্থার অধীনে প্রকৃত প্রস্তাবে ফকিহর নয়; রবং ফিকাহ বা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এমনকি মহানবী (সা.)-ও যে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানে তিনি নিজের ইচ্ছা মতো কোন রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপ পরিচালনা করতেন না; বরং আল্লাহ প্রেরিত বাণী অনুসারেই দেশ পরিচালনা করতেন। কারণ, প্রকৃতপক্ষে বেলায়েত বা শাসনক্ষমতার অধিকারী হচ্ছে স্বয়ং মহান আল্লাহ। আর রাসূলের নিকট এ ক্ষমতা আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত হয়েছে। একইভাবে রাসূলের সত্যিকারের উত্তরাধিকারী হিসাবে ফকিহগণের কাছে শাসনক্ষমতা অর্পিত হয়েছে মাত্র। তাই রাসূলের মতো ফকিহগণও আল্লাহর কিতাব বা ইসলামের বিধি-বিধান অনুসারে দেশ পরিচালনা করতে নির্দেশিত হয়েছেন।
৬. ফকিহ্র সর্বময় ও চূড়ান্ত ক্ষমতা
ইতিপূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে যে, মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব প্রদানকারী হিসাবে প্রয়োগিক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন ফকিহ্ আর রাসূল (সা.) ও তাঁর ন্যায়পরায়ণ খলীফাবৃন্দের ক্ষমতার মধ্যে কোন তারতম্য নেই। সুতরাং মুসলিম সমাজকে সুচারুরূপে পরিচালনার জন্য যত রকমের ক্ষমতা ও এখতিয়ারের প্রয়োজন, তার সবটাই ওয়ালী-এ-ফকিহ্র রয়েছে। আর জনগণের ওপর এটা অবশ্য কর্তব্য যে, ওয়ালীয়ে ফকিহ্র নির্দেশনাকে পুরোপুরি মেনে চলবে।
বেলায়েতে ফকিহ ব্যবস্থায় ওয়ালীয়ে ফকিহ্ নিজে সরাসরি কোন নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন না। তবে নির্বাহী দায়িত্ব পালনকারী যে কোন ব্যক্তির সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মের ওপর তিনি হস্তক্ষেপ করতে পারেন, আর সেক্ষেত্রে তাঁর সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত। তবে এসব কিছু তিনি করেন শরীয়তের বিধি-বিধানের আলোকেই। ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক বা ইসলামের চৌহদ্দির বাইরের কোন আইন জারি করার কোন অধিকার ফকিহ্র নেই। সুতরাং ফকিহ্র সর্বময় ক্ষমতা সত্ত্বেও বেলায়েতে ফকিহ্ ব্যবস্থায় স্বেচ্ছাচারিতা বা একনায়কতান্ত্রিকতার কোন অবকাশ নেই।
পরিশেষে বলা যায়, বেলায়েতে ফকিহ ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাষ্ট্রে আসলে চূড়ান্তভাবে আল্লাহর যমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এক্ষেত্রে কোন ভাবেই ব্যক্তি ফকিহ্’র শাসন বিষয়বস্তু নয়। এমনকি ইসলামি শাসনব্যবস্থায় স্বয়ং মহানবীও শুধু তাঁর মহান প্রভুর বিধান অনুসারে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা করেছেন। প্রকারান্তরে যা আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠারই নামান্তর। প্রকৃতপ্রস্তাবে মহানবী (সা.)-এর শাসনক্ষমতা, তাঁর ন্যায়পরায়ণ খলীফাদের শাসনক্ষমতা ও ফকীহর শাসনক্ষমতা বেলায়েতে ফকিহ্ এসবই মহান আল্লাহর শাসনক্ষমতা থেকেই উৎসারিত। আসলে প্রকৃত ইসলামি রাষ্ট্রে মানুষ আল্লাহর বান্দা হিসেবে আল্লাহর শাসনক্ষমতা বা সার্বভৌমত্বের অধীনেই পরিচালিত হয়। তাই বেলায়েতে ফকিহর অধীনে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত একটি কল্যাণ রাষ্ট্র। কারণ, ফকিহ্ সেখানে শুধু মহান আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে সমাজকে আল্লাহর বিধি-বিধান অনুসারে, ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে পরিচালনা করেন মাত্র।