রবিবার, ১৬ই জুন, ২০১৯ ইং, ২রা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইমাম খোমেইনী (র.)-এর আন্দোলন ইমাম মাহদী (আ.)-এর বৈশ্বিক আন্দোলনের পটভূমি

পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৬ 

খন্দকার মোঃ মাহফুজুল হক
ইরানের খোমেইন শহরের নাম নিশ্চয়ই সচেতন ব্যক্তিমাত্রই শুনে থাকবেন। কারণ, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের স্থপতি মরহুম ইমাম খোমেইনী (র.)-এর নামের সাথে জড়িয়ে আছে এই শহরটি। এই ঐতিহাসিক শহরের নামের শেষে ‘ই’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে মুসলিম জাহানের অবিসংবাদিত নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ মুসাভী বিশ্বজুড়ে ইমাম খোমেইনী নামে পরিচিতি লাভ করেছেন।
ফেব্রুয়ারি ইরানী জনগণের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। কারণ, ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মরহুম ইমাম
খোমেইনীর নেতৃত্বে ইরানে ইসলামী বিপ্লব চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে। শহীদদের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ইরানের জনগণ লাভ করে প্রকৃত স্বাধীনতা ও মুক্তি। চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র কয়েক দিন আগে অর্থাৎ ১লা ফেব্রুয়ারি ইমাম খোমেইনী ১৫ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এদিনে তাঁকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য ইরানের কোটি কোটি মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন যা ছিল বিশ্ব ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা।
ঠিক তেমনই ১৯৮৯ সালের চৌঠা জুন মুসলমানদের জন্য বিশেষ করে ইরানী জনগণের জন্য একটি শোকাবহ দিন।
এদিন ইমাম খোমেইনী (র.) মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে এ নশ্বর জগৎ ত্যাগ করেন। ১৯৭৯ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি যে পরিমাণ মানুষ ইমামকে স্বাগত জানাতে রাস্তায় নেমে এসেছিল তার চেয়ে কয়েকগুণ মানুষ দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাঁকে শেষ বিদায় জানায়।
ইমাম খোমেইনী জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের ভক্তি, শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন। কারণ তিনি বিশ্বের প্রচলিত ধারার বাইরে নতুন এক ধারা প্রবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত ইরানের ইসলামী বিপ্লব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রচলিত অনেক সমীকরণ বা হিসেব-নিকেশ বদলে দিয়েছে। বিশ্ব যখন একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদ এবং অন্যদিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন ধর্মহীন সমাজতন্ত্রের নিগড়ে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল, যখন মুসলিম দেশগুলোর সরকার এবং তথাকথিত ইসলামী দলগুলোর নেতাদের মধ্যেও এই ধারণা বিস্তার লাভ করেছিল যে, দুই পরাশক্তিকে উপেক্ষা করে চলা সম্ভব নয়, ঠিক তখন ইসলামের বিজয় কেতন উড়িয়ে বিশ্ববাসীর সামনে আসেন ইরানের এই অবিসংবাদিত নেতা।
যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ দাম্ভিক ও অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। ফেরাউন ও নমরুদের মতো অত্যাচারী এবং খোদাদ্রোহী শাসকদের হাত থেকে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে উদ্ধার করতে আল্লাহ পাক দুইজন বিশিষ্ট নবীকে এ ধরাপৃষ্ঠে পাঠিয়েছেন। নবুওয়াতের ধারা পরিসমাপ্তির পর যুগে যুগে আহলে বাইতের মহান ইমামগণ নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। যখনই কোন জনপদে কোন মানবগোষ্ঠী বিভ্রান্তিতে নিপতিত হয়েছে কিংবা অত্যাচারী শাসক কর্তৃক নিপীড়িত-নিগৃহীত হয়ে মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছে তখনই মহান প্রতিপালক তাদেরকে উদ্ধার করার জন্য তাঁর মনোনীত ব্যক্তিদেরকে এ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। পবিত্র কোরআনের সূরা নিসার ৭৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমাদের কি হলো যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করছ না সেই সব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুদের জন্যে, যারা (ফরিয়াদ) করে বলছে, ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে এই জনপদ থেকে উদ্ধার কর; এখানকার অধিবাসীরা যে অত্যাচারী! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য অলি নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী পাঠাও।”
ইমাম খোমেইনী (র.) ছিলেন এমন একজন অলি যিনি দুর্বল জাতিগুলোকে দাম্ভিক বৃহৎ শক্তিগুলোর আধিপত্য থেকে মুক্তি লাভের পথ দেখিয়েছেন। দিগ্ভ্রান্ত মুসলমানদেরকে দিয়েছেন পথের দিশা। ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে তিনি মুসলমানদেরকে ইমানী চেতনায় পুনরুজ্জীবিত করেছেন। তিনি খাঁটি মোহাম্মাদী ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। যে ইসলাম সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলে না, অন্যায়-অবিচার, যুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে কিংবা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলে না, তিনি সে ইসলামকে ‘আমেরিকান ইসলাম’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। যুগে যুগে নবী-রাসূল ও ইমামগণ যেভাবে অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন এবং ইমাম হোসাইন (আ.) যেমনিভাবে ইয়াযীদের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন, ইমাম খোমেইনী (র.) ঠিক তেমনই হোসাইনী চেতনা নিয়ে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে মুসলমানদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
তিনি পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের মূর্তি ভেঙে ফেলার ডাক দিয়ে দৃপ্তকণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছেন, মানুষের তৈরি করা মতবাদ প্রকৃত শান্তি ও মুক্তি নিশ্চিত করতে সক্ষম নয়, একমাত্র আল্লাহপ্রদত্ত ইসলামী জীবনাদর্শ মানুষের প্রকৃত মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারে। তিনি মনে করতেন, ইসলাম শুধু মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ বা ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়, ইসলাম হলো সর্বজনীন ও বিশ্ব মানবতার ধর্ম। একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এই ধর্ম একদিকে যেমন মানুষকে উন্নত চরিত্র ও নৈতিক গুণাবলি অর্জনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয় তেমনি সব ধরনের অন্যায়-অবিচার, শোষণ-নির্যাতন, সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানায়। এ ধর্ম জীবনের সর্বক্ষেত্রে সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা ,দারিদ্র্য বিমোচন ও মযলুম মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে।
ইমাম খোমেইনী (র.) ছিলেন একাধারে একজন বড় দার্শনিক, রাষ্ট্রনায়ক, সচেতন রাজনীতিজ্ঞ, অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী আইনজ্ঞ ও মুজতাহিদ আলেম, আপোসহীন সংগ্রামী, শ্রেষ্ঠ মানের শিক্ষক, অনুপম লেখক, হৃদয়স্পর্শী বক্তা, আধ্যাত্মিক কবি এবং সর্বোপরি একজন অনন্যসাধারণ আধ্যাত্মিক নেতা ।
সমকালীন যুগে বা হাজার বছরের ইতিহাসে কোনো মুসলিম মনীষীর মধ্যে এতগুলো সফল দিক বা গুণের সমাহার দেখা যায়নি। আধ্যাত্মিক জ্ঞানের দিক থেকে তাঁর অবস্থান ছিল অনেক উঁচুতে। একজন আধ্যাত্মিক সাধক ও পরহেজগার আলেম হিসেবে জনপ্রিয় এই ইমাম কখনও নেতৃত্বের পেছনে ছুটেননি; বরং মযলুম মানুষের প্রতি তাঁর অপরিসীম ভালোবাসা, দেশ ও জাতির স্বার্থে সময়োপযোগী পদক্ষেপ, দূরদর্শী ও সাহসী নেতৃত্ব, আল্লাহর উপর অবিচল আস্থা, আত্মবিশ্বাস এবং যুগোপযোগী অসাধারণ জ্ঞান ও যোগ্যতার কারণেই তিনি মুক্তিকামী মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতায় পরিণত হয়েছিলেন ।
তিনি বলতেন, তাদের হাতে ইসলামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে যারা উচ্চশিক্ষিত হয়েছে, অথচ আত্মিক দিক থেকে সংশোধিত হয়নি। এজন্য তিনি সরকারি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আত্মসংশোধন এবং ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার উপর খুব বেশি গুরুত্ব প্রদান করতেন। তিনি নৈতিকতা শিক্ষার ক্লাসে ধর্মতত্ত্বের ছাত্রদের উপদেশ দিয়ে বলতেন, ‘ধর্মতত্ত্বের একজন প্রবীণ শিক্ষকের মতে আলেম হওয়া খুব সহজ। কিন্তু খুব কঠিন হচ্ছে একজন সত্যিকার মানুষ হওয়া, আর আমি বলব, আলেম হওয়া বেশ কঠিন, আর মানুষ হওয়াটা প্রায় অসম্ভব।’
তিনি প্রায় সময়ই বলতেন, ‘যদি তোমরা পদ ও পদবি গ্রহণ করতে চাও তাহলে সবার আগে অন্তরের বিশুদ্ধতা অর্জন কর। অন্তর পবিত্র না হলে পদ ও ক্ষমতা তোমাকে বিভ্রান্তিতে নিপতিত করবে, একই সাথে তোমার আখেরাতকেও বরবাদ করে দেবে।’
ইমাম খোমেইনী (র.)-এর আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব এবং ইরানের ইসলামী বিপ্লবের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের কারণে আলেমদের অনেকেই একে প্রতিশ্রুত ইমাম মাহদী (আ.)-এর বৈশ্বিক বিপ্লবের পটভূমি বলে অভিহিত করেছেন। বিভিন্ন হাদিস থেকে নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, পৃথিবীতে যখন অবিচার-অনাচার ছড়িয়ে পড়বে, জাতিগুলো বিবাদ-বিসম্বাদ ও হানাহানিতে লিপ্ত হবে, অত্যাচার-অবিচার, হত্যা-খুন ও সন্ত্রাস পৃথিবীকে অশান্ত করে তুলবে, তখন নবী বংশ বা পবিত্র আহলে বাইতের মধ্য থেকে একজন ত্রাণকর্তার আবির্ভাব হবে। তিনি ইমাম মাহদী নামে পরিচিত হবেন। তিনি আগমন করে এই উম্মতকে নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। ইসলাম ধর্মকে সংস্কার করবেন এবং ইসলামী শরীয়তের মাধ্যমে বিচার-ফয়সালা করবেন। পৃথিবী থেকে যুলুম-নির্যাতন দূর করে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন।
ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাব এবং বিশ্বব্যাপী সৎ ও ঈমানদারদের শাসন কায়েম হওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসন কর্তৃত্ব দান করবেন, যেমন তিনি শাসনকর্তৃত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয় ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে তারাই অবাধ্য।” (সূরা নূর : ৫৫)
ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের বিষয়ে মুসলমানদের সকল মাজহাবের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। যুগ যুগ ধরে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা তাঁর আত্মপ্র্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন। আল্লাহর কাছে তাঁরা প্রার্থনা করছেন যেন এই ঝঞ্ঝাসঙ্কুল পৃথিবীতে তাঁর আগমন ত্বরান্বিত হয়। পবিত্র নবী বংশের অনুসারী শিয়া মুসলমানরা বিশ্বাস করেন শাবান মাসের ১৫ তারিখ অর্থাৎ পবিত্র শবে বরাত তিনি আহলে বাইতের এগারোতম ইমাম হযরত হাসান আসকারী (আ.)-এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন। যেহেতু তিনি নবী বংশের সর্বশেষ ইমাম হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করছেন তাই আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় বর্তমানে তিনি অন্তর্ধানে রয়েছেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি আবার উপযুক্ত সময়ে আত্মপ্রকাশ করবেন এবং তাঁর উপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করবেন।
নবী করিম (সা.)-এর বিভিন্ন হাদিস ও ভবিষ্যদ্বাণী থেকে জানা যায় যে, ইমাম মাহদী (আ.)-এর আত্মপ্রকাশের আগে মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করবে, তাঁর আগমনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকবে, ন্যায়নিষ্ঠ আলেম ও ইসলামী ব্যক্তিত্বরা তাঁর আগমনের প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য সচেষ্ট হয়ে উঠবেন, মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি হবে। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, এক্ষেত্রে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত সালমান ফারসি (রা.)-এর বংশধর অর্থাৎ পারস্যের আলেমরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের অনেক আগে থেকেই ইরানের বিশিষ্ট আলেমরা মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এক্ষেত্রে আয়াতুল্লাহ বুরুজের্দি ও শেইখ আহমদ শালতুত (র.)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর ইমাম খোমেইনী (র.) শিয়া-সুন্নিসহ সকল মুসলমানকে ঐক্যবদ্ধ করার মহতি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি রাসূলে পাক (সা.)-এর জন্মের মাস রবিউল আওয়ালের ১২ থেকে ১৭ তারিখ ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ হিসেবে পালনের নির্দেশ দেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘মুসলিম দেশগুলোতে যারা শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে, তারা শিয়াও নয়, সুন্নিও নয়; বরং তারা হলো সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল।’ এভাবে তিনি ইসলামী ঐক্য গড়ে তোলার কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের তাঁবেদাররা মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা পরিত্যাগ করেনি। বিভিন্ন দেশে তারা মুসলিম নামধারী এমন কিছু সুবিধাবাদী ব্যক্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে যারা এ ক্ষেত্রে ইহুদিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের নীল-নকশা বাস্তবায়নের কাজে সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি সিরিয়া ও ইরাকে সন্দেহভাজন ও উগ্রবাদী একটি গোষ্ঠী হত্যা ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বকে অশান্ত করে তুলেছে। হত্যা, লুটপাট, সন্ত্রাস এবং ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো ধ্বংস করে এই উগ্রবাদী গোষ্ঠীটি এটাই প্রমাণ করেছে যে, তারা আসলে ইসলামকে কলংকিত করার কাজে লিপ্ত রয়েছে। এধরনের উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর চরিত্র উন্মোচন করে দিয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “যখন তাদেরকে বলা হয় যে, দুনিয়ার বুকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, ‘আমরা তো শান্তির পথ অবলম্বন করেছি।’ মনে রেখ, তারাই হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।” (সূরা বাকারাহ : ১১)
ইরাক ও সিরিয়ায় জেঁকে বসা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর বেশির ভাগ সদস্য বহিরাগত, অর্থাৎ বহিরাগতরা ইরাক বা সিরিয়ার নাগরিক নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তাদেরকে সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের কার্যকলাপ প্রত্যেক সচেতন মানুষের মনে কতগুলো প্রশ্ন জন্ম দেয়। যেমন, এই গোষ্ঠীগুলোর শক্তির উৎস কোথায়? কারা এদেরকে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে? যুদ্ধের প্রশিক্ষণ তারা কোথা থেকে পেয়েছে? সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তির কড়া নজর এড়িয়ে কিভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উগ্রবাদীরা ইরাক ও সিরিয়ায় সমবেত হওয়ার সুযোগ পেল?
এরপর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, আইএস বা অন্যান্য উগ্রবাদী গোষ্ঠী নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে যে তাণ্ডব চালাচ্ছে তাতে ইসলামের সম্মান বাড়ছে নাকি কমছে? তাদের কার্যকলাপের ফলে মুসলিম বিশ্ব লাভবান হচ্ছে না কি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? ইসলামের নামে তারা যে তাণ্ডব চালাচ্ছে তা কি ইসলামী নীতি আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুবই স্পষ্ট এবং সবার কাছেই অনুমেয়। অতএব, মুসলিম বিশ্বকে ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্র ও ক্রমবিস্তারমান উগ্রবাদের কবল থেকে মুক্ত করতে হলে মুসলমানদের মধ্যে সঠিক ইসলাম স¤পর্কে জ্ঞান ও সচেতনতা বাড়াতে হবে, পাশাপাশি ঐক্য ও সংহতি মজবুত করে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। এ দু’টি বিষয়কে সামনে রেখেই ইসলামের মহান সাধক ও সংস্কারক মরহুম ইমাম খোমেইনী (র.) আজীবন কাজ করে গেছেন।
অতএব, এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তাঁর চিন্তা ও আদর্শ অনুসরণ করা হলে এ ক্ষেত্রে অনেক মূল্যবান দিক-নির্দেশনা লাভ করা সম্ভব হবে।
লেখক : মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক