সোমবার, ২১শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৬ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

আয়াতুল্লাহ হাশেমি রাফসানজানি ছিলেন ইসলামি বিপ্লবের পরিচয়পত্র

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ১৬, ২০১৭ 

অধ্যাপক মুহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন খান
হযরত আয়াতুল্লাহ আলী আকবর হাশেমি রাফসানজানি যখন গত আট জানুয়ারি (২০১৭) ৮২ বছর বয়সে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করলেন তখন বিশ্ববাসী, বিশেষ করে ইরানের সর্বশ্রেণির জনগণের কাছে সংবাদটি খুবই অপ্রত্যাশিত ও অকালমৃত্যু বলে মনে হলো। হযরত ইমাম খোমেইনী রহমাতুল্লাহি আলাইহির নেতৃত্বে সংগঠিত ইরানের ইসলামি বিপ্লব এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের দ্বিতীয় এ শক্তিমান বিপ্লবী নেতা যেন বিনা সংবাদে পরলোকের অদৃশ্য জগতে পাড়ি জমালেন। তাঁর আচমকা এ তিরোধানে ইরানে তার ঘোর সমর্থক, অনুসারী, সমালোচক, বিরোধী তথা কোটি কোটি মানুষ থ হয়ে গেলেন। ৭ জানুয়ারি শনিবারও যিনি তাঁর প্রতিদিনের ডায়েরিতে তাঁর স্মৃতিকথা ও মূল্যায়ন লিখলেন পরদিন ৮ জানুয়ারি রোববার থেকে সে দায়িত্ব দিয়ে গেলেন অন্যদের ওপর। যেন বলে গেলেন, আমার লেখা শেষ, এবার তোমরা লেখ! তাইতো হাশেমির হয়ে এক ইরানি কবি গেয়ে উঠলেন :
تا هستم¬ای رفیق ندانی که کیستم
روزی سراغ وقت من آیی که نیستم
‘তা হাস্তাম এই রাফিক, না’দানী কে কিস্তাম
রুজি সুরাগে মান আয়ি কে নিস্তাম।’
অর্থাৎ ‘হে বন্ধু! যদ্দিন আছি তোমাদের মাঝে জানলে না যে আমি কে
যেদিন আমার খোঁজে আসবে তখন আর আমি নেই।’
জনাব আয়াতুল্লাহ হাশেমি রাফসানজানি (রহ.) যদিও আমাদের হিসেবে মোটামুটি পরিণত বয়েসে ইন্তেকাল করেছেন তথাপি তাঁর দেদীপ্য ব্যক্তিত্ব, জ্ঞান-প্রজ্ঞার অবিরাম প্রবাহ এবং ইসলামি ইরানের উচ্চতম ক্ষমতা বলয়ে তাঁর সক্রিয় অবস্থান, কর্মচাঞ্চল্য ও জনমনে সদা উপস্থিতিতে তাঁর এ মৃত্যু যেন এক শক্তিশালী নিরোগ যুবকের আচমকা প্রয়াণ। অবশ্য একথাও সত্য, ইসলামি ইরানের আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় নেতাদের জন্য এ বয়েসে মৃত্যুবরণ অকাল মৃত্যুই বটে। ইসলামি বিপ্লবের নেতা হযরত ইমাম খোমেনী যখন প্রায় নব্বই বছর বয়েসে ওফাত গ্রহণ করলেন তখন এই হাশেমি রাফসানজানিই বলেছিলেন, ‘ইমাম খুবই কম বয়েসে ইন্তেকাল করলেন।’ উল্লেখ্য, ইমামের বড় ভাই আয়াতুল্লাহ পাসান্দিদে তখনও জীবিত ছিলেন এবং ১১৫ বছর বয়েসে ইন্তেকাল করেন। যাক, আসল কথা আল্লাহ জাল্লা শানুহু তাঁর বান্দাদের হায়াত-মউতের মালিক। তাঁর পরিকল্পিত ইচ্ছাতেই বান্দাদের আগমন ও প্রস্থান ঘটে থাকে।
জনাব হাশেমি রাফসানজানি মধ্য ইরানের রাফসানজান শহরের নিকটবর্তী বাহ্রামান গ্রামে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা হাজী মির্জা আলী হাশেমি ছিলেন একজন আলেম, কৃষক ও বাগান মালিক। তাঁর মায়ের নাম মাহ্ বিবি। বাবার পেস্তা বাগানে শৈশবকালেই আলী আকবর হাশেমি কাজ করতেন এবং সকাল-সন্ধ্যায় বাবার কাছে পড়াশুনা করতেন। নয় ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয় এ হাশেমি চৌদ্দ বছর বয়েসেই বাহরামানে প্রাথমিক শিক্ষার পাট চুকিয়ে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে ইরানের প্রখ্যাত ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র কোমের উদ্দেশে রওয়ানা হন। শিশুকাল থেকেই তিনি ছিলেন বুদ্ধিদীপ্ত, যুক্তিবাদী ও প্রগতিমনা এবং ভারসাম্যপূর্ণ বিচার বিবেচনার অধিকারী। তাঁর সৌভাগ্যই বলতে হবে যে, কোমে তিনি তাঁর পরম শিক্ষাগুরু হিসেবে পেয়ে গেলেন আয়াতুল্লাহ উজমা বুরুজের্দী এবং আধ্যাত্মিক-রাজনৈতিক চিন্তা-দর্শনের শিক্ষক আয়াতুল্লাহ উজমা ইমাম খোমেইনীকে। অল্প কিছুকালের মধ্যে কোরআন শরীফ হেফ্জ্ করা ও এর প্রতিযোগিতায় বিশেষ কৃতিত্ব দেখানোর জন্য আয়াতুল্লাহ উজ্মা বুরুজের্দীর হাত থেকে তিনি বিশেষ পুরস্কার লাভ করেন।
অসামান্য প্রতিভাদীপ্ত জনাব হাশেমি রাফসানজানি কোমের প্রথাগত সব ধরনের শিক্ষার পাশাপাশি অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়াদিতেও ফিকাহের আলোকে জ্ঞানসমৃদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং যৌবনের শুরু থেকেই হযরত ইমাম খোমেইনীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য, চিন্তা-দর্শন ও আধ্যাত্মিকতায় সমৃদ্ধ হতে থাকেন। রাফসানজানের বিশ্বখ্যাত পেস্তা বাগানের ধনাঢ্য পরিবারের এ যুবক আলেম কোমে তাঁর অনেক সহপাঠী আলেমের পড়াশুনার খরচও নিজে বহন এবং তাদেরকে ইমাম খোমেইনীর আধ্যাত্মিক-রাজনৈতিক চিন্তা-দর্শনের দিকে আকর্ষণ করতেন। কোমের বিশ্বখ্যাত দ্বীনী শিক্ষাকেন্দ্র ফেইজিয়া মাদ্রাসায় ইমাম খোমেইনী (রহ.) ও অন্যান্য শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে আগা হাশেমি রাফসানজানি ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত ও আকর্ষণীয় যুব আলেমে দ্বীন। স্বৈরাচারী শাহানশাহী সরকার এবং উপনিবেশবাদী ও সা¤্রাজ্যবাদীদের শোষণ-শাসন, লুণ্ঠন এবং যাবতীয় ষড়যন্ত্রের বিষয়ে তিনি ও তাঁর সহপাঠীরা সবাই ইমাম খোমেইনীর বিপ্লবী ধ্যান-ধারণার সাথে ছিলেন একাত্ম ও সুতীক্ষ্মভাবে সচেতন। জনাব হাশেমি রাফসানজানি কোম শহরের প্রখ্যাত শিক্ষকগণের কাছে ফেকাহশাস্ত্র অধ্যয়ন ছাড়াও কিছুকাল ধর্মীয় শিক্ষার আরেক বিশ্বখ্যাত কেন্দ্র ইরাকের নাজাফে অধ্যয়ন করেন। সেখানকার একজন সেরা শিক্ষক আয়াতুল্লাহ মির্জা হাসান বুজ্নুর্দী জনাব হাশেমি সম্পর্কে বলেছিলেন : ‘কোম থেকে আগত কম দাড়িসম্পন্ন আলেমের (রাফসানজানির মুখে দাড়ি অত্যন্ত অল্প ছিল) ফেকাহ্শাস্ত্রীয় জ্ঞান-প্রজ্ঞা খুবই প্রশংসনীয়।’
আয়াতুল্লাহ হাশেমি রাফসানজানির কথা ও কলম যেমন তাঁর শিক্ষকবৃন্দ, সহপাঠিগণ ও দীনদার জনগণের কাছে সুপরিচিত ছিল তেমনি তিনি ছিলেন জালেম শাহ সরকারের গুপ্ত পুলিশ সাভাক বাহিনীর কাছে সংবেদনশীল ও আশঙ্কার বিষয়। তাঁকে মোট সাতবারে বহু বছর মেয়াদে কারাগারে আটক রাখা হয়। ছাত্রাবস্থাতেই তাঁকে অন্যান্য তালাবার সাথে বলপূর্বক বাধ্যতামূলক সামরিক সার্ভিসে নেয়া হয় যা দীনী শিক্ষার্থীদের জন্য মাফ ছিল। কিন্তু জনাব হাশেমি ইমাম খোমেইনীর অনুপ্রেরণায় সামরিক পোশাকে সেনা ছাউনির ভেতরেই মাতম-মর্সিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুরু করেন যা সাধারণ সৈন্যদের মাঝে দীনী উদ্দীপনা ও আকর্ষণ সৃষ্টি করে। শাহী সরকার এতেও প্রমাদ গুণে তাঁর ওপর নির্যাতন চালায়।
ইমাম খোমেইনী যখন শাহ ও আমেরিকাবিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রাম শুরুর কারণে তেহরানে দীর্ঘ কারাবরণের পর দেশের বাইরে ইরাকে নির্বাসিত হন তখন একবার জনাব হাশেমি গোপনে নাজাফে গমন করে ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এরপর দেশে ফেরার সময় ইমাম তাঁকে সাবধান করলেন যে, শাহী সরকার তাঁকে জেলে পুড়বে। তাই ইরাকে থেকে যেতে পারেন। কিন্তু দুঃসাহসী বীরোত্তম হাশেমি বলেছিলেন, ‘গ্রেফতার করলে করুক। তবুও দেশেই যাব। ওখানে অনেক কাজ করতে হবে।’
শাহের জেলখানাতেও হাশেমি বসে থাকেননি। হাফেজে কোরআন এই হাশেমি শৈশব থেকেই ছিলেন কোরআনের আশেক। জেলে বসেই তিনি বড় বড় ষোল খ-ের তাফসিরে কোরআন ‘রাহ্নামা’ রচনা করেন যা পরবর্তীকালে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর প্রকাশিত হয়। এছাড়াও বন্দি অবস্থায় তাঁর আরেক অনন্য কীর্তি হচ্ছে ৩৩ খ-ের ‘কোরআন বুঝার চাবিকাঠি ও অভিধান’ রচনা করা। জেলখানায় তাঁর বুকে ভারী বোঝা চাপিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর নির্যাতন চালিয়ে বলা হতো, ‘খোমেইনীর পক্ষে প্রচার চালাও! তবে এর স্বাদ গ্রহণ কর।’ চরম মাত্রার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর হাশেমি জবাব দিতেন, ‘এ কার্যক্রম চালিয়ে যাব!’ জেলখানায় তাঁর স্ত্রী দেখা করতে গেলে তিনি গোপনে তাঁর কোরআনবিষয়ক পা-ুলিপিগুলো বাইরে চালান করে দিতেন।
জনাব হাশেমি রাফসানজানি ইরানের কাজার বংশীয় শাহের সময়কার দেশপ্রেমিক ও উপনিবেশবাদবিরোধী প্রধানমন্ত্রী আমীর কবির এর অবদান এবং সংগ্রামী ফিলিস্তিনসহ বহু বিষয়ে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন যা অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত তাঁর রচিত তেহরানের জুমআ নামাযের কয়েক হাজার খুতবা সম্বলিত গ্রন্থ, স্মৃতিকথা এবং নানা বিষয়ক কয়েক ডজন অমূল্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তেহরানে হাশেমির খুতবা প্রদান কালে মুহুর্মুহু ধ্বনি উঠতÑ ‘হাশেমি হাশেমিÑ তু রুহে এশ্তেমায়ি।’ অর্থাৎ হে হাশেমি, তুমি আমাদের সমাজের আত্মা।
ইসলামি বিপ্লবের বিজয় অর্জনে তাঁর ভূমিকা ছিল প্রথম সারির কয়েকজন মনীষীর মতোই অনন্য। বিপ্লবের নেতার অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী বাহুস্বরূপ আয়াতুল্লাহ আলী আকবর হাশেমি রাফসানজানি ছিলেন প্যারিসে অবস্থানকালে ইমাম যে পাঁচজন সদস্যকে নিয়ে গোপন ‘ইসলামি বিপ্লবী পরিষদ’ গঠন করেন তাঁদের অন্যতম। শহীদ আয়াতুল্লাহ বেহেশতী, শহীদ আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মুতাহ্হারী, আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী ও ড. বাহুনার ছিলেন এ পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট বিপ্লবী পরিষদের সদস্য। তাঁরা সবাই তখন ইরানে অবস্থান করে ইমামের নির্দেশ অনুসারে জনগণের নেতৃত্ব দান করেন। ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয় লাভের পর দেশব্যাপী জনগণকে সঠিক পথে পরিচালনা করা এবং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের যাবতীয় লাল-কালো শত্রুকে দমন করার জন্য পাঁচজন আহ্বায়কের নেতৃত্বে ‘ইসলামিক রিপাবলিক পাটি’ নামক সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই পাঁচজন ছিলেন জনাব হাশেমি রাফসানজানি, আয়াতুল্লাহ বেহেশতী, আয়াতুল্লাহ মুসাভী আর্দাবিলী, হুজ্জাতুল ইসলাম ড. বাহুনার এবং বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা বা রাহবার আয়াতুল্লাহ উজমা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী।
আয়াতুল্লাহ হাশেমি রাফসানজানিকে আমি প্রথম দেখি কোমের মাদ্রাসা ফেইজিয়ায় ১৯৭৯ সনে। আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মুতাহ্হারী ইসলামের নাম ব্যবহারকারী ও সা¤্রাজ্যবাদের সন্ত্রাসী এজেন্ট গ্রুপ ‘ফুরকান’ এর হাতে শাহাদাত বরণ করলে তেহরানের হাজার হাজার শোকার্ত জনতার সাথে আমিও তেহরান থেকে কোমে যাই। ওখানে মাদ্রাসা ফেইজিয়ায় শহীদ মুতাহ্হারীর জানাযা-পরবর্তৗ জনসভায় ইমাম খোমেইনীর সামনে যিনি জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং সন্ত্রাসীদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন তিনিই জনাব হাশেমি রাফসানজানি। জনাব হাশেমি সম্পর্কে এর আগে আমি তেমন কিছু জানতাম না। তেহরান ফিরে আমি আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ড. মুহাম্মদ আলী নাকাভী (বর্তমান আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান) আমার কাছ থেকে বক্তাদের কথা শুনে জানালেন জনাব হাশেমি কত বড় নেতা ও কতো কি!
দুঃখজনকভাবে এর ক’মাস পরই মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের এজেন্ট ‘ফুরকান’ গ্রুপের আততায়ীরা জনাব হাশেমির ওপর তার বাসভবনে ঢুকে ব্রাশ ফায়ার করে। তিনিও তাদের জাপটে ধরেন। ধস্তাধস্তির ভেতরই মিসেস হাশেমি (ইফাত মারাশী) জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বামীকে আগলে ধরলে সন্ত্রাসীরা এ নেতাকে অকূস্থলে খতম করতে পারে নি। তবে জনাব হাশেমি ও তার স্ত্রী মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হন। হাশেমি রাফসানজানি প্রায় তিন মাস ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন। হযরত ইমাম খোমেইনী ইরানি জনতা ও হাশেমির উদ্দেশে প্রদত্ত বাণীতে বলেছিলেন, ‘হাশেমি জিন্দা থাকবে যদ্দিন আমাদের সংগ্রাম জিন্দা থাকবে।’ মৃত্যুর নিশ্চিত কূল থেকে হাশেমি পুনরায় পূর্ণশক্তিতে বেঁচে ওঠায় তাঁকে বলা হতো ‘জিন্দা শহীদ’, যেমনটি বলা হয় বর্তমান রাহবারকেও।
ইরানে ইসলামি বিপ্লবের বিজয় ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর থেকে আয়াতুল্লাহ রাফসানজানি তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শক্তিশালী বাহু হয়ে থাকার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে যান। তাঁর মৃত্যুর পর সঠিকভাবেই দেশের সকল মিডিয়া ও জনগণ তাঁকে খেতাব দিয়েছেÑ ‘ইসলামি বিপ্লবের পরিচয়পত্র’ তথা ‘শেনাসনামে ইনকেলাব’।
ইরানের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন পরিষদ ও দেশের আইন প্রণয়নকারী মজলিসে শুরার নির্বাচন অনুষ্ঠান পর্যন্ত তিনি ছিলেন বিপ্লবী পরিষদের নির্বাচিত প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সারাদেশে মসজিদভিত্তিক সংগঠিত বিপ্লবী কমিটিসমূহের অধিনায়ক। এরপর ১৯৮০ সন থেকে নয় বছর পর্যন্ত তিনি ছিলেন মজলিসে শুরা বা ইসলামি সংসদের সফল স্পিকার। তিনি ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া ইরান-ইরাক যুদ্ধে ছিলেন ইমাম খোমেইনীর নিয়োগকৃত সর্বাধিনায়ক ও যুদ্ধবিষয়ক মুখপাত্র। চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের শেষ ও চূড়ান্ত পর্যায়ে এই সর্বাধিনায়ক নিজে এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা স্বয়ং সামরিক পোশাক পড়ে যুদ্ধের সম্মুখ ফ্রন্টে অবস্থান করেন ও যুদ্ধের গতি বদলে দেন বিজয়ের দিকে। তবে আন্তর্জাতিক শয়তানি চক্রের মারাত্মক দুরভিসন্ধি এবং ইরানকে ধ্বংস করার গভীর পারমাণবিক নীল নক্শা টের পেয়ে জনাব হাশেমি যুদ্ধ বিরতি মেনে নেয়ার জন্য ইমামের কাছে অনুরোধ জানান। আধ্যাত্মিক-রাজনৈতিক নেতা হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) এক পর্যায়ে যুদ্ধবিরতি মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং হৃদয়গ্রাহী ভাষণে বলেন, ‘আমি ইসলামি বিপ্লবকে ও ইসলামি রাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষার জন্যই এ বিষের পেয়ালা পান করলাম।’
যুদ্ধ শেষে হযরত ইমাম খোমেইনীর ইন্তেকালের পর আয়াতুল্লাহ হাশেমি দুই মেয়াদে আট বছরের জন্য দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ইমাম খোমেইনীর স্থলে নতুন নেতা নির্বাচনের বিশেষজ্ঞ পরিষদে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। পরিষদের মিটিংয়ে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামনেয়ীকে সর্বোচ্চ নেতা বা রাহবার হিসেবে নির্বাচনে জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেন। আট বছরের যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত ইরানকে গড়ে তোলার গুরুভার যথার্থভাবে পালন করলেন রাফসানজানি। শুধু তাই নয়, তিনি ইরানকে একটি পারমাণবিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ এবং অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিধর দেশে পরিণত করার ব্যাপারে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ইরানের ইসলামি বিপ্লব ও ইসলামি হুকুমতের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের যাবতীয় ভবিষ্যদ্বাণী, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের জবাবে তিনি একবার তেহরানের জুমআ নামাযের খুতবায় বলেছিলেন : ‘পশ্চিমারা গরুর মতো ব্যাখ্যা করে!” তার একথা প্রবাদ বাক্য হয়ে আছে ইরানী জনগণের মুখে মুখে।
জনাব হাশেমি রাফসানজানি একাধারে তেহরানের জুমা নামাযের ইমাম, রাহবার নির্বাচনী বিশেষজ্ঞ পরিষদের নেতা এবং দেশের সর্বোচ্চ কল্যাণ পরিষদেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। শেষোক্ত পরিষদের দায়িত্ব ছিল দেশের পার্লামেন্ট, গার্ডিয়ান কাউন্সিল ও সরকারের মাঝে বিরোধ মীমাংসা, সমন্বয় সাধন ও ভারসাম্য বিধান করা। তিনি আগাগোড়াই সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক-রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ উজমা সাইয়্যেদ আলী খামনেয়ীর ঘনিষ্ঠতম বন্ধ,ু সহযোগী, সহকর্মী ও সমর্থক ছিলেন। জনাব হাশেমির ইন্তেকালের পর রাহবারের প্রদত্ত অমূল্য বাণী ও জানাযা নামাযে ইমামতি করা এবং সকাতর ও সকান্না মুনাজাতেই এর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তিনি তাঁর পীর ও মুর্শিদ ইমাম খোমেইনীর মাযারেই হযরতের একান্ত ঘনিষ্ঠতায় সমাহিত হয়েছেন। ইরানের রাজনীতির এ বিস্ময়কর সদা হাস্য দুঃসাহসী বীর পুরুষ বেঁচে থাকবেন শতাব্দীর পর শতাব্দী যেমনটি খোদ্ ইমাম খোমেইনী বলে গেছেন, ‘হাশেমি বেঁচে থাকবেন যদ্দিন আমাদের সংগ্রাম বেঁচে থাকবে।’ নারী জাগরণ ও নারী অধিকার প্রদানে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য ও বৈপ্লবিক।
জনাব হাশেমিসহ ইসলামি বিপ্লব ও প্রজাতন্ত্রের মহামান্য নেতৃবৃন্দের সাথে আমার ও আমার সহধর্মিনীর অনেক ঘনিষ্ঠ ও মধুর স্মৃতি রয়েছে যা কোন প্রবন্ধেই স্থান সংকুলান হওয়ার নয়। শুধু আল্লাহ পাকের অসংখ্য শোকরিয়া জানাই এ তূলনাহীন ঐশী নেয়ামত দানের জন্য। নবীজী ও তাঁর আহলে বাইতপ্রেমী এ বুজুর্গানের দোয়া হোক আমাদের পাথেয়।
লেখক : অধ্যাপক ও পরিচালক, ইউআইটিএস রিসার্চ সেন্টার,
ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ইউআইটিএস)