রবিবার, ১৭ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

আসুন পারস্পরিক সহযোগিতায় নতুন বিশ^ গড়ি প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ২২, ২০১৮ 

 
আসুন পারস্পরিক সহযোগিতায় নতুন বিশ^ গড়ি
প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলেমীন ড. হাসান রুহানি গত ১৯ জানুয়ারি ২০১৮ ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সদস্য দেশগুলোর পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের ১৩তম সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সকল দেশের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখ-তার প্রতি সম্মান পোষণ করে। ইরান মনে করে যে, ইসলামি উম্মাহর যাবতীয় সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হচ্ছে সকল ইসলামি দেশের মাঝে সৌহার্দ্য সম্প্রীতি ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা। ড. হাসান রুহানির ভাষণের পূর্ণ বিবরণ নি¤েœ প্রদত্ত হলো :
بسم‌الله الرّحمن الرّحیم
و المؤمنون و المؤمنات بعضهم اولیاء بعض یأمرون بالمعروف و ینهون عن المنکر و یقیمون الصلاة و یوتون الزکاة و یطیعون الله و رسوله اولئک سیرحمهم الله ان الله عزیز حکیم

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী তারা একে অপরের বন্ধু। তারা সৎ ও ন্যায়ের আদেশ দেয় আর অন্যায় ও অসৎ কাজ থেকে বাধা দেয়। আর তারা নামায কায়েম করে। যাকাত দেয়। এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করে। তাদের প্রতিই আল্লাহ অতি শীঘ্র রহমত নাযিল করবেন। আল্লাহ তা‘আলা পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা তাওবা, আয়াত-৭১)
জনাব ড. লারিজানী
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মজলিসে শুরার মাননীয় স্পীকার!
ইসলামি দেশসমূহের পার্লামেন্টের স্পিকার মহোদয়গণ!
উপস্থিত ভদ্র মহোদয় ও ভদ্র মহিলাগণ!
প্রথমেই আমি ইসলামি উম্মাহর পার্লামেন্ট সদস্যদের এই মহতী বৈঠকে আপনাদের উপস্থিতির জন্য আমার পক্ষ হতে আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে সব সম্মানিত মেহমানকে স্বাগত জানাচ্ছি। আশা করি ইরানে আপনাদের অবস্থানকাল আনন্দময় হবে। আমি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সদস্য দেশগুলোর পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের ১৩তম বৈঠকে উত্থাপিত আলোচ্য বিষয়গুলো সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আপনাদের তাওফিক ও সাফল্যের জন্য আল্লাহ তা‘আলার দরবারে ফরিয়াদ জানাচ্ছি।
ইসলামি জাহানের বর্তমান অত্যন্ত স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে ইসলামি দেশগুলোর সমস্যা ও সংকটের বিরাট অংশের সমাধান সন্দেহাতীতভাবে বিভিন্ন দেশের চলতি বিষয়াদির ক্ষেত্রে জনগণের সত্যিকার সম্পৃক্ততা ও ইনসাফপূর্ণ অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল। এ বিষয়টি আইন প্রণয়নকারী পার্লামেন্টের ভূমিকাকে অতি পরিষ্কাররূপে প্রতিভাত করে, যে পার্লামেন্ট মূলত প্রত্যেক দেশের নিজস্ব বিষয়াদি উপস্থাপনে জনগণের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের বাস্তব প্রতীক। এরই প্রেক্ষাপটে ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য সুসংহত করার ক্ষেত্রে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সদস্য দেশগুলোর পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের মূল্যবান ভূমিকাকে কোনোভাবে অস্বীকার করা যাবে না। সন্দেহ নেই যে, এ ধরনের বৈঠক ইসলামি জাহানে ভ্রাতৃত্বের চেতনা শক্তিশালী ও উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে গতিশীল করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামি উম্মাহর মাঝে সমন্বয় ও সংহতি স্থাপনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কল্যাণকর ও ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করবে।
আজকের দিনে ইসলামি জাহান বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। মুসলমানদের বিভিন্ন বিষয়াদিতে নাক গলানো এবং তাদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ উৎসের ওপর বিদেশী শক্তিগুলোর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, দারিদ্র্য, বঞ্চনা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাবলি, অনুন্নতি, ইসলামি দেশগুলোর মাঝে মতবিরোধ প্রভৃতি হচ্ছে এমন সব সংকট ও চ্যালেঞ্জের নমুনা, আমরা যেগুলোর মুখোমুখি হয়ে রয়েছি। এসব চ্যালেঞ্জের মোকাবিলার পথ বিদেশী শক্তিগুলোর প্রতি তাকিয়ে থাকা ও তাদের ওপর নির্ভরশীলতা নয়।
সমকালীন ইতিহাসের অভিজ্ঞতা আমাদেরকে এই শিক্ষা দেয় যে, এসব শক্তি শুধু নিজেদের স্বার্থের চিন্তায় থাকে। আর তাও অন্যদের খরচের ওপর নির্ভর করে। তারা অন্যদের ব্যথা-বেদনা হ্রাস করার জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয় না। অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি প্রয়োগ, যেমন প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ অথবা সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে বলে হুমকি প্রদান, বিভিন্ন দেশ মারণাস্ত্র বিক্রি, যার ফলে হত্যা, ধংসাযজ্ঞ ও অস্ত্র প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে যায়, অনুরূপভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে আধিপত্যবাদ, শ্রেষ্ঠত্ব লিপ্সা ও ক্ষমতাচ্যুত করার নীতি অব্যাহত রাখার জন্য ইসলামি উম্মাহর মাঝে অনৈক্য ও মতবিরোধ সৃষ্টি প্রভৃতি হচ্ছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুরোনো সা¤্রাজ্যবাদী ও শোষণ নীতি অব্যাহত রাখার বহুমুখি প্রয়াসের একেকটি নমুনা।
উপস্থিত সমস্যা ও সংকট এবং চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ে পর্যালোচনা এবং এগুলোর মোকাবিলার পথ বের করার জন্য আমাদের দৃষ্টি অভ্যন্তরের দিকে দিতে হবে, বাইরের দিকে নয়। আমাদেরকে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা ও শক্তির ওপর নির্ভর করে আমাদের সমাজের সমস্যা ও সংকটগুলো আমাদের সম্মুখ থেকে অপসারণ করতে হবে, অন্যদের দিকে আশার দৃষ্টিতে চেয়ে থাকার মাধ্যমে নয়। যাতে আমাদের সমস্যবলি আমরা নিজেরা সমাধান করতে পারি। এর অর্থ একঘরে থাকার মনোভাব নয়; বরং তার বিপরীত। আমরা গঠনমূলক আদান প্রদান, বোঝাপড়া এবং অন্যদের সাথে ইসলামি দেশগুলোর সমকক্ষ নীতি অবস্থানের পক্ষপাতি। এমনভাবে যে, তাতে ইসলামি দেশগুলোর অভ্যন্তরে নাক গলানো এবং শোষণ লুণ্ঠনের কোনো অবকাশ থাকবে না।
আমরা বিশ^াস করি যে, যদি পারস্পরিক সম্পর্ক সুস্থ বোঝাপোড়া এবং আন্তর্জাতিক অধিকারের মূলনীতির ভিত্তিতে গড়ে উঠে তাহলে আজকের বিশে^র অধিকাংশ সমস্যা ও সংকটের সমাধান এমনিতেই হয়ে যাবে। সমস্যা এখান থেকে শুরু হয় যে, কোনো কোনো দেশ অন্যদের সাথে সমান ও গঠনমূলক সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী নয়। অন্যদের প্রতি তাদের দৃষ্টি হচ্ছে ওপর থেকে নিচের দিকে দৃষ্টিপাত করার মতো। তারা সব সময় একতরফা সম্পর্কের পক্ষপাতি আর তাও তাদের স্বার্থের অনুকূলে। আমাদের কর্তব্য হলো, আমাদের মতবিরোধগুলো দূর করে, নিজেদের মধ্যে সমন্বয় ও অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে নিজস্ব জনশক্তি ও সামাজিক সম্পদ এবং সমৃদ্ধ উৎসগুলোকে কাজে লাগিয়ে বিজাতীয়দের প্রতি নির্ভরশীলতা হ্রাস করব এবং ইসলামি জাহানের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও উন্নতশির হওয়ার লক্ষে এগিয়ে যাব। আমাদেরকে নিজেদের মধ্যে এই বিশ^াস শক্তিশালী করতে হবে যে, কেবল বিজাতীয়দের প্রতি নির্ভরশীল না হওয়া ও ইসলামি উম্মাহর মাঝে অধিকতর সংহতির মাধ্যমে আমরা ইসলামি জাহানের সমস্যা ও সংকটগুলো সমাধান করতে সফলকাম হব।
সম্মানিত উপস্থিতি!
ইসলামি জাহান কখনোই নিজেকে ফিরে পাবে না, যতদিন না মুসলিম দেশের জাতিসমূহ জনগণের ক্ষমতা অর্জন ও তাকে উন্নত করার ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতা ও যথার্থতা প্রমাণ করতে না পারবে, যতদিন সামাজিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তার ছায়াতলে সব শ্রেণি ও মানুষের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সওগাত বয়ে আনতে সক্ষম না হবে। এই লক্ষ্যে পৌঁছার ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপটি হবে এতদঞ্চল শান্ত থাকা এবং শান্তিপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্কের অধিকারী হওয়া। যতদিন বৈদেশিক ঝগড়া ও টানাপোড়েনে জড়িয়ে থাকবে ততদিন পর্যন্ত কোনো দেশই নিজস্ব অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারবে না। কোনো দেশই বিদেশী সেনা অভিযানের মাধ্যমে তার অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।
প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর বোমাবর্ষণ ও হত্যাকা- চালানোর মাধ্যমে কখনোই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচি এগিয়ে নেয়া কোনো দেশের পক্ষেই সম্ভবপর নয়। নিজস্ব সীমানার বাইরে সহিংসতা চালানো এবং নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যাবলি বাইরে নিক্ষেপ করার মাধ্যমে দেশের ভেতরকার উগ্রবাদ ও সহিংসতার অবসান কেউ ঘটাতে পারবে না। তার বিপরীতে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের মোকাবিলা, বর্ণ বা লিঙ্গভেদ, জাতীয়তা, ধর্মীয় তারতম্যের ঊর্ধ্বে উঠে সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করার মাধ্যমেই উগ্রবাদ ও সহিংসতার অবসান ঘটানো সম্ভবপর হতে পারে। এটি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য, যা বাস্তবায়নের জন্য আমাদের পার্লামেন্টসমূহ জনপ্রতিনিধিদের ফোরাম হিসাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। এই লক্ষেই আমি প্রস্তাব করতে চাই যে, ইসলামি পার্লামেন্টারি ইউনিয়নগুলোর সদস্যদের মাঝে সহযোগিতা, চিন্তার বিনিময় ও সহমর্মিতাকে অধিকতর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। যাতে পার্লামেন্ট সদস্যরা শুধু এই ফোরামে নয়; বরং বিশেষায়িত কমিশনগুলোতে মেয়াদি ফ্রেমে ও সুবিন্যস্ত আকারে তাদের প্রতিপক্ষের সাথে সমস্যাবলি ও তার সমাধান নিয়ে সম্মিলিত আকারে আলাপ আলোচনা করতে পারে।
মাননীয় সভাপতি!
অন্য যে কোনো সময়ের চাইতে অধিক মাত্রায় ইসলামি দেশগুলোতে জনশাসনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ ও তা কার্যকর করা একান্ত প্রয়োজন। পশ্চিমা বিশ^ মনে করে যে, ইসলামি চিন্তা-চেতনা ও জনশাসনের মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি এতদুভয়ের মাঝে সম্পর্ক বিপরীতমুখি। তারা এই অজুহাতেই সা¤্রাজ্যবাদের নতুন নতুন সংস্করণ ইসলামি দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দিতে ও তার প্রস্তাবনা পেশ করতে নিজেদের অধিকার আছে বলে মনে করে।
মুসলমান হিসেবে আইনশাস্ত্র ফিকাহ, শরীয়া ও ইতিহাসের যে বিশাল উত্তরাধিকার আমাদের আছে তার যথাযথ সংরক্ষণ আমাদের করতে হবে। দ্বীনের সাথে সংগতিপূর্ণ গণভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা একদিকে দ্বীনের রাজনৈতিক ও সামাজিক উপস্থিতির কারণ হবে এবং তা আইনগত ও জন সমর্থিত রূপ লাভ করবে, অন্যদিকে ধর্মীয় তথা ইসলামি ঐতিহ্যকে অত্যন্ত সুন্দর অবয়বে প্রতিষ্ঠিত ও অবিচল রাখা সম্ভব হবে।
আমাদের শাসন ব্যবস্থাকে জনভিত্তিক রাখার জন্য সর্বোত্তম মডেল হলো মহানবী (সা.)-এর শাসন পদ্ধতি। নবী করিম (সা.)-এর শাসন ব্যবস্থার সুমহান আদর্শের মধ্যে-যদিও তিনি ওহী ও নিষ্পাপতার সমুচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন এবং সব মুসলমানই সেই রহমতের নবীর প্রতি আসক্ত ছিলেন এবং তাঁর বাণীসমূহ আল্লাহর অহী থেকে উৎসারিত বলে জানতেন এবং এখনো সবাই সেভাবে জানেন; তবুও তিনি একজন শাসকের অবস্থান থেকে জনগণের সাথে পরামর্শ করতেন। তিনি তাদের প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসাসমূহ, এমনকি তাদের আপত্তিগুলোও খুশি মুখে শ্রবণ করতেন ও তার জবাব দিতেন। হযরত ইমাম মাহদী (আ.)-এর বিশ^জনীন হুকুমতেও- যদিও তিনি আল্লাহর পক্ষ হতে হেদায়াত ও নিষ্পাপতার উৎসস্বরূপ, কিন্তু তাঁর দিকে মানুষের এগিয়ে আসা ও সাদরে বরণ করে নেয়ার মাধ্যমেই সেই শাসন ব্যবস্থা বলবৎ হবে। আমরাও যেখানে নবী করিম (সা.)-এর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছি, সেখানে আমাদেরকেও ওহীলব্ধ শিক্ষাগুলোর প্রতি গভীর বিশ^াস নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে জনভিত্তিক করার উদ্যোগ নিতে হবে। এ লক্ষে জনগণের মতামত ও প্রতিবাদসমূহের প্রতি আমাদের বক্ষ খুলে দিয়ে মজবুতভাবে তা সুসম্পন্ন করতে হবে।
জনভিত্তিক শাসন এবং জনগণের মতামতের প্রতি মনোযোগ প্রদান হবে পশ্চিমা বিশে^র মোকাবিলায় আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকৌশল। আমরা আমাদের ভোটের বাক্স, পার্লামেন্টের ট্রিবিউন, স্বাধীন সংবাদপত্র, সংবাদ মাধ্যম ও চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্দেশ্যে বলতে চাই যে, তোমাদের হস্তক্ষেপের কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই। ইসলাম হচ্ছে জন শাসনের ধর্ম। শান্তির ধর্ম। যুদ্ধের ধর্ম নয়। ‘ইসলাম’ পরিভাষার মূল উৎস ‘সিল্ম’। বস্তুত ইসলামি জাহানের বাইরে বা ভিতরে সবখানে আমাদেরকে শান্তি, সন্ধি ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে কাজ করতে হবে। এই পথেই আমাদের সমস্যাসমূহ সমাধান করতে হবে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সকল দেশের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখ-তার প্রতি সম্মান পোষণ করে। ইরান মনে করে যে, ইসলামি উম্মাহর যাবতীয় সমস্যার সমাধানের একমাত্র পথ হচ্ছে সকল ইসলামি দেশের মাঝে সৌহার্দ্র ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ইসলামি দেশগুলোর সাথে তার সহযোগিতাকে ইসলামি সহমর্মিতা ও ভালোবাসার বন্ধনে ব্যাখ্যা করতে বিশ^াসী। আমরা কোনো ইসলামি দেশকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বি ভাবি না। আমরা বিশ^াস করি, এমনকি যেসব দেশের সাথে আমাদের মতপার্থক্য আছে, তাদের সাথেও পারস্পরিক সম্মানবোধের মূলনীতিতে আলাপ-আলোচনা ও সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় রাখতে পারি। দুঃখজনকভাবে কোনো কোনো দেশ রাস্তা ভুলে ভুলপথে চালিত হচ্ছে। তারা আমেরিকা ও যায়নবাদী সরকারের প্ররোচনার শিকার হয়ে ইসলামি উম্মাহর মাঝে ফাটল সৃষ্টির চেষ্টা করছে। আমাদের মতে যেসব শক্তি নিজেরা বিভিন্ন যুদ্ধ বিগ্রহ চাপিয়ে দেয়া, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ ও ইসলামি জাহানে উদ্ভূত সংকটগুলোর জন্য দায়ী এবং এসবের উৎস ও অনুঘটকের কাজ করছে আর রক্তপাত ঘটানো, অনৈক্য সৃষ্টি, সহিংসতার বিস্তার ও উগ্রবাদের প্রসার ঘটানোর মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব ও স্থায়িত্বের চাহিদা পূরণ করছে, তারা কোনো ক্রমেই চায় না এবং এমন অবস্থায় তারা নেই যে, মজলুম ও নির্যাতিত মানুষের পাশে এসে দাঁড়াবে।
মাননীয় সভাপতি!
সম্মানিত প্রতিনিধিবৃন্দ!
এই বৈঠক এমন পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন আল্লাহ পাকের অশেষ রহমতে উগ্রবাদী আইএস থেকে সৃষ্ট ধ্বংসাত্মক ও মারাত্মক হুমকির মাত্রা প্রচ-ভাবে হ্রাস পেয়েছে। যে আইএস পবিত্র ইসলামি শরীয়ার একটি বিকৃত ব্যাখ্যা অবলম্বন করে ইসলাম সম্পর্কে আগাগোড়া ভুল, অশুভ ও মারাত্মক একটি ধারণা বিশ^বাসীর সামনে উপস্থাপনের প্রয়াস পেয়েছিল। ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই আমরা এই সন্ত্রাসী দল এবং এ জাতীয় অন্যান্য দলের বিলুপ্তির দৃশ্য দেখতে পাব। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এই বিভ্রান্ত গ্রুপটির জন্মের শুরু থেকেই তাকে মোকাবিলা করার শুরুর কাতারে ছিল এবং সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় নিজস্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অন্যদেরকেও এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছে।
আমরা ইরাক ও সিরিয়ার সরকারসমূহের আহ্বানে আমাদের সামরিক উপদেষ্টাদের ঐ দুই দেশে প্রেরণ করেছি। যাতে ঐ দুই দেশের জনগণের পাশে থেকে তাকফিরি সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করতে পারেন এবং অন্যান্য দেশে তাদের অপতৎপরতা রোধ করতে সক্ষম হন। আমরা আশা করি অপরাপর সব মুসলিম দেশের সহযোগিতায় ইসলামি জাহানে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদের পুরোপুরি মূলোৎপাটন হয়ে যাবে এবং ইসলামি উম্মাহর সম্পদ ও শক্তি-সামর্থ্য এ ধরনের ধ্বংসাত্মক হুমকির মোকাবিলায় ব্যয় হওয়ার পরিবর্তে মুসলিম জনগনের কল্যাণ ও সৌভাগ্যের পথে ব্যয় করা সম্ভবপর হবে। সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংঘটিত করা, যা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাব হিসেবে এবং ‘বিশ^ সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে আমরা (ডঅঠঊ) শিরোনামে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ হতে সমর্থিত ও সর্বজনীন সম্মতি লাভ করেছে, তা ইসলামি উম্মাহর লক্ষসমূহ এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিদ্যমান সক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আইএস এর সহিংস, বিকৃত ও বিচ্যুত তৎপরতা ব্যর্থ ও পরাজিত হওয়ার একটি মূল অর্জন হচ্ছে ফিলিস্তিন ইস্যু ইসলামি উম্মাহর সর্বাধিক অগ্রাধিকারযোগ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে তার আসল অবস্থানে ফিরে আসা। আমরা বিশ^াস করি যে, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে ফিলিস্তিনে জবরদখল অব্যাহত থাকা এবং যায়নবাদী সরকারের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বমূলক ও অবারিত সমর্থন ও সাহায্য আব্যাহত থাকা। একই সাথে ফিলিস্তিনের মজলুম জাতি কুদ্স শরীফকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন সরকারের গঠনের ক্ষেত্রে তাদের ন্যূনতম অধিকার হতে বঞ্চিত হওয়া। কুদ্স শরীফে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের যে অশুভ অলক্ষুণে সিদ্ধান্ত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট গ্রহণ করেছেন, তা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ইসলামি জাহানের বলিষ্ঠ নীতি-অবস্থান অব্যাহত থাকা উচিত। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপ জাতিসংঘের প্রস্তাবের এতখানি প্রকাশ্য লঙ্ঘন যে, পশ্চিমা বিশে^ মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতি ও কৌশলের ঘোর সমর্থকরাও তাঁর সমালোচনা করেছে। তার এই পদক্ষেপ ফিলিস্তিন ও কুদস ইস্যুতে মুসলমানদেরকে অধিকতর সুসংহত করেছে।
কুদ্স ইস্যু- যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এতদঞ্চলে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা জোরালো হওয়ার প্রেক্ষিতে অনেক ক্ষেত্রে তার অগ্রাধিকার অবস্থান থেকে সরে গিয়েছিল, তা এখন তার আসল অবস্থানে ফিরে এসেছে। এ কারণেই যায়নবাদী সরকার ফিলিস্তিন ইস্যু পুনরায় ইসলামি জাহানের প্রধান ইস্যুতে পরিণত হওয়ায় বেজায় বেজার হয়েছে। সে চেষ্টা করছে, কতক কাল্পনিক বিষয় উত্থাপন করে ইসলামি জাহানের প্রধানতম ইস্যু ফিলিস্তিন ও আল কুদ্স আশ শরীফকে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে দিতে। এরই মধ্যে আমেরিকাও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ বিভিন্ন উপায়ে যায়নবাদী ইসরাইলের এই চক্রান্তের প্রতি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
ফিলিস্তিন, আল কুদ্স ও ইসলামি জাহানের বিরুদ্ধে নতুন চক্রান্ত এ পর্যন্ত এসবের চক্রান্তকারীদের জন্য উল্টা ফল বয়ে এনেছে। এ কারণে যায়নবাদী সরকার ও তার মদদদাতাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি জাতির নতুন আন্দোলন ও ইন্তিফাদার অভ্যুদয় আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমি নিশ্চিত যে, ইসলামি উম্মাহ ও ইসলামি সরকারগুলো মুসলমানদের প্রথম কেবলা হিসেবে আল কুদ্সের বিষয়টিকে কখনোই ভুলবেন না। একইভাবে এই লক্ষ্যের ব্যাপারে ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে সব ধরনের অনৈক্য ও বিচ্ছিন্নতা হতে দূরে থাকবেন এবং নিজেদের সামগ্রিক প্রচেষ্টাকে সুসমন্বিত করে মাঠে অবতীর্ণ হবেন আর সকল ফিলিস্তিনির তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়া এবং আল কুদ্স আশ শরীফকে কেন্দ্র করে সমগ্র ফিলিস্তিন ভূখ-ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করার জন্য তাঁদের প্রচেষ্টা ও উদ্যোগকে বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন।
জনাব সভাপতি
হাজেরানে মজলিস!
ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সদস্য দেশগুলোর পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সম্মেলনের সাথে সংশ্লিষ্ট সবচেয়ে মূল প্রশ্নটি হলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামি দেশগুলোর আইন প্রণয়নের সংসদগুলোর মুসলিম জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করা যায়? এর পরিষ্কার জবাব হচ্ছে, ইসলামি জাহানে ভ্রাতৃত্বের মনোভাব শক্তিশালী করা এবং সংহতি ও ঐক্যকে জোরদার করার লক্ষ্যে নিজ নিজ সরকার ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং নেতৃবৃন্দকে তাদের সমর্থন যোগানো এবং সাহায্য ও সহযোগিতা করে যাওয়া। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসলামি দেশগুলোর আইন প্রণেতা সংসদসমূহকে সমস্যা ও সংকটের মূল শিকড় ও ক্ষেত্রসমূহ চিহ্নিত করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। অবিচল প্রত্যয় ও সুদৃঢ় মনোবল নিয়ে সমস্যাদির মোকাবিলার জন্য বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে, পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।
আপনাদেরকে অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে, যাতে অভ্যন্তরীণ ও বাইরের নীতিমালার ক্ষেত্রে বিদেশী শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা, দলাদলি, অনৈক্যের বিষবাষ্প ছড়ানো, যুদ্ধংদেহী মনোভাব, ঘৃণার বিস্তার ঘটানো, আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থ অন্বেষণ, গোঁড়ামি ও মূর্খতা প্রভৃতি উপাদানের পরিবর্তন হয় এবং আত্মনির্ভরতা, সহাবস্থান, উদারতা, অন্যের প্রতি সম্মানবোধ. ঘনিষ্ঠতা, বন্ধুত্ব, ঐক্য, জ্ঞান-নির্ভরতা ও যুক্তি ও বুদ্ধিমতা তার স্থলাভিষিক্ত ও প্রতিস্থাপিত হয়।
এই লক্ষ্যপথে আমি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আপনাদের-সকল প্রিয়জনের-প্রতি, যারা আমার দৃষ্টিতে নিজ নিজ সমাজের গতিপথ নির্ণয়ের নেতৃত্বের ভূমিকায় আছেন, আমাদের সহযোগিতা ও সাহায্যের হাত প্রসারিত করছি। আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনাদের নিজের এবং ইসলামি উম্মাহর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নততর ভবিষ্যৎ নির্মাণের লক্ষে এসব সমুন্নত মানবিক মূল্যবোধ ও ভাবধারার প্রবর্তক ও সমর্থকের ভূমিকা পালন করবেন। এসব ভাবধারা যদি ইসলামি সমাজে বিস্তার লাভ করে তাহলে আমাদের সৃষ্টিস্বভাবের সঙ্গে সংগতিশীল ও সঠিক পথ রচনায় আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করতে সক্ষম হব।
পরিশেষে আমার প্রত্যাশা হলো, কুরআনুল করিম ও ইসলামের মহান পয়গাম্বরের সুন্দর সুন্নাতের মূল্যবান শিক্ষাসমূহের আলোকে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মূল্যবান নীতির ওপর নির্ভর করে শান্তি, ইনসাফ, ভ্রাতৃত্ব, সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে বিশে^র সকল মানুষ বিশেষ করে পরম সম্মানিত ইসলামি উম্মাহর জন্য এমন একটি জগৎ গড়তে পারব, যা হবে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা, সম্মান ও মানব কল্যাণে আকীর্ণ এবং বৈষম্য, শোষণ ও সহিংসতা হতে মুক্ত।
ওয়াস্ সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।