মঙ্গলবার, ২২শে জানুয়ারি, ২০১৯ ইং, ৯ই মাঘ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

English

ইবনে সীনা ও তাঁর জ্ঞান-মঞ্জুষা

পোস্ট হয়েছে: নভেম্বর ১৪, ২০১৬ 

ড. তারিক সিরাজী*
বিশ্ববিশ্রুত মনীষী হুসাইন বিন আবদুল্লাহ বিন হাসান বিন আলি ইবনে সীনা ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে বুখারার অন্তর্গত আফ্সানা নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ও মাতা সেতারা বিবি উভয়েই ছিলেন ইরানী। তাঁর পিতা সামানি রাজবংশের অধীন বুখারার একজন শাসনকর্তা ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি বুখারা ত্যাগ করেন এবং প্রথমে কিছুকাল গুরগান এরপর যথাক্রমে কাযভিন, হামেদান ও ইস্ফাহানে বসবাস করেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে শেইখুর রাইস (প্রধান প্রাজ্ঞনেতা), হুজ্জাতুল হক (সত্যের দলিল), শারফুল মুল্ক (রাজ্যের মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি) ও ইমামুল হুকামা (মনীষীদের নেতা) প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত করা হয়ে থাকে। পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীদের নিকট তিনি আভিসীনা (আরপবহহধ) নামে অধিক পরিচিত। তিনি ১০৩৭ খ্রিস্টাব্দে ৫৭ বছর বয়সে হামেদান শহরের নিকটবর্তী এলাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
ইবনে সীনাকে বেশিরভাগ লোকই চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিসাবে জানেন। কিন্তু তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান ছাড়াও পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, জ্যামিতি, গণিত ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে সমান পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন এবং এসকল বিষয়কে ঘিরে তিনি শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর চিন্তা-দর্শনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল অ্যারিস্টটলীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও ইসলাম ধর্মশাস্ত্রীয় চিন্তা-দর্শনÑ যার সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল একটি মতবাদ। এ মতবাদ মূলত ইসলামী চিন্তাধারার আলোকে প্রকাশিত হয়েছিল। যে কারণে ইবনে সীনার গভীর চিন্তা-দর্শনের প্রতি আমরা সহজেই মোহাবিষ্ট হয়ে থাকি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এই যে, ইবনে সীনা হিকমাতে মাশ্শায়ী মতবাদ তথা অ্যারিস্টটলীয় মতবাদকে সুসংবদ্ধ করে তাঁর চিন্তাধারায় আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের মধ্যকার শূন্যতাকে বৈজ্ঞানিক ধারণাশক্তি দিয়ে পূরণ করেন। ইবনে সীনা মুসলিম বিশ্বে অ্যারিস্টটলীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিভিত্তিক মতবাদের প্রবর্তক আল-কিন্দি (মৃ. ৮৬৬ খ্রি.) এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত আবু নাস্র আল-ফারাবি (৮৭২-৯৫০ খ্রি.)-এর ন্যায় দার্শনিকগণের মতবাদের ব্যাখ্যাতাই ছিলেন না; বরং গ্রীসের সকল চিন্তা-দর্শনকে নিজস্ব জ্ঞানের আলোকে সুশৃঙ্খল ও সুবিন্যস্ত করে দর্শনশাস্ত্রের পাঠকদের সামনে তা তুলে ধরেন। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক হিট্টির ভাষায় বলা যায় যে, ধর্মশাস্ত্রীয় মতবাদের (ইলমুল কালাম) সাথে অ্যারিস্টটলীয় (হেকমতে মাশ্শায়ী) বা গ্রীক দর্শনের সাযুজ্য বিধানের যে সূচনা আল-কিন্দি করেছিলেন, ইবনে সীনা দক্ষতার সাথে তা উচ্চমার্গে নিয়ে যান। তবে তিনি অ্যারিস্টটলকে অন্ধভাবে অনুসরণ করেননি; বরং তাঁর উদ্ভাবিত নতুন ধারাগুলোকে প্রকাশ করতে গিয়ে অ্যারিস্টটলীয় মতবাদের অস্পষ্ট দিকগুলো প্লেটোনিক ও নিউপ্লেটোনিক চিন্তাধারার উপাদানের সহায়তায় প্রকাশ করেন- যা একটি নতুন দার্শনিক রীতি হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। অতএব, ইবনে সীনাকে হেকমাতে মাশ্শায়ীর সাথে ইসলামী ভাবধারার মিলনকারী ভাষ্যকার হিসাবে গণ্য করা যায়। তিনি ছিলেন জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধিসঞ্জাত একত্ববাদে বিশ্বাসী মুসলমান। উদাহরণ হিসাবে তাঁর একটি প্রসিদ্ধ মতবাদের উল্লেখ করা যেতে পারেÑ
‘প্রত্যেকটি বস্তুর হাকীকত তার সত্তার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত। এ কারণে চূড়ান্ত বিবেচনায় কোনো কিছুকে জানা মানে তার সত্তাকে এবং সাধারণভাবে অস্তিত্বলোকে তার অবস্থানকে জানা, আর তার এই অবস্থানই তার গুণ-বৈশিষ্ট্যসমূহ ও ধরন-ধারণ নির্ধারণ করে। সমগ্র বিশ্বলোকে যে সকল জিনিস আছে, যেহেতু আছে সেহেতু সেগুলো অস্তিত্বশীল। কিন্তু বস্তুগত অর্থে শূন্যতা বা নিরঙ্কুশ অস্তিত্ব, যা সমস্ত কিছুর সূচনাস্থল তথা ¯্রষ্টা। এ কারণে সত্তার মূল সুর বা তাঁর গুণাবলি কোনো কিছুর বিচারেই সেই নিরঙ্কুশ অস্তিত্বের সাথে ধারাবাহিকতার দ্বারা যুক্ত নন; বরং আল্লাহ তাআলা এ বিশ্বজগতের তুলনায় অগ্রবর্তী অর্থাৎ যখন এ বিশ্বজগৎ ছিল না তখনো তিনি ছিলেন এবং এদের তুলনায় তিনি সব সময়ই সমুন্নত।’
ইবনে সীনার দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিষয়াবলির প্রতি আলোকপাত করা যেতে পারেÑ যা ধারণ করেই তাঁর মতবাদ আবর্তিত হয়েছে। এ মতবাদগুলোর বেশিরভাগই গ্রীক দার্শনিকদের কাছ থেকে গৃহীত হয়েছে এবং এগুলো ইসলামী চিন্তাধারার আলোকে প্রকাশিত হয়েছে। ইবনে সীনার চিন্তা-দর্শনের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি হচ্ছে :
১. অস্তিত্বের স্বরূপবিষয়ক সুনির্দিষ্ট তত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্ব।
২. প্রকৃতি ও অস্তিত্বের মধ্যে পার্থক্য।
৩. সৃষ্টিজগতের স্তরসমূহ এবং মূল সত্তা ও তার সংঘটিত হওয়ার বিষয়ে আলোচনা।
৪. অপরিহার্য ও সম্ভব।
৫. ইল্মে ওয়াজেবুল ওয়াজুদ (অপরিহার্য সত্তা তথা আল্লাহ তাআলা সম্বন্ধীয় জ্ঞান)।
৬. ফেইয ওয়া সুদুর তথা অনুগ্রহ ও উদ্ভব মতবাদ।
৭. মারেফাত (আল্লাহ পরিচিতি) সম্পর্কিত মতবাদ।
৮. মাআদ (পারলৌকিক জীবন) সম্পর্কিত মতবাদ।
৯. উকূল (বিবেকসমূহ) সম্পর্কিত মতবাদ।
ইবনে সীনার রচনাসমগ্র ছিল বিশাল ও বিক্ষিপ্ত। পিতামাতা ইরানী হওয়ার ফলে তাঁর মাতৃভাষা ছিল ফারসি। কিন্তু তিনি আরবি ভাষাকে তাঁর চিন্তাধারা প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। ফলে, তিনি তাঁর অধিকাংশ গ্রন্থই আরবি ভাষায় রচনা করেছেন। তাঁর রচিত বহু পাণ্ডুলিপি তাঁর জীবদ্দশাতেই হারিয়ে গেছে। বর্তমানে তাঁর যে রচনাসমগ্র বিদ্যমান তাও অপূর্ণাঙ্গ ও অপ্রতুল। ইবনে সীনা রচিত গ্রন্থগুলোকে মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।
প্রথম ভাগেই রয়েছে তাঁর দর্শনশাস্ত্রীয় গ্রন্থসমূহ :
১. ফারসি ভাষায় রচিত প্রথম দর্শন বিষয়ক গ্রন্থ দানেশ নামে আলায়ি।
২. নাজাত (মুক্তি)-এটি তাঁর রচিত শেফা গ্রন্থের সংক্ষিপ্তসার।
৩. অয়ুনুল হিক্মা (জ্ঞানের ঝর্না)
৪. কিতাবে শেফা
৫. আল-ইশারাত ওয়াত্ তাম্বিহাত (নির্দেশিকা ও মন্তব্যবিষয়ক গ্রন্থ)
৬. এছাড়াও যুক্তিবিদ্যা, মনোবিজ্ঞান, বিশ্বতত্ত্ব ও অধিবিদ্যা সম্পর্কে তাঁর আরো বহু গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে।
দ্বিতীয় ভাগে যেসকল গ্রন্থ রয়েছে তা মূলত প্রকৃতিবিজ্ঞান নিয়ে রচিত।
১. চিকিৎসাবিজ্ঞানের খ্যাতনামা গ্রন্থ কানুন ফিত্ তিব্। কানুন গ্রন্থে তাঁর সমসাময়িক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সকল বিষয়ের তথ্যাবলি বিধৃত হয়েছে। এটি হলো একটি বিশাল গ্রন্থ যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল। বইটি বিভিন্ন ভাষায়, যেমন ল্যাটিন, ইংরেজি, হিব্রু ইত্যাদি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এটি ইউরোপীয় মেডিকেল কলেজগুলোতে পুরোদমে পড়ানো হয়। এটি পাঁচ খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ডে রয়েছে মানুষের দেহ, রোগ, সুস্থতা, সামগ্রীক ও সর্বজনীন চিকিৎসা সম্পর্কে মৌলিক নীতিমালা ও চিকিৎসাবিদ্যা (ঞযবৎধঢ়বঁঃরপং) সম্পর্কে আলোচনা। দ্বিতীয় খণ্ডে রয়েছে আরোগ্যদায়ক ওষুধপত্র ও ভেষজবিদ্যা (চযধৎসধপড়ষড়মু)। গ্রন্থের একটি অংশে ওষুধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা রয়েছে। তৃতীয় খণ্ডে হচ্ছে প্যাথলজি (চধঃযড়ষড়মু) সম্পর্কিত যা দেহের অঙ্গ বা তন্ত্রীর (ঙৎমধহ ধহফ ংুংঃবসং) সাহায্যে পরীক্ষিত হয়। চতুর্থ খণ্ড বিভিন্ন রকম জ্বর সম্পর্কিত আলোচনা দিয়ে শুরু হয়েছে। এরপর রোগের লক্ষণ, রোগ চিহ্নিতকরণ, রোগ সম্পর্কে আগাম সংবাদ দান, ছোটখাট অস্ত্রোপচার, ফোঁড়া, ক্ষত, কাটাছেঁড়া ও নানা রকম বিষ সম্পর্কিত আলোচনা রয়েছে। পঞ্চম খণ্ডে বিভিন্ন রকম ওষুধ প্রস্তুত প্রণালি (চযধৎসধপড়ঢ়ড়বরধ) সম্পর্কে বিশদ আলোচনা স্থান পেয়েছে।
২. আল্ উরজুযাহ ফিত্ তিব্ নামক চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ।
৩. বিশ্বজগতের অস্তিত্বের প্রকৃতি দর্শনের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি নিয়ে রচিত আশ্ শেফা গ্রন্থ। মূলত বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় ও অধিবিদ্যা তথা গবঃধ-চযুংরপং দর্শন নিয়ে রচিত হয়েছে। এটি দর্শনশাস্ত্রের অমূল্য গ্রন্থ। গ্রন্থটি ২০ খণ্ডে বিভক্ত। এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রাণীতত্ত্ব, উদ্ভিদতত্ত্বসহ যাবতীয় বিষয়।
তৃতীয় ভাগে রয়েছে তাঁর রচিত রহস্যপূর্ণ ও বাতেনি (আধ্যাত্মিক) রচনাসমূহ- যা তাঁর জীবনের শেষ দিকে রচিত হয়েছে।
১. রেসালেয়ে হাই বিন ইয়াক্যান (সতর্ক জগতের জীবন্ত পুত্র) শীর্ষক পুস্তিকা।
২. রেসালাতুত্ তায়ের (পাখি সম্বন্ধীয় প্রবন্ধ)।
৩. সালমান ও আবসাল
৪. ‘মানতেকুল মাশরেকিন’ শিরোনামে ইশারাত গ্রন্থের শেষ তিনটি অধ্যায়।
৫. ‘আল-কাসিদাতুল আইনিয়্যাহ’ শীর্ষক আত্মা সম্পর্কিত কবিতাগুচ্ছ।
৬. কুরআনে কারিমের সূরাগুলোর সংক্ষিপ্ত তাফসীর।
ইবনে সীনার রচনাবলি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাকর্ম রচিত হয়েছে এবং এর ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া তাঁর রচনাসমগ্রের ওপর অনেক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও প্রণীত হয়েছে। ইরানের খ্যাতনামা মনীষী সাঈদ নাফিসি ও ড. ইয়াহইয়া মাহ্দাভির প্রচেষ্টায় ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে তেহরান থেকে ইবনে সীনার রচনাবলির ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থে ইবনে সীনার রচনাবলির নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
ইবনে সীনা মনে করতেন মানুষের প্রতি আল্লাহর শ্রেষ্ঠ দান হচ্ছে তার বিশ্বাস ও যুক্তিবাদিতা। তিনি কোনো একটি বিশিষ্ট ধর্মীয় মতবাদ বা চিন্তা-দর্শনে আস্থা রাখতেন না। তাঁর মতে ধার্মিকতার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত মানসিক ও বুদ্ধিসুলভ উপলব্ধি। তিনি এক আল্লাহতে এবং হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর রেসালাত ও অহিতেও একইভাবে বিশ্বাস করতেন এবং ধর্মীয় কাজকর্মগুলো যথারীতি নিজে পালন করতেন এবং তা পালনে সমর্থন করতেন।
অস্তিত্ব সম্পর্কে ইবনে সীনার মতবাদ দু’টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করেই এগিয়ে গেছে। প্রথমটি হচ্ছে যে কোনো বস্তুর প্রকৃতিকে তার অস্তিত্ব থেকে পৃথক্করণ আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে অস্তিত্বের অপরিহার্যতা, অস্তিত্বের সম্ভবতা ও অসম্ভবতার মধ্যকার পারস্পরিক পৃথক্করণ। এ মতবাদের আলোকে বলা যায় যে, এ বিশ্বজগতে যা কিছু আছে তার সবই হচ্ছে সম্ভব অস্তিত্ব এবং তা অপরিহার্য অস্তিত্বের পুরোপুরি মুখাপেক্ষী।
ইবনে সীনা নৃতত্ত্বকে ফেরেশতাতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই বর্ণনা করেছেন। ফেরেশতাতত্ত্বে বিশ্বতত্ত্বের যে ভিত্তি রয়েছে তা এবং নৃতত্ত্বের মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কেও তিনি সম্যক অবগত ছিলেন। তাই ইবনে সীনার দর্শনে সৃষ্টিতত্ত্বও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ফেরেশতাতত্ত্বের সাথে। ফেরেশতার স্বাভাবিক কার্যক্রমের অন্যতম হলো সৃষ্টির কার্যক্রম প্রকাশের প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকা। কারণ, ফেরেশতা হচ্ছে সেই সত্তা যার মাধ্যমে সম্পন্ন হয় আল্লাহর নির্দেশিত সৃষ্টির কার্যাবলি।
আল্লাহ এবং বিশ্বজগতের মধ্যকার সম্পর্ক সম্বন্ধে ইবনে সীনা পরিপূর্ণ জ্ঞাত ছিলেন। তিনি সবসময় ¯্রষ্টার সামনে সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর সম্ভাব্য প্রকৃতিকে প্রদর্শন করার চেষ্টা করেছেন। আর এভাবে তিনি সেই আদর্শে বিশ্বস্ত ছিলেন যা ইসলামী চিন্তা-দর্শনের মূল ও আদি নীতি।
ইবনে সীনা আধ্যাত্মিকতা প্রকাশের ক্ষেত্রে বিখ্যাত সুফি কবি ফরিদউদ্দিন আত্তারের ন্যায় কাব্যকলার প্রতিও বিশেষ মনোযোগী হয়েছিলেন। প্রমাণস্বরূপ তিনি রেসালাতুত্ তায়ের শীর্ষক প্রতীকাশ্রয়ী আধ্যাত্মিক সৃষ্টিকর্ম রেখে গেছেন। এ গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি মানব আত্মার রহস্য উদ্ঘাটনে প্রয়াসী হয়েছেন এবং জীবনের ঘটে যাওয়া অন্তর্নিহিত বিষয়গুলোকে প্রতীকীরূপে তুলে ধরেছেন।
মূলত ইবনে সীনা মনুষ্যসমাজকে সুস্থ করতে চেয়েছেন মূল সত্তার প্রতি তাদের উদাসীনতার ব্যাধি থেকে। তাদের এ ব্যাধি তাদের আত্মার মাঝেই বিদ্যমান। তাই তিনি মানুষকে নিরাময় করতে আত্মা সম্পর্কিত গান গেয়েছেন এবং এর গূঢ় রহস্য সকলের সম্মুখে তুলে ধরেছেন। ফলে ইসলামের অনেক ধ্যানশীল মনীষী যুগ যুগ ধরে ইবনে সীনার বহুমুখী প্রতিভা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন এবং তাঁরা তাঁর চিন্তা-দর্শন ও কর্মের আলোকে মানুষের মুক্তির জন্য ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে আলো বিস্তার করছেন।

তথ্যসূত্র
১.    সৈয়দ হোসেন নসর (২০০৫ খ্রি.), তিনজন মুসলিম মনীষী, (অনুবাদ : মহীউদ্দীন), দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা।
২.     আহমাদ তামীমদারী (২০০৭ খ্রি.), ফার্সী সাহিত্যের ইতিহাস (তারিক জিয়াউর রহমান সিরাজী ও মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী অনূদিত), আলহুদা আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা, ইরান।
৩.     আবদুল মওদুদ (১৯৮০ খ্রি.), মুসলিম মনীষা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা।
৪.     মুজাফফর সারবাজী (১৯৯৯ খ্রি.), চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সীনা (অনুবাদ : তারিক সিরাজী), গ্রন্থ মালঞ্চ, ঢাকা।
৫.     মো. ফজলুর রহমান মুনশী (১৯৯৭ খ্রি.), বিশ্বের মুসলিম মনীষীদের কথা, বার্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা।
৬.     নিউজ লেটার (১৯৯৯ খ্রি.), ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ঢাকার মুখপাত্র।

* অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান
ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়