মঙ্গলবার, ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

English

ইমাম খোমেইনীর অনমনীয় উত্তরাধিকারে নিমগ্ন ইরান এখন বিশ্বব্যবস্থা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে

পোস্ট হয়েছে: জুন ৬, ২০২০ 

news-image

রাশিদ রিয়াজ: যে কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বলে দেয় দেশটি কতটুকু স্বাধীন, সার্বভৌম ও পরাশক্তিগুলোর লেজুরবৃত্তি করে কি না। কোনো দেশ ধন-সম্পদে প্রাচুর্যময় হতে পারে, কিন্তু স্বাধীন শাসনব্যবস্থা না থাকায় দুর্নীতির জগদ্দল পাথর চাপিয়ে শাসকরা বছরের পর বছর দেশগুলো শাসন করেন, উন্নয়নের নানা ফিরিস্তি তুলে ধরেন এবং এমনকি ভোটাধিকারের কোনো ধার না ধরে বাদশাহ, আমির বনে যান। ইরানে এধরনের শাসনব্যবস্থা টিকে ছিল আড়াই হাজার বছরের বেশি। আজ সেই ইরান পুরো বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে কিভাবে স্বাধীন ও সার্বভৌম হয়ে টিকে থাকতে হয়, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষানীতিতে কোনো ছাড় না দিয়ে জনগণের শাসন কায়েম করতে হয়।
আর এটা সম্ভব হয়েছে ইরানের মহান নেতা ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা, দিকনির্দেশনা ও ইরানি জাতিকে পথ বাৎলে দেয়ার কারণে। ইরানের শাসকরা গত চার দশক ধরে ইমামের দিকনির্দেশনা থেকে বিচ্যুত হননি। পৃথিবীর অনেক দেশ উন্নত ও শক্তিধর হওয়ার পরও তাদের মহান নেতার পথ অনুসরণ অব্যাহত রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় সেসব দেশ নতজানু রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ইরান এর ব্যতিক্রম বরং পরাশক্তি দেশগুলোর হুংকার তুচ্ছ করে কিভাবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, শক্তি অর্জন করতে হয়, এর এক অনন্য উদাহরণ।
ইরানের ইসলামি বিপ্লব চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগে কয়েক দশক ধরে এর বিনির্মাণে কাজ করে গেছেন দেশটির সুযোগ্য আলেমরা। তাঁরা আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানে শুধু সমৃদ্ধই ছিলেন না, বিভিন্ন দেশের শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, উত্থান পতনের কারণগুলো অতি সহজে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা রাখতেন। তাঁদের সুচিন্তিত মত ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্বে বিন্যস্ত হয়ে এমন এক মেধার স্ফূরণ সৃষ্টি হয়েছে যা থেকে উৎসারিত হয়ে আসছে দিকনির্দেশনার অপরাজেয় এক মর্মবাণী। ইরানের একজন নাগরিক যখন কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করেন, তা অর্থনীতি, রাজনীতি, ব্যবসা বা ধর্মীয় কোনো বিষয় থেকে শুরু করে আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক ইস্যু হোক না কেন, এব্যাপারে ইমাম খোমেইনী কী বলে গেছেন তা স্মরণ করেন। এটি মানব শরীরে বহমান রক্তধারার মতো। যতক্ষণ তা অবিচল থাকে ততক্ষণ সে জীবিত থাকে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ইমামকে অনুসরণ ইরানের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেই জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা কোনো কিছুতেই তাদেরকে ঘাটতিতে পড়তে হচ্ছে না। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে ১৯২২ সালে দর্শন ও অধ্যাত্মবাদের সাথে গতানুগতিক ধর্মীয় শিক্ষার নবতর বিন্যাস করে আয়াতুল্লাহ আব্দ আল করিম হায়েরী কোমের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড় করান।  
একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তথাকথিত এলিটরা বলে আসতেন ধর্মভিত্তিক জীবনই মুসলমানদের আধুনিক বিশ্বে পশ্চাৎপদতার কারণ এবং জাতীয়তাবাদ ও সার্বভৌম গণতন্ত্রের স্লোগানে ইউরোপীয় আদলে মুসলিম বিশ্ব খণ্ডবিখণ্ড করতে থাকেন এবং মুসলিম উম্মাহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মতপার্থক্য ও বিভ্রান্তির বেড়াজালে আটকে যায়, নিজেদের দুনিয়ায় পদ ও প্রতিষ্ঠায় মশগুল থাকা, পাশ্চাত্য পুঁজিবাদের হাতে মুসলিম উম্মার ভাগ্যকে তুলে দিয়ে মুক্তির আশায় দিন গুজরান করা শাসকদের ব্রতে পরিণত হয়।
এসব দেশের শাসক ও তাদের প্রভুরা ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে মুক্তি, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, প্রতিনিধিত্বশীল সরকার, ন্যায়বিচার, বাকস্বাধীনতা, সমঅধিকারের মতো বিভিন্ন মুখরোচক শব্দ ব্যবহার করে। এরপর বিশ্বায়ন, মুক্ত বাজার অর্থনীতি, লিঙ্গ বৈষম্য, বর্ণ বৈষম্য, টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার ইত্যাকার শব্দের ঘাটতি হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতি যে তিমিরে সেখানেই রয়ে গেছে তা মুসলিম দেশগুলোর দিকে তাকালে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। উপরন্তু ইসলামফোবিয়া ছড়িয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৈরি করে লিবিয়া, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস দমনের প্রচেষ্টা শুরু হয়। এসব সন্ত্রাসীর কাছে কোত্থেকে এমন অস্ত্র আসে যা সাধারণ সন্ত্রাসী তো নয়ই, রীতিমত কোনো দেশের সেনাবাহিনী ব্যবহার করে তা সরবরাহ করা হয়। এর পাশাপাশি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রস্তুতি পর্ব, আন্দোলন, প্রতিরোধ পর্ব, অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম এক নতুন দিগন্তের সৃষ্টি করে।
সকলেই জানেন এজন্যে ইরানের আলেম সমাজকে বিপ্লবের আগে ও পরে নিরন্তর সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। ইমামের পিতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুস্তফা খোমেইন শহরে জমিদার খানরা জনগণের ওপর যে নির্যাতন চাপিয়ে দেন তার প্রতিবাদ করায় খান বাহিনীর হাতে খোমেইন-আরাক সড়কে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। ১৯৬৩ সালের জুনে ইমাম খোমেইনীর ডাকে ইরানের আলেম সমাজ ঐক্যবদ্ধ হলে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং মাত্র কয়েক দিনে শাহের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর গুলিতে ১৫শ’ মানুষ প্রাণ হারায়। ১৯৭৭ সালে ইমামের জ্যেষ্ঠপুত্র মুস্তাফা খোমেইনী সাভাক বাহিনীর হাতে শহীদ হন। বিপ্লব উত্তর যেমন শাহের গোয়েন্দাদের হাতে গুম, খুন, হত্যা নির্বিচারে নেমে এসেছে তেমনি বিপ্লবের পরও তা বরং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে অসংখ্য তরুণকে প্রাণ দিতে হয়েছে অকাতরে। পারমাণবিক গবেষণা যা শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্যে শুরু করে ইরানের তরুণ বিজ্ঞানীরা, তাঁরাও ঘাতকদের হাত থেকে নিস্তার পাননি। শাহাদাতের পেয়ালা গ্রহণের সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছেন কাসেম সোলায়মানি।
আজ যখন কৃষ্ণাঙ্গদের নির্যাতনে মার্কিন ইতিহাসের নিন্দা জানান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনেয়ী তখন বিশ্বের অনেক দেশ ও অনেকে বিস্ময় বোধ করেন। কিন্তু তাঁরা খেয়াল করলে দেখতে পারেন পুলিশের নির্যাতনে নিহত কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের স্মরণ সভায় ন্যাশনাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের প্রেসিডেন্ট আল শার্পটন কী বলেছেন। তিনি বলেছেন, আমেরিকা মহান কাদের জন্যে, তা অবশ্যই কৃষ্ণাঙ্গ বা ল্যাটিনদের জন্যে নয়, নারীদের জন্যেও নয়। শার্পটন বলেন, সময়ের পরিবর্তনে কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ তরুণ তরুণীরা বিক্ষোভে যোগ দিচ্ছে। বর্ণবাদের মতো উদ্বেগজনক তিরস্কার ৪শ’ বছর ধরে চলছে বলেই আমরা আমাদের ঘাড় থেকে চেপে বসা হাঁটু সরাতে বলতে পারছি না।
শার্পটন বলেন, মার্কিন জীবন যাত্রায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে ফ্লয়েডের সঙ্গে যা ঘটেছে, কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে তাই ঘটছে। আমাদের যে মানের স্কুলে শিক্ষার সুযোগ দেয়া হয়েছে তার চেয়ে আমরা বেশি স্মার্ট ছিলাম, কর্পোরেশন চালাতে পারি, যে কোনো কাজে সৃজনশীলতা দেখাতে পারি, কিন্তু আমাদের ঘাড়ে আপনারা চেপে বসে আছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেন্ট জন্স চার্চে গিয়ে বাইবেল হাতে নিয়ে হুংকার দেন আমেরিকা সর্বশ্রেষ্ঠ দেশ। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেন বরং তাঁকে বাইবেল খুলে মানুষকে ভালোবাসার বাণী পড়তে বলেছেন। এই দেশ কিনা এখন নিজের জনগণের বিরুদ্ধে সেনা নামিয়েছে! ইরান সেই ভিন্ন ইসলামি সংস্কৃতি ও বিপ্লবের মহান আদর্শের অনুসরণ করছে যা ইমাম খোমেইনী তাদের জন্যে অসিয়ত হিসেবে রেখে গেছেন। এজন্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আমেরিকার বর্ণবৈষম্যের কালো দিক উন্মোচিত করতে পিছপা হননি।
ইরানের ওপর অবরোধ আর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বিশ্বে তাকে এক ঘরে করে রাখার মার্কিন ও ইসরায়েলিদের সুগভীর ষড়যন্ত্র কোনো কাজে আসছে না। কিছুদিন আগে লুক্সেমবার্গে যুক্তরাষ্ট্রের আটকে রাখা ইরানের ১.৬ বিলিয়ন অর্থ মুক্ত করতে সমর্থ হন আইনজীবীরা। ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র একতরফা সরে গেলেও অন্যান্য দেশ ইরানের পাশেই রয়েছে। ইরানিদের ধৈর্য, মেধাদীপ্ত দূরদর্শিতার কারণে দেশটির পররাষ্ট্রনীতি সফলজনকভাবে ইউরোপ, আফ্রিকা, চীন, রাশিয়া, লাতিন আমেরিকার দেশ ছাড়াও ভারত, জাপানসহ অনেক দেশের সঙ্গে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যিক লেনদেনকে সফল করেছে। পণ্য বিনিময়ে মাধ্যমেও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে অনেক দেশ। ভেনেজুয়েলায় ৫টি ইরানি ট্যাংকার গিয়ে পৌঁছেছে। বরং সৌদি আরব থেকে সম্প্রতি পেন্টাগনের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেয়া মার্কিন নীতি আর মেনে নেবে কি না। ইরানের তেল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা মধ্যপ্রাচ্যের ভূকৌশলগত রাজনীতিতে প্রশ্ন তুলেছে অন্যকোনো দেশের ওপর যদি এধরনের অন্যায় চেয়ে বসে তখন কী হবে?
একই সঙ্গে ইরান কাতারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে অহেতুক সৌদি সমর্থিত আমিরাত, মিসর ও বাহরাইনের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে। মজলুম কিংবা মজলুম রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানো, প্রতিরোধ গড়ে তোলার যে মহান শিক্ষা ইমাম খোমেইনী দিয়ে গেছেন তা অনুসরণ করেই ইরান কাতারে খাদ্য সাহায্য পাঠিয়েছে। সিরিয়া সরকারের ডাকে সাড়া দিয়ে ইসরায়েল ও মার্কিনি জবরদখলকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। ইরাকের পুনর্গঠনে সাহায্য করছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ ও হামাস ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
ইরান অব্যাহতভাবে তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ মোকাবেলা করেছে সফল কূটনীতির সাথে। জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেন সহ ইউরোপের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক যাতে বৃদ্ধি না পায় সে জন্যে যুক্তরাষ্ট্র কম চেষ্টা করেনি, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। ইরানের ওপর সামরিক আগ্রাসন চালানোর মার্কিনি খোয়াবকে কখনোই পাত্তা দেয়নি এসব দেশ। এটা সম্ভব হয়েছে ইরানের আন্তর্জাতিক প্রভাব ও শক্তিশালী মনোভাবসম্পন্ন জাতি হিসেবে অবস্থানের কারণে। যখনই কোনো যড়যন্ত্র ডানা মেলেছে তখনই ইরানিরা ঐক্যবদ্ধভাবে তা মোকাবেলা করে আসছে। এর কারণ হচ্ছে ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও গভীর সংস্কৃতির আবাসস্থল এবং স্পষ্টতই এই সংস্কৃতি ইরানিদের সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্তগুলোতে বাঁচতে সহায়তা করে। ইমাম খোমেইনি সেখানে তাদের কাছে অবিসংবাদিত নেতা, বেঁচে থাকার প্রেরণা।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের ভূখণ্ডের পানিসীমার ঠিক পাশেই কেবল ঘোরাফেরা করে। একটি ভুল, একটি মিথ্যা পদক্ষেপে যুদ্ধ শুরু হলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে আশেপাশের দেশগুলোর তেল রফতানি বন্ধ হয়ে যাবে। ইরান একটি গর্বিত জাতি এবং এটি তার স্বাধীনতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে একের পর এক ভয়ংকর আঘাত এসেছে, কিন্তু ইরান কখনো নতজানু হয়নি। কখনো আন্তর্জাতিকতাবাদকে বিসর্জন দেয়নি।
কেউ লক্ষ্য করলে দেখবেন ইউএনডিপির মানব উন্নয়ন সূচকে বিশ্বে ইরান চতুর্থ স্থানে রয়েছে। এধরনের একাধিক আন্তর্জাতিক সূচক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান, খেলাধুলা কোনো কিছুতেই ইরান পিছিয়ে নেই; বরং শীর্ষে অবস্থান করছে। নিষেধাজ্ঞার পর অবরোধ আর ধারাবাহিক সামরিক আগ্রাসনের হুমকিকে ইরান তোয়াক্কা করে না বলেই কৃষি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, উদ্ভাবন, নিত্য নতুন আবিষ্কার সম্ভব হচ্ছে। ইরান সফরে গেলে দেখা যায় অভূতপূর্ব জনসমাবেশ, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনির্মাণ, চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, আরামদায়ক ট্রেন, আতিথেয়তা, শিক্ষিত ও গর্বিত গণমানুষের উপস্থিতি এসব কিভাবে সম্ভব হচ্ছে? ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থায় আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ইরানের আলেম, রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ এমনভাবে অনুসরণ করছেন যা ইমাম খোমেইনী তাঁদের শিখিয়ে গেছেন। আদতেই ইরান এক আন্তর্জাতিক দেশ। এটি কিউবা বা ভেনেজুয়েলা নয় যারা দীর্ঘদিন মিত্র ছিল। বলিভিয়ার সঙ্গে রয়েছে ইরানের সহযোগিতা আর বন্ধুত্ব। এসব দেশে তেল প্রযুক্তি কিংবা সামাজিক আবাসন নির্মাণে দীর্ঘদিন ধরে সহায়তা করে আসছে ইরান। যে ইরাকে মার্কিনিরা স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে সেখানে নির্বাচনকে সম্ভব করে পুনর্গঠনে সাহায্য করছে ইরান। এটা প্রমাণিত যে, নিজে আক্রান্ত হয়েও অন্যের পাশে দাঁড়ায় ইরান। ইরাক যুদ্ধে হাজার হাজার ইরানি নারী তাঁদের স্বামীদের শাহাদাত অর্জন অকাতরে মেনে নিয়েছেন।
ল্যাতিন আমেরিকা কিংবা সিরিয়ায় ইরান রয়েছে মজলুমদের পাশেই। হিজবুল্লাহর প্রবল গণভিত্তি না থাকলে সে লেবানন বা সিরিয়ায় টিকে থাকতে পারত না। বৈরুতের প্রিন্সরা যখন প্যারিস, নিসের নাইটক্লাবগুলোতে টাকা উড়ায় তখন সেখানকার মজলুমের পাশে দাঁড়িয়েছে হিজবুল্লাহ- তা সে শিয়া হোক, সুন্নি হোক কিংবা খ্রিস্টান বা নাস্তিক হোক। ফিলিস্তিনের দিকে তাকালে দেখতে পাই উপসাগরীয় দেশগুলো শুধু কথা বলছে বছরের পর বছর। কিন্তু ইরান ও সিরিয়া ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করছে। আফগানিস্তানের হেরাত প্রদেশে ইরানি কনসুলেটের সামনে প্রচুর আফগানের ভিড় লেগে থাকে। তারা ন্যাটোর দখলে থেকে বিপর্যস্ত। এশিয়ায় সবচেয়ে কম মানব উন্নয়ন সূচক এ দেশটির। ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের হিসেব দেখা গেলেও হেরাতের এইসব লাখো মানুষ ইরানে কাজের খোঁজে ছুটে যায়। এছাড়া তাদের বিকল্প কোনো রাস্তাও নেই। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরান এখন আফগানিস্তানে কিভাবে শান্তি ফিরিয়ে আনা যায় সেই লক্ষ্যে কাজ করছে।
পশ্চিমারা চেষ্টা করে দেখতে পারে, কিন্তু ইরান ভেঙ্গে যাওয়ার জিনিস নয়। করোনাভাইরাস মোকাবেলা কিংবা মহাকাশ গবেষণা কোথাও ইরান থেমে নেই। দুর্ভাগ্য যে, বিশ্ববাসীর পশ্চিমা মিডিয়ার অন্ধত্বের কারণে ইরানের এই স্বাধীনচেতা মনোভাব অনেকে অনুধাবন করতে পারে না আর তাদের কাছে ইরান হয়ে ওঠে এক নব্য হুমকি!
ইমাম খোমেইনীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কী করে তিনি তাঁর বিপ্লবকে সফল করলেন। উত্তর তিনি বলেছিলেন, ‘মহান আল্লাহর নির্দেশেই তা সফল হয়েছে, আমার চেষ্টায় নয়।’ ধর্মের বিশ্বাস প্রথাগত ধর্মীয় আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ধর্মীয় বিশ্বাসটি যখন বিশুদ্ধ চিত্ত থেকে জাগে তখন তা সকল সর্বনাশকে বিনষ্ট করে মানুষকে সম্মানের সিংহাসনে বসায়। মানুষ তখন আল্লাহর প্রতিনিধি হয় এবং আল্লাহর সহায়তায় রাষ্ট্রীয় জীবনে, সামাজিক জীবনে এবং সাংস্কৃতিক জীবনে সফলতার প্রতিষ্ঠা ঘটায়। ইমাম খোমেইনী তাঁর বিশ্বাসের দ্বারা, ত্যাগ ও বিনয়ের দ্বারা এবং আল্লাহর উপর অকুণ্ঠ নির্ভরতার দ্বারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
ইমামের ইন্তেকালের পর ১৩ জুন ’৮৯ সালে যেদিন তাঁর পুত্র হুজ্জাতুল ইসলাম আহমদ খোমেইনী তাঁর পিতার স্বহস্তে লিখিত কবিতা ‘হে প্রিয়তম সুহৃদ আমার’ আধ্যাত্মিক কবিতা প্রকাশ করলেন, দেখা গেল তা ছিল আশিক-এ দিওয়ানা পরম প্রিয় আল্লাহতালার দীদার লাভের অস্থির কামনা।