মঙ্গলবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকাভুক্ত ইরানের ২৪টি স্থান

পোস্ট হয়েছে: অক্টোবর ২২, ২০১৯ 

জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা বা ইউনেস্কো ইরানের মোট ২৪টি স্থানকে বিশ^ ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করে যেগুলোর ২২টি সাংস্কৃতিক ও ২টি প্রাকৃতিক স্থান। নিচে এই স্থানগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো।
আর্মেনিয়ান আশ্রম বা চার্চ (২০০৮)
ইরানের পশ্চিম আযারবাইজান প্রদেশে এর অবস্থান। এটি ইরানের বিশ^ ঐতিহ্য তালিকার অন্যতম স্থান। ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত এই অঞ্চলের মোট আয়তন হলো ১২৯ হেক্টর। আর্মেনিয়ান আশ্রম হলো সপ্তম এবং চতুর্দশ শতকে নির্মিত তিনটি আশ্রম বা চার্চের সমষ্টি। এ তিনটি চার্চের নাম হলো সেইন্ট থাডুয়েস চার্চ, চ্যাপেল অব যার্ডযার এবং সেইন্ট স্টেপানোস চার্চ।
এই চার্চগুলোর সংস্কার কাজ করায় এগুলো উত্তমরূপে সংরক্ষিত হয়েছে। এগুলো আর্মেনিয়ান স্থাপত্যশৈলীর শক্তিশালী গুণমান এবং সাজসজ্জাগত ঐতিহ্যকে উপস্থাপন করে। উপরন্তু এটি ইরানের এই অংশে আর্মেনিয়ান সংস্কৃতির বিস্তারকেও প্রকাশ করে।
বাম নগরীর সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য (২০০৪)
২০০৪ সালে ইউনেস্কোর বিশ^ ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় বাম নগরীর রোদে পোড়া মাটি দ্বারা তৈরি বিশে^র সর্ববৃহৎ দালান। এই দালানটি প্রাচীন সিল্ক রোড বা রেশম পথের সন্নিকটে প্রকা- দুর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ইতিহাসবিদদের অভিমত অনুসারে এটি হাখামানেশী সা¤্রাজ্যের সময়ে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। সপ্তম থেকে একাদশ শতাব্দীতে এই দুর্গটি রেশম পথের বাণিজ্য রুটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাম নগরীর পুরো এলাকাটি একটি বৃহদাকার দুর্গের মতো যার অন্তর্ভুক্ত ছিল এই দালানটি।
২০০৩ সালে ইরানে সংঘটিত ভূমিকম্পে এই দালানটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। পরে ইরান সরকার তা পুনঃনির্মাণ করে।
বিসোতুন (২০০৬)
বিসোতুন হলো ইরানের আরেকটি সাংস্কৃতিক স্থান যা ইউনেস্কোর বিশ^ ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হয়েছে। এটি কেরমানশাহ প্রদেশে অবস্থিত। এটি ২০০৬ সালে ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত হয়।
বিসোতুন বহুভাষী শিলালিপি এবং বেহিসতুন পাহাড়ের ঢালে বড় বড় পাথরের ওপর উৎকীর্ণ খোদাই কাজের জন্য সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। বিশেষজ্ঞগণ পাথরের গায়ে খোদাই করা কুনোফর্ম স্ক্রিপ্টের পাঠোদ্ধারকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। এসব শিলালিপির উচ্চতা ১৫ মিটার এবং প্রস্থ ২৫ মিটার। আর এগুলো চুনাপাথরের পাহাড়ি ঢালে ১০০ মিটার পর্যন্ত উঁচুতে অবস্থিত।
গোলেস্তান প্রাসাদ (২০১৩)
ইরানের রাজধানী তেহরানে গোলেস্তান প্যালেসের অবস্থান। এটিও ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত ইরানের অন্যতম ঐতিহ্য নিদর্শন যা ২০১৩ সালে ইউনেস্কোর বিশ^ ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান লাভ করে। গোলেস্তান প্রাসাদ ছিল প্রাচীন কাযার রাজার বাসভবন। এটি তেহরান শহরের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন। এটি প্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত কয়েকটি গুচ্ছ দালানের সমন্বয়ে দুর্গের আকারে নির্মিত। প্রাচীরের অভ্যন্তরে রাজপ্রাসাদ ও অন্যান্য অবকাঠামো রয়েছে, আর রয়েছে ইরান ও ইউরোপের নানা ধরনের কারুশিল্পের সংগ্রহ (যেগুলোর কয়েকটি ১৮ থেকে ১৯ শতকের) এবং অনেকগুলো বাগান।
কাবুস মিনার (২০১২)
ইরানের এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি ২০১২ সালে ইউনেস্কোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এই নিদর্শনটি ৭২ মিটার উঁচু যা কাবুস মিনারের কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত। মিনারটি পাকা ইটের তৈরি এবং দশকোণী আকৃতির। তবে মিনারটির ছাদ মোচাকৃতির এবং স্বর্ণালি অনুপাত ‘ফি’ (গোল্ডেন র‌্যাশিও ফি) অনুযায়ী ডিজাইনকৃত। এই মিনারের অভ্যন্তরভাগের নকশা মুকারনা অলংকারশৈলীর সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা। স্থাপত্যটি ৩ মিটার পুরু দেয়াল ও দশ কোণবিশিষ্ট। এই মিনারটি এমনভাবে স্থাপত্য ও বৈজ্ঞানিক ডিজাইনের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে যে, এর সামনের দিক থেকে আপনি আপনার কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি শুনতে পাবেন। এই মিনারটি ১০০৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করা হয়েছে। উজবেক আমীর শামস-উল মা’লী কাবুস ইবনে ওয়াশ্মগীরের নির্দেশে এটি নির্মাণ করা হয়।
লূত মরুভূমি (২০১৬)
২০১৬ সালে এটি ইউনেস্কোর বিশ^ ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। লূত মরুভূমি ইউনেস্কোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ইরানের দুটি প্রাকৃতিক নিদর্শনের অন্যতম। এই মরুভূমির সংরক্ষিত এলাকার আয়তন ২.২ মিলিয়ন হেক্টর। এটি দাশ্তে লূত নামেও পরিচিত। এই লবণ মরুভূমি আয়তনের দিক থেকে বিশে^ ২৫তম। এটি বিশে^র সবচেয়ে উত্তপ্ত ও শুষ্ক বালুময় স্থানগুলোর একটি, যার গড় তাপমাত্রা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ইসফাহানের জামে মসজিদ (২০১২)
৭৭১ খ্রিস্টাব্দে ইসফাহানের জামে মসজিদ নির্মিত হয় এবং বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত অনেকবার এর পুনঃনির্মাণ, সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ সম্পন্ন হয়। এটি ২০১২ সালে ইউনেস্কোর বিশ^ ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হয়। ইরানের দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাচীনতম মসজিদগুলোর অন্যতম হওয়ায় এটি বিশ^ ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান লাভ করে। এটি মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে ইরানে ব্যাপকভাবে প্রচলিত চুতষ্কোণীয় আইভান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত।
ম্যায়মান্দ সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য (২০১৫)
এই সাংস্কৃতিক গ্রাম হলো ইরানের আরেকটি বিশ^ ঐতিহ্যবাহী সম্পত্তি যা ম্যায়মান্দ পল্লি জেলার একটি অংশ। ২০০৬ সালে এই গ্রামের জনসংখ্যা ছিল সাতশ’ এর চেয়েও কম (যা ১৮১টি পরিবারের সমান বলে হিসেব করা হয়)। এটি ইরানের কেরমান প্রদেশের একটি প্রাচীন গ্রাম এবং এ অঞ্চলকে ইরানের প্রাচীনতম মানব বসতির স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইতিহাসবিদগণ মনে করেন, মানুষজন ১২০০০ বছর আগে থেকে এই গ্রামে বসবাস করে আসছে। গ্রামটির বাড়ি-ঘরগুলো হাত দিয়ে পাথর কেটে কেটে নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে ১০০০০ বছর পূর্বেকার খোদাই করা পাথরও রয়েছে।
ইমাম ময়দান, ইসফাহান (১৯৭৯)
ইমাম ময়দান হলো ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক তালিকাভুক্ত ইরানের প্রথম কয়েকটি বিশ^ ঐতিহ্যবাহী স্থানের অন্যতম। এটি সপ্তদশ শতকের সূচনালগ্নে প্রথম শাহ আব্বাসর নির্দেশে নির্মাণ করা হয়। এর কাঠামোটি ভবন দ্বারা বেষ্টিত যা দুই তলাবিশিষ্ট খিলান দ্বারা সংযুক্ত। এই ভূসম্পত্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শনগুলো হলো শেখ লুতফুল্লাহ মসজিদ, কায়সারিয়েহ চত্বর এবং রাজকীয় মসজিদ। এ নিদর্শনগুলো ইরানের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্তস্বরূপ।
পাসারগাদ (২০০৪)
এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ইউনেস্কোর বিশ^ ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত ইরানের অন্যতম স্থান। এটি হাখামানশী সা¤্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হতো- যা সাইরাস দ্য গ্রেটের নির্দেশে তৈরি করা হয়েছিল। ৫৪৬ খ্রিস্টাব্দে এই রাজধানী গড়ে ওঠে, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সাইরাস দ্য গ্রেটের নিহত হওয়া পর্যন্ত এর নির্মাণকাজ অসমাপ্ত অবস্থায় রয়ে যায়। বর্তমানে পাসারগাদের সাইরাস দ্য গ্রেটের সমাধিক্ষেত্র এই অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এই সমাধিক্ষেত্র পাথর ও মাটি দিয়ে নির্মিত।
পারসেপোলিশ (১৯৭৯)
পারসেপোলিশ ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ থেকে ৩৩০ অব্দ পর্যন্ত পারস্যের হাখামানশী সা¤্রাজ্যের রাজধানী। এটি ইরানের শিরাজ প্রদেশের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। বর্তমানে যেসব পর্যটক এই প্রাচীন নগরী পরিদর্শনে আসবেন তাঁরা হাখামানশী স্থাপত্যের রয়ে যাওয়া নিদর্শন দেখবেন যা রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠার সমসাময়িককালেই গড়ে উঠেছিল। যেহেতু এই ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনা ইরানের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সেহেতু সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণে ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়।
পার্সিয়ান গার্ডেন অব ইরান (২০১১)
পার্সিয়ান গার্ডেন অব ইরান ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ^ ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ইরানের একটি সাংস্কৃতিক স্থান যা ২০১১ সালে তালিকাভুক্ত হয়। পারস্যের ঐতিহ্যগত বাগান ডিজাইন ও স্টাইল ব্যবহারের কারণে বাগানটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভারতীয় বাগান ডিজাইন থেকে শুরু করে স্পেনের আন্দালুসিয়ার বাগান ডিজাইন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এই বাগানের ডিজাইন তৈরি করা হয়। প্রকৃতপক্ষে স্পেনের আলহামরার বাগানগুলোর সাথে পার্সিয়ান গার্ডেনের ব্যাপক সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।
পার্সিয়ান কানাত অব ইরান (২০১৬)
এই সাংস্কৃতিক নিদর্শন ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত ইরানের আরেকটি নিদর্শন। এই নিদর্শনটি হলো একটি স্বল্প ঢালবিশিষ্ট খাল যা একটি কূপ থেকে পানি সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এখান থেকে প্রাপ্ত পানি পানীয় হিসেবে এবং চাষাবাদের জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি পানি সরবরাহের জন্য ইরানের একটি প্রাচীন পদ্ধতি যা পারসিকদের দ্বারা খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দে আবিষ্কার করা হয়েছিল। বর্তমানেও এই অঞ্চলের লোকদের পানি সরবরাহের জন্য এই পদ্ধতি চালু রয়েছে।
শাহর-ই সোখতেহ (২০১৪)
এটি ইরানের ইউনেস্কো বিশ^ ঐতিহ্য তালিকার আরেকটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। এ শহরের নামের আভিধানিক অর্থ হলো পুড়ে যাওয়া শহর। শহরটি তা¤্র যুগে এ অঞ্চলে জনমানুষের বসতি স্থাপনের চিহ্ন বহন করছে- যা তা¤্র সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কযুক্ত। এটি ২০১৪ সালে ইউনেস্কোর তালিকায় স্থান পায় যা ইরানের সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত। এই পুড়ে যাওয়া শহরটির উত্থান-পতন সম্পর্কে বেশি কিছু জানা সম্ভব হয় নি।
শেখ সাফিউদ্দিন খানেগাহ এবং আরদাবিলের সমাধি (২০১০)
সমাধিক্ষেত্র ও গম্বুজের সমাহারে গড়ে ওঠা এই স্থানটি মুসলিম সুফিসাধক শেখ সাফিউদ্দিনের সাথে সম্পর্কিত। শেখ সাফিউদ্দিন আরদাবিলে জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর জন্মস্থানটি এই সমাধিক্ষেত্র ও পুরো কমপ্লেক্সের মাঝেই অবস্থিত। ২০১০ সালে স্থানটি ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত হয়। এ সমাধিক্ষেত্রটি একটি বিশাল কমপ্লেক্সে অবস্থিত যার মধ্যে রয়েছে কমপ্লেক্সটির মূল স্থাপনা, গম্বুজ, দরগা এবং নামাযের স্থান। সাফাভী শাসনামলে বেশিরভাগ অংশ মূল স্থাপনার সাথে সংযুক্ত হয়। চালদিরান যুদ্ধের সময় যারা নিহত হয়েছিল তাদের অনেককে এই স্থানে সমাহিত করা হয়।
শুসতারের ঐতিহাসিক হাইড্রোলিক সিস্টেম (২০০৯)
২০০৯ সালে তালিকাভুক্ত শুসতারের ঐতিহাসিক হাইড্রোলিক সিস্টেম হলো একটি সমন্বিত সেচ ব্যবস্থা যা ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের দ্বীপ শহরে অবস্থিত। এটি ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত ইরানের ১০ম স্থান। এই বিশাল অবকাঠামো গড়ে উঠেছে ওয়াটার মিল, খাল, বাধ এবং সুড়ঙ্গ নিয়ে। এই সেচ ব্যবস্থার মূল অবকাঠামো হলো কায়সার বাধ। এর আয়তন ৫০০ মিটার, যা নদী থেকে খালে পানি সরবরাহ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। তৃতীয় শতাব্দীতে রোমান কারিগরদের দ্বারা এটি তৈরি করা হয়।
সোলতানিয়াহ (২০০৫)
ইরানের যানযান প্রদেশে অবস্থিত সোলতানিয়াহ ইউনেস্কোর বিশ^ ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকাভুক্ত আরেকটি স্থান। এটি তেহরানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এবং চতুর্দশ শতকে মোঙ্গল ইলখানী শাসকদের রাজধানী হিসেবে একে গড়ে তোলা হয়েছিল। নামটি একজন মুসলিম শাসকের উপাধি থেকে নেয়া হয়েছিল যার অর্থ ‘রাজকীয়’। এই প্রাচীন শহরের বেশ কয়েকটি স্থাপনা শহরটিতে ইলখানী শাসনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ওলযাইতুর সমাধিক্ষেত্র। এই সমাধিক্ষেত্রটি চতুর্দশ শতকের গোড়ার দিকে তৈরি করা হয়।

শুশা (২০১৫)
এই সাংস্কৃতিক স্থানটি খুজেস্তান প্রদেশে অবস্থিত যা ২০১৫ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক তালিকাভুক্ত হয়। এটি হলো আরেকটি প্রাচীন শহর যে শহরকে নিকট-প্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন শহরগুলোর অন্যতম বলে গণ্য করা হয়। বর্তমানে এই প্রাচীন শহরের নাম হলো শুশ যার জনসংখ্যা ৬৫ হাজার।
প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০ অব্দে শুশা শহরে জনমানুষের বসতি গড়ে উঠেছিল। নব্যপ্রস্তরযুগীর গ্রাম হিসেবে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন শহরটি অঙ্কিত মৃৎশিল্প সভ্যতার সাথে সম্পর্কিত ছিল। এই স্থানে প্রাপ্ত নিদর্শনসমূহের মধ্যে আঁকা মৃৎশিল্প ছাড়াও আঁকা সিরামিকের পাত্রও রয়েছে।
তাবরীযের ঐতিহাসিক বাজার কমপ্লেক্স (২০১০)
২০১০ সালে তাবরীযের ঐতিহাসিক বাজার কমপ্লেক্স ইউনেস্কোর বিশ^ ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকাভুক্ত হয়। ইরানের তাবরীয প্রদেশের কেন্দ্রে এই ঐতিহাসিক বাজারটি অবস্থিত। এটি কেবল ইরানের নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন ও বৃহৎ বাজারসমূহের অন্যতম। এই ঐতিহাসিক বাজার নির্মাণের আগে প্রাচীনত্বের কারণে তাবরীয শহরটি ইরানের সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কেন্দ্ররূপে পরিগণিত হতো। তাবরীয বাজার কমপ্লেক্স ঐতিহাসিক রেশমপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেও প্রসিদ্ধ ছিল।
তাখতে সোলায়মান (২০০৩)
ইরানের পশ্চিম আযারবাইজান প্রদেশে অবস্থিত এই সাংস্কৃতিক স্থানটি ভূতাত্ত্বিক গুরুত্বের জন্য প্রসিদ্ধ। এই সাংস্কৃতিক স্থান একটি আগ্নেয়গিরির মুখে অবস্থিত এবং একটি সুরক্ষিত স্থানও বটে। দুর্গটি এই স্থানের অধিকাংশ এলাকাজুড়ে অবস্থিত। এখানে রয়েছে সাসানি শাসনামলে নির্মিত জরাথ্রুস্টদের অগ্নিমন্দির। ইলখানীদের শাসনামলে মন্দিরটি পুনর্নিমিত হয়।
চোঘা যানবিল (১৯৭৯)
এই প্রাচীন ইলামী কমপ্লেক্স ইউনেস্কোর বিশ^ ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত ইরানের অন্যতম স্থান। এটি ইরানের খুজেস্তান প্রদেশে অবস্থিত। মেসোপোটেমিয়া অঞ্চলের বাইরে হাতে গোনা যে কয়েকটি প্রাচীন ও বিশাল স্থাপত্য নিদর্শন রয়েছে সেগুলোর অন্যতম হলো এই চোঘা যানবিল। এই সাংস্কৃতিক স্থান খ্রিস্টপূর্ব ১২৫০ অব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ৬৫০ অব্দে তা পরিত্যক্ত হয়। এটি পোড়ামাটি এবং কাদামাটি দিয়ে নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে এ স্থানে প্রাচীন বিশাল স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়- যা ইউনেস্কো কর্তৃক সংরক্ষিত।
ইয়াযদের ঐতিহাসিক নগরী (২০১৭)
ইয়াযদের ঐতিহাসিক নগরী ইউনেস্কোর বিশ^ ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকার অন্যতম ইরানি নিদর্শন। এই শহুরে ভূদৃশ্য ঐতিহ্যবাহী মাটিনির্মিত শহর অবকাঠামোর জন্য ইউনেস্কো কমিটির কাছ থেকে স্বীকৃতি অর্জন করে। বিশেষত মরু এলাকার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার সক্ষমতার জন্য স্থানটি স্বীকৃত। শহরটির অবস্থান প্রাচীন রেশমপথের পাশে। আর তাই বাণিজ্যিক কর্মকা-ের মাধ্যমে এলাকাটি সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। এই প্রাচীন নগরীর একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে- যা হাখামানশী সা¤্রাজ্যের সাথে সম্পৃক্ত।
ফার্স অঞ্চলের সাসানি আমলের ভূতাত্ত্বিক স্থান (২০১৮)
ইরানের ফার্স প্রদেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত তিনটি ভৌগোলিক এলাকা, যথা: ফিরুযাবাদ, বিশাপুর ও সারভেস্তানে আটটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে। এর সুরক্ষিত অবকাঠামো, রাজপ্রাসাদ এবং নগর পরিকল্পনায় সাসানি শাসনামলের প্রাচীনতম ও নবীনতম স্থাপত্যের নিদর্শন বিদ্যমান যা ২২৪ থেকে ৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত বলে মনে করা হয়। এই স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে সাসানি সা¤্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা আরদেশীর বাবাকানের রাজধানী এবং তাঁর উত্তরসূরি প্রথম শাপুরের সময়ে নির্মিত একটি শহর ও স্থাপত্য কাঠামো। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ প্রাকৃতিক ভূসংস্থানের যথাযথ ব্যবহারকে প্রতিফলিত করে এবং ওই সময়ে ইসলামি স্থাপত্যের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাব বিস্তারকারী হাখামানশী ও পার্থিয়ান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও রোমান শিল্পকলার প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করে।
আক্কাডিয়ান বনভূমি (২০১৯)
আক্কাডিয়ান বনভূমি একটি অনন্য বনভূমি যা কাস্পিয়ান সাগরের উপকূল বরাবর ৮৫০ কিলোমিটার ব্যাপী বিস্তৃত। এই বিস্তৃত বনভূমির ইতিহাস ২৫ থেকে ৫০ মিলিয়ন বছরের পুরানো- যা উত্তরের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল। এই প্রাচীন বনভূমি হিমবাহ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এরপর যখন আবহাওয়া পুনরায় নাতিশীতোষ্ণ হয় তখন আবারোও এই বনভূমি বিস্তৃত হতে শুরু করে। এ বনভূমির জীববৈচিত্র লক্ষণীয়। সংবহনতান্ত্রিক উদ্ভিদের শতকরা ৪৪ ভাগ এই বনভূমিতে রয়েছে। বর্তমানে এই নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে পার্সিয়ান চিতাসহ ১৮০ প্রজাতির পাখি এবং ৫৮ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে।
সংকলন ও অনুবাদ : মো. আশিফুর রহমান