শনিবার, ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

English

ইমাম খোমেইনী : এক অনন্য ব্যক্তিত্ব

পোস্ট হয়েছে: জুন ১৫, ২০২১ 

news-image

بسم الله الرحمان الرحیم

ثم الصّلاه و السّلام علی سیّدنا و نبیّنا محمد صلی الله علیه و آله اجمعین

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে বলেছেন :

و لقد کتبنا فی الزبورِ من بعد الذکر ان الارض یرثها عبادی الصالحون

অর্থাৎ আমি তাওরাতের পর যাবুরে লিখে দিয়েছি যেআমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দারা পৃথিবীর অধিকারী হবে।

প্রথমে আমি সম্মানিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গবিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবুদ্ধিজীবী ও সুধীমণ্ডলীর প্রতি সালাম ও শ্রদ্ধা নিবেদন করছিযাঁরা ইসলামের গৌরব-মাহাত্ম্যইরানের ইসলামি বিপ্লব ও এর সুযোগ্য নেতা ইমাম খোমেইনী (র.)-কে হৃদয়ে ধারণ করেন।

প্রিয় বন্ধুরা! ফারসি মাসের ১৩ই খোরদাদ মোতাবেক ৩রা জুন এক অনবদ্য আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদৃঢ় প্রত্যয়ী আরেফমুক্তিকামী মানুষের নেতাখোদাভীরু চিন্তাবিদ অর্থাৎ ইমাম খোমেইনী (র.)-এর মৃত্যুবার্ষিকী। আজ থেকে বত্রিশ বছর আগের এমন এক দিনে শতাব্দীর বৃহত্তম বিপ্লবের নেতা-যাঁর নাম প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দাম্ভিক শক্তিগুলোর মনে কম্পন সৃষ্টি করতো-মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে এই ইহধাম ত্যাগ করেন।  

একজন আদর্শবাদী জনপ্রিয় ইমামযিনি ছিলেন সদা জাগ্রত এক মহান নেতামুক্তি ও স্বাধীনতা এবং এই শতাব্দীতে ইসলামি বিশ্বের জাগরণের অগ্রদূততাঁর সম্পর্কে কিছু লেখা বা বলা সত্যিই খুব কঠিন। আমি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দুঃখভারাক্রান্ত মনে এই দিনটিকে স্মরণ করছি এবং এই দিন উপলক্ষে বাংলাদেশের মুসলিম ভাই-বোনদের উদ্দেশে কিছু কথা বলার প্রয়াস পাচ্ছি।

প্রিয় বন্ধুরা! মহান ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছেন তাঁদের স্মৃতি-আদর্শের কথা সাধারণত মানুষ বছরের বিশেষ কোনো দিনবিশেষ করে তাঁদের মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ করে থাকেন। কিন্তু ইমাম খোমেইনী (র.) ছিলেন নিজেই একটি ইতিহাস এবং কালোত্তীর্ণ ব্যক্তিত্ব।

তিনি এমন এক চরিত্র যা শাশ্বত ও চিরন্তন। সুতরাং মুক্তিকামী জাতিগুলোর চিন্তা-চেতনার জগতে ইমাম খোমেইনীর নাম সর্বদা জীবন্ত ও অম্লান হয়ে আছে। কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা মিখাইল গর্বাচেভও ইমাম খোমেইনীর দূরদর্শিতা ও চিন্তার সর্বজনীনতার কথা স্বীকার করেছেন।

ইমাম খোমেইনী (র.) ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষযিনি ধর্মদর্শননৈতিকতাইরফান এবং রাজনীতির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এমন এক রসায়ন তৈরি করেছিলেন যার স্বাদ মানুষ এর আগে কখনই পায়নি। ইমাম খোমেইনী ছিলেন তৎকালীন সময়ের অন্যতম অনন্য ব্যক্তিত্বযিনি বস্তুবাদ ও ধর্মবিদ্বেষের যুগে ধর্মের পুনর্জাগরণের পতাকা উড্ডয়ন করেছিলেন এবং বিশ্বব্যাপী এতটাই আলোড়ন তৈরি করেছিলেন যেএই শতাব্দীর সাথে তাঁর পবিত্র নামটিই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।

ইমাম খোমেইনী ছিলেন মুসলিম বিশ্বের এক অনন্য ব্যক্তিত্বযাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভাব কেবল ইরানের ভৌগোলিক গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ ছিল নাবরং তিনি ছিলেন গোটা মানবজাতি এবং মুসলিম বিশ্বের অমূল্য সম্পদ

সম্মানিত উপস্থিতি! এতে কোনো সন্দেহ নেই যেইরানের ইসলামি বিপ্লব বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিস্মরণীয় একটি ঘটনা। যেই বিপ্লব ইসলামের জন্য স্বর্ণযুগ বয়ে এনেছে এবং মুসলমানদের জন্য পরিণত হয়েছে অনুকরণীয় আদর্শে। এই বিপ্লব পথহারা মুসলমানদেরকে দিয়েছে পথের দিশাএভাবে এই বিপ্লব ঠাঁই করে নিয়েছে সত্যসন্ধানীদের হৃদয়ের গভীরে। বর্তমান প্রজন্মের যারা ইমাম খোমেইনীকে চিনতে বা বুঝতে সক্ষম হয় নি তাদের জন্য ইমাম খোমেইনীর উন্নত চিন্তাদর্শের সাথে পরিচিত হওয়া খুবই দরকার। ইমাম খোমেইনী (র.) ইসলামের যে শিক্ষা এবং ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা মুহাম্মাদি ইসলামের’ পূর্ণ রূপএটি অবশ্য অন্যান্য প্রচলিত ব্যাখ্যার চেয়ে পৃথক। তিনি বিমর্ষ ও মৃতপ্রায় ইসলামকে পুনরায় বিপ্লবী ইসলামে পরিণত করেন। এই মহান ও অলৌকিক কাজটি সাধন করা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাহায্য ও তাওফিক ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা! ইমাম খোমেইনী কে ছিলেনতিনি এমন একজন ব্যক্তি যিনি একটি নতুন বিশ্ব বিনির্মাণের বিষয়ে গভীরভাবে এবং নিবিড়ভাবে চিন্তা করেছিলেন। তিনি এমন এক ব্যক্তি যাঁর কর্ম ছিল নবীদের প্রয়াসেরই পুনরাবৃত্তি। যিনি ইবরাহীম (আ.)-এর মতো প্রতিমা (তাগুতিশক্তি) ভেঙ্গেছেনযিনি মসিহ রুহুল্লাহর উদ্যম নিয়ে উম্মতকে নতুন করে উজ্জীবিত করেছেন। যিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মতো আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ছিলেন সাথি-সঙ্গীদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সদয় ও স্নেহশীল। আর আল্লাহর দ্বীনের শত্রুদের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনমনীয় এবং অত্যন্ত কঠোর। তিনি এমন এক মহান ব্যক্তিত্ব যাঁর চিন্তা ও দিকনির্দেশনা শুধু তাঁর জীবদ্দশায় নয়বরং তাঁর মৃত্যুর পরও সমস্যার জট খুলতে সাহায্য করছে। যিনি ইমান ও ইখলাসের সাথে এবং অঙুলির ইশারায় বিশ্বের বড় একটি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও ধর্মীয়   মাদ্রাসার মধ্যে পুনর্মিলন ও প্রীতির সম্পর্ক  গড়তে সক্ষম হয়েছিলেনতিনি ছিলেন বিভিন্ন ধর্ম ও মাজহাবের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির পথিকৃৎ। তিনি সেই ব্যক্তি যিনি দর্শনশাস্ত্রের সাথে ইরফান ও নীতিশাস্ত্রেরও সম্মিলন ঘটিয়েছেন। তিনি ছিলেন জনহিতৈষী এবং মনে করতেন জনগণই সকল সম্পদের মালিক। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি জনগণকে নিজের স্বার্থে অপব্যবহার করেন নি। 

ইমাম খোমেইনী (র.)-এর বিপ্লবী চিন্তাদর্শ জীবন্ত ও অমর এবং তাঁর অনুপ্রেরণামূলক কথা ইরানের জনগণ ও বিশ্বের মুসলমানদের সতত অনুপ্রাণিত করে চলেছে। ইমাম খোমেইনী (র.)-এর জীবনাদর্শে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার খোরাক রয়েছে। বিশ্বের সব অঞ্চলের মুসলিম জাতিগুলো যদি এই আধ্যাত্মিক নেতার দিকনির্দেশনা গ্রহণ করে হাতে হাত রেখে ঐক্যবদ্ধ হয়তাহলে নিঃসন্দেহে তারা বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।

প্রিয় বুদ্ধিজীবিগণ! ইমাম খোমেইনী (র.)-এর কর্ম ও চিন্তাদর্শ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত মূল্যবান কাজতবে ইমাম খোমেইনীর মতাদর্শ গ্রন্থাগারে ফেলে রাখা গুরুত্ব বহন করতে পারে না।বর্তমান সময়ে ইমাম খোমেইনীর চিন্তাদর্শ সংরক্ষণ করা আমাদের বড় সাফল্যশত্রুরা যা বছরের পর বছর ধরে ব্যাহত করার চেষ্টা করেছে। ইমাম খোমেইনীর স্মরণসভাগুলো প্রকৃতপক্ষে এই আধ্যাত্মিক নেতার চিন্তাদর্শ ও আলোকিত পথনির্দেশনা সংরক্ষণের একটি উপায়। বর্তমান সময়ে মুসলিম যুবকদেরকে ইমাম খোমেইনীর জীবনাদর্শের সাথে পরিচিত করানো উচিত। ইসলামি বিপ্লবের ইশতেহার হিসেবে বিবেচিত ইমাম খোমেইনীর দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচিত হওয়া বর্তমান সময়ে বিশ্বের সকল বুদ্ধিজীবী ও আলেমের জন্য একটি অতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হতে পারে। ইমাম খোমেইনীর বহুমুখী ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানতে না পারলে ইসলামি বিপ্লবকে সঠিকভাবে বুঝা অসম্ভব। 

ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী যথার্থই বলেছেন, ‘ইমাম খোমেইনীর নাম ছাড়া এই বিপ্লবকে পৃথিবীর কোথাও কেউ চেনে না।

সবশেষে আমি বলতে চাইআমাদের এখন ফিরে যাওয়া দরকার ইমাম খোমেইনী (র.)-এর যুগে- যে যুগের পতাকাটি এখন উড়ছে স্বাধীনচেতাআধুনিক ইসলামি আইনবিদ (ফকিহ)নির্ভীক ও বিচক্ষণ নেতা হযরত আলী খামেনেয়ীর হাতে।

ইমাম খোমেইনী (র.) এবং মুক্তি সংগ্রাম ও ইসলামি বিপ্লবের মহান শহিদদের আত্মার উদ্দেশ্যে সালাম ও দরুদ পেশ করছি এবং ইমাম মাহদী (আ.)-এর আত্মপ্রকাশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে শেষ করছি।

[ইমাম খোমেইনী (র.)-এর ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গত ৩ জুন ২০২১ ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আয়োজিত ওয়েবিনারে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মহামান্য রাষ্ট্রদূত জনাব মোহাম্মদ রেজা নাফারের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য]