বৃহস্পতিবার, ২৭শে জুন, ২০১৯ ইং, ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইমাম খোমেইনী (রহ.) ও ইসলামী সরকারের পররাষ্ট্রনীতি

পোস্ট হয়েছে: আগস্ট ৬, ২০১৩ 

news-image

ইমাম খোমেইনী (রহ.) ইরানের মুসলিম জাতিকে শুধু সম্মান, স্বাধীনতা, মুক্তি ও একটি ইসলামী সত্তাই দান করেননি; বরং জীবনদানকারী মতাদর্শ তথা ইসলামকে বর্তমান বিশ্বের সমস্যা সমাধানের একটি বিপ্লবী ও স্বাধীনতাদানকারী মতবাদ হিসাবে উপস্থাপন করেছেন।

এটা নিঃসন্দেহ যে, যদি ইসলামকে বর্তমান আদর্শিক শূন্যস্থান পূরণের পন্থা হিসাবে উল্লেখ করা হয়, যদি মুসলমানরা তাদের সকল শক্তি নিয়ে বৃহৎ শক্তিবর্গের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে এবং বিশ্বের মুসলিম জনতার নীরব সমুদ্র যদি গর্জন শুরু করে দেয় ও এর তরঙ্গমালা বিশ্ব দাম্ভিক শক্তির মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করে ইসলামের আলোকে ও ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর চিন্তাধারার পথ অনুযায়ী এ সকল কিছুই সম্ভব।

আজকে ইমামের অস্তিত্বের ফুল আর আমাদের মাঝে প্রস্ফুটিত হচ্ছে না, কিন্তু তাঁর চিন্তাধারার সুমিষ্ট ঘ্রাণ আমাদের জীবন, আমাদের সমাজ ও বিশ্বকে আমোদিত করছে।

এই নিবন্ধে আমরা ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সংক্ষেপে তুলে ধরব। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ইমামের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা নিয়ে যাতে প-িত ও গবেষকরা চিন্তাভাবনা শুরু করেন এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই এই ক্ষুদ্র নিবন্ধের অবতারণা। তিনি যদিও আজ আমাদের মাঝে বেঁচে নেই তবু তাঁর চিন্তাধারা ও কথা আমাদের পথ চলার নির্শেক হিসাবে কাজ করছে। ইসলামী ধারণার উপলব্ধির কাঠামোর মধ্যেই ইমামের দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে পররাষ্ট্র নীতির আদর্শ উপলব্ধি করা সম্ভব। তাঁর দৃষ্টিতে ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং তা জাতীয় স্বার্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যদি জাতীয় স্বার্থ হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে তা হলেও ইসলামী সরকারকে রক্ষণাবেক্ষণ করা অত্যাবশ্যক বলে ইমাম মনে করেন।

ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর দৃষ্টিতে পররাষ্ট্রনীতির অপরিবর্তনীয় আদর্শ হচ্ছে : পূর্ব নয়, পশ্চিম নয়, আধিপত্য ও অধীনতাকে অস্বীকার করা, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষণাবেক্ষণ, বিপ্লব রফতানি করা, বিশ্বের মুসলমান ও নির্যাতিতদের প্রতি সমর্থন দান, দাম্ভিক শক্তির মোকাবিলায় মুসলমানদের ঐক্য, আল-কুদস মুক্ত করা ও বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে (কয়েকটি বিশেষ দেশ ছাড়া) সম্পর্ক স্থাপন করা।

এগুলো হচ্ছে স্থায়ী ভিত্তি যেগুলোর উপর ইসলামী সরকারের পররাষ্ট্র নীতি গড়ে উঠবে। কয়েকটি বিষয় পরিবর্তনযোগ্য, যেমন কোন দেশ বা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে। কোন কোন সময় এ রকম ঘটে যে, একটি দেশ বা সংস্থা পরাশক্তির প্রতিনিধি হিসাবে এবং তাদের নীতি অনুসারে কাজ করে থাকে। উদহারণ হিসাবে আমরা মিসরের কথা উল্লেখ করতে পারি। অমর্যাদাকর ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইমাম খোমেইনী (রহ.) মিসরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেন। বায়তুল্লাহ শরীফের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করার জন্য সউদী সরকারের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়। পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে ইমামের দৃষ্টিভঙ্গি নিম্নরূপ :

পূর্ব নয়, পশ্চিম নয়

এটা স্বাভাবিক যে, কোন সরকার যখন তার জাতীয় সীমান্তের কাঠামোর মধ্যে শক্তিশালী হয় এবং বাইরের কোন রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত না হয় তাহলে সেই সরকারের পক্ষেই উপরে উল্লিখিত নীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এ জন্যই উপরোল্লিখিত কোন বিষয়ে বাইরের সঙ্গে যোগসূত্র থাকলে জাতীয় শাসনকার্যের স্থায়িত্ব হ্রাস পায়। অতীতে বৃহৎ শক্তি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিকসহ সকল ক্ষেত্রে আমাদের দেশের উপর আধিপত্য করেছে। দেশের ভিতরে সাবেক সরকারের কোন শক্তিশালী ভিত্তি ছিল না বলেই এটা হয়েছে। ইমাম এসব বিষয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন বলেই পূর্ব নয়, পশ্চিম নয়নীতির উপর ভিত্তি করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নীতিমালা গ্রহণ করেছিলেন।

ইমামের দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে এই নীতি পূর্ব ও পশ্চিম উভয় ব্লকের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিকসহ যে কোন ক্ষেত্রে যে কোন ধরনের সংযোগকে প্রত্যাখ্যান করে। এটা নিঃসন্দেহ যে, শুধু জোট নিরপেক্ষতার এই নীতি অনুসরণের মাধ্যমেই একটি দেশ স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে। পূর্ব নয়, পশ্চিম নয়এই কথা বলার মাধ্যমে সম্ভবত এমন একটি প্রশ্নের অবতারণা করা হতে পারে যার অর্থ হচ্ছে পূর্ব ও পশ্চিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা কিংবা এই কথা বলার মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিমের সঙ্গে যে কোন ধরনের সম্পর্ককে প্রত্যাখ্যান করা বুঝায়। এ প্রসঙ্গে ইমামের দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই করলে উপরোক্ত এই উভয় পন্থার চিন্তাধারাই বাতিল হয়ে যায়।

এই নীতি সম্পর্কে ইমাম খোমেইনী (রহ.) অনেক বক্তব্য রেখেছেন। এখানে সেসবের কয়েকটির উদ্ধৃতি দেয়া হলো :

আমরা বিদেশী সরকারসমূহের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করার দাবি করি না, আমরা চাই ইরান বিদেশী সরকারসমূহের বশ্যতা থেকে বেরিয়ে আসুক।

ইসলামের বিধান হচ্ছে, কেউ তোমার উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে না, তুমিও কাউকে তোমার উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে দিবে না। আমরা বলি, যুক্তরাষ্ট্রের একটি শক্তি হিসাবে থাকা উচিত নয় এবং রাশিয়া ও তার অন্যান্য মিত্রের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের টিকে থাকা ও স্থায়িত্ব পূর্ব নয়, পশ্চিম নয়নীতির উপর নির্ভরশীল। এই নীতি থেকে বিচ্যুতির অর্থই হবে ইসলাম ও মুসলমানদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। এই বিশ্বাসঘাতকতা দেশ এবং জাতির স্বাধীনতা ও মর্যাদা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

ইমাম বিশ্বাস করতেন, জাতি ঐক্যবদ্ধ হলেই কেবল এসব নীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বের সম্মুখে দাঁড়াতে পারি এবং বলতে পারি, আমরা পূর্ব কিংবা পশ্চিমের দিকে ঝুঁকে পড়ব না এবং সোজ পথ অনুসরণ করব যাতে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারি।

পবিত্র কুরআনের উপর ভিত্তি করেই এই নীতি গড়ে উঠেছে, যাতে মুসলমানদের উপর অবিশ্বাসীদের যে কোন রূপ আধিপত্যকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক

এ সম্পর্কে ইমাম বলেন, ‘আমরা এমন একটি দেশে বসবাস করতে চাই না, যে দেশটি বাইরের বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। আজকের বিশ্ব একটি নগরীর মতো। একটি নগরীর বিভিন্ন জনপদ থাকে এবং একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পর্কযুক্ত। এ রকম অবস্থায় বিশ্ব থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন থাকা উচিত নয়। যেসব দেশ আমাদের সঙ্গে আছে এবং যারা আমাদের জন্য ক্ষতিকর নয় সেসব দেশের সাথে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত। অবশ্য আমরা তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি না যারা আমাদের উপর নির্যাতন চালাতে চায়…।

আজকের বিশ্ব হচ্ছে পারস্পরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগের বিশ্ব। ইমামের দৃষ্টিভঙ্গিগত দিক থেকে বলা যায়, ইসলাম ও ইসলামী সমাজের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার সদ্ব্যবহার করা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে ব্যতিক্রমধর্মী বিষয় হবে তখনই যখন এ ধরনের সম্পর্ক কোন পরাশক্তির আধিপত্য ও অধীনতার দিকে নিয়ে যায় কিংবা বিপ্লবের স্বার্থ হুমকির সম্মুখীন হয়। কয়েকটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে অন্যদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। ইমামের দিক নির্দেশনায় আমরা বুঝতে পারি যে, মুসলিম ফিলিস্তিনীদের উপর বেআইনি ও জবর দখল প্রতিষ্ঠার জন্য ইসরাইলের সঙ্গে এবং বর্ণবৈষম্য নীতি অব্যাহত রাখার কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত নয়। একইভাবে আগ্রাসী নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইমামের বিপ্লবী আক্রমণের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়। ঐ দেশটি যদি তাদের আগ্রাসনমূলক নীতি পরিহার করে তা হলে আমরা তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি। এ ব্যাপারে ইমাম বলেন, ‘যতদিন পর্যন্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নির্যাতিত ও নির্যাতনকারী কিংবা শোষিত ও শোষকের সম্পর্কের অনুরূপ সম্পর্ক থাকবে ততদিন পর্যন্ত ঐ দেশটির সঙ্গে আমাদের কোনরূপ সম্পর্ক স্থাপন করা অসম্ভব।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষণাবেক্ষণ

ইমাম খোমেইনী (রহ.) বলেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। এটা অবশ্য কর্তব্য এবং ইসলামের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই এটা এতটা গুরুত্বপূর্ণ।তথাকথিত আমেরিকান ইসলাম ও এর উপাদানসমূহ প্রচারের জন্য পরাশক্তিগুলো যখন চেষ্টার কোন ত্রুটি করছে না সে সময় খাঁটি ইসলামের একটি কেন্দ্র ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি সমর্থন জানানো এবং সকল পন্থায় এর রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব সকল মুসলমানের উপর বর্তায়। নিম্নলিখিত দুই পন্থায় এই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব :

১.         ইরানকে একটি উন্নত দেশে রূপান্তরিত করা যাতে সকল প্রয়োজন নিজের থেকে মেটানো যায়। এটা নিঃসন্দেহে যে, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে অপরের উপর নির্ভরশীল কোন দেশ অন্যান্য দেশ ও আন্দোলনের জন্য একটি আদর্শ বা মডেলের ভূমিকা পালন করতে পারে না।

২.         বিপ্লবের জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বিশ্ব নিরাপত্তার প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী বিপদসমূহ হ্রাস কিংবা দূর করা।

বিপ্লব রফতানি

বিপ্লব রফতানির অর্থ হচ্ছে বিপ্লবের মহান মূল্যবোধসমূহ দেশের সীমান্তের বাইরে ছড়িয়ে দেয়া। ইসলামী বিপ্লবের ফলে জেগে ওঠা সারাবিশ্বের মুসলমানরা বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে তাদের আশা-আকাক্সক্ষা স্থাপন করেছে। সউদী শাসকবর্গ বিপুল অর্থ ব্যয়ে তথাকথিত আমেরিকান ইসলাম প্রচারের জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সুতরাং বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে শক্তিশালী ও পথনির্দেশ করা পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারক কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এবং এই পর্যায়ে বিপ্লব রফতানির মানেও খুঁজে পাওয়া যাবে। ইসলামী সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের হৃদয়বৃত্তি ও চিন্তাধারার উপর কাজ করা।

এ ধরনের উদ্দেশ্য যে সরকারের আছে সে সরকারে কাছে মূল্যবোধ রফতানি করার একটি বিশেষ অর্থ আছে। এটা নিঃসন্দেহে যে, ইমাম খোমেইনী (রহ.) বিপ্লব রফতানির মানে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ কিংবা সীমালঙ্ঘন করে অন্য রাষ্ট্রের ভিতরে অভিযান চালানোকে বুঝাননি, যদিও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রচার মাধ্যমসমূহ এর অর্থ বিকৃত করার চেষ্টা করেছে। এ সম্পর্কে ইমাম বলেন, ‘আমরা বলি যে, আমরা আমাদের বিপ্লব রফতানি করতে চাই, তবে সেটা আমরা তরবারির মাধ্যমে করতে চাই না, সেটা হবে প্রচার মাধ্যমে। ইসলামের বিরুদ্ধে কম্যুনিস্ট ও অন্যরা যে প্রচারণা চালাচ্ছে আমরা সঠিক প্রচারণার মাধ্যমে সেটাকে ভণ্ডুল করে দিতে চাই এবং আমরা বলতে চাই যে, ইসলামের মধ্যে কোন কিছুর ঘাটতি নেই। বিপ্লব রফতানি মানে সারাবিশ্বে পরাশক্তিবর্গের ঘাঁটিসমূহে বিপ্লবের চিন্তাধারা ও সংস্কৃতির আঘাত। আমরা উপসংহারে বলব, ইসলামী বিপ্লব শুধু ইরানের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং এই বিপ্লব বিশ্ব ইসলামী বিপ্লবের প্রারম্ভিক স্তর।

মুসলমান, নির্যাতিত ও বঞ্চিতদের প্রতি সমর্থন

ইমাম খোমেইনী (রহ.) প্রমাণ করেছেন, ভৌগোলিক নয়, আদর্শিক সীমানাই হচ্ছে প্রকৃত সীমানা। সারাবিশ্বের মুসলমান যে যেখানেই থাকুক না কেন, একই সমাজের সদস্য। এ সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমান ও তাদের দেশসমূহ রক্ষা করা জরুরি আর খোদায়ী লক্ষ্য অর্জন ও মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য আমাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।ইমামের সমর্থন শুধু নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সারাবিশ্বের সকল নির্যাতিত, শোষিত ও পরাধীন জাতির সংগ্রামের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা সকল পরাধীন দেশকে তাদের স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জনে সমর্থন দান করি। আমরা তাদের পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, তাদের অধিকার ফিরে পেতে হবে। আপনারা জেগে উঠুন এবং পরাশক্তিবর্গের হাত থেকে দুনিয়াকে মুক্ত করুন।

মুসলমানদের ঐক্য

মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং একে অন্যের থেকে পৃথক এভাবে নিজেদের চিন্তা করা অনুচিত। তাদের একথা ভাবা উচিত নয় যে, সীমান্ত তাদেরকে পৃথক করার একটি পন্থা। মুসলমানদের হৃদয় একত্র হলে তারা একটি বিরাট শক্তির অধিকারী হবে। মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হলে তাদের হৃদয়ও ঐক্যবদ্ধ হবে।

ইসলাম ও মুসলমানের শত্রুদের বিশ্বাস, মুসলিম জাতি ও সরকারগুলোর অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে তারা ইসলামী দেশগুলোর সম্পদ শোষণ, তাদের উপর আধিপত্য ও আগ্রাসন অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে। তারা মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির জন্য সব সময় সংকট তৈরির প্রচেষ্টা চালায় এই কারণে যে, এসব দেশ ও সরকারের মধ্যে যদি ঐক্য না থাকে তাহলে তারা স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তখন তাদের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে। এ ছাড়া ইসলামের শত্রুরা ইসলামী আন্দোলন মোকাবিলায় সব সময়ই একই ধরনের অবস্থান গ্রহণ করে। তাদের বিশ্বাস সংগ্রামরত সকল মুসলমান একই চিন্তাধারা ও একই বিপ্লবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।  তাদের কাছে ফিলিস্তিনী, লেবাননী, ইরানী, আফগান, কাশ্মীরী, শিয়া বা সুন্নীর মধ্যে কোন তফাৎ নেই। ইমাম সব সময় মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে, মুসলিম বিশ্বের মর্যাদা বাস্তব ঐক্যের উপরই নির্ভরশীল।

আল-কুদস মুক্তকরণ

ইসলামী আন্দোলনের প্রথম থেকেই ইমাম আল-কুদস প্রশ্নে খুবই সংবেদনশীল ছিলেন। ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, ইসলামী বিশ্বের ভূখণ্ডের উপর আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব অব্যাহত রাখা নির্যাতিত ফিলিস্তিনী মুসলমান ও ইসলামী সরকারসমূহের জন্য একটি অপমানজনক ব্যাপার। এই অমর্যাদা ও অপমান মোচন এবং মুসলমানদের গৌরব ও শক্তি ফুটিয়ে তোলার লক্ষ্যে ইমাম খোমেইনী (রহ.) রমজানের শেষ শুক্রবারকে কুদস দিবসহিসাবে ঘোষণা করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন সকল বিষয়ের চাবিকাঠি হচ্ছে ঐক্য। ইসরাইলকে মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে তিনি জোর দিয়ে কয়েকবার বলেছেন, ‘যদি মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হয় এবং প্রত্যেকে এক বালতি করে পানি ইসরাইলের দিকে ছুঁড়ে মারে তাহলে দেশটি তলিয়ে যাবে। কিন্তু তারা সেটা করতে পারছে না।

ইমাম খোমেইনী (রহ.) ইসরাইলকে সব সময়ই এ অঞ্চলের জন্য একটি দুষ্ট ক্ষতবলে বিবেচনা করতেন এবং তাঁর বিশ্বাস ছিল, ‘তারা আরো অগ্রসর হতে চায়, তারা মার্কিন নীতি অনুসরণ করছে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য শুধু একটি জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়।

উপসংহারে আমরা ইমামের রাজনৈতিক কৌশলের সারমর্ম একটি বাক্যে প্রকাশ করতে পারি এবং তা হচ্ছে আল্লাহর বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং আল্লাহর শত্রুদের সঙ্গে বৈরিতা।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর থেকে একটি মুহূর্তের জন্যও ভিতর ও বাইরের ইসলামবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র ও নাশকতা থেকে মুক্ত থাকেনি। বিপ্লবের ধ্বংস বা এর গতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে আমেরিকা এবং তার দোসররা বহুমুখী ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা অব্যাহত রাখে। কিন্তু আল্লাহ তাআলার অশেষ কৃপায় এবং ইমাম (রহ.)-এর সুচিন্তিত পদক্ষেপে ইসলামী বিপ্লব ও প্রজাতন্ত্র টিকে আছে।

১৯৮৯ সালে ৩ জুন, ইরানী সময় রাত দশটা কুড়ি মিনিটে হযরত ইমাম ইরানী জাতি ও সমগ্র ইসলামী উম্মাহকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে এ ধূলির ধরা ছেড়ে আলামে মালাকুতে পাড়ি দেন (ইন্ন লিল্লাহি ও ইন্না ইলাইহি রাজেউন)।

আজ ইমাম নেই, কিন্তু আছে তাঁর সংগ্রামী আদর্শ। আর সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে আছে লাখো কোটি ভক্ত-অনুসারী। ইমামের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা ইসলামী বিপ্লবকে ছড়িয়ে দিবে কাল থেকে কালান্তরে।

(নিউজলেটার, ফেব্রুয়ারি ১৯৯২)