মঙ্গলবার, ২০শে আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৫ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইমাম খোমেইনী (র.)-এর দৃষ্টিতে ইসলামি ঐক্য

পোস্ট হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৭ 

বিজ্ঞ মনীষিগণের কল্যাণচিন্তায় সবসময়ই ইসলামি ঐক্যের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়েছে। ইমাম খোমেইনী (র.) মুসলিম জগতের কল্যাণকামী এবং ঐক্যের আহ্বানকারীদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব। মুসলিম ফেরকাগুলোর মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁর সু¯পষ্ট কিছু পরিকল্পনা ছিল। বিপ্লবের আগে এবং পরেও ইমাম তাঁর ঐ পরিকল্পনা অনুযায়ী মুসলমানদের ঐক্যের আহ্বান জানান এবং এ বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করে ঐক্যের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করার চেষ্টা চালান। তাঁর এই চেষ্টার ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। একটি হলো সাংস্কৃতিক ও মননশীল
আন্দোলন এবং দ্বিতীয়টি হলো রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি।
ইমাম খোমেইনীর চিন্তাধারা অনুযায়ী ইসলামি সমাজে পরিবর্তন আনা এবং বিচ্ছিন্নতা থেকে জাতিকে মুক্তি দেয়া এমন সহজ কোনো বিষয় নয় যে, সুচিন্তিত এবং মৌলিক কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই তা সম্ভব হয়ে যাবে। কেননা, মুসলিম বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ও চিন্তাদর্শনগত অবক্ষয় এবং মুসলিম দেশগুলোতে উপনিবেশবাদী এবং স্বৈরাচারী শক্তিগুলোর শাসনব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো এক্ষেত্রে দায়ী। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে মুসলিম দেশ ও সরকারগুলোর সামগ্রিক তৎপরতা এবং সুনির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করা উচিত। যেহেতু মুসলিম দেশগুলোর অভিন্ন ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ইতিহাস রয়েছে, সেহেতু তাদের উচিত তাদের সেই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও মৌলিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দিকে প্রত্যাবর্তন করা, সেইসাথে ধর্মীয় পরিচিতির স্মারক বই-পুস্তকগুলোর সাথে ভালোভাবে পরিচিত হওয়া। এ কারণেই ইমাম খোমেইনী ইসলামের মৌলিক সংস্কৃতির দিকে প্রত্যাবর্তন করার ব্যাপারে বলেছেন : ‘আমাদের মুসলমানদের খুবই সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে। মুসলমানদের উচিত নিজেদের পরিচয় স¤পর্কে
সচেতন হওয়া। অর্থাৎ বুঝতে হবে যে, তারা একই সংস্কৃতির অধিকারী… অসহায় এবং দুর্বল জাতিগুলো পরাশক্তিগুলোর সাথে যে স¤পর্ক সৃষ্টি করেছে, অভ্যন্তরীণ এবং চিন্তাগত স¤পর্ক তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কেননা, অন্যসব নির্ভরতামূলক স¤পর্ক তা থেকেই প্রেরণা লাভ করে। চিন্তার স্বাধীনতা লাভ করতে হলে নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে উপলব্ধি করতে হবে।’
ইমাম খোমেইনী (র.) মুসলমানদের মাঝে অভিন্ন বিশ্বাস ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ইসলামি চিন্তাদর্শনগুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এ বিষয়টিকে তিনি ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী বলে উল্লেখ করেছেন। ইমামের দৃষ্টিতে ইসলাম হচ্ছে মানুষের চিন্তাদর্শন ও ব্যবহারিক জীবনের জন্য একটি পূর্ণ ও সামগ্রিক বিধান। মানুষের সামগ্রিক জীবনের জন্য তাই ইসলামের রয়েছে সামগ্রিক কর্মসূচি। মুসলিম সমাজে বিশ্বাসগত গভীরতার কারণে এবং মুসলমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগত দিক থেকেও তাদের যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। যদি এ বিষয়গুলোকে যথার্থভাবে কাজে
লাগানো সম্ভব হয় তাহলে মুসলিম বিশ্বের সম্মান পুনরায় ফিরে আসতে পারে। ইমাম খোমেইনীর মতে, ইসলাম এ বিশ্বাস ও বোধকে কাজে লাগিয়ে মুসলমানদের ভৌগোলিক সীমারেখা মুছে ফেলতে পারে, পারে ব্যক্তিগত স্বার্থের সীমা পেরিয়ে গোত্র বর্ণভেদে সকল মুসলমানকে একটি কেন্দ্রে সমবেত করতে।
ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইমাম খোমেইনী (র.) যেসব কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছেন, সেগুলো ছিল মুসলিম বিশ্বে বিচ্ছিন্নতার মূল কারণকেন্দ্রিক। এই বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ হিসেবে ইমাম খোমেইনী বিদেশি শক্তির কথা উল্লেখ করেছেন যারা মুসলমানদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির জন্য মুসলমানদেরই অভ্যন্তরীণ উপাদান বা বিষয়গুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্টের কাজে লিপ্ত রয়েছে। মুসলিম সমাজের ওপর বিদেশিদের এই চক্রান্তের উদ্দেশ্য হিসেবে ইমাম বলেন, মুসলমানদের স¤পদ লুট করাই তাদের উদ্দেশ্য। তিনি এ স¤পর্কে আরো বলেন : ‘যারা মুসলমানদের ভূখ- থেকে স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়, যারা মুসলমানদের স¤পদগুলোকে আত্মসাৎ করতে চায় এবং মুসলিম সরকারগুলোকে তাদের তাঁবেদার বানাতে চায়, তারাই মুসলমানদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। শিয়া ও সুন্নির নামে তারাই এই মতপার্থক্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়।’
ইমাম খোমেইনী (র.) অপর এক ভাষণে মুসলমানদেরকে নিজেদের ভেতরে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির জন্য শত্রুদের মূল হাতিয়ার মাযহাবগত মতপার্থক্যের ফাঁদে পা দিতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইসলামি মাযহাবগুলোর মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টির পরিকল্পনা একটি মারাত্মক অপরাধ, আর এই অপরাধের স্রষ্টা হলো সেসব পরাশক্তি যারা ওই মতপার্থক্য থেকে ফায়দা হাসিল করে। তারাই এই মতানৈক্যের বীজ মুসলমানদের মাঝে বপন করেছে এবং নিয়মিত তার গোড়ায় পানি ঢেলে পরিচর্যা করে যাচ্ছে। যারা এই বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করতে চায় তারা না আহলে সুন্নাতের, না আহলে শিয়ার অন্তর্ভুক্ত। তারা হলো পরাশক্তিগুলোর মদদপুষ্ট সরকারের কর্মকর্তা। মাযহাব এবং গোত্রগত সবধরনের মতপার্থক্যকে অসমীচীন ও অবৈধ বলে উল্লেখ করেছেন, কেননা, এগুলো মুসলমানদের সংহতির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তিনি ইসলামের মানদ- ও কোরআনকে ঐক্যের মূল মাপকাঠি বলে মনে করেন। সে জন্য ইসলামি মাযহাবগুলোর মাঝে যেসব বিষয়ে অভিন্নতা রয়েছে যেমন আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, নবী এবং কোরআনের প্রতি বিশ্বাস ইত্যাদির মতো বিষয়গুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে ইমাম হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন : ‘শিয়া এবং সুন্নিদেরকে দুটি পক্ষে দাঁড় করানোর মতো সমস্যাটির মূল নিহিত রয়েছে বিদেশিদের অজ্ঞতা এবং প্রচারণার মধ্যে। এখন সময় এসেছে সকল মুসলমান পর¯পরে ঐক্যবদ্ধ হবার।’
ইমাম অসহায় বঞ্চিতদের একটি দল গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, এই দলে সকল বঞ্চিত জনগোষ্ঠী যোগ দেবে এবং পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। এ প্রসঙ্গে তিনি মুসলিম জাতিগুলোর প্রতি উপদেশ দিয়ে বলেছেন, তারা যেন ইরানের মুজাহিদ জাতির আদর্শ অনুসরণে এগিয়ে আসে।
একইভাবে তিনি ইসলামি ঐক্য বাস্তবায়নের পন্থা হিসেবে মুসলিম দেশগুলোর কর্মকর্তাদের পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছেন। কারণটা হলো মুসলিম দেশগুলোর প্রধানদের হাতে ইসলামি ঐক্যের পক্ষে সরকার গঠন করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তাই তাঁরা যদি সত্যিকার অর্থেই ইসলামি ঐক্য বাস্তবায়নের চেষ্টা চালান তাহলে তা অর্জন করা খুব একটা কঠিন হবে না।
তিনি বিশ্বাস করেন, মুসলিম দেশগুলোর স¤পদ বা অর্থনৈতিক বৃহৎ উৎসগুলোকে কাজে লাগালে পরাশক্তিগুলোর মোকাবেলায় তা মুসলমানদের বৃহৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি চালিকাশক্তি হতে পারে। ইমাম খোমেইনীর মতে খনিজ স¤পদের দিক থেকে সমৃদ্ধ মুসলিম দেশগুলোর মাঝে যদি ঐক্য গড়ে ওঠে তাহলে কোনো দেশ বা কোনো শক্তির কাছেই মুসলমানদের ধন্না দেয়ার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু মূল সমস্যাটা হলো অধিকাংশ মুসলিম দেশই পরাশক্তির নীতির অনুসারী এবং ইসলামি ঐক্য গড়ে তোলার ব্যাপারে আন্তরিক নয়। এ অবস্থার অবসান ঘটুক, মুসলমানদের মধ্যকার সকল বিভেদ দূর হয়ে যাক, প্রতিষ্ঠিত হোক শিসাঢালা প্রাচীরের মতো দৃঢ় ঐক্য।