মঙ্গলবার, ২০শে আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৫ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর ওফাত বার্ষিকী উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণে রাহ্বার

পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৬ 

আইএসআইএল-এর অপরাধ আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর পরিচালিত নৃশংসতার ন্যায় সমভাবে নিন্দনীয়
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ্ ‘উয্মা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী বলেন, আইএসআইএল ইরাক ও সিরিয়ার মুসলমানদের বিরুদ্ধে যেসব অপরাধমূলক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে তা আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নৃশংসতার ন্যায় সমভাবে নিন্দনীয়। তিনি গত ৪ঠা জুন (২০১৫) ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর ২৬তম ওফাত বার্ষিকী উপলক্ষে মরহুম নেতার মাযার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সর্বস্তরের জনগণের সমাবেশে প্রদত্ত ভাষণে এ কথা বলেন।
ইসলামী বিপ্লবের রাহ্বার হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী মরহুম ইমাম খোমেইনীর ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাধারাকে বিকৃত করার বা অ¯পষ্ট রাখার মারাত্মক বিপদ স¤পর্কে সকলকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, হযরত ইমামকে কেবল এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা ঠিক নয়; বরং হযরত ইমাম ছিলেন ইরানী জাতির এক মহা-আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক এবং একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক মতাদর্শের প্রতিষ্ঠাতা। ইরানী জাতি তাঁর এ আদর্শকে মেনে নিয়েছে। আর এ আদর্শের পথে চলা অব্যাহত রাখার জন্য মরহুম ভালোভাবে চেনা জরুরি।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বর্তমান রাহ্বার বলেন, হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর চিন্তাদর্শের প্রথম মূলনীতি হলো খাঁটি মুহাম্মাদী ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করা ও মার্কিন ইসলামকে নাকচ করে দেয়া। ইমামের মতে খাঁটি ইসলাম হলো কোরআন ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ্নির্ভর। এ ইসলাম যুগ ও স্থান স¤পর্কিত অভিজ্ঞতার আলোকে ¯পষ্ট ধারণার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষাকেন্দ্রগুলোয় সঠিক ‘ইল্মী পদ্ধতির মাধ্যমে পরিপূর্ণতা পেয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন ইসলামের কেবল দু’টি শাখা রয়েছে : একটি শাখা হলো সেক্যুলার বা ধর্মসম্পর্কহীন ইসলাম- যা সমাজকে ইসলাম থেকে পৃথক করে এবং অন্যটি হলো শুষ্ক-নির্দয় ইসলাম- যার ভিত্তি হলো গোঁড়ামি বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন চিন্তাধারা। ইমাম এ দু’টি শাখাকেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী বলেন, বর্তমান বিশ্বে সেক্যুলার ইসলাম ও শুষ্ক-নির্দয় ইসলামের (যেমন, আইএসআইএল ও তালেবান) অস্তিত্ব রয়েছে এবং আমেরিকাসহ বিশ্বের মোড়ল শক্তিগুলো এ ইসলামকে সমর্থন দিচ্ছে। ইসলামী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আরও বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান যেমন আইএসআইএল-এর অপরাধ ও নৃশংসতার বিরোধিতা করছে ঠিক তেমনি আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ওপর মার্কিন পুলিশের হিংস্র আচরণেরও নিন্দা করছে। একই সঙ্গে ইরান গাযায় যায়নবাদীদের যুলুম ও অবিচার এবং বাহরাইনে জনগণের ওপর দমন-পীড়ন ও ইয়েমেনে বোমা বর্ষণ তথা আগ্রাসনের নিন্দা করছে।
ইসলামী ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মতে, ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর চিন্তাদর্শের দ্বিতীয় মূলনীতিটি হলো আল্লাহ্ তা‘আলার ওয়াদার প্রতি দৃঢ় ঈমান পোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদী ও বলদর্পী শক্তিগুলোকে প্রত্যাখ্যান। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, এ নীতির ফলে হযরত ইমাম তাঁর বিপ্লবী অবস্থানে অবিচল ও দ্বিধাহীন ছিলেন। যদিও তিনি জানতেন যে, পরাশক্তিগুলো এর ফলে ক্রুদ্ধ হবে, কিন্তু তিনি খোদায়ী শক্তি ও খোদায়ী সাহায্যের ওপর ভরসা করতেন। মহান আল্লাহ কোরআন মজীদে মুমিনদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যারা আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য করবে তিনি তাদেরকে সাহায্য করবেন।
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, অন্যদিকে যারা আল্লাহর এ ওয়াদায় ঈমান রাখে না আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ দেন এবং তাদের স্থান জাহান্নামে হবে বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ্ তা‘আলা সূরা আল্-ফাত্হ্-এর ষষ্ঠ আয়াতে এরশাদ করেন: “তিনি মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী এবং অংশীবাদী পুরুষ ও অংশীবাদিনী নারীদেরকে শাস্তি দেনÑ যারা আল্লাহ স¤পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে। তাদের জন্য মন্দ পরিণাম। আল্লাহ তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাদেরকে অভিশপ্ত করেছেন। এবং তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন। তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল অত্যন্ত মন্দ।”
ইসলামী বিপ্লবের নেতা বলেন, ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেইনী (রহ্.) জনগণের শক্তির প্রতি আস্থাশীল ছিলেন এবং এ শক্তিকে ব্যাপক গুরুত্ব দিতেন; তিনি সরকারের হাতে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার বিরোধিতা করতেন। সেই দিনগুলোতে কোনো এক ভুল ধারণার ভিত্তিতে দেশের সমস্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সরকারের ওপর ন্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ইমাম এ বিষয়ে বার বার সতর্ক করেন।
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী বলেন, হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) অর্থনৈতিক, সামরিক, উন্নয়ন ও পুনর্গঠন এবং প্রচারের বিষয়ে ও এ সবকিছুরও ওপরে নির্বাচনসমূহের ব্যাপারে জনগণের ওপর আস্থাশীল ছিলেন। ইমাম খোমেইনী (রহ্.) দশ বছর ইরানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নেতা ও শাসক ছিলেন। এ দশ বছরে দেশটিতে ১০টি জাতীয়ভিত্তিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর এ থেকেই জনগণের প্রতি ইমামের গুরুত্ব দেয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। অথচ এ ১০ বছরের মধ্যে ৮ বছরই চাপিয়ে দেয়া এক অসম যুদ্ধে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে ইরানকে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে যাতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে এক দিনও দেরী করা না হয় সে জন্য তিনি খুবই তাকিদ করতেন। ফলে নির্বাচনগুলো যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হয়।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মতে, সামাজিক সুবিচারের প্রতি আস্থা, দুর্বল ও বঞ্চিতদের প্রতি সহায়তা এবং প্রাসাদতুল্য ভবনে থাকার ও বিলাসী জীবন যাপনের বিরোধিতা ছিল ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর আরেকটি মূলনীতি। ইমাম স্মরণ করিয়ে দিতেন যে, দরিদ্ররাই তাদের উপস্থিতির মাধ্যমে নানা অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছে এবং তারাই বিপ্লবে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। তারা হত-দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও বিপজ্জনক নানা ময়দানে উপস্থিত হয়েছে এবং দারিদ্রের বিষয়ে তারা প্রতিবাদও করছে না!

ইসলামী বিপ্লবের নেতা বলেন, বিশ্বের ওপর মোড়লিপনা করতে অভ্যস্ত দাম্ভিক শক্তিগুলোর বিরোধিতা করা ছিল ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর অন্যতম মূলনীতি। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, ইমাম দাম্ভিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সখ্য রাখতেন না এবং মার্কিন সরকারকে বড় শয়তান বলে উল্লেখ করা ছিল ইমামের অভিনব সৃষ্টিশীলতা। আপনি যখন কোনো প্রতিষ্ঠানকে শয়তান বলে মনে করবেন তখন আপনার আচরণ ও অনুভূতি তার প্রতি কেমন হবে তা ¯পষ্ট। ইমাম জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মার্কিন সরকারকে এমনই মনে করতেন ও তা উল্লেখও করতেন। বস্তুত সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিগুলোকে দাম্ভিক শক্তি বলে উল্লেখ করা এবং স্বীয় ইসলামী আন্দোলনকে দাম্ভিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই বলে উল্লেখ করাও ছিল ইমামের অনন্য সৃষ্টিশীলতা যার ভিত্তি ছিল কোরআন মজীদের বাণী।
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী বলেন, জাতির স্বাধীনতায় বিশ্বাস ও আধিপত্যকামিতার প্রতিরোধ ছিল ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর অন্যতম মূলনীতি। আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী এ প্রসঙ্গে বলেন, মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে যখন সম্মান দেখানো হচ্ছে তখন একটি দেশের তুলনায় একটি জাতির স্বাধীনতা বিজাতীয়দের ও বিরোধীদের মোকাবেলায় কেনো সম্মানিত হবে না?
ইসলামী বিপ্লবের নেতা বলেন, আল্লাহ তা‘আলা কোরআন মজীদে বলেছেন, ‘আল্লাহ কখনও ঈমানদারদের ওপর কাফেরদের কর্তৃত্বের পথ খোলা রাখেন নি।’ বস্তুত মুসলমানদের স্বাধীনতা নির্ভর করে কাফেরদের প্রতি আস্থা না রাখার মধ্যে এবং তাদের কর্তৃত্ব ও অভিভাবকত্ব মেনে না নেয়ার মধ্যে। কোরআনের দৃষ্টিতে কাফেরদের সঙ্গে মুসলমানদের এমন কোনো সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও অন্য যে কোনো চুক্তি করা অবৈধ যা তাদের ওপর কাফেরদের কর্তৃত্ব বা কাফেরদের প্রতি নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।
মরহুম ইমাম খোমেইনী সব সময়ই জাতীয় ঐক্য ও ইসলামী ঐক্যের ওপর জোর দিতেন। হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী এ প্রসঙ্গে বলেন, হযরত ইমাম এরই আলোকে শিয়া-সুন্নি মাযহাবগত বিভেদ বা জাতিগত বিভেদসহ বিভেদকামী যে কোনো বিষয়কে শত্রুদের নীতি বলে মনে করতেন এবং তিনি জাতীয় ঐক্যের ওপর নযিরবিহীন জোর দিতেন। মার্কিন সরকার যেসব সুন্নিকে সহায়তা দিচ্ছে ও যেসব শিয়াকে লন্ডন থেকে বিশ্বের নানা অঞ্চলে মদদ দেয়া হচ্ছে এ উভয় গোষ্ঠীই শয়তানের ভাই। তারা উভয়ই আমেরিকা, পাশ্চাত্য ও সাম্রাজ্যবাদীদের অনুচর।